Home Blog Page 126

রাজনৈতিক দলে সংস্কারের জরুরি আলাপ কেউই করছে না : মাহফুজ আনাম , সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

0

“… এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, আমাদের গণতন্ত্র ও সুশাসনে দুরবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর, বিশেষত দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার অভাব।

… শিক্ষার্থী ও তাদের নতুন নেতৃত্ব যখন বলছে, সংবিধান সংশোধন না করা হলে স্বৈরশাসন আবারও ফিরে আসবে—সেটা সম্পূর্ণ সঠিক। এর সঙ্গে আমরা যোগ করতে চাই, সংবিধান সংশোধন অবশ্যই ন্যায্য, কিন্তু কেবল সেটাই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। বিশেষ করে বিএনপির—কারণ তারা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এবং বলা যায় যে, ক্ষমতার দোরগোড়ায়।

আমরা বিএনপির ‘রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের রূপরেখা’ শীর্ষক সংস্কার প্রস্তাবের ৩১ দফা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছি। …কিন্তু তাদের প্রস্তাবের কোথাও দলীয় সংস্কারের বিষয়ে কিছু নেই—যেখানে তাদেরও সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। অতীতে আমরা দেখেছি, দলের ভেতরে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা ছাড়া শাসন প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা আনা সম্ভব না। সুতরাং এই বিষয়টি বিএনপির নিশ্চিত করা উচিত। … বিএনপির গঠনতন্ত্র চেয়ারপারসনকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছে, যার ফলে তিনি কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।

… যদি দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তে নেতাকর্মীদের প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকে এবং যদি নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি দলীয় প্রধানের ওপর নির্ভর করে, তাহলে কেউ কি ভিন্নমত পোষণের সাহস দেখাবে? এমন অবারিত ক্ষমতা কি একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার জন্ম দেবে না—যার পরিণতি অদূর ভবিষ্যতেই ঘটতে পারে? এমন একটি দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে সরকার গঠন করলে সেটা কি এক ব্যক্তির সরকার, এক ব্যক্তির সংসদ, এক ব্যক্তির রাষ্ট্র হয়ে উঠবে না?

এমন সম্ভাবনা পরিবর্তনের যে ব্যাপক জনদাবি, বিএনপি কি সেটা উপেক্ষা করতে পারে? এটা কি তাদের জন্য বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে? … প্রধানমন্ত্রীর জন্য টানা সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ এবং একবার বিরতি দিয়ে পুনরায় নির্বাচনের সুযোগ রাখার যে প্রস্তাব তারেক রহমান দিয়েছেন, তা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে ভালো। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির যে চিন্তা তিনি প্রকাশ করেছেন, সেটাও ইতিবাচক। একটি উচ্চকক্ষ গঠনের ধারণাও অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু, এর সদস্যপদ যদি যথাযথ অনুপাতে নির্ধারিত না হয়, তাহলে সেটাও নিম্নকক্ষের মতোই হয়ে যাবে এবং সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার কাজটিও বাধাগ্রস্ত হবে।

আর এর সবই লোক দেখানো পরিবর্তন হয়ে থাকবে, যদি প্রকৃত ক্ষমতায় পরিবর্তন না আসে। আর সেই জন্যই প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধান এবং সংসদ নেতা এই তিনটি পদ একজনের হাতে থাকা উচিত না। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা একই ব্যক্তি হলেও প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান অবশ্যই আলাদা হওয়া উচিত। দল পরিচালনা ও সরকার পরিচালনার ক্ষমতা দুটি ভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে হওয়া উচিত। এতে নেতৃত্ব বিকাশে সহায়তা হয়, প্রধানমন্ত্রীকে অন্য মতামতের সামনে দাঁড় করায় এবং তাকে দলীয় ভাবনার প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। তা না হলে সবকিছু একক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, যার ফলে ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার হয়।

… এই সুযোগ না থাকলে দলে কোনো সৃজনশীলতা ও উদ্দীপনা থাকবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে কেবল জন্ম নেবে মোসাহেব। আমরা দেখেছি এই কারণেই আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোই ধ্বংস করেননি, তিনি গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী নিজের দলটিকেও ধ্বংস করে দিয়েছেন। বিএনপি উচিত আওয়ামী লীগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া। তারেক রহমান কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং এখন তার কাজের মধ্যে অন্যতম হওয়া উচিত, দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। ”


অভ্যুত্থানের তরুণেরা ব্যর্থ হলে , জাতির দুর্ভাগ্যই বাড়বে : আলতাফ পারভেজ , লেখক ও গবেষক

0

“… এনসিপির ছাত্র-তরুণেরা দেখছেন, সংস্কার প্রশ্নে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোকে তাঁদের মিত্র হিসেবে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আবার সমাজ-রাজনীতি-প্রশাসনের প্রচলিত কাঠামো বদলের জন্য চাপ তৈরির জোরও কমছে তাঁদের। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো পরিস্থিতিকে যেকোনো উপায়ে নির্বাচনমুখী করে ফেলতে আগ্রহী।

… সংস্কার প্রশ্নে বর্তমান টানাপোড়েনে যদি পুরোনো-প্রথাগত-সংস্কারবিমুখ মনোভাব জয়ী হয় এবং তার মোকাবিলায় এনসিপি যদি অসফল হয়, তাহলে জাতির দুর্ভাগ্যের ইতিহাসে নতুন পালকই কেবল যুক্ত হবে; যেমনটি ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধের পর জাসদের ব্যর্থতায় এবং ১৯৯০-এর পর ‘তিন জোটের রূপরেখা’ বাস্তবায়নে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর সচেতন উদাসীনতায়।

… নিশ্চিতভাবে এ মুহূর্তে নির্বাচন জরুরি এবং এটাই সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা দরকার। কিন্তু ভোটের আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থবহ এবং মৌলিক ধাঁচের কিছু সংস্কারেও রাজি হতেই হবে। কিন্তু সে রকম না হলে ছাত্র আন্দোলনের তরুণেরা কী করবেন? দল গঠন করে ভোটে লিপ্ত হওয়ার ভেতর দিয়ে তাঁরা কিছু অর্জন করতে সক্ষম কি না আদৌ?

… তারকা হোটেল আর মিডিয়ার পরিসর ছেড়ে গ্রামগঞ্জের পথঘাটে যদি গত আট মাস তাঁরা মানুষের সঙ্গে সংলাপে লিপ্ত হতেন, তাহলে ‘দ্বিতীয় রিপাবলিকের’ জন্য সমর্থন চেয়ে স্থিতিশীলতাপন্থী পুরোনো দলগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো না বলেই মনে হয়।

… সংস্কারের পক্ষে জনমত তৈরির জন্য যখন প্রয়োজন ছিল বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কাঠামোকে ক্রমে প্রান্তের দিকে ছড়ানো, তখন দ্রুতলয়ে একটা নাগরিক কমিটি করে ফেলে সংস্কারের সমাবেশশক্তিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে বলেই কারও কারও অভিমত।

‘৩৬ জুলাই’-এর আগের হাজার হাজার মিছিলের মুখকে এখন আর কোথাও দেখা যায় না। ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, উত্তরা-বসুন্ধরা-বনশ্রীর সেই শত শত নারীমুখ এখন আর কোথাও নেই। কেন তাঁদের ধরে রাখা গেল না, সেই আত্মজিজ্ঞাসা এ সময় জরুরি বৈকি, যদি তাঁদের আবার সমাবেশগুলোতে ফিরিয়ে আনতে হয়।

… ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সংগঠকদের সঙ্গে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রশক্তিরও বিচ্ছিন্নতা ঘটে গেছে। ছাত্রনেতারা সচিবালয়মুখী হওয়ামাত্র স্বাভাবিকভাবে তাঁদের ওপর নিয়োগ ও বদলির তদবির বেড়ে যায় এবং তাঁদের মূল্যবান সময় ও মনোযোগের অনেকটা ওই সব কাজকারবারে চলে যায়। এতে মাঠে, বিশেষ করে জেলা-উপজেলায় সমাবেশশক্তি গড়ার কাজটি ব্যাহত হয়।

সমাবেশশক্তি কমে যাওয়ার আরেকটা কারণ ছিল ছাত্রনেতাদের অপ্রযোজনীয়ভাবে ডানে-বামে মতাদর্শিক বিতর্কে লিপ্ত হওয়া। এই কাজে কিছু বুদ্ধিজীবীর ইন্ধন ও উৎসাহ ছিল। তাতে করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক চিন্তা থেকে শ্রমিক-কৃষক-দলিত সমাজের জরুরি এজেন্ডা উধাও হয়ে যায়।

আবার অভ্যুত্থানের সরকার অনেক চেষ্টা করেও তাদের প্রশাসনিক কর্মতৎপরতাকে জনপ্রত্যাশার কাছাকাছি আনতে না পারার দায়ও বর্তাচ্ছে ছাত্রনেতাদের ওপর। সরকারের ভেতর ছাত্রনেতারা থাকায় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক-মহাপরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের সম্পর্ককে বিবেচনায় নিয়ে জনগণের কাছে এই সরকার ও ছাত্র আন্দোলন সমার্থক হয়ে ধরা দেয়। এসবও এনসিপির এখনকার ইমেজে যুক্ত আছে।

… স্রেফ একটা নির্বাচন রাজনৈতিক অস্থিরতা-অনিশ্চয়তা কমাতে পারলেও বাংলাদেশকে কেবল সেটা আবার ১৯৯১ সালে স্থাপন করবে।…এ অবস্থায় হাজার হাজার ছাত্র-তরুণের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনবিরোধী অবস্থান না নিয়েও কীভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ও স্বপ্নগুলো বাস্তব করে তোলা যায়।

সেই কৌশল কী হবে? শহরে প্রেস কনফারেন্স ডেকে বারবার গণপরিষদ নির্বাচন আর আওয়ামী অপকৃতির কথা বলা? মনে হয়, এ রকম কৌশল এনসিপির সমাবেশশক্তিতে র‌্যাডিক্যাল কোনো বদল ঘটাতে আর সক্ষম নয়।

বরং দলটির নেতৃত্ব পর্যায়ে মোটাদাগে শুদ্ধি অভিযান, আত্মজিজ্ঞাসা এবং পুনর্জাগরণ জরুরি। অভ্যুত্থানের এ রকম কারিগরদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো গত আট মাসের নির্মোহ রিপোর্ট কার্ড তৈরি। প্রয়োজনে ভুল নেতৃত্ব এড়িয়ে সরাসরি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে চলে যাওয়া, নতুন ‘৩৬ জুলাই’-এর জন্য ক্রমাগত নতুন মানুষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।

… কুলীনদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে বাংলাদেশে নতুন বন্দোবস্ত সম্ভব কি না, নাকি নিচুতলার মানুষদের আরও বৃহত্তর শক্তি সমাবেশ প্রয়োজন, সেটাই এখনকার ‘এক নম্বর প্রশ্ন’। বাংলাদেশ কেবল পুরোনো বন্দোবস্ত নয়, রাজনীতি করার পুরোনো রীতিরও বদল চাইছে। “


বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে ১০ গুণ : গবেষণা

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু নিয়ে নতুন শঙ্কার জানান দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) আর্থ, অ্যাটমোস্ফিয়ারিক এবং প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের একদল গবেষক। গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। আগে যে ধরনের বড় ঝড় ১০০ বছরে একবার হতো, এখন তা ১০ বছরেই হতে পারে। এই ঝুঁকি অঞ্চলভেদে ও মৌসুমভেদেও ভিন্ন হতে পারে। দেশে বাড়ছে এসব ঘূর্ণিঝড়ে জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও। বাংলাদেশের উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি ১০ গুণ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু নিয়ে আরও শঙ্কা আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে প্রাক্‌-মৌসুমি বা মৌসুমি বায়ু পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে অসময়ে প্লাবিত হবে নতুন নতুন এলাকা ও কৃষিজমি। দেশের উপকূলীয় এলাকায় কৃষি এবং সার্বিকভাবে জনজীবনে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি বাংলাদেশের এই ভয়ানক ভবিষ্যতের চিত্র উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়ান আর্থ নামের বিজ্ঞান সাময়িকীতে। ১১ এপ্রিল এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নতুন এ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম তথ্য-সংকটাপন্ন কিন্তু দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। বৈজ্ঞানিকভাবে, বাংলাদেশ হলো জটিল ও ক্রমিক দুর্যোগ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান।

এমআইটির এই গবেষকদের একজন এবং প্রতিষ্ঠানটির আর্থ, অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেস বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাই জ্যান্ডার সাভেলা প্রথম আলোকে ই-মেইলে বলেন, ‘বাংলাদেশ যে পরিমাণ ঝুঁকির মুখোমুখি, তা সর্বোচ্চ মানের মডেলিং, সর্বোত্তম বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জরুরি সহযোগিতা দাবি করে।’বাংলাদেশের অবস্থান এমন একটি ভৌগোলিক স্থানে যেখানে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে। এটি নিচু বদ্বীপ অঞ্চল। এখানে আছে ফানেল আকৃতির উপকূল। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, তীব্র ঘূর্ণিঝড় এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত—বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির দিক প্রকট করছে।

সিন্ধু পানি চুক্তি – স্থগিত করল ভারত , দু’দেশে তার প্রভাব কী পড়বে?

0

২০১৯ সালের কথা। পুলওয়ামায় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপর সন্ত্রাসী হামলার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে বলেছিলেন, ‘‘রক্ত এবং জল একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না।’’ কিন্তু সেই সময়ে ভারত শেষ পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত না করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবার পহেলগাঁও হামলার পরে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হল। অনেকেই বলছেন যে এই পদক্ষেপের সূত্রে শুরু হল দুই দেশের পানি যুদ্ধ। এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ নদী সিন্ধু এবং তার পাঁচ উপনদ বিতস্তা (ঝিলম), চন্দ্রভাগা (চেনাব), ইরাবতী (রবি), বিপাশা (বিয়াস), শতদ্রু (সতলুজ) ভারত থেকে পাকিস্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এ নদগুলোর পানি ন্যায্যতার সঙ্গে ভাগাভাগি করর লক্ষ্যে ‘ইন্ডাস ওয়াটার ট্রিটি’ বা সিন্ধু জল চুক্তি ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায়।

চুক্তিটি বাস্তবায়নে উভয় দেশ থেকে একজন করে কমিশনার নিয়ে গঠিত হয় স্থায়ী সিন্ধু কমিশন। চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী কমিশন নিয়মিত ভ্রমণ ও তথ্য আদান-প্রদান এবং বছরে অন্তত একটি সভা করে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কমিশন মোট ১১৭টি সভা করেছে। এছাড়া চুক্তি সম্পর্কিত যেসব মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তা চুক্তিতে উল্লেখিত উপায়ে ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। এই চুক্তি পৃথিবীর একমাত্র আন্তসীমান্ত পানি চুক্তি যা নদীর পানি ভাগ না করে নদীগুলোই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব দিকের সুটলুজ, বিয়াস, রবি নদীর বেশিরভাগ পানি বাধাহীনভাবে ব্যবহার করতে পারবে ভারত। পশ্চিম দিকের সিন্ধু, চেনাব, ঝিলামের পানির অধিকাংশ পাবে পাকিস্তান।

চুক্তিতে রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলির ওপর জলবিদ্যুৎ বা বিভিন্ন প্রকল্প বানানোর অধিকার ভারতের রয়েছে। সেই প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানানোর অধিকারও চুক্তি দিয়েছে পাকিস্তানকে। চুক্তিটি উভয় দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নয়। তবে, পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় নদীর দিক থেকেই ভাটির দেশ হওয়ায় পাকিস্তান আশঙ্কা করে যে ভারত যে কোনও সময়ে বন্যা বা খরার সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে। ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের কিষেণগঙ্গা ও রাতলে নামে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত নদীর পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সিন্ধু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে, ২০১৬ সালে এমন অভিযোগ তোলে পাকিস্তান।এই সব নদী থেকেই পাকিস্তানের কৃষিক্ষেত্রে শতকরা ৮০ ভাগ সেচের জল সরবরাহ করা হয়।

সিন্ধু চুক্তি অনুসারে পশ্চিমের নদীগুলো ভারতকে বিশেষ কয়েকটি উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন, ছোট মাপের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যাতে জল আটকে রাখার প্রয়োজন হয়ই না বা খুব কম হয়, সেগুলো বানাতে কোনও অসুবিধা নেই। পাকিস্তান মনে করে, এই দুটি প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত যেভাবে ড্যাম বা জলাধারের নকশা প্রস্তুত করেছে তাতে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। ইসলামাবাদ পশ্চিমের নদীগুলোয় ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে বারবার আপত্তি তুলেছিল। বিষয়টি তারা হেগ-ভিত্তিক স্থায়ী সালিসি আদালতে নিয়ে যায়। ভারত এই বিরোধের বিষয়ে হেগের সালিসি আদালতের এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করেছে। এই বিরোধের প্রেক্ষিতে ভারত ২০২৩ সালে সিন্ধু চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের জন্য পাকিস্তানকে চিঠি দেয়।

চুক্তির আওতায় থাকা মোট পানির প্রায় ৩০ শতাংশে পায় ভারত। নদীর পানি ব্যবহারের এই অনুপাত ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। জনসংখ্যার চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও চুক্তির অন্য প্রভাবগুলোর সাপেক্ষে চুক্তির শর্তগুলো নতুন করে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করে ভারত। সিন্ধু, ঝিলাম, চেনাব এই তিনটি নদী ভারত-প্রশাসিত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-প্রশাসিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই ভারত সিন্ধু চুক্তির পুনর্মূল্যায়ণ শুরু করে। হামলার পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, নয়াদিল্লি সিন্ধু উপত্যকার উজানে থাকার সুবিধাটি পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাবে।

এবার ভারত এই জলধারাকে হাতিয়ার করে চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের ভাষ্য-পাকিস্তান যদি সীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধ করে এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনে তবে চুক্তি আবার আগের মতোই চলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্যই ভারত পানি বণ্টন ইস্যুটিকে ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের ধারণা — পর্যাপ্ত পানি নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কিষেণগঙ্গা বাঁধ ও রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাঁধের উচ্চতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারে ভারত।

দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে তিনবার, একবারও সিন্ধু পানি চুক্তি ব্যাহত হয়নি। আন্তর্জাতিক চুক্তির অবমাননার করে ন্যায্য পানির হিস্যা বন্ধ করে প্রতিবেশী দেশের জনসাধারণকে শাস্তি দিতে ভারত চায়নি, কিন্তু এবার করল। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে সম্ভবত বোঝাতে চাইছে, দশকের পর দশক ধরে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে তারা কতটা বিরক্ত, ব্যতিব্যস্ত ও রক্তাক্ত।

মৃত্যুর এক বছর পরেও নড়তে থাকে মৃতদেহ !

মৃত্যুর পর মানবদেহের অবস্থা নিয়ে বহু দিন ধরেই বিভিন্ন মতামত ও গবেষণা রয়েছে, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় এক অপ্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার Australian Facility for Taphonomic Experimental Research (AFTER) পরিচালিত গবেষণায়, ১৭ মাসের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে মৃতদেহের অব্যাহত নড়াচড়া শনাক্ত করা হয়। এ আবিষ্কারটি আমাদের মৃত্যুর পর দেহের শারীরিক অবস্থার বোঝাপড়ায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যা ফরেনসিক বিজ্ঞানে সময়-নির্ধারণের প্রক্রিয়া নতুন করে সংজ্ঞায়িত করতে সহায়ক হতে পারে।

মানবদেহের মৃত্যুর পরের অবস্থা সম্পর্কে জানা গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিলো। যদিও টাফোনমি শাস্ত্রের মাধ্যমে মৃত্যু পরবর্তী পচন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থা এবং দেহের অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তবুও মৃতদেহের শারীরিক নড়াচড়ার বিষয়টি পূর্বে তেমনভাবে পর্যবেক্ষিত হয়নি। অ্যালিসন উইলসনের নেতৃত্বে AFTER দলটি ১৭ মাসব্যাপী একাধিক মৃতদেহের ওপর টাইম-ল্যাপ্স চিত্রগ্রহণ করে এই অস্বাভাবিক নড়াচড়ার প্রমাণ উদ্ধার করেছে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যু পরবর্তী শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা, বিশেষত দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নড়াচড়া। দেহগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রেখে প্রতি ৩০ মিনিট পর পর চিত্রগ্রহণ করা হয়। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, মৃতদেহের হাত, পা, শরীরের বিভিন্ন অংশে ধীরে ধীরে কিন্তু অব্যাহতভাবে কিছু নির্দিষ্ট নড়াচড়া লক্ষ্য করা গেছে।

মৃত্যুর পর দেহের যে ধরনের নড়াচড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা শারীরবৃত্তীয়ভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। দেহের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, বিশেষ করে সিনভিয়াল জয়েন্ট, টেন্ডন, এবং পেশি শুষ্ক হয়ে যাওয়ার পর দেহের কিছু অংশে টান সৃষ্টি হয়, যার ফলে প্যাসিভ মোশন হতে পারে। এছাড়া মৃতদেহের পচন প্রক্রিয়া ধীর এবং ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া, যার মধ্যে প্রাকৃতিক উপাদানগুলির উপস্থিতি মৃতদেহের অবস্থা পরিবর্তন করতে সাহায্য করে। বিশেষভাবে বাহ্যিক কোনো শক্তি বা প্রাণশক্তির দরকার নেই—শুধু প্রাকৃতিক শক্তি এবং শারীরবৃত্তীয় মেকানিজমের সমন্বয়ে এই নড়াচড়া ঘটে।

এই নতুন আবিষ্কার ফরেনসিক বিজ্ঞান এবং আইনগত তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। মৃতদেহের অবস্থান পরিবর্তন, পচনের স্তর, এবং রিগর মর্টিস (rigor mortis)—এসবই বর্তমানে মৃত্যুর সময় নির্ধারণের জন্য মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যদি মৃতদেহের কোনো অঙ্গ সচেতনভাবে নড়তে থাকে, তবে এসব উপাদানগুলির নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এর ফলে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে প্রমাণের বিশ্লেষণ এবং মৃত্যুর সময় নির্ধারণে পুনঃমূল্যায়নের প্রয়োজন পড়বে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো অপরাধী শিকারকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে হত্যা করে এবং পরে মৃতদেহের অবস্থান পরিবর্তন হয়ে যায়, তবে ঐ মৃতদেহের অবস্থান ও পচনের স্তরকে এককভাবে নির্ভরশীল না রেখে আরো সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করতে হবে। এতে পুলিশি তদন্তে নতুন কৌশল এবং প্রযুক্তির ব্যবহার প্রয়োজন হবে।

মৃত্যুর পরে দেহের চলাচল অনেক সংস্কৃতিতে অলৌকিক শক্তি বা আত্মার আটকে থাকার চিহ্ন হিসেবে দেখানো হয়। বাংলার গ্রাম্য সমাজে একে “আত্মা মুক্তির অক্ষমতা” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে বিশ্বাস করা হয় মৃতদেহে কোনো অশান্ত আত্মা থাকতে পারে, যা মৃতদেহকে নড়াচড়া করতে বাধ্য করে। মধ্যযুগীয় ইউরোপের ভ্যাম্পায়ার (undead) ধারণা এই ধরনের বিশ্বাসের ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছে। এই নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আমাদেরকে মৃত্যুর পরের সময়কে একটি দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়া হিসেবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। মৃত্যু কি একবারে শেষ না, বরং একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া, এই চিন্তা মানব অস্তিত্বের সার্বিক ধারণা ও বিশ্বাসে একটি বিপ্লবী পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে।

আইনি বিচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুর সঠিক সময় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি হত্যাকাণ্ড বা আত্মহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। তবে মৃতদেহের অব্যাহত নড়াচড়া ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল করতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশেষত মৃতদেহের পুনঃপ্রসারণ বা প্লাস্টিক সার্জারি ক্ষেত্রে এই নড়াচড়ার গভীর বিশ্লেষণ চিকিৎসকদের জন্য নতুন কৌশলগুলো তৈরি করতে সাহায্য করবে।

AFTER এর এই গবেষণা আমাদের শারীরিক মৃত্যু সম্পর্কে পুরনো ধারণাগুলি চ্যালেঞ্জ করেছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা মৃত্যুর পরের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পেরেছেন, যা ফরেনসিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন কৌশল উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া, সাংস্কৃতিক ও দর্শনীয় প্রতীক হিসেবে এই নড়াচড়া আমাদেরকে মৃত্যু ও জীবনের অস্তিত্ববাদী ভাবনা নতুন করে চিন্তা করতে প্ররোচিত করেছে। এটি মৃত্যুর পরের পৃথিবীকে কেবল অব্যক্ত রহস্য হিসেবে নয়, একটি প্রাকৃতিক ক্রমবর্ধমান প্রক্রিয়া হিসেবে উপলব্ধি করতে সহায়তা করছে।

ডিমেনশিয়া ঠেকাবে গ্রীন টি –

জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, নিয়মিত গ্রীন টি পান করার অভ্যাস বয়স্কদের মস্তিষ্কে হোয়াইট ম্যাটার লেজন কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এই লেজনগুলো সাধারণত মস্তিষ্কের ক্ষুদ্র রক্তনালীর রোগের (Small Vessel Disease) লক্ষণ, যা স্মৃতিভ্রংশ ও মানসিক দুর্বলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গবেষণায় জাপানের ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ৮,৭০০ জন অংশগ্রহণকারীকে বিশ্লেষণ করা হয়। দেখা যায় যারা প্রতিদিন তিন গ্লাস বা তার বেশি গ্রীন টি পান করেন, তাদের হোয়াইট ম্যাটার লেজনের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। সবচেয়ে বেশি গ্রীন টি পানকারীদের ক্ষেত্রে এই হ্রাসের হার ছিল প্রায় ৬%।

এই ফলাফল গবেষকদের মনে করিয়ে দেয়, গ্রীন টি-তে থাকা ক্যাটেচিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-নিরোধী উপাদানসমূহ মস্তিষ্ককে রক্তনালীর ক্ষয় এবং অবক্ষয় থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। এখনো এই প্রক্রিয়ার নিখুঁত ব্যাখ্যা চলমান গবেষণার বিষয় হলেও এটি গ্রীন টি’র দীর্ঘকালীন উপকারিতা সংক্রান্ত আলোচনায় আরেকটি শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে যুক্ত হলো। গবেষণায় পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কফি পানকারীদের ক্ষেত্রে এই ধরণের কোনো মস্তিষ্ক-সুরক্ষাকারী প্রভাব পাওয়া যায়নি।

এর আগের গবেষণাগুলোও ইঙ্গিত দিয়েছিল যে গ্রীন টি নিয়মিত পান করলে স্মৃতি এবং মনোযোগ বাড়ে। এতে থাকা এল-থিয়ানিন নামক একটি অ্যামিনো অ্যাসিড চাপ হ্রাস করে ও মনের প্রশান্তি এনে দেয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। এমনকি এটি আলঝেইমারস বা পারকিনসন্সের মতো স্নায়বিক রোগ প্রতিরোধেও সহায়ক হতে পারে। তাই মস্তিষ্ককে সতেজ ও সুস্থ রাখতে চাইলে গ্রীন টি-কে প্রতিদিনের জীবনের একটি ছোট অথচ কার্যকর অভ্যাস হিসেবে গ্রহণ করুন।

এ বছর বাংলাদেশে , আরও ৩০ লাখ মানুষ ‘অতি গরিব’ হবে : বিশ্বব্যাংক

এ বছর বাংলাদেশে আরও ৩০ লাখ মানুষ অতি গরিব হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে।বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চলতি বছরে শ্রমবাজারের দুর্বল অবস্থা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শ্লথগতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা গরিব মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। এতে বৈষম্য আরও বাড়বে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে।

শুধু অতি দারিদ্র্য হার নয়; জাতীয় দারিদ্র্য হারও বাড়বে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, অতি দারিদ্র্যের হার ৭.৭% থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৯.৩% উঠবে। জাতীয় দারিদ্র্য হার গত বছরে ছিল সাড়ে ২০%। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ২২.৯% হবে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুসারে, দেশের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবটি বিবেচনায় আনলে ২০২৫ সাল শেষে অতি গরিব মানুষের সংখ্যা হবে ১ কোটি ৫৮ লাখের মতো। অন্যদিকে জাতীয় দারিদ্র্য হার বা গরিব মানুষের সংখ্যা হবে ৩ কোটি ৯০ লাখের মতো। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা দিয়ে গরিব মানুষ চিহ্নিত করা হয়। ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) অনুসারে, দিনে ২.১৫ ডলার আয় করে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার সামর্থ্য না থাকলে অতি দরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। এটি আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা।

তবে প্রতিটি দেশের জন্য নিজস্ব একটি দারিদ্র্যরেখা ঠিক করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যসীমার মানদণ্ড হলো খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবা কেনার জন্য একজন মানুষের প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচ করার সামর্থ্য যদি না থাকে, তাহলে তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবেন বা গরিব হয়ে যাবেন। বিবিএসের হিসাবমতো, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরির হার বৃদ্ধি বেশি ছিল। এরপর ৩৯ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। গত ৩ বছরের বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষের বিশেষ করে গরিব মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে।

হামাস কেন আত্মসমর্পণ করবে না : ডেভিড হার্স্ট , সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক , মিডল ইস্ট আই

“… টানা ১৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধ এবং ২ মাস ধরে অনাহারের পর গাজার নেতারা টাকা নিয়ে ভেগে যাবেন, যেমনটা একবার ফাতাহ নিয়েছিল—এমন কথা ভাবাটা অজ্ঞতা। এমন প্রত্যাশা বলে দেয়, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর শত্রুকে কতটা কম বোঝেন। হামাসের প্রতি ইসরায়েলের শেষ ‘প্রস্তাব’ যে কার্যত তাদের আত্মসমর্পণে গড়াত, তা বুঝতে ভুল করার অবকাশ নেই। এ প্রস্তাবের মানে আসলে ৪৫ দিনের মতো খাবার ও পানির বিনিময়ে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে ফিরিয়ে দেওয়া এবং হামাস সদস্যদের নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেওয়া।

এ প্রস্তাবের জবাবে হামাস বলেছিল, তারা ইসরায়েলের কারাগারে থাকা নির্দিষ্টসংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দির বিনিময়ে সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে তৈরি আছে। শুধু তা-ই নয়, তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিরও প্রস্তাব করেছিল, যার আওতায় হামাস নিজেদের সুড়ঙ্গগুলো আবার তৈরি করবে না কিংবা অস্ত্র বানাবে না এবং গাজার শাসন ফিলিস্তিনের অন্য দলগুলোর কাছে হস্তান্তর করবে। তবে এ যুদ্ধের শুরুতে দেওয়া দুটি শর্ত থেকে সরে আসেনি হামাস। একটি শর্ত হলো—তারা নিরস্ত্র হবে না। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তারা গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং যুদ্ধের সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত সমাপ্তি চায়। এটা বারবার সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে অন্তরায় নেতানিয়াহু নিজেই। তিনি দুই দফায় হামাসের সঙ্গে চুক্তি করেছেন, কিন্তু একতরফাভাবে নিজেই তা ভেঙে দিয়েছেন।

… নেতানিয়াহু যুদ্ধে ফিরে যান শুধু বাজেটবিষয়ক ভোটে আসন্ন পরাজয় থেকে নিজের জোটকে বাঁচাতে। যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্যগুলো অনেক আগেই ব্যবহার করা হয়ে গেছে। … হামাস এবং গাজাবাসী প্রতি রাতে যে সাজা ভোগ করছে, তাতে সংগঠনটির নত না হওয়ার অনেক কারণ আছে। গত মার্চ মাসে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় হামলা চালানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেড় হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের হামলায় হামাসের প্রথম সারির নেতৃত্ব, বেসামরিক সরকার, পুলিশ এবং প্রায় প্রতিটি হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে গেছে। রাফাও ধ্বংস করা হচ্ছে। তবু দেশ ছেড়ে নির্বাসনে যাওয়ার বিনিময়ে মোটা টাকা দেওয়ার প্রস্তাবকে তারা অগ্রাহ্য করে চলেছে।

… সবচেয়ে বড় কথা হলো, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা এবং দক্ষিণ ইসরায়েলে চালানো নৃশংসতা যদি ইসরায়েলকে চিরতরে বদলে দেয়, তেমনি গাজার ধ্বংসযজ্ঞও ফিলিস্তিনি লক্ষ্য-আদর্শকে আমূল বদলে দিয়েছে। দুনিয়ার নানা প্রান্তে ফিলিস্তিনিদের কাছে গাজা হয়ে উঠেছে পবিত্র ভূমি। গাজার এমন কোনো পরিবার নেই যারা এই যুদ্ধে আত্মীয়স্বজন কিংবা তাদের ঘরবাড়ি হারায়নি। হামাস কিংবা অন্য কোনো প্রতিরোধ গোষ্ঠীকে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। এই মানুষদের জন্যই তারা লড়াই করছে। সম্মিলিত দুর্ভোগ যত বাড়ছে, ততই নিজেদের ভূমিতে থাকার সম্মিলিত ইচ্ছাও বাড়ে, যেমনটি দক্ষিণ হেবরনের নিরস্ত্র কৃষকেরা করেছিলেন।

… হামাসের সম্মিলিত শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত হতে দেয়নি। এটি সবার ওপর প্রভাব ফেলে। … অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার মুখে গাজার ফিলিস্তিনিরা যে সাহসিকতা ও ত্যাগ স্বীকার করছেন, …গাজার বিশ্বাসও অটল থাকবে। হামাস কেন হাল ছাড়বে না, তার আরও কিছু কম প্রত্যক্ষ কারণ আছে। হামাসের ভাগ্যে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে। সংগঠনটি বিশ্বাস করে, তারা তাদের কৌশলগত লক্ষ্যও অর্জন করে ফেলেছে। তামিল টাইগার্স বা চেচেন বিদ্রোহীদের বল প্রয়োগ করে দমন করা হয়েছে। অন্যদিকে স্পেনের ইটিএর মতো বিদ্রোহীরা মূল লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই হাল ছেড়ে দিয়েছে ।কৌশলগত লক্ষ্যটি হলো, ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বিশ্বের মানবাধিকার এজেন্ডার শীর্ষে ফিরিয়ে আনা।

পিউ রিসার্চের গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি ধারণা নেতিবাচক হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক (৫৩%) ইসরায়েল সম্পর্কে প্রতিকূল মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ৭ অক্টোবরের আগের চেয়ে এই হার ৯% বেশি। জনমতের যুদ্ধে হামাস জিতে যাচ্ছে আর ইসরায়েল হেরে যাচ্ছে, বিশেষ করে যেসব দেশে হামাসকে নিষিদ্ধ সংগঠন ঘোষণা করা হয়েছিল সেখানে। আইন মানুষকে বলছে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ভাবতে, কিন্তু তাঁরা ক্রমেই তা চাচ্ছেন না। যদিও তাঁরা মনে করেন, ৭ অক্টোবর কাজটা খুব খারাপ হয়েছিল। …”



নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডার বিষয় নয় , গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য সংস্কার অত্যাবশ্যক : কল্লোল মোস্তফা , বিদ্যুৎ , জ্বালানি , পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

0

“… সংস্কারের এজেন্ডাকে অনেকে অন্তর্বর্তী সরকার বা এনসিপির এজেন্ডার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। এর প্রভাব খোদ সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর গিয়ে পড়ছে। এতে অনেক মৌলিক সংস্কার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে না, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তাদের ওপর জনমতের চাপও তৈরি হচ্ছে না। এ রকম কিছু মৌলিক সংস্কার হলো জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন; আনুপাতিক পদ্ধতির উচ্চকক্ষ; সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি; একই ব্যক্তির একাধারে প্রধানমন্ত্রী, দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা না হওয়া; এক ব্যক্তির দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রীর একচেটিয়া ক্ষমতার রাশ টেনে ধরার জন্য এই সংস্কারগুলো ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কেউ কেউ মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতার সুযোগে উগ্রবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কার প্রয়োজন, ততটুকু সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচন দেওয়াই মঙ্গলজনক।…উগ্রবাদী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দেওয়ার পরিবেশ দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে, নির্বাচনের পরও থাকবে, যদি রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক রূপান্তর না হয়। … শুধু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংস্কার করাই যথেষ্ট নয়। নির্বাচনের পর যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, সেই সরকার যেন স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, তার জন্য বিভিন্ন কাঠামোগত সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন, সংবিধান সংস্কার না করেও আপাতত একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা যাবে। একইভাবে পুলিশ সংস্কার না করে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত না করে কিংবা আমলাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো না করেও দেশে কোনোরকমে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব। অতীতে বিভিন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই সংবিধান, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও আমলাতন্ত্র বজায় রেখেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু তাতে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের চরম স্বৈরাচারী হয়ে যাওয়া ঠেকানো যায়নি। … তার মানে আবার এই নয় যে কয়েক বছর সময় নিয়ে সব সংস্কার একবার শেষ করে নির্বাচন করতে হবে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার শেষ করে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।

… সংবিধান সংস্কার ছাড়া যেসব সংস্কার করা সম্ভব, সেসব সংস্কার ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতির প্রয়োজন হবে। এ জন্য ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের শর্ত হিসেবে জনগুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক সংস্কারগুলোকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নির্বাচনের আগে ও পরে বাস্তবায়নের লিখিত অঙ্গীকারের বিনিময়ে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে।…এ ধরনের সমঝোতার পরিবেশ তৈরি করার জন্য নির্বাচন নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা দূর করতে হবে।

… যারা সত্যিকার অর্থেই স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর সংস্কার চায়, তাদের দায়িত্ব হলো ডিসেম্বরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট টাইমলাইনসহ সুনির্দিষ্ট সংস্কারের দাবি তোলা। প্রশ্ন আসতে পারে সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের রোডম্যাপ দিলেই যে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের ব্যাপারে একমত হতে পারবে, তার কী নিশ্চয়তা। এখানেই চলে আসে নাগরিকদের দিক থেকে ব্যক্তিগত ও সংগঠিত তৎপরতার প্রয়োজনীয়তা। … রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন, যেন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো নিয়ে শক্তিশালী জনমত তৈরি হতে পারে।

এভাবে এক ব্যক্তির দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রিত্ব না থাকা কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন নিয়ে যে ধরনের জনমত তৈরি হয়েছে, পুলিশ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম, নারী, শ্রম ইত্যাদি খাতের সংস্কার নিয়েও এ রকম জনমত তৈরি হবে এবং সেসব সংস্কার বাস্তবায়ন করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি হবে। ফলে নির্বাচনের আগে সব সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও নির্বাচনের পরও সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের চাপ বজায় থাকবে। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডার বিষয় নয়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্যই এসব সংস্কার অত্যাবশ্যক। সংস্কার বিতর্কে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব হবে না। “


বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম , ভারত ও দুবাইয়ের তুলনায় কেন বেশি ?

0

বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম অব্যাহতভাবে বাড়ছে, যা অনেকেই জানতে চাচ্ছেন কেন প্রতিবেশী ভারত বা বৈশ্বিক ট্রেডিং হাব দুবাইয়ের তুলনায় এখানে স্বর্ণের দাম বেশি। বাজার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ১,৪১৪ মার্কিন ডলার, যেখানে ভারত এবং দুবাইতে যথাক্রমে ১,১৮৯ এবং ১,১৩৭ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায়, এটি বাংলাদেশে প্রায় ১.৭২ লাখ টাকা, যা ভারতের ১.৪৫ লাখ টাকা এবং দুবাইয়ের ১.৩৮ লাখ টাকার তুলনায় অনেক বেশি। এই পার্থক্য নতুন নয়। গত এক বছর ধরে বাংলাদেশে সোনার দাম ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা মূলত চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি স্থায়ী বৈষম্যের কারণে।

অর্থনীতিবিদ এবং জুয়েলাররা মনে করেন, দেশের মধ্যে স্বর্ণের চাহিদা এবং সরকারি সরবরাহের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে, যা অতিরিক্ত স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যদিও দেশীয় চাহিদা রয়েছে, তবে বৈধ আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, এই ঘাটতি স্থানীয় উৎসগুলির উপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করেছে, যা অনেক সময় আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে কাজ করে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র মাসুদুর রহমান বলেন, “আমরা স্থানীয় বাজার থেকে স্বর্ণ কিনে থাকি, সুতরাং আন্তর্জাতিক বাজারের দাম অনুসরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

এছাড়া স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়ন পরিস্থিতি আরও সংকট সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সাল থেকে টাকার মান প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় স্থানীয় স্বর্ণের দাম বেড়েছে। বৈশ্বিক স্বর্ণের দাম যদি স্থির থাকত, তাও কেবল টাকার অবমূল্যায়নই সোনার দাম বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। গত মঙ্গলবার স্বর্ণের দাম বাংলাদেশে সর্বকালের রেকর্ডে পৌঁছায়, যেখানে প্রতি ভরি সোনার দাম ১.৭৭ লাখ টাকা ছুঁয়েছিল। পরবর্তীতে এটি সামান্য কমে ১.৭২ লাখ টাকায় নেমে আসে। এটি ছিল ২০২৫ সালে বাজুসের ১৯ তম দাম বৃদ্ধির ঘটনা। স্বর্ণের দাম নির্ধারণে ট্রেডাররা ঢাকা শহরের তন্তিবাজারের বাজারদর অনুসরণ করেন।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৮ সালে সোনার চোরাচালান রোধ এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য একটি সোনার নীতি প্রণয়ন করেছিল। যদিও সরকারি লাইসেন্স প্রাপ্ত কোম্পানিগুলো দ্বারা কিছু স্বর্ণ আমদানি করা হয়েছে, তাও চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না, এবং প্রতি বছর আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ টন স্বর্ণের চাহিদা পূরণের জন্য প্রায় ৮০ শতাংশ চোরাচালান মারফত আসে। বিশ্ব বাজারে স্বর্ণের দাম গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ সীমা স্পর্শ করার পর কিছুটা কমে গিয়েছে। তবে বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে তা এখনও ঊর্ধ্বমুখী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেছেন, বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে সঠিক আমদানি, চাহিদা এবং সরবরাহ সম্পর্কিত তথ্য নেই। তিনি বলেন, “ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব বাজার চাহিদার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করে।”

তিনি আরো জানান, স্বর্ণের বাজারে চোরাচালান একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। “সরকার যদি কঠোর পদক্ষেপ নেয়, তবে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং বাজারকে আনুষ্ঠানিক করা সম্ভব হবে।” অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় স্বর্ণ সাধারণত বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, যা দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়া টাকার অবমূল্যায়নও দাম বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।