Home Blog Page 125

জলবায়ু সংকটের শিল্প-আন্দোলন – “The Herds Project”

বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠছে শিল্প। শুধু তথ্য বা প্রতিবাদ নয়, অনুভূতি, স্মৃতি এবং সংবেদনশীলতাকে কেন্দ্রে রেখে আজকের পৃথিবীতে জন্ম নিচ্ছে নানা শিল্প-আন্দোলন। তেমনি একটি অভিনব ও আবেগনির্ভর আন্দোলনের নাম “The Herds Project”। এটি একটি চলমান ভাস্কর্য-ভিত্তিক আর্ট প্রকল্প, যেখানে বিশালাকৃতির প্রাণীর পাপেটগুলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে ভ্রমণ করে জলবায়ু সংকটের গভীরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের বার্তা বহন করছে।

“The Herds Project” মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব মানুষ ও প্রাণী বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিশাল পাপেট প্রাণীগুলোকে রূপ দিয়েছে। এই প্রকল্পে যেমন দেখা যায় বিশাল গরু, হাতি, কিংবা বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণীদের আদলে তৈরি মূর্ত, তেমনি এগুলোর ভেতর দিয়ে উঠে আসে বাস্তুচ্যুতির দুঃখ, নিঃসঙ্গতা ও ক্ষয়িষ্ণু প্রাকৃতিক পরিবেশের আর্তনাদ। এই পাপেটগুলো সাধারণত একেকটি নাট্যদলের সহায়তায় হ্যান্ডেল করা হয়। একটি প্রাণীকে সচল রাখতে প্রায় ৮-১০ জন মানুষ প্রয়োজন হয়, যারা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তি পরিচালনা করেন। ফলে এই প্রাণীগুলো নিছক দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য নয়, জীবন্ত অনুভবের বাহক।

এই প্রকল্পের লক্ষ্য ২০,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা থেকে আর্কটিক পর্যন্ত এক বিশাল ভৌগোলিক ও প্রতীকী যাত্রা সম্পন্ন করা। যাত্রাপথে এই প্রাণীরা শহর, গ্রাম, পাহাড়, মরুভূমি, নদী পার হয়ে চলেছে। প্রতিটি স্থানই যেন একটি পর্ব, যেখানে স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে এই পাপেটগুলো একাত্ম হয়ে পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে সংলাপ গড়ে তুলছে। যেখানেই এরা যাচ্ছে, সেখানেই স্থানীয় শিশু, পরিবার ও শিল্পীদের সঙ্গে একটি ছোটখাটো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কেউ গান গায়, কেউ কবিতা পড়ে, কেউবা নাটক করে। এভাবে একেকটি স্টপেজে সৃষ্টি হচ্ছে সাময়িক কিন্তু প্রভাবশালী মঞ্চ, যেখানে মানুষ শুনছে মাটির কান্না, বাতাসের হাহাকার এবং প্রাণীর প্রতিধ্বনি।

প্রকল্পের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হলো “জলবায়ু উদ্বাস্তু” বিষয়টি। বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৪ কোটিরও বেশি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নিজ ভূমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ খরা, কেউ বন্যা, কেউ ঝড়ের কারণে নিজ ঘর হারিয়েছে। এই বাস্তবতা এখনও বহু উন্নত দেশের মানুষের কাছে শুধু পরিসংখ্যানমাত্র। কিন্তু যখন এক বিশাল হাতি বা গরু হেঁটে শহরের রাস্তায় প্রবেশ করে, তখন সেটি শুধু কৌতূহলের জন্ম দেয় না, বরং প্রশ্ন তোলে কেন এই বুনো প্রাণী লোকালয়ে? এভাবে তারা মানুষের মনোযোগ ধরার চেষ্টা করছে। এই শিল্প তাই তথাকথিত প্রতিবাদী ভাষার বাইরে গিয়ে এক নতুন প্রতিবাদ নির্মাণ করে, যা নীরব অথচ গভীর। একটি শিশু যখন পাপেট প্রাণীটির চোখে চোখ রাখে, তখন সে দেখে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের গ্রহের অস্তিত্বের সঙ্কট।

“The Herds Project”-এ ব্যবহৃত অনেক প্রাণী এমন প্রজাতির প্রতিরূপ, যারা বিলুপ্তপ্রায় বা ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে। এতে করে শুধু মানুষের দুর্দশা নয়, বরং সমগ্র প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ভাঙনের গল্প বলা হয়। এই প্রকল্প প্রমাণ করে দেয় শিল্প শুধু গ্যালারি বা মঞ্চে আবদ্ধ নয়। এটি রাস্তায় নেমে আসতে পারে, পদচারণায় রূপ নিতে পারে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক বৈশ্বিক বার্তা দিতে পারে। এটি শিল্পের সেই রূপ, যা আন্দোলন, অধ্যাত্ম ও মানবিকতার এক যোগসূত্র হয়ে ওঠে। “The Herds Project”-এর এই ভ্রমণ তাই শুধুই এক প্রতীকী অভিযান নয়, বরং এটি এক ধরণের ধ্যানী পথচলা, যাকে আমরা বলতে পারি “slow protest”। এটি ধ্বংসের বার্তা দেয় না, বরং সংলাপের মাধ্যমে সম্ভাবনার দরজা খোলে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হলে দরকার অনুভব, দরকার গল্প, দরকার মানবিক স্পর্শ। “The Herds Project” সেই স্পর্শ এনে দিচ্ছে শিল্পের হাত ধরে।

অভিবাসী শ্রমিক সংকট , উপসাগরীয় দাস সমাজের প্রতিচ্ছবি !

0

পারস্য উপসাগরের আধুনিক শহর-রাষ্ট্রগুলো, দুবাই, দোহা, আবুধাবি—বিশ্ববাসীর চোখে আজ উন্নয়ন, বিলাসিতা ও প্রযুক্তির প্রতীক। তবে এই উজ্জ্বলতার পেছনে রয়েছে এধুলোর নিচে চাপা পড়ে যাওয়া একটি প্রকৃত দাস সমাজের ইতিহাস। ক্লাসিক্যাল ইতিহাসবিদ মোজেস ফিনলি তার “Ancient Slavery and Modern Ideology” গ্রন্থে একটি “genuine slave society” বা প্রকৃত দাস সমাজের সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, যেখানে দাসত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। ফিনলির এই সংজ্ঞার আলোকে পারস্য উপসাগরের শহর-রাষ্ট্রগুলো (১৮শ থেকে ২০শ শতক পর্যন্ত) নিঃসন্দেহে দাস সমাজ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ওমান, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার অঞ্চলে মূলত আফ্রিকার পূর্ব উপকূল (জাঞ্জিবার, মোজাম্বিক, সোমালিয়া, তানজানিয়া) থেকে দাস আনা হতো। দাসেরা নিয়োজিত ছিল মুক্তা আহরণে, খেজুর খামারে, অথবা অভিজাত পরিবারের গৃহস্থালিতে। মুক্তা আহরণ ছিল সবচেয়ে কষ্টকর ও বিপজ্জনক কাজ। দাসদের প্রায়শই শ্বাসরোধকারী গভীর পানিতে পাঠানো হতো, সুরক্ষা ছাড়া। এই মুক্তা শিল্প উপসাগরীয় অর্থনীতির প্রাণ ছিল, আর তা টিকে ছিল মূলত দাসশ্রমের উপর। অর্থনৈতিক উৎপাদন, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস, এমনকি পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্যেও দাসত্ব গেঁথে ছিল। এই অঞ্চলের সমাজে দাসত্ব কেবল বৈধই নয়, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যুক্তির মাধ্যমে ন্যায্যতা দেওয়া হতো। যদিও ইসলাম ধর্ম দাসমুক্তিকে উৎসাহ দেয়, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। অনেক ধর্মীয় ব্যাখ্যায় আফ্রিকানদের ‘অযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে দাসত্বকে বৈধতা দেওয়া হতো।

দাস নারীদের উপর যৌন নিপীড়ন ছিল প্রায় স্বাভাবিক। তাদের সন্তানরাও জন্মগতভাবে দাস হিসেবে গণ্য হতো। ফলে দাসত্ব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান এক সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হয়ে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের চাপে ১৯৫০-এর দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলগুলো দাসপ্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। তবে প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি কাগুজে প্রক্রিয়া। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও এর জায়গায় আসে ‘শ্রম অভিবাসন’—যার কাঠামো প্রায় অভিন্ন। শুধু ‘দাস’ শব্দটি বদলে গিয়েছে ‘কর্মী’ বা ‘ডমেস্টিক হেল্প’য়ে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ আয়োজন বিশ্ববাসীর কাছে এই “আধুনিক দাসত্ব” পুনরায় উন্মোচিত করে। বিশাল স্টেডিয়াম, রোড, হোটেল, রেললাইন নির্মাণের নেপথ্যে কাজ করেছে লক্ষাধিক দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক—বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা দরিদ্র যুবকরা।

তাদেরকে দীর্ঘ সময় অমানবিক পরিবেশে, প্রায় কোনো ছুটি ছাড়া কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কফালা (Kafala) নামক নিয়োগব্যবস্থার ফলে তারা মালিকের অনুমতি ছাড়া চাকরি বদল বা দেশত্যাগ করতে পারে না—যা কার্যত আধুনিক দাসত্বের আইনি কাঠামো। Amnesty International ও Human Rights Watch-এর মতে, কাতারে অভিবাসী শ্রমিকদের শ্রম-পরিস্থিতি ছিল “forced labor” বা “জবরদস্তিমূলক শ্রম”-এর সমতুল্য। গার্ডিয়ান পত্রিকার অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ থেকে ২০২০-এর মধ্যে কাতারে কমপক্ষে ৬,৫০০ অভিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সরকার এই সংখ্যা অস্বীকার করলেও মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্বজুড়ে কাতারের সমালোচনা হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক চাপে কিছু আইনি সংস্কার আনলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। অনেক শ্রমিক এখনও পাসপোর্ট জব্দের, খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবের অভিযোগ করছেন। বলা চলে আধুনিকতা আর বিলাসের পেছনে এক দমনমূলক, নিপীড়নমূলক কাঠামো আজও টিকে আছে, যা পূর্ববর্তী দাস সমাজেরই একটি রূপান্তরিত সংস্করণ। এই অঞ্চলের ইতিহাসে দাসদের কোনো কণ্ঠ নেই। তারা ছিল অদৃশ্য নির্মাতা, যাদের কষ্টে শহর উঠেছে, কিন্তু নাম নেই কোনো ফাউন্ডেশনে। আজকের অভিবাসী শ্রমিকরাও সেই একই ছায়ায় দাঁড়িয়ে, তারা শহর গড়ে তোলে, কিন্তু নাগরিক হয় না। তারা অর্থনীতি টিকিয়ে রাখে, কিন্তু মর্যাদা পায় না।

ইতিহাস কি পুনরাবৃত্ত হচ্ছে? পারস্য উপসাগরের দাস সমাজ ইতিহাসে প্রলেপ দিয়ে ঢাকা, কিন্তু তার ছায়া আজকের শহরগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। “দাসত্ব নেই” বলা হয়, কিন্তু যখন একজন শ্রমিক মালিকের অনুমতি ছাড়া পানি খেতে পারে না, দেশে ফিরতে পারে না, তখন সেই বক্তব্য কি আদৌ টিকে থাকে ?মধ্যপ্রাচ্যে ইদানীংকার অভিবাসী শ্রমিক সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক দমন কাঠামোরই একটি আধুনিক রূপ।

খাদ্যে বিষক্রিয়া – ইন্দোনেশিয়ার ফ্রি স্কুল-মিলস প্রোগ্রামে , অনিশ্চয়তার ছায়া

৮ কোটি স্কুল শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী মিশনে নেমেছে ইন্দোনেশিয়া — তবে পরিকল্পনাটি হোঁচট খাচ্ছে। এই সপ্তাহে রাজধানী জাকার্তার দক্ষিণে চিয়ানজুরের দুটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ জন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে খাবার খাওয়ার পর। যাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তাদের বেশিরভাগকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। খাদ্যে বিষক্রিয়ার এটি সর্বশেষ ঘটনা যা প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ানতোর এই স্বাক্ষর নীতির উপর ছায়া ফেলছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, খাদ্য প্রস্তুতিতে অবহেলা এর সম্ভাব্য কারণ। শিক্ষার্থীদের বমি থেকে নমুনা ল্যাবে পাঠানো হয়েছে এবং রান্না করা থেকে শুরু করে প্যাকিং ও ডেলিভারি পর্যন্ত খাদ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, খাবারের ছেঁড়া মুরগির মাংসের “একটি অস্বস্তিকর গন্ধ” ছিল – “আমার মাথা ঘুরছিল, বমি বমি লাগছিল, এবং আমি বমি করি।” বিশ্বজুড়ে, শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহের এই ধরণের প্রোগ্রাম স্বাস্থ্য, ফলাফল এবং উপস্থিতি উন্নত করতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়ার ২৮ বিলিয়ন ডলারের (২১ বিলিয়ন পাউন্ড) এই প্রকল্প — যেটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুলদের একটি হতে যাচ্ছে — এখন খাদ্য নিরাপত্তা ও সরকারবিরোধী প্রতিবাদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারিতে, বাজেট কর্তনের বিরুদ্ধে যখন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, তখন তাদের ক্ষোভের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রাবোয়োর ফ্রি স্কুল মিলসের ব্যয়। একটি প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: “শিশুরা বিনা পয়সায় খায়, বাবা-মায়েরা চাকরি হারায়।”

প্রতিশ্রুতিশীল এক উদ্যোগ, যার স্বাদ এখন তেতো হয়ে উঠছে – গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে প্রাবোয়োর মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল এই ফ্রি মিলস প্রোগ্রাম। এটি শিশুদের অপুষ্টিজনিত অবস্থা স্টান্টিং মোকাবেলার উপায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যা ইন্দোনেশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজনকে আক্রান্ত করে। ২০২৩ সালে প্রাবোয়ো বলেছিলেন: “এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমাদের শিশুরা আরও লম্বা হবে এবং বিজয়ী হয়ে উঠবে।” গত অক্টোবরে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে, এই প্রোগ্রাম এবং অন্যান্য জনপ্রিয় নীতিগুলো — যেমন বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নতুন ঘর — তাকে রাজনৈতিক পয়েন্ট অর্জন করতে সাহায্য করেছে। ক্ষমতায় আসার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ৮০% ছুঁয়ে যায়।
প্রথম ধাপে, যা জানুয়ারিতে শুরু হয়, ফ্রি স্কুল মিলস ২৬টি প্রদেশের ৫,৫০,০০০ শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে যায়। যদিও প্রোগ্রামটির “ উদ্দেশ্য ভালো”, আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো মারিয়া মনিকা উইহারদজা বিবিসিকে বলেন, “এই প্রোগ্রাম দেশের জন্য আশু জরুরি এমন কোনও প্রমাণ নেই।” জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার ১% এরও কম পরিবার গত বছর অন্তত একদিন কোনও খাবার না খেয়ে ছিল।

বিষক্রিয়ার ধাক্কা
জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া একাধিক খাদ্যে বিষক্রিয়া এই ফ্রি মিলস প্রোগ্রাম নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে, পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী মিশেল বলেন, স্কুলের খাবার খাওয়ার পর তার পেটে ব্যথা শুরু হয়। তিনি বিবিসি ইন্দোনেশিয়াকে বলেন, “খাবার ছিল একেবারে সাদামাটা এবং বাসি।”
ঘটনার পর, কিছু অভিভাবক সন্তানদের জন্য নিজে থেকে ঘরে তৈরি খাবার পাঠানো শুরু করেন। এই সপ্তাহে চিয়ানজুরে বিষক্রিয়ার ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ খাদ্য নিরাপত্তার প্রক্রিয়া জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাতীয় পুষ্টি সংস্থার প্রধান দাদান হিন্দায়ানা, হাসপাতালে ভর্তি শিক্ষার্থীদের পরিদর্শনের পর বলেন, “আমাদের মান উন্নত করতে হবে।”
অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার অফ রিফর্ম অন ইকোনমিকস ইন্দোনেশিয়ার গবেষক এলিজা মার্ডিয়ান বলেন: “এই প্রোগ্রাম শুরু করার আগে পরিপক্ক ও গভীর পরিকল্পনার অভাব ছিল স্পষ্ট। তাড়াহুড়া করে চালু করা মান ও কার্যকারিতা উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।” ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন – এই প্রোগ্রামের বিশাল ব্যয়ও সমস্যার একটি কারণ। ইন্দোনেশিয়া চলতি বছরে ফ্রি স্কুল মিলস প্রোগ্রামের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। তুলনায়, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম এমন প্রোগ্রামে প্রতি বছর ১.৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ১২ কোটি শিশুকে খাওয়ায়। ব্রাজিলও প্রায় একই পরিমাণ খরচ করে ৪ কোটি শিক্ষার্থীকে খাবার সরবরাহ করে।
এই খরচ সামলাতে প্রাবোয়ো দেশের ধনকুবেরদের সাহায্য চেয়েছেন এবং চীনের কাছ থেকে সহায়তার প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। তিনি এই খরচ সামলাতে ১৯ বিলিয়ন ডলারের বাজেট কাটছাঁটের নির্দেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে অন্যান্য পপুলিস্ট প্রকল্পও আছে — যা এই উদ্যোগকে আরও বিতর্কিত করেছে।শিক্ষাসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের বাজেট অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। কিছু আমলা অভিযোগ করেছেন, তারা এমনকি এসি, লিফট এবং প্রিন্টার ব্যবহারে কড়াকড়ির মুখে পড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে যখন স্কলারশিপ বাতিল ও ক্লাসে বিঘ্ন ঘটার খবর ছড়ায়। বানডুংয়ের এক ছাত্রনেতা মোহাম্মদ রমজান বলেন: “সবচেয়ে খারাপ হলো পেট ভরা থাকলেও মস্তিষ্ক খালি থাকা।”

আরও চ্যালেঞ্জ আসছে? বাজেট ব্যবস্থাপনার দুর্নীতির অভিযোগও উঠে আসছে। মার্চে, ইন্দোনেশিয়ার দুর্নীতি দমন সংস্থা “জালিয়াতির বাস্তব সম্ভাবনা” নিয়ে সতর্ক করেছে। এই মাসে পুলিশ একটি তদন্ত শুরু করেছে যখন দক্ষিণ জাকার্তার এক খাবার সরবরাহকারী অভিযোগ করেন, তিনি ফেব্রুয়ারি থেকে কোনো অর্থ পাননি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি অনেক গভীরে। ইন্দোনেশিয়ার বৃহৎ আকারের সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিগুলি ঐতিহাসিকভাবে “দুর্নীতিতে ভরা”, বলেছেন দেশটির নিরীক্ষা বোর্ডের বিশ্লেষক মুহাম্মদ রাফি বাকরি। তিনি বলেন, “বাজেটের বিশাল আকার বিবেচনা করলে, এই প্রোগ্রাম দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য এক সোনার খনি।” প্রাবোয়ো অবশ্য প্রোগ্রামটির পক্ষে । তিনি এই সপ্তাহে বলেছেন, “আমরা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু মোকাবিলা করব এবং জনগণের প্রতিটি টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করব।”

ষড়যন্ত্র তত্ত্বে ‘আইফেল টাওয়ার’

আইফেল টাওয়ার বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত স্থাপনা প্যারিসের গগনচুম্বী প্রতীক। ১৮৮৯ সালে গুসটাভ আইফেলের ডিজাইন ও নির্মাণে এটি উদ্বোধন হয়। শুরুতে এটিকে একটি সাময়িক কাঠামো হিসেবে দেখা হয়েছিল, তবে সময়ের সাথে এটি প্যারিসের অন্যতম স্থায়ী পরিচিতি হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর আকাশচুম্বী দৃষ্টিনন্দন উপস্থিতি শুধুমাত্র পর্যটকদের আকর্ষণই তৈরি করেনি, বরং এটি নানান ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আইফেল টাওয়ারের নির্মাণের উদ্দেশ্য, এর প্রকৃতি এবং এর পিছনে লুকানো রহস্য সম্পর্কে নানা বিতর্ক রয়েছে।

আইফেল টাওয়ারের নির্মাণের সময় এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব উঠে আসে, যেখানে দাবি করা হয় যে এটি শুধুমাত্র একটি স্থাপনা নয়, একটি শক্তির কেন্দ্র! কিছু তত্ত্বের মতে, গুসটাভ আইফেল টাওয়ারটি নির্মাণ করেছিলেন এমন এক গোপন উদ্দেশ্য সাধনের জন্য যা অনেকের কাছে অজানা। বিশেষত এই টাওয়ারটির মধ্যে এমন কিছু প্রযুক্তি লুকানো ছিল, যা অতিপ্রাকৃত শক্তি বা বিদ্যুৎ সংগ্রহ করতে সক্ষম ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এটি কোনও ধরনের আলোর বা আকাশবিদ্যুতের শক্তি ধারণ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল, যা মানব জাতির উন্নতি বা ক্ষতি সাধনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারত। এর আকৃতি এবং স্থাপত্যকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যেন এটি এক ধরনের শক্তির বাহক বা সিগন্যাল পাঠানোর যন্ত্রের মতো কাজ করে।

আইফেল টাওয়ারের আকৃতি এবং কাঠামোকে কেন্দ্র করে একটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রয়েছে, যেখানে দাবি করা হয় এটি এলিয়েনদের সাথে যোগাযোগের জন্য তৈরি হয়েছিল। এই তত্ত্বের পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, টাওয়ারের অত্যন্ত নিখুঁত গঠন এবং এর অস্বাভাবিক উচ্চতা এটি একটি অসাধারণ সংকেত পাঠানোর যন্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে। কিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিশেষজ্ঞ মনে করেন, টাওয়ারটি আসলে পৃথিবী থেকে বাইরের বিশ্বের সাথে যোগাযোগের একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। টাওয়ারের কিছু বিশেষ অংশ এবং এর নকশায় খুঁজে পাওয়া ‘গোপন’ চিহ্ন এবং সংকেত এর পক্ষে আরও কিছু জোরালো প্রমাণ তুলে ধরতে সাহায্য করে।

গুসটাভ আইফেলের নকশায় যে গোপন রহস্য রয়েছে, তা নিয়েও নানা তত্ত্ব রয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, টাওয়ারের নকশায় এমন কিছু চিহ্ন এবং অক্ষর রয়েছে যা একজন পণ্ডিতের জন্য গোপন বার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। বিশেষত টাওয়ারের কাঠামো এবং এর নকশায় লুকানো কিছু প্রতীক এবং চিহ্নের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। এগুলো কখনও স্যুভেনিরের চিহ্ন, কখনও গোপন সামাজিক গোষ্ঠী বা সোসাইটি, এমনকি প্রাচীন সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বলে দাবি করা হয়। এ ধরনের ধারণা অনুসারে, আইফেল টাওয়ারের নির্মাণের মাধ্যমে কিছু অদৃশ্য বার্তা বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা কেবলমাত্র নির্বাচিত কিছু মানুষের কাছে পৌছেছে।

আরেকটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মতে, আইফেল টাওয়ার মূলত ফ্রান্সের কোনো গোপন কার্যক্রম বা পরিকল্পনা আড়াল করার জন্য তৈরি হয়েছিল। এই তত্ত্ব অনুসারে, এর মাধ্যমে সরকার গোপন সামরিক পরীক্ষা বা আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির পরীক্ষা চালানোর উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করত। এছাড়া, টাওয়ারের ভিতর গোপন সুরক্ষা ব্যবস্থা বা প্রযুক্তি থাকত, যা রাষ্ট্রীয় বা সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিছু তত্ত্বকারীর মতে, এটি কোনো ধরনের ‘বিশ্বব্যাপী মনিটরিং সিস্টেম’ হিসেবেও কাজ করত, যা পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম ছিল।

আইফেল টাওয়ারের নির্মাণের সময় একটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছিল যে, এটি মূলত একটি অস্থায়ী কাঠামো ছিল, যা একসময় ভেঙে ফেলা হবে। ফ্রান্সের কিছু জনগণ এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেছিলেন, এটি শুধুমাত্র ১৮৮৯ সালের বিশ্ব মেলার জন্য তৈরি করা হয়েছিল এবং তা পরবর্তীতে সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু আজকের দিনে আমরা জানি এটি এখনো প্যারিসের অন্যতম প্রধান স্থাপনা হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

আইফেল টাওয়ার একটি অসাধারণ স্থাপনা, যা শুধুমাত্র তার নান্দনিকতা এবং ইতিহাসের জন্য নয়, বরং এর সাথে সম্পর্কিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলির জন্যও জনপ্রিয়। অনেকের মতে, এর নির্মাণ এবং এর কাঠামোর মধ্যে লুকানো রহস্য মানব সভ্যতার জন্য অজানা বিষয়গুলি তুলে ধরতে পারে। তবে আইফেল টাওয়ারের আসল উদ্দেশ্য এবং এর মধ্যে লুকানো শক্তির প্রকৃতি এখনও সঠিকভাবে জানা যায়নি। এই ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলি শুধুমাত্র মানুষের কল্পনাশক্তির ফল এবং এর মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, একটি আইকনিক স্থাপনা কীভাবে নানা রহস্য এবং আধ্যাত্মিক ধারণার মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে।

পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে – আইএসআইএসের ধ্বংস করা , ইরাকের তৃতীয় বৃহত্তম শহর মসুল

0

ইরাকের তৃতীয় বৃহত্তম শহর মসুল একটি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। শহরের প্রাচীন ঐতিহ্য, বিশেষ করে আল-নুরি মসজিদ এবং তার বিখ্যাত মিনার আল-হাদবা (যা ‘হঞ্চব্যাক’ নামে পরিচিত) ইতিহাসের অমূল্য রত্ন ছিল। তবে ২০১৪ সালে আইএসআইএস জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে মসুল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তারা মসুলের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ওপর আঘাত হানে, যা শুধু ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, গোটা মানবজাতির জন্য এক বিরাট সাংস্কৃতিক ক্ষতি ছিল।

দীর্ঘ সময় পর মসুল পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং এই প্রক্রিয়া একাধিক রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জাতীয় পরিচয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। মসুলের ধ্বংসের পর পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ কেবল একটি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ইরাকী জাতি তাদের জাতীয় সম্মান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে। ২০১৭ সালে ইরাকের সেনাবাহিনী যখন মসুল পুনরুদ্ধার করেছিল, তখন তা শুধু সামরিক বিজয় ছিল না, বরং এটি ছিল জাতীয় আত্মবিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ।

মসুলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু ইরাক বা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নয়, পুরো মুসলিম বিশ্ব এবং আরব সংস্কৃতির জন্য তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল-নুরি মসজিদ এবং তার মিনার আল-হাদবা, যেগুলি মসুলের পরিচয়ের অংশ ছিল, তাদের ধ্বংস কেবল স্থাপত্যের ক্ষতি নয়, এটি ইরাকের সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পরিচয়েরও একটি আঘাত ছিল। মসুলের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ইরাক তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করার পাশাপাশি তার জাতীয় পরিচয়ের প্রতি একাধিক বার্তা দিয়েছে: “আমরা আমাদের অতীতকে রক্ষা করতে প্রস্তুত, তা শুধু একটি স্মৃতি নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের অংশ।” আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পুনর্নির্মাণ মসুলের পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইউনেস্কো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি মসুলের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্মৃতিস্তম্ভ পুনর্নির্মাণে সহায়তা করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত মসুলের পুনর্নির্মাণে ৫০ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে।

মসুলের পুনর্নির্মাণ কার্যক্রমের মধ্যে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অনেক ইরাকি নাগরিক মনে করেন, আন্তর্জাতিক সহায়তার মূল লক্ষ্য শুধু স্থাপত্য পুনর্নির্মাণে সীমাবদ্ধ, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন প্রয়োজন। এই পুনর্নির্মাণ প্রকল্পগুলির মধ্যে স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা কতটুকু তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, কারণ তাদের জীবনের মূল চ্যালেঞ্জ – যেমন কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ইত্যাদি এখনও অগ্রাধিকারে নেই। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কার্যক্রম কেবল একটি ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ নয়, এটি একটি রাজনৈতিক প্রতীক।মসুলের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে ইরাক আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য রক্ষার দাবি জানিয়েছে। এখানে এক ধরণের সাংস্কৃতিক রাজনীতি কাজ করছে, যেখানে মসুলের স্মৃতিস্তম্ভগুলো শুধু ঐতিহাসিক সাইট নয়, তা ইরাকের জাতীয় পরিচয়ের এবং স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মসুলের ধ্বংসের পর পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টায়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার মানে কেবল ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ নয়, এটি এক ধরনের প্রতিরোধও। আইএসআইএসের ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে মসুলের পুনর্নির্মাণ কাজটি গুরুত্বপূর্ণ। আইএসআইএস, যারা প্রাচীন মসুল এবং তার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করেছিল, তা একটি সাংস্কৃতিক লুণ্ঠন এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের চিহ্ন। মসুলের পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি জাতি এবং জনগণ এই প্রতিরোধের অঙ্গীকার করছে, যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কখনো ধ্বংস হতে দেওয়া হবে না।

মাইগ্রেশন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের মধ্যে , বৈষম্য খুঁজে পেয়েছে – বিশ্বব্যাংক

সৌদি আরব বর্তমানে বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য হলেও, যুক্তরাষ্ট্র (ইউএস) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) রেমিট্যান্সের অবদান বিবেচনায় শীর্ষস্থানে রয়েছে, যদিও সেখানে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত “বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট”-এ এই চমকপ্রদ বৈষম্য তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে FY25-এর প্রথম আট মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে ২৭.৬ শতাংশের একটি রেকর্ড-ব্রেকিং বার্ষিক বৃদ্ধি রিপোর্ট করা হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রম মন্ত্রণালয় এবং প্রশিক্ষণ (বিএমইটি) অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবে ৪৬.৩৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী অবস্থান করছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছেন ২২.০৬ লাখ শ্রমিক। তবে সৌদি আরব থেকে মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের মাত্র ১৩ শতাংশ আসে, যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবদান ১৭ শতাংশ। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৩.০৪ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন, সে দেশে রেমিট্যান্সের শেয়ার ছিল ১৮.২ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংকও সতর্কতা দিয়েছে যে দীর্ঘমেয়াদী ভিসা স্থগিতকরণ, বিদেশী দেশগুলোর অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলগুলোর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রেমিট্যান্স প্রবাহকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এটি রেমিট্যান্স বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কারণে যেমন মে ২০২৪ সালে বাস্তবায়িত ক্রলিং পেগ এক্সচেঞ্জ রেট, টাকার মূল্যহ্রাস এবং সরকারী রেমিট্যান্স চ্যানেলে ২.৫ শতাংশ প্রণোদনা নির্দেশ করছে।

বিআরএসি মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান বলেন, “ডলার এবং পাউন্ড স্টার্লিংয়ের উচ্চ এক্সচেঞ্জ রেট রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য অভিবাসীদের জন্য বৈধ পদ্ধতিতে অর্থ পাঠানো আরও আকর্ষণীয় করেছে।” তিনি আরো বলেন, “এটি দেখায়, আমাদের শ্রমিকরা মূলত সৌদি আরবে কম মজুরির এবং কম উৎপাদনশীল কাজের সাথে জড়িত, যেখানে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতে আরও দক্ষ অভিবাসীরা বেশি রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে।” বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী, FY25-এর প্রথমার্ধে নতুন অভিবাসীদের মধ্যে ৭৪.৫ শতাংশই সৌদি আরবে গেছেন, যদিও গালফ দেশগুলোর কঠোর ভিসা নীতির কারণে মোট অভিবাসন প্রবাহ ২৬.৯ শতাংশ কমে গেছে। শরীফুল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।”

পলিসি ডায়ালগ সেন্টারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এটা সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না যে সৌদি আরবে বড় সংখ্যক শ্রমিক থাকার পরও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংককে এর তদন্ত করা উচিত।” অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, “রেমিট্যান্সের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সাময়িক কিছু কারণে ঘটছে। কিছু অস্বাভাবিক অভিবাসী তাদের আয়ের অধিকাংশ টাকা দেশে পাঠাচ্ছে, এবং সৌদির কর্ম অনুমতির খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।” তিনি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য দক্ষ অভিবাসনকে প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দেন।

এই পরিস্থিতি বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে, যেখানে একদিকে সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর উপর নির্ভরতা কমছে, অন্যদিকে নতুন এবং দক্ষ অভিবাসীদের জন্য আরও বৈচিত্র্যময় গন্তব্যস্থলের দিকে নজর দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়া – শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য , পুরোপুরি ক্ষতিকর নয় : জরিপ

একটি নতুন প্রতিবেদন বলছে, শিশুদের ওপর সামাজিক মাধ্যমের কিছু ইতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। খবর টেকক্রাঞ্চ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের বন্ধুদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে রিলস-ভিডিও দেখে মানসিক চাপ কিছুটা কমে বলেও জানিয়েছে তারা। এছাড়া ৬৩ শতাংশ মনে করে, এসব অনলাইন প্লাটফর্ম তাদের সৃজনশীল চিন্তা প্রকাশের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে।

পিউয়ের গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, ৩৪ শতাংশ কিশোর-কিশোরী সামাজিক মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পায়। যদিও এসব তথ্য কতটা সঠিক তা স্পষ্ট নয়। এছাড়া নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এমন কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা ৫২ শতাংশ। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের চেয়ে তাদের সমবয়সীদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়ে বেশি চিন্তিত। জরিপে অংশ নেয়া ৪৮ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বলেছে, সোশ্যাল মিডিয়া তাদের সমবয়সীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মাত্র ১৪ শতাংশ মনে করে, সোশ্যাল মিডিয়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা স্বীকার করেছে এটি তাদের ঘুম (৪৫ শতাংশ) ও কাজের মনোযোগ (৪০ শতাংশ) কমিয়ে দেয়।

সামাজিক মাধ্যম কিশোর-কিশোরী কিংবা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর, ধারণাটি অনেক গবেষণায় প্রমাণিত। সম্প্রতি কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রাম প্রতি তিনজন কিশোরীর একজনের নিজ শরীর নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ায়। স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং রোধে ব্যর্থতার অভিযোগে একাধিক মামলাও হয়েছে। এমনকি সাবেক মার্কিন সার্জন জেনারেল কিশোরদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে একটি সতর্কবার্তাও জারি করেছিলেন।

রাগে চিৎকার – আপনার শিশুর শৈশব , ট্রমা হয়ে যাচ্ছে না তো ?

শিশুদের বড় করতে গিয়ে কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন আমরা নিজেরাই নিজেদের চিনতে পারি না। একটানা কান্না, বারবার একই ভুল, বা সীমাহীন দুষ্টুমি—এসবের মাঝে কখন যেন গলার সুর চড়ে যায়। আমরা চিৎকার করি, অথচ কিছুক্ষণ পরেই সেই মুহূর্তটা আমাদের মাঝেও অপরাধবোধ রেখে যায়। আপনি একা নন। এই অভিজ্ঞতা অনেক অভিভাবকেরই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চিৎকার কি আসলেই আমাদের শিশুর আচরণ পরিবর্তন করে? না, বরং তারা চুপ হয় ভয় পেয়ে, শেখে না বুঝে। এই ভয় এক সময় তাদের মনে ভেতরে ভেতরে ক্ষত তৈরি করে— যে ক্ষত একদিন বিষিয়ে তোলে শিশুর আত্মবিশ্বাস, সম্পর্ক এবং ভালোবাসা প্রকাশের পথ।

বিশ্বজুড়ে শিশু মনোবিজ্ঞানীরা একমত যে, শিশুরা যা দেখে, তা-ই শেখে। যদি তারা দেখে বাবা-মা রেগে গিয়ে চিৎকার করেন, তাহলে তারাও তেমনই আচরণ শিখে। শুধু পরিবারে নয়, বাইরের জগতে, বন্ধুত্বে, এমনকি নিজের অনুভূতির প্রকাশেও তারা হয়ে ওঠে অস্থির ও প্রতিক্রিয়াশীল। তাই সন্তানের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ শেখা। ড. লরা মার্কহ্যাম বলেন, “আপনার শিশু যদি আপনার ভালোবাসার কেন্দ্র হয়, তবে আত্মনিয়ন্ত্রণই তার চারপাশের নিরাপত্তা বলয়।”

তাহলে কিভাবে এই চক্র ভাঙা সম্ভব? নিজেকে সময় দিন:
রাগের মুহূর্তে সরতে শিখুন। গলা না চড়িয়ে নিজেকে স্থির করুন। এক কাপ পানি, কিছুক্ষণ নীরবতা বা অন্য ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ থাকা—এগুলো ছোট কিন্তু শক্তিশালী অভ্যাস।

অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন:
শিশুকে বলুন, “আমি রেগে গেছি কারণ…” এতে তারা শেখে—রাগ লুকোবার নয়, বোঝার বিষয়। তাদেরও নিজের অনুভূতি প্রকাশে উৎসাহ দিন।

শান্ত কিন্তু দৃঢ় আচরণ:
খারাপ ব্যবহারের প্রতিক্রিয়া দিন সম্মানজনক ভাষায়। চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন—এই আচরণ কেন গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে ভালো ব্যবহার হলে প্রশংসা করুন। ইতিবাচক ভাষাই গড়ে তোলে ইতিবাচক শিশু।

হুমকি নয় :
শাস্তি নয়—তাদের শেখান কাজের পরিণতি। খেলনা দিয়ে আঘাত করলে খেলনা কিছু সময়ের জন্য সরিয়ে রাখা যায়, সঙ্গে ব্যাখ্যা দিন—”খেলনা খেলবার জন্য, কাউকে আঘাত করতে নয়।”

মৌলিক চাহিদার যত্ন:
পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত রুটিন শিশুকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখে। উদ্বেগ কমে, আচরণও নিয়ন্ত্রিত হয়।

আর যদি আপনি কখনো চিৎকার করে ফেলেন?
স্বাভাবিক। কিন্তু শিশুর সামনে সরি বলুন। তারা শেখে—ভুল হওয়াটা সমস্যা নয়, তা স্বীকার করে ঠিক করাটাই আসল শিক্ষা। এবং যদি অনুভব করেন আপনার রাগ প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, অথবা পরবর্তী সময়ে অপরাধবোধে ভোগেন—তাহলে থেরাপিস্টের সহায়তা নিন। এটি দুর্বলতা নয়, বরং সাহসিকতার প্রথম ধাপ। পরিবারের আবহ যদি হয় ভালোবাসায় পূর্ণ, কথা বলার সুযোগময়, যেখানে দোষ নয়—মাফের জায়গা বেশি, তবেই সেখানে শিশুরা বড় হয় আত্মবিশ্বাসে, মানবিকতায় এবং মমতায়।

জলবায়ু পরিবর্তন ও তীব্র তাপপ্রবাহ , দক্ষিণ এশিয়ায় আশঙ্কাজনক বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তান এই মুহূর্তে এক ভয়াবহ গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এ সমস্যা আঞ্চলিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে রাজস্থান অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৬.৪°C ছাড়িয়ে গেছে, এটি গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহের শীর্ষ সীমার কাছাকাছি। এই অত্যধিক গরমের ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ফসলের ক্ষতি এবং ঝড়-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা ঘটে অন্তত ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এটি কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটবে বলে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।

তাপপ্রবাহের ফলে জীবনযাত্রা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। রাজস্থান, গুজরাট, এবং পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের মতো অঞ্চলে শীতলীকরণের অভাব ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এতে স্থানীয় জনগণকে ব্যাপকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, বিশেষ করে শহরের অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে। গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ, কারণ তাপপ্রবাহের ফলে ফসলের উৎপাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।তাপমাত্রার এমন রেকর্ড-ব্রেকিং বৃদ্ধি কৃষকদের জন্য গভীর দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করেছে। এই অঞ্চলের প্রধান ফসল যেমন গম, ভুট্টা এবং তুলা—যা স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ—সেগুলি তীব্র তাপমাত্রার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। গরমের প্রভাবে শস্য শুকিয়ে যাচ্ছে, যা খাদ্য উৎপাদনকে হ্রাস করছে এবং কৃষি শ্রমিকদের জীবিকা বিপর্যস্ত করছে।

ভারত ও পাকিস্তানে লোডশেডিং হচ্ছে তাপপ্রবাহের অন্যতম বড় সমস্যা। গরমের কারণে বিদ্যুৎ চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে, বিশেষ করে এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা পর্যাপ্ত না হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে, ফলে বহু শহরের বাসিন্দারা গরমের মধ্যে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছে। এই পরিস্থিতি মানুষকে শারীরিকভাবে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত গরমের কারণে স্নায়ুজনিত সমস্যা, তাপদাহ এবং হিটস্ট্রোকের ঘটনা বেড়ে গেছে।

এই তাপপ্রবাহের সাথে সাথে ঝড় ও বন্যার সম্ভাবনাও বেড়ে গেছে। তীব্র গরম ও আর্দ্রতার কারণে সামুদ্রিক ঝড়ের সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়াকে আরও বড় সংকটে ফেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ভারতের পূর্বাঞ্চল এবং পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে, এটি ইতিমধ্যে উষ্ণ সমুদ্রের কারণে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ঝড়ের ফলে সম্পদ ক্ষতি, মানুষের মৃত্যু এবং বিপর্যস্ত পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনই এই ধরনের তাপপ্রবাহের জন্য দায়ী। গ্লোবাল ওয়র্মিংয়ের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে এবং এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। তাপপ্রবাহ, গ্রীষ্মকালীন অতি তাপ এবং মৃদু বৃষ্টির অভাব—এই সমস্তই জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটের সংকেত। বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ, শিল্পবিপ্লব এবং বনভূমির ধ্বংস এই পরিবর্তনগুলোর জন্য দায়ী।

বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায় যে, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগামী দশকগুলোতে আরও বাড়বে। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ—এই তিনটি দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে এই অঞ্চলের কৃষি, পানির উৎস এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, আগামী কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই পরিস্থিতি আরও বিপদজনক হতে পারে। সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির উচিত উন্নত প্রযুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সরকারকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং কৃষি খাতে বিশেষ নজর দিতে হবে। পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজন রয়েছে।

পানির অস্ত্রায়ন – বাস্তবে ভারতের পক্ষে পাকিস্তানকে কি কাবু করা সম্ভব ?

• এশিয়া মহাদেশের অন্যতম দীর্ঘ সিন্ধু নদের উৎপত্তি তিব্বতে। সেখান থেকে প্রবাহিত হয়ে জম্মু ও কাশ্মীর দিয়ে পাকিস্তানে ঢুকেছে এই সিন্ধু নদ। সিন্ধু পানি চুক্তি অনুসারে, সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদী—রাভি (ইরাবতী), বিয়াস (বিপাশা) ও সাটলেজ (শতদ্রু০র পানি বরাদ্দ ছিল ভারতের জন্য। আর পশ্চিমাঞ্চলীয় তিনটি নদী—সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের পানি ব্যবহারের অধিকার ছিল পাকিস্তানের। ভারত পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর পানি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সীমিত সেচের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। তবে এগুলোর প্রবাহ সংরক্ষণ বা পরিবর্তন করে নিম্নগামী এলাকায় পানি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

• অতীতেও এই চুক্তি নিয়ে বিবাদ তৈরি হয়েছে দুদেশের মধ্যে। ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পানি অবকাঠামো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পাকিস্তান। অভিযোগ করেছে, চুক্তি লঙ্ঘন করে এসব নদীর প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে ভারত। অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সেচ, সুপেয় পানি ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনের কথা বলে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাস্তবতার আলোকে, চুক্তি পর্যালোচনা এবং পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়ে আসছে।

• উজানের দেশ হওয়ায় ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে ভারত। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষাকালে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলো যখন ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন সেগুলোর কোটি কোটি ঘনমিটার পানির আটকে দেওয়া ভারতের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এ কাজের জন্য প্রয়োজন পানি সরিয়ে মজুত করে রাখার বিশাল অবকাঠামো আর অগণিত খাল—যা ভারতের নেই। পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাবে ভারত এখনও চুক্তি অনুযায়ী ঝিলম, চেনাব ও সিন্ধু থেকে তার জন্য বরাদ্দ করা ২০ শতাংশ পানিও যথাযথ কাজে লাগাতে পারছে না। তবে জটিল ভূপ্রকৃতি আর ভারতের অভ্যন্তরেই প্রতিবাদের কারণে সিন্ধু অববাহিকায় কিছু পানি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প খুব একটা দ্রুত এগোয়নি।

• বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি স্থগিতের ফলে ভারত এখন চাইলে পাকিস্তানকে না জানিয়েই পানি ধরে রাখতে বা প্রবাহের দিক বদলাতে বিদ্যমান অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনতে বা নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে। চুক্তি অনুযায়ী, ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে পানিসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি করতে হয়—যা বন্যা পূর্বাভাস এবং সেচ, পানিবিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির পরিকল্পনায় অপরিহার্য। তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, চুক্তি স্থগিতের আগে থেকেই ভারত পানিসংক্রান্ত তথ্য ভাগাভাগি ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছিল।

• পাকিস্তানের কৃষির বেশির ভাগ ফসল আসে পাঞ্জাব রাজ্য থেকে। আর পাঞ্জাবের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কৃষির কাজে সেচের পানির জোগান আসে সিন্ধু ও অন্যান্য শাখা নদী থেকে। সেখানে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় সিন্ধু নদ ও এর শাখা নদ–নদীগুলোর পানি দিয়ে। ভারত বড় বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে দিলে অতি বন্যাও দেখা দিতে পারে।

• ভারত নিজেও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় চীনের ভাটিতে রয়েছে। আর সিন্ধুর উৎপত্তি তিব্বতে। তিব্বতে কয়েকটি পানিবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পর চীন এখন ইয়ারলুং সাংপো নদীর(যা উত্তরপূর্ব ভারতে ব্রহ্মপুত্রে পরিণত হয়) ভাটি এলাকায় বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। বেইজিংয়ের দাবি, এ বাঁধ নির্মাণের পরিবেশগত প্রভাব হবে খুবই সামান্য। কিন্তু ভারতের আশঙ্কা, এ বাঁধ চীনের হাতে নদীর পানিপ্রবাহের ওপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ এনে দেবে।

• বিশ্লেষকরা বলছেন – ভারত নিজেই ব্রহ্মপুত্র ও চীন থেকে উৎপন্ন অন্যান্য নদীর ভাটি অঞ্চলের দেশ। চুক্তি লঙ্ঘন করে বা চুক্তির বিষয়ে একতরফা কাজ করার মাধ্যমে ভারত এমন নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে, যা একদিন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। এই ধরনের পদক্ষেপের পর অন্যান্য আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজেকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রমাণ করা ভারতের জন্য কঠিন হবে।