‘দ্য ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট’ এবং আমাদের সময়

ইতিহাসের পাতায় যখনই কোনো প্রজাতন্ত্র আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে, যখন রাজনৈতিক আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে এক তীব্র সংঘর্ষ ঘটে তখনই যেন ফিরে আসে এক নাম, নিক্কোলো ম্যাকিয়াভেলি। তাঁর রচনাগুলোর মধ্যে এমন এক রাজনৈতিক বোধ নিহিত, যা সময়কে অতিক্রম করে এসে প্রতিটি যুগে নতুনভাবে উচ্চারিত হয়। এই বোধকেই রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা ‘The Machiavellian Moment’ নামে চিহ্নিত করেন— একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংকট, যেখানে নৈতিকতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নির্দিষ্ট কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।

কিন্তু এই “ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট” কী?

এটি সেই মুহূর্ত যখন কোনো সমাজ রাজনৈতিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে পড়ে। যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা রক্ষার জন্য আদর্শ নয়, বাস্তবতা, কৌশল ও মানবস্বভাবের অসামঞ্জস্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই মুহূর্ত রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি নীরব চুক্তিভঙ্গের সময় — যেখানে ‘সততা’ আর ‘চতুরতা’-র মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি জাতি ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করে। ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন রাজনৈতিক চিন্তার এক উগ্র বাস্তববাদী। তাঁর মতে, রাজনীতি নীতিশাস্ত্রের শাখা নয়, মানব প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা এবং রাজনৈতিক সুযোগ-সন্ধানীতার বাস্তব প্রয়োগ। ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে তিনি বলেন, “It is better to be feared than loved, if you cannot be both।” এই বক্তব্য তাঁকে পাশ্চাত্য নৈতিক রাজনীতির বিপরীতে এক বিতর্কিত স্থানে দাঁড় করায়।

তবে ম্যাকিয়াভেলি নৈতিকতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। তাঁর ‘Discourses on Livy’ গ্রন্থে একটি রিপাবলিকের টিকে থাকার জন্য “সিভিক ভার্চু” বা নাগরিক গুণাবলির গুরুত্ব অনস্বীকার্য বলে বিবেচিত হয়েছে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, কেবল একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা নয়, একটি কার্যকর ও সতর্ক নাগরিক সমাজই একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। তাই তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল দ্বৈত প্রকৃতির। একদিকে নিষ্ঠুর বাস্তবতা, অন্যদিকে গঠনমূলক নাগরিকতা।

“দ্য ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট” ধারণাটি প্রধানত কোয়েন্টিন স্কিনার এবং জে.জি. পোককের বিশ্লেষণে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পোকক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Machiavellian Moment: Florentine Political Thought and the Atlantic Republican Tradition-এ বলেন, এই ধারণা এমন এক সময়কে নির্দেশ করে যখন একটি প্রজাতন্ত্র নিজস্ব নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শের গভীরে এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আমরা আদর্শগতভাবে সত্যিই স্বাধীন? নাকি ক্ষমতা আর স্বার্থপরতার দাসত্বে বন্দি?” এই মোমেন্টে ব্যক্তিরা আর রাষ্ট্রের প্রতি নিছক আনুগত্য দেখায় না। তারা প্রশ্ন তোলে—রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কারা ক্ষমতায় এবং সেই ক্ষমতার ভিত্তি কতখানি ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই দ্বন্দ্বের মুহূর্তেই আসে এক ধাক্কা — যা সমাজকে হয় আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যায়, নয়তো এক ভয়ঙ্কর কর্তৃত্ববাদী ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক ম্যাকিয়াভেলিয়ান প্রতিধ্বনি –

বাংলাদেশে বারবার এই ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট ফিরে এসেছে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় আদর্শ ছিল গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সমতা। কিন্তু স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, একনায়কতন্ত্র, সামরিক শাসন এবং গণতন্ত্রের নামে দলীয় স্বার্থ রাষ্ট্রকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। ১৯৭৫-এর পরিবর্তন, ১৯৯০-এর গণ-আন্দোলন কিংবা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনী সংকট—প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা দেখি এক ম্যাকিয়াভেলিয়ান দ্বিধা, জনগণের ভোটে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আদৌ জনগণের অধিকারকে রক্ষা করছে, নাকি কৌশল, ভয় এবং প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করছে?

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই আজকের বাংলাদেশও এক দীর্ঘ “ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট”-এর ভেতর দিয়ে অতিক্রম করছে। নাগরিকদের মনে প্রশ্ন—রাজনীতির নামে কি কেবল ক্ষমতার পুনঃউৎপাদন ঘটছে? আদর্শের মৃত্যু কি কেবল অতীতের ইতিহাস বইয়ে সীমাবদ্ধ? যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবেশে ম্যাকিয়াভেলিয়ান চিন্তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায়। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি, পুতিনের কৌশলী কর্তৃত্ববাদ, অথবা নরেন্দ্র মোদীর ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি—সবখানেই আমরা দেখি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নৈতিকতাকে পাশ কাটিয়ে বাস্তববাদ ও জনমত প্রভাবের এক অনিবার্য খেলা।

ম্যাকিয়াভেলির শিয়ালের মতো চতুরতা আর সিংহের মতো ভয়ের এই নীতি আজও সমানভাবে কার্যকর। এই কারণেই “ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট” কেবল ইতিহাসের একটি ব্যাখ্যা নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বাস্তবতার ভাষ্য। ‘দ্য ম্যাকিয়াভেলিয়ান মোমেন্ট’ আমাদের সময়ের দর্পণ। এটি কেবল রাজনৈতিক সংকট নয়, বরং নাগরিক পরিচয়ের, আদর্শের, এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এটি এক দার্শনিক আহ্বান “আমরা কি কৌশলের শিকার হয়ে যাব, নাকি আদর্শের পথে অবিচল থাকব?” ম্যাকিয়াভেলি হয়তো নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর লেখার গভীরে লুকিয়ে ছিল এক আশঙ্কা—যদি নাগরিকেরা জাগ্রত না হয়, তবে রাষ্ট্র কেবল একটি কর্তৃত্বের মেশিনে পরিণত হবে। তাই এই মোমেন্টে আমাদের দায়িত্ব হলো প্রশ্ন করা, বিশ্লেষণ করা এবং এমন একটি রাজনৈতিক চেতনা গড়ে তোলা যা নৈতিকতাকে ত্যাগ না করে বাস্তবতাকে বোঝে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন