Home Blog Page 124

বিশ্বকে বদলে দেয়া ‘ইউটিউবের’ বিশ বছর

0

বিশ্বের প্রায় ২৫০ কোটি মানুষ বর্তমানে ইউটিউব ব্যবহার করেন (Statista, 2023)। এই বিপুল ব্যবহারই প্রমাণ করে যে ইউটিউব কেবল বিনোদন নয়, বরং শিক্ষা, ব্যবসা, সামাজিক পরিবর্তন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব বিস্তার করেছে। Rick Kirkham বলেছিলেন, ‘YouTube did not just change the media; it changed how people communicate, learn, and earn.’

ইউটিউব বিনোদন জগতে এক বিপ্লব এনেছে। আগে মানুষ যখন টেলিভিশন ও সিনেমার মাধ্যমে বিনোদন গ্রহণ করত, তখন ইউটিউব যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে কনটেন্ট দেখার স্বাধীনতা দিয়েছে। Pew Research Center-এর এক জরিপ অনুযায়ী, তরুণদের মধ্যে ৮১% ইউটিউবকে প্রধান বিনোদনের উৎস হিসেবে দেখেন। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অসংখ্য নতুন শিল্পী, যেমন তাহসিনেশন, সালমান মুক্তাদির (বাংলাদেশে), এবং MrBeast ও PewDiePie (বিশ্বব্যাপী) তাদের নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলেছেন। ইউটিউবের democratization of fame-এর ধারণা আজ বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে প্রচলিত মিডিয়া ছাড়াই যে কেউ তারকা হয়ে উঠতে পারেন।

শিক্ষাক্ষেত্রেও ইউটিউব এক নিরব বিপ্লব এনেছে। ফোর্বসের রিপোর্ট অনুসারে, বর্তমানে প্রতি মিনিটে ইউটিউবে প্রায় ৫০০ ঘণ্টা নতুন ভিডিও আপলোড হয়, যার একটি বড় অংশ শিক্ষামূলক কনটেন্ট। “Khan Academy”, “CrashCourse”, এবং বাংলাদেশের “১০ মিনিট স্কুল”-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ফ্রি শিক্ষা ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে, ইউটিউবের মাধ্যমে অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০% বৃদ্ধি পেয়েছিল (UNESCO, 2021)। ফলে ইউটিউব এখন শুধু সহায়ক মাধ্যম নয়, শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে।

আয়ের ক্ষেত্রেও ইউটিউব একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইউটিউবাররা তাদের ভিডিও থেকে সরাসরি আয় করতে পারে। ২০২۳ সালের তথ্যানুসারে, জনপ্রিয় ইউটিউবার MrBeast এর বার্ষিক আয় প্রায় ৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (Forbes, 2023)। বাংলাদেশেও বিভিন্ন ইউটিউবার যেমন বায়োস্কোপ, অনন্য ফ্যাশন ব্লগার, কিংবা রিভিউভিত্তিক চ্যানেলগুলি ইউটিউব আয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৫১ মিলিয়নের বেশি ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে, যাদের অনেকেই ইউটিউবকে তাদের মূল জীবিকার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ইউটিউব মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেও সহজ করেছে। আগে যেখানে সংবাদ প্রচারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু মাধ্যম ছিল, এখন যেকেউ নিজের মতামত বা প্রতিবাদ ইউটিউবে প্রকাশ করতে পারে। Black Lives Matter আন্দোলনের সময় ইউটিউব ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রচার মাধ্যম। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আন্দোলনের সময়ে সামাজিক ন্যায়বিষয়ক ভিডিওগুলোর দর্শক সংখ্যা ২২০% বৃদ্ধি পেয়েছিল (YouTube Official Blog, 2020)। বাংলাদেশেও শিক্ষাবিষয়ক আন্দোলন, অধিকার আদায়, এবং সামাজিক ইস্যুগুলোর প্রচারে ইউটিউব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এছাড়াও ইউটিউব আজ ব্যবসা ও ব্র্যান্ডিংয়ে অনন্য ভূমিকা পালন করছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০% ব্যবহারকারী নতুন পণ্য বা ব্র্যান্ড সম্পর্কে প্রথম জানে ইউটিউবের মাধ্যমে (Think with Google, 2023)। প্রযুক্তি পণ্যের ক্ষেত্রে যেমন MKBHD এর রিভিউ, কিংবা ফ্যাশন পণ্যের ক্ষেত্রে Safiya Nygaard-এর মতো ইউটিউবারদের ভিডিও পণ্যের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশেও খাদ্যপণ্য, পোশাক ও ইলেকট্রনিক পণ্যের প্রচারে ইউটিউব একটি প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

তবে ইউটিউবের নেতিবাচক দিকও রয়েছে। Pew Research Center-এর তথ্যানুসারে, প্রায় ৬৪% ইউটিউব ব্যবহারকারী স্বীকার করেছেন যে, প্ল্যাটফর্মে মাঝে মাঝে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের জন্য অনুপযুক্ত কনটেন্টের ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত ব্যবহারে আসক্তি সমস্যাও বর্তমানে আলোচিত ইস্যু। তাই নিরাপদ কনটেন্ট নীতিমালা অনুসরণ এবং ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। ইউটিউব নিজেও নানা ধরনের পরিবর্তন এনেছে, যেমন “Restricted Mode”, “YouTube Kids” ইত্যাদি।

বর্তমানে ইউটিউব নিজেকে আরো বৈচিত্র্যময় করে তুলছে। ইউটিউব শর্টসের মাধ্যমে টিকটকের প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং ইউটিউব মিউজিক বা ইউটিউব প্রিমিয়ামের মতো পরিষেবার মাধ্যমে নিজস্ব ইকোসিস্টেম তৈরি করছে। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করে ভবিষ্যতে ইউটিউব আরো উন্নত হবে বলে অনুমান করা যায়।

ইউটিউব আজ বিশ্বব্যাপী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মত প্রকাশ, ব্যবসা ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি প্রধান শক্তি। বিল গেটস যেমন বলেছিলেন, ‘The Internet is becoming the town square for the global village of tomorrow,’ — আর ইউটিউব সেই বিশ্বগ্রামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে ইউটিউব ভবিষ্যতেও ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন আনার একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

বায়ু দূষণ – মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে

বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা, বায়ু দূষণের কারণে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঢাকা শহরের বায়ু প্রতিনিয়ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশকৃত সীমার চেয়ে অনেক বেশি দূষিত থাকে। বিশেষ করে শীতকালীন সময়ে, ঢাকা শহরের বায়ুতে পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫ (PM2.5) কণিকার ঘনত্ব অত্যধিক বেড়ে যায়, যা শ্বাসযন্ত্রের পাশাপাশি মস্তিষ্কের উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। আইকিউএয়ারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহর হিসেবে দূষণের দিক থেকে ঢাকা তৃতীয় স্থানে । এ শহরের বায়ু দূষণের মাত্রা এবং তার পরিণতিতে স্বাস্থ্যগত সমস্যা দিন দিন বাড়ছে।এদিকে, যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি এ বিষয়ে আরও গভীর চিন্তা এবং উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি, যুক্তরাজ্যের কমিটি অন দ্য মেডিক্যাল এফেক্টস অব এয়ার পলিউট্যান্টস (COMEAP) এ ঘোষণা করেছে যে, বায়ু দূষণ কেবল শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে না, বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে, বায়ু দূষণের কারণে স্মৃতিভ্রংশ, কগনিটিভ ডিক্লাইন (বোঝা ও চিন্তা-ক্ষমতার লোপ) এবং অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদীভাবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাজ্যের গবেষণাগুলি দেখায় যে, PM2.5 এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র কণিকার মধ্যে থাকা রাসায়নিক উপাদানগুলি মস্তিষ্কের প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে, যা স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয় এবং মস্তিষ্কের কোষগুলির ক্ষতি ঘটায়। গবেষণাটি জানায়, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে, এই ধরনের দূষণের কারণে ডিমেনশিয়া এবং আলঝেইমারসহ নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ু দূষণের কারণে কগনিটিভ ফাংশন হ্রাসের মাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা কমে যায়।
বায়ু দূষণের ফলে মস্তিষ্কের ভাস্কুলার ক্ষতিও হতে পারে, যা স্ট্রোক এবং ভাস্কুলার ডিমেনশিয়া (vascular dementia) সৃষ্টি করে। এই রোগগুলি মস্তিষ্কের রক্তনালীর ক্ষতির কারণে ঘটে, যা ব্যক্তির স্মৃতি, চিন্তা এবং আচরণে প্রভাব ফেলে। এর ফলস্বরূপ, বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে কগনিটিভ ডিক্লাইন এবং স্মৃতিভ্রংশের সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে।
বায়ু দূষণ কেবল বয়স্কদের জন্যই ক্ষতিকর নয়, শিশুদের জন্যও এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ু দূষণ শিশুদের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারের (neurodevelopmental disorders) ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। শিশুদের মধ্যে শেখার ক্ষমতা এবং আচরণগত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যত জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বায়ু দূষণের কারণে শিশুদের মধ্যে ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) এর মত সমস্যা বেড়ে যাচ্ছে।
ঢাকায় বায়ু দূষণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। বাংলাদেশে বায়ু দূষণের কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, এবং এটি শ্বাসযন্ত্র, হৃদরোগ, এবং ক্যান্সারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ঢাকার বায়ুর গুণগত মান অনেকটাই খারাপ, যা স্থানীয় এবং বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষত, ঢাকার শীতকালে বায়ু দূষণ ব্যাপক আকার ধারণ করে, যেখানে PM2.5 কণিকার ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোর তুলনায়, ঢাকার বায়ু দূষণের মাত্রা অনেক বেশি এবং এর প্রভাবও অধিক তীব্র।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অনুযায়ী, ঢাকার বায়ু দূষণের পরিমাণ গড়ে ৫১.৮ μg/m³, যা WHO-এর নিরাপদ সীমা ১০ μg/m³ এর চেয়ে অনেক বেশি। এই দূষণ সরাসরি মানুষের শ্বাসযন্ত্র এবং হৃদরোগের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, ঢাকায় বায়ু দূষণের কারণে বিশেষভাবে বয়স্ক ব্যক্তিরা, শিশু এবং গর্ভবতী মহিলাদের জন্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে বায়ু দূষণের সমস্যা মোকাবেলা করতে হলে, যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, সরকারকে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি, শিল্প কারখানাগুলোর নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো এসব পদক্ষেপের মধ্যে পড়ে।ঢাকায় বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য, স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় ডিজেল ইঞ্জিনের ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া এবং বাইরের পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা, যেমন সিএনজি চালিত বাস ও মেট্রোরেল প্রকল্প, এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে। বিশ্বব্যাপী বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি আনার জন্য, জনগণের সচেতনতা এবং শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি সবাই সঠিকভাবে বায়ু দূষণের প্রভাব সম্পর্কে জানি এবং সচেতনতা বাড়াই, তবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনের মানের উপর একটি বড় প্রভাব ফেলছে।

সিন্ধু চুক্তির পরিণতি থেকে বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা : শেখ রোকন , লেখক ও নদী গবেষক

0

“… কাশ্মীরের পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেসব ‘ব্যবস্থা’ নিয়েছিল, সে তালিকায় সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ছিল সিন্ধুর পানিবণ্টন চুক্তি।…যদিও ২০১৬ সালের উরি হামলার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সিন্ধু চুক্তি বাতিল করার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন ‘পানি ও রক্ত একসঙ্গে বইতে পারে না’। সবকিছু সত্ত্বেও চুক্তিটি যে শেষ পর্যন্ত স্থগিত হতে পারে, ২৩ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত কেউ ধারণা করতে পারেনি।

এর একটি কারণ, ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধুর পানিবণ্টন চুক্তিকে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে এশিয়ার সেরা দুই চুক্তির অন্যতম বিবেচনা করা হয়। অপর সেরা চুক্তিটি হচ্ছে ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চার দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত মেকং চুক্তি। ঢাকায় কিংবা কাঠমান্ডুতে বসেও আমরা যখন বাংলাদেশ-ভারত বা ভারত-নেপালে মধ্যে স্বাক্ষরিত বা স্বাক্ষরযোগ্য চুক্তিগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করি, তখন ঘুরেফিরে সিন্ধু ও মেকং চুক্তির কথা আসে।

… আমরা বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছি, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আসলে তিনটি চুক্তি হওয়া উচিত– গঙ্গা অববাহিকা চুক্তি, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা চুক্তি, মেঘনা অববাহিকা চুক্তি। তাহলে এগুলোর শতাধিক উপনদীও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তির আওতায় আসবে। এছাড়া নদীবিষয়ক চুক্তি হতে হবে স্থায়ী, মেয়াদি নয়। দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের সালিশি ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বলা বাহুল্য, আমাদের এসব প্রত্যাশার অনুপ্রেরণা আসলে সিন্ধু চুক্তি। এখন খোদ সিন্ধু চুক্তির যখন এমন পরিণতি, তখন আমরা কী করব?

সিন্ধু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানের ভাগের তিনটি নদীর–সিন্ধু, বিতস্তা ও চন্দ্রভাগা–উজানে ভারত কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা পানি আটকাতে পারবে না। ভারত বলছে, এখন তারা এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে পানি আটকাবে। আর ৬টি নদীর বন্যা ও বৃষ্টিপাতসংক্রান্ত যেসব তথ্য পাকিস্তানকে দেওয়ার কথা, সেটিও দেবে না। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, ভারতের ভাগের তিনটি নদীর–শতদ্রু, বিপাশা ও ইরাবতী–ড্যামগুলো বরং আকস্মিকভাবে ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানে ‘বন্যা অস্ত্র’ ছুড়ে দিতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সিন্ধু চুক্তির এই পরিণতি থেকে বাংলাদেশ কী কী সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেবে? … (বাংলাদেশ-ভারত) দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক যে তলানিতে পৌঁছেছে, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ভারত যদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন না করে বা ঝুলিয়ে দেয়? যদি বন্যার আগাম তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকে? সময় থাকতে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ ভেবে রাখা দরকার।

প্রথমত, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে, যাতে করে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়ন এবং তিস্তাসহ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এবং মেঘনা অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি করা যায়। দ্বিতীয়ত, ভারতের বন্যা পূর্বাভাসের ওপর ভরসা না করে স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তির সহায়তায় নিজস্ব পূর্বাভাস ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, নদীবিষয়ক আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচগুলো যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর সম্পন্ন করতে হবে। “


জুলাই আন্দোলন – মামলা নিয়ে বাণিজ্য , প্রতিপক্ষকে হয়রানি

0

গত বছর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। আহত হওয়ার ঘটনায়ও অনেক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রকৃত আসামি, সন্দিগ্ধ ব্যক্তির পাশাপাশি হয়রানিমূলকভাবেও অনেককে আসামি করা হয়েছে। যাঁদের মধ্যে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, অন্যত্র থাকা মানুষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিও রয়েছেন। সাজানো ঘটনার পাশাপাশি কোথাও সত্য ঘটনার মামলায় এ রকম অনেককে আসামি করে ‘মামলা-বাণিজ্য’ হচ্ছে। মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার আশ্বাস, ভুলবশত আসামি করা হয়েছে মর্মে হলফনামা দিয়ে ও পুলিশ প্রতিবেদনে নির্দোষ দেখানোর প্রতিশ্রুতিসহ নানাভাবে এই বাণিজ্য করার অভিযোগ যেমন আছে, আবার প্রতিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েও কাউকে কাউকে মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও রয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতসহ বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১,৪৯৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৫৯৯টি। অন্যান্য ৯০০টি। এসব মামলায় ১০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যা মামলার মধ্যে অনেকগুলোর তদন্তে অগ্রগতি আছে বলেও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। দৈনিক প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকার ৪০টি মামলা পর্যালোচনা করে ঢালাওভাবে আসামি করাসহ নানা অসংগতি দেখা গেছে। ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের চেয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর করে জানা গেছে, হয়রানিমূলক আসামি করার ক্ষেত্রে অধিকাংশ স্থানে ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির কোনো না কোনো নেতা-কর্মী। কিছু ক্ষেত্রে কতিপয় অসাধু আইনজীবী, পুলিশ সদস্য ও দালাল চক্র জড়িত। কোথাও প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য, কোথাও চাঁদাবাজির জন্য, কোথাও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আসামি করার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন অথবা বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

যে ৪০টি মামলার খোঁজখবর নিয়েছে প্রথম আলো, সেগুলোর মধ্যে ২১টি মামলা হওয়ার আগে-পরে কোনো কোনো আসামির কাছ থেকে অর্থ দাবি ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাকি ১৯ মামলায় রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, পেশাগত ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব থেকে অনেককে আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তাঁদের স্বজনেরা। অনেক আসামিকে বাদী চেনেনও না। যে ৪০টি মামলা নিয়ে প্রথম আলো অনুসন্ধান করেছে, সেগুলোর এজাহারে উল্লেখ করা ১১ বাদীর মুঠোফোন নম্বরে কল করে সেগুলো বন্ধ পাওয়া গেছে। কেউ কেউ ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন অথবা ভুয়া ঠিকানা দিয়েছেন। ফলে আসামি ও তাঁদের স্বজনেরা বাদীকে খুঁজে পাচ্ছে না। ১৪ জন বাদী জানিয়েছেন, অন্য কেউ তাঁদের দিয়ে মামলা করিয়েছেন। এর মধ্যে চারজন জানিয়েছেন, মামলার কাগজে তাঁদের কাছ থেকে কেবল সই নেওয়া হয়েছে। আসামির নাম দিয়েছেন অন্যরা।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্যদের মনোবল দুর্বল ছিল। তখন যাচাই-বাছাই করে মামলা নেওয়ার মতো পরিস্থিতি থানাগুলোর ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশেও মামলা হয়েছে। এদিকে আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর সরাসরি হামলায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বড় অংশ এখনো ধরা পড়েনি। শহীদদের স্বজনেরা প্রিয়জন হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রায় প্রতিটি মামলায় এত বেশিসংখ্যক মানুষকে আসামি করা হয়েছে, তাঁদের সবার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করতেই তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন।

কিচ (Kitsch) : নন্দন , জনপ্রিয়তা আর লোক সংস্কৃতির ছেদবিন্দু

কলা ও নান্দনিকতার জগতে “কিচ” (Kitsch) একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। শিল্প বা সাংস্কৃতিক উপাদান কিচ বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় ও চটকদার হলেও, গভীরতা, মৌলিকতা ও মানের ঘাটতি রয়েছে। সাধারণত, কিচ শিল্পকর্ম বা পণ্য গুলো অতিরঞ্জিত আবেগ, বাহুল্যপূর্ণ অলংকরণ এবং সাধারণ দর্শকের তাৎক্ষণিক আনন্দ বা চমকপ্রদ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে তৈরি হয়। তবে এসবের পেছনে গভীর কোনো ভাবনার অবকাশ থাকে না। বিশ্বব্যাপী কিচ ধারণার উৎপত্তি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইউরোপের শিল্প আন্দোলনগুলির সাথে। বিশেষ করে আধুনিকতার বিকাশের পর যখন শিল্পের গুণগত মান, মৌলিকতা এবং চিন্তার গভীরতা নিয়ে গুরুত্ব আরোপ শুরু হলো, তখনই কিচ শব্দটি জনপ্রিয় হয়। জার্মান শব্দ “kitschen” থেকে “kitsch” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে, যার অর্থ – ‘সস্তাভাবে কিছু জোড়াতালি দেওয়া’।
কিচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বাহ্যিক চাকচিক্য। এটি সহজে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, কারণ এর রং, আকার বা বিষয়বস্তু সাধারণত অত্যন্ত চটকদার এবং আবেগে ভরা হয়। উদাহরণস্বরূপ, অত্যন্ত রঙিন, ঝলমলে আলোতে সজ্জিত প্লাস্টিকের ফুল, নকল মার্বেল মূর্তি বা অতিরঞ্জিত রোমান্টিক দৃশ্যপট – এগুলো সবই কিচের উদাহরণ। এগুলো আপাতদৃষ্টিতে আনন্দদায়ক হলেও, গভীর দার্শনিক বা নান্দনিক মূল্য বহন করে না। কিচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। সাধারণ দর্শকের মাঝে কিচ পণ্য ও শিল্পকর্ম বেশ গ্রহণযোগ্য, কারণ এগুলো সহজবোধ্য ও তাৎক্ষণিক আনন্দদায়ক। এই জনপ্রিয়তার কারণেই শিল্প বোদ্ধা ও সমালোচকরা কিচকে অনেক সময় “জনপ্রিয় সংস্কৃতির ছায়াপথ” বলে অভিহিত করেন।

যেমন বিশ শতকের প্রথমার্ধে হিটলারের নাৎসি জার্মানিতেও কিচ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল, যেখানে শিল্পকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং আবেগময়তাকে হাতিয়ার করা হয়েছিল। আজকের বিশ্বে কিচ শুধু অবজ্ঞাসূচক কিছু নয়, বরং এটি প্রধানধারার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। The Conversation এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, কিভাবে আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতি কিচকে তার কেন্দ্রবিন্দুতে টেনে এনেছে।বিজ্ঞাপন, সিনেমা, পপ মিউজিক, টেলিভিশন সিরিয়াল এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার নিত্যদিনের পোস্টেও কিচ এখন সহজেই দেখা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া যুগে, যেখানে দ্রুত চমক তৈরিই মুখ্য, সেখানে বাহ্যিক সৌন্দর্য এবং তাৎক্ষণিক আবেগের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। তাই কিচও হয়ে উঠেছে অনিবার্য। বিশেষ করে, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক এর মতো প্ল্যাটফর্ম গুলোতে অতি স্টাইলাইজড, চটকদার ছবি এবং ভিডিও — যা আবেগের সহজাত প্রকাশ দেখায় — তা মূলত কিচ চর্চার আধুনিক রূপ। অনেক সময় জনপ্রিয় মুভি, টিভি সিরিজ বা গানের ভিডিওতেও আমরা দেখি অতিরিক্ত রঙ, অতিরঞ্জিত আবেগ এবং সস্তা দর্শন — যা দর্শকদের কাছে তাৎক্ষণিক মুগ্ধতা তৈরি করে, কিন্তু চিন্তার গভীরতা সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়।
বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহোল পপ আর্ট আন্দোলনের মাধ্যমে কিচকে উচ্চমার্গীয় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে আসেন। তার বিখ্যাত কাজ, যেমন ক্যাম্পবেল স্যুপ ক্যানের সিরিজ, কিচ সংস্কৃতির উপর ব্যঙ্গ করলেও, একই সাথে একে বৈধতাও প্রদান করে। তিনি বলেছিলেন, “Making money is art and working is art and good business is the best art.” অর্থাৎ, ভোগবাদ ও সস্তা জনপ্রিয়তার মধ্যেই আজকের শিল্পের বাস্তবতা নিহিত।
অন্যদিকে, বিখ্যাত লেখক মিলান কুন্ডেরা তার বিখ্যাত উপন্যাস The Unbearable Lightness of Being এ কিচকে “মিথ্যা আবেগের সর্বোচ্চ রূপ” বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, কিচ হলো এমন এক জগত যেখানে কষ্ট, মলিনতা বা মৃত্যু নেই — আছে শুধু চিরন্তন হাসি, সুখ এবং প্রপঞ্চের প্রদর্শনী।
ফ্যাশন জগতে, কিচ দেখা যায় যখন পোশাকের ডিজাইনে অতিরিক্ত রং, ঝিকঝিকে কাপড় বা অদ্ভুত প্যাটার্ন ব্যবহার করা হয়, যা চটকদার হলেও রুচিসম্মত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কিছু ফ্যাশন শো যেখানে ‘অতিরিক্ত’ কে স্টাইলের মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
টেলিভিশন ও বিনোদনে, কিচ দেখা যায় অতি নাটকীয় সিরিয়ালে যেখানে প্রতিটি দৃশ্য আবেগে ভরা, অতিরিক্ত কান্না, রোমান্স বা সংঘাত দেখানো হয়। বাংলা সিরিয়ালের কিছু জনপ্রিয় ধারাবাহিক এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হতে পারে, যেখানে বাস্তবতার তুলনায় আবেগের নাটকীয় প্রদর্শন বেশি।
আর্কিটেকচারে, কিচ চর্চা স্পষ্ট দেখা যায় সস্তা অলঙ্করণযুক্ত বিশাল প্রাসাদ বা রিসোর্টে, যেখানে গ্রীক, রোমান বা মিশরীয় ধাঁচের নকল পিলার ও মূর্তি দেখা যায় — অথচ এগুলোর ঐতিহাসিক বা নান্দনিক গভীরতার কোনো ভিত্তি নেই।
ধর্মীয় অনুষঙ্গেও কিচ প্রবেশ করেছে। আজকাল অনেক ধর্মীয় অনুষঙ্গ বা উপহার সামগ্রী তৈরি হয় অত্যন্ত ঝলমলে রঙ এবং অলংকারে পূর্ণ করে, যা প্রার্থনার গভীরতাকে ছাপিয়ে বাহ্যিক চমক তৈরিতে মনোযোগ দেয়। উদাহরণস্বরূপ, প্লাস্টিকের তৈরি চকচকে পূজার মূর্তি বা সস্তা রত্নখচিত রোজার মালা।
রাজনৈতিক প্রচারে, কিচ দেখা যায় যখন রাজনৈতিক নেতাদের বিশাল পোস্টার, রঙিন ব্যানার বা অতি আবেগময় গান তৈরি করা হয়, যা বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে নেতাকে অতিমানবীয় করে তোলে।
খেলাধুলার বিজ্ঞাপনে, বিশেষ করে বিশ্বকাপ বা বড় খেলার সময় কিচের আধিক্য দেখা যায়। চটকদার বিজ্ঞাপন, ভুয়া আবেগে ভরা স্লোগান, এবং অলিম্পিক বা বিশ্বকাপের লোগো গুলো প্রায়ই কিচের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহোল পপ আর্ট আন্দোলনের মাধ্যমে কিচকে উচ্চমার্গীয় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে আসেন। তার বিখ্যাত কাজ, যেমন ক্যাম্পবেল স্যুপ ক্যানের সিরিজ, কিচ সংস্কৃতির উপর ব্যঙ্গ করলেও, একই সাথে একে বৈধতাও প্রদান করে। তিনি বলেছিলেন, “Making money is art and working is art and good business is the best art.” অর্থাৎ, ভোগবাদ ও সস্তা জনপ্রিয়তার মধ্যেই আজকের শিল্পের বাস্তবতা নিহিত।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমাদের দেশেও কিচ সংস্কৃতি চোখে পড়ে নানা জায়গায়। বিশেষ করে বিয়ের সাজসজ্জা, মেলার স্টল, বা কিছু নির্দিষ্ট সস্তা সৌন্দর্য্যচর্চায় আমরা কিচের উপস্থিতি দেখতে পাই। প্লাস্টিকের ফুলে সাজানো কৃত্রিম গাছ, রঙিন আলোর ছটা, অতি অলঙ্করণ করা পোশাক — এগুলো সবই আমাদের নিত্যদিনের কিচ চর্চার উদাহরণ।
তবে কিচ নিয়ে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখাই যথার্থ নয়। আধুনিক কালে অনেকে কিচকে ‘আনন্দময় সস্তা সংস্কৃতি’ হিসেবে গ্রহণ করছে এবং নতুন ভাবে মূল্যায়ন করছে। অনেক সমকালীন শিল্পী কিচ উপাদানকে ব্যবহার করে স্যাটায়ার বা সমালোচনার হাতিয়ার হিসেবে শিল্প সৃষ্টি করছেন। বিশেষ করে পপ আর্ট আন্দোলনে কিচ উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহোলের মতো ব্যক্তিত্বরা জনপ্রিয় সংস্কৃতির গভীর ব্যঙ্গ করেছেন।
সুতরাং, কিচ শুধুমাত্র “খারাপ শিল্প” নয়, বরং এটি সমাজের এক বাস্তব প্রতিফলন — যেখানে মানুষ তার চাহিদা, স্বপ্ন এবং সৌন্দর্যের সহজ রূপ প্রকাশ করতে চায়। কিচ আমাদের জানিয়ে দেয়, সৌন্দর্য শুধু দার্শনিক বা অভিজাত দর্শনের বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের অনুভূতি, আবেগ এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথেও গভীরভাবে জড়িত।
কিচ একদিকে যেমন নান্দনিকতার ঘাটতির প্রতীক, অন্যদিকে এটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার অভিব্যক্তি। এটি আমাদের শেখায় যে, শিল্প এবং সংস্কৃতি শুধু বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার ক্ষেত্র নয়, বরং মানুষের সরল আবেগ এবং তাৎক্ষণিক আনন্দ লাভের চেষ্টার প্রতিফলনও। তাই কিচকে বোঝা এবং তার ভূমিকা বিশ্লেষণ করা সমকালীন শিল্প এবং সংস্কৃতি চর্চার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টিআরএফ হামলার দায় স্বীকার করেনি , পোস্টটি ছিল সাইবার আক্রমণ – TRF

সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে লস্করে তাইয়েবার সহযোগী সংগঠন হিসেবে পরিচিত ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)। সংগঠনটি তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘মিথ্যা, প্রমাণ ছাড়া তড়িঘড়ি করে দায় চাপানো ও কাশ্মীরি প্রতিরোধকে হেয় করার জন্য সাজানো অভিযানের অংশ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। শনিবার (২৬ এপ্রিল) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে গোষ্ঠীটি দাবি করে, ঘটনার পরপরই তাদের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে অননুমোদিত বার্তা পোস্ট করা হয়েছিল। এই পোস্ট ছিল ‘সমন্বিত সাইবার আক্রমণের ফল, যা ভারতের ডিজিটাল যুদ্ধাস্ত্রের একটি পরিচিত কৌশল।’

এই পোস্টের ভিত্তিতেই বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর চালানো ভয়াবহ হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স’ নামে পরিচিত ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ)। ২০১৯ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটিকে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবার (LeT) একটি শাখা বা সহযোগী সংগঠন হিসেবে দাবি করেন ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এদিকে, গত ৫ দিনে পেহেলগাম হামলায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে না পারলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জম্মু-কাশ্মীরে তথাকথিত ১০ ‘সন্ত্রাসীর’ বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অথচ, এই তথাকথিত ১০ সন্ত্রাসী এই হামলায় জড়িত ছিল কিনা সে বিষয়ে কোনো তথ্যই দেয়নি ভারত সরকার।

নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, এদের মধ্যে আহসান উল হক ২০১৮ সালে পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং সম্প্রতি উপত্যকায় অনুপ্রবেশ করেন। শহীদ আহমেদ কুট্টে লস্কর-ই-তৈয়্যবার কমান্ডার। জাকির আহমেদ গনি একাধিক সন্ত্রাস-সম্পর্কিত কার্যকলাপে জড়িত সন্দেহে নজরদারিতে ছিলেন। ফারুক আহমেদ টেডওয়া পাকিস্তান থেকে কাজ করছেন। গত মঙ্গলবারের হামলায় থোকার সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। পুলিশের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘বাড়ি ভাঙচুর এবং তল্লাশির উদ্দেশ্য জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের জাল ছিন্ন করা।’

দেশি বিনিয়োগেই বেশি কর্মসংস্থান , তবু কেন বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে বেশি উৎসাহ ?

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) পরিসংখ্যান বলছে, কর্মসংস্থান তৈরিতে দেশীয় বিনিয়োগের অবদানই তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও এ অভিযোগ বেশ পুরোনো যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এ দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। বিডার বিনিয়োগবিষয়ক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০৯-১০ থেকে ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত ১০ হাজার ৫৭৫ কোটি ডলার স্থানীয় বিনিয়োগের বিপরীতে কর্মসংস্থান হয়েছে মোট ২৮ লাখ ১৭ হাজার ৯০২ জনের। একই সময় ৫ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগের বিপরীতে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৮৭৫ জনের।

বাস্তবতা হলো, দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অনেক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত হারে তা বাড়ছে না। বিশ্লেষকেরা বলেন, স্থানীয় বিনিয়োগ থেকে যে মুনাফা হয়, তা সাধারণত দেশেই থাকে এবং পুনর্বিনিয়োগ হয়। ফলে দেশের সম্পদ দেশেই বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় সংযোগ ও সহযোগী শিল্প গড়ে ওঠার অবকাশ তৈরি হয়। অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলো মুনাফার একটি বড় অংশ নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যায়। স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তাদের সংযোগে গভীরতা আসে না। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি বিদেশি বিনিয়োগ থেকে যতটা উপকৃত হতে পারত, এসব কারণে ততটা পারে না।

তবে বিদেশি বিনিয়োগেরও প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান আসে; ব্যবসা-বাণিজ্যে আসে প্রতিযোগিতা। অনেক সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে অংশ নেয়।

বিদেশি বিনিয়োগ আসলে দেশীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধি পায়; অর্জিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু স্থানীয় বিনিয়োগে গতি না এলে বিদেশি বিনিয়োগও গতি আসবে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। বিশ্বব্যাংকের আইএফসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বিদেশি বিনিয়োগ মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ (২০২৩)। সামগ্রিকভাবে যেখানে জিডিপির অনুপাতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ শতাংশের মতো সরকারি ও ব্যক্তি বিনিয়োগ মিলিয়ে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিডার বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলনে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ব্যবসার পরিবেশ তথা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচটি বড় বাধা হলো — বিদ্যুতের সমস্যা, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ, দুর্নীতি, অনানুষ্ঠানিক খাতের আধিক্য ও উচ্চ করহার। দেশের স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে স্বস্তি না পেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আসতে চাইবেন না, এটাই বাস্তবতা বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।বিনিয়োগের যথোপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় অধিকাংশ খাতে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানি গঠনের সুযোগ থাকলেও কখনোই এফডিআই আকর্ষণে বাংলাদেশ ভালো করেনি। এমনকি দেশে কর্মরত বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার হার ভালো হলেও দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ খুবই কম। তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা।

এদিকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের রিটার্ন অন ইক্যুইটি ভালো হলেও রিটার্ন অন অ্যাসেট বৈশ্বিক গড় মানের চেয়ে কম। দ্য গ্লোবাল ইকোনমির হিসাবে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রিটার্ন অন অ্যাসেট ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় মান ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। রিটার্ন অন অ্যাসেট (ROA) হল একটি সূচক যে একটি কোম্পানি তার মোট সম্পদের তুলনায় কতটা লাভজনক। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এই পরিসংখ্যান দেখে বিনিয়োগ করে থাকেন।

নরকের সাত রাজপুত্র –

গূঢ় তন্ত্র-মন্ত্র, মধ্যযুগীয় ডেমোনোলজি আর খ্রিস্টীয় নৈতিকতার অন্ধকার প্রান্তরে নরকের সাত রাজপুত্র (Seven Princes of Hell) একটি রহস্যময় ও গভীর প্রতীকী ধারণা হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে। যদিও বাইবেলের মূল ধর্মগ্রন্থে এর সরাসরি কোনো উল্লেখ নেই, তবে মধ্যযুগীয় গ্রিমোয়ার, খ্রিস্টীয় ডেমনোলজি ও গুপ্তচর্চার লেখালেখিতে এই ধারণাটি ধীরে ধীরে গঠিত হয়েছে। এখানে প্রতিটি রাজপুত্র এক একটি মারাত্মক পাপ বা “Seven Deadly Sins”-এর প্রতীক এবং নরকের একেকটি অংশের শাসক।

মধ্যযুগীয় ভিত্তি ও খ্রিস্টীয় ডেমনোলজি –

নরকে রাজপুত্রদের শাসনের ধারণা বাইবেলের মূল পাঠে নেই। বাইবেলে শয়তান ও কিছু দানবের উল্লেখ থাকলেও, কোনো স্পষ্ট অধিপতিত্ব কাঠামো দেয়া হয়নি। কিন্তু মধ্যযুগে, যখন খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ব পাপকে নৈতিক রূপ দিতে চাইছিল, তখন “Seven Deadly Sins” অর্থাৎ গর্ব, লোভ, হিংসা, ক্রোধ, অলসতা, ভোগ ও লালসা—এই সাতটি প্রধান পাপের ধারণা গড়ে ওঠে। পরে প্রতিটি পাপের সাথে এক একজন নরকের রাজপুত্রকে যুক্ত করা হয়।এই কাঠামো সবচেয়ে পরিচিতভাবে উঠে আসে ১৬শ শতকে ডাচ ধর্মতত্ত্ববিদ পিটার বিনসফেল্ডের (Peter Binsfeld) রচনায়। তিনি প্রতিটি পাপের জন্য একেকজন দানবিক শাসক নির্ধারণ করেন। যদিও এটি সর্বজনস্বীকৃত নয়, কিন্তু বহু পশ্চিমা সাহিত্যে এটিই প্রচলিত রূপ।নরকের সাত রাজপুত্র ও তাদের পাপ-সম্পর্কিত অধিপত্য –

লুসিফার –

লুসিফার অর্থ “আলো বহনকারী।” তিনি ঈশ্বরের সবচেয়ে উজ্জ্বল ফেরেশতা ছিলেন, যিনি নিজের অহংকারের জন্য বিদ্রোহ করে পতিত হন। গর্বের রাজপুত্র হিসেবে লুসিফার আত্মম্ভরিতা, অহমিকা ও ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার প্রতীক। তিনি মানুষের আত্ম-অভিমান ও ঈশ্বরতুল্য হবার বাসনার প্রতিফলন।

ম্যামন –

ম্যামন হলো ধন, সম্পদ ও বস্তুগত লোভের প্রতীক। বাইবেলে যীশু বলেন, “তোমরা ঈশ্বর ও ম্যামন উভয়ের সেবা করতে পারবে না” (ম্যাথিউ ৬:২৪)। ম্যামনের প্রলোভন মানুষকে আত্মিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। সে চায় সীমাহীন সম্পদের উপাসনা।

আসমোডিয়াস –

আসমোডিয়াস বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে যৌন পাপ ও হিংস্র লালসার প্রতীক। তোবিত বইয়ে (Apocrypha) দেখা যায়, সে ঈর্ষা ও কামনার বশবর্তী হয়ে বারবার বিবাহবন্ধন ধ্বংস করে। লালসার রাজপুত্র হিসেবে আসমোডিয়াস কামনাকে বিকৃত করে, প্রেমকে রূপান্তরিত করে আসক্তিতে।

লিভায়াথান –

লিভায়াথান হিব্রু বাইবেলে উল্লিখিত এক বিশাল সাগরদানব। হিংসার রাজপুত্র হিসেবে সে অন্যের সাফল্যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। তার হিংসা আত্মার ভেতর ক্ষরণ ঘটায়, যেটা অনিবার্যভাবে ঈর্ষা ও আত্মধ্বংসের দিকে ধাবিত করে।

বেলজেবাব –

বেলজেবাব একসময় ক্যানানীয় দেবতা ‘বাল’-এর রূপ ছিল। খ্রিস্টীয় ডেমনোলজিতে সে রূপান্তরিত হয় “মাছির প্রভু”-তে। ভোগের রাজপুত্র হিসেবে বেলজেবাব শুধু অতিরিক্ত খাদ্য নয়, বরং যেকোনো মাত্রাতিরিক্ত আসক্তির রূপ। তার ছবি প্রায়ই স্ফীত শরীর, দুর্গন্ধ ও মাছির মাধ্যমে আঁকা হয়।

শয়তান –

অনেক সময় শয়তান ও লুসিফারকে এক মনে করা হলেও, অনেক দার্শনিক ও মিস্টিক শাখা শয়তানকে আলাদা পরিচয়ে দেখে। সে হলো প্রতিশোধ, ধ্বংস ও অগ্নিমূর্তি ক্রোধের প্রতীক। ঈশ্বরের ন্যায় বিচারের পরিণত রূপ যদি লুসিফার হয়, তবে শয়তান তার বিপরীত ধ্বংসকারী প্রতিহিংসা।

বেলফেগোর –

বেলফেগোর হলো উদ্ভাবন, অলস প্রলোভন এবং ‘সহজে ধনী হবার’ মায়ার প্রতীক। অলসতার রাজপুত্র হিসেবে সে কেবল শারীরিক অলসতা নয়, বরং আত্মিক শূন্যতা ও অনাগ্রহের প্রতীক। কখনও তাকে বিদ্রূপাত্মক আরাম ও অপচয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে ময়লা সিংহাসনে বসে দেখা যায়।

প্রতীকবাদ ও সংস্কৃতিতে প্রভাব

এই সাত রাজপুত্র একেকটি মানবিক প্রবৃত্তির রূপ। মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইউং সহ অনেকে তাদেরকে মানুষিক ছায়া বা archetype হিসেবে দেখেছেন। তারা হয়তো দানব নয়, বরং আমাদের ভেতরের নিয়ন্ত্রণহীন প্রবৃত্তির রূপ। সাহিত্য ও শিল্পে তারা বহুবার উঠে এসেছে। দান্তে’র ইনফার্নো-তে বিভিন্ন স্তরের নরক পাপ অনুযায়ী বিভক্ত। আধুনিক টিভি সিরিজ যেমন Supernatural অথবা কমিক The Sandman-এ এদের নতুন রূপায়ণ দেখা যায়।Diablo, Doom এর মতো ভিডিও গেমেও এরা মূল ভিলেন। গথিক ও হেভি মেটাল সংস্কৃতিতেও এরা প্রতিরোধ, স্বাধীনতা ও নৈতিকতা ভাঙার প্রতীক।

গুপ্তচর্চা ও আধুনিক ব্যাখ্যা –

আধুনিক শয়তানবাদ বা বামহস্তপন্থী (Left-hand path) আচারানুষ্ঠানে অনেক সময় এদের সম্মান করা হয়। যেমন, লুসিফারকে জ্ঞান, মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কেউ কেউ এদের ডাকে ধ্যান বা রিচুয়াল করে নিজের আকাঙ্ক্ষা ও শক্তি জাগানোর জন্য। নরকের সাত রাজপুত্র কি বাস্তব? নাকি আমাদের ভেতরের ছায়া? তারা শুধু শাসক নয়, তারা আমাদের অবদমিত ইচ্ছা, লোভ, অহংকার ও ক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। এই রাজপুত্রদের চেনা মানে আমাদের নিজের অন্তর্জগতে এক অন্ধকার ভ্রমণ, যেখানে আমরা নিজেদের ভয়, কামনা ও পতনের সম্ভাবনাকে মুখোমুখি হই।

সানস্ক্রিন বনাম ছাতা – UV রশ্মি থেকে রক্ষার , আসল উপায় কোনটি ?

গ্রীষ্মকালে রোদের তীব্রতা যেন এক অদৃশ্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি (UV rays) ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে সানবার্ন, বয়সজনিত দাগ এবং দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্যানসার পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে। এই বিপদ থেকে বাঁচতে মানুষ মূলত দুটি প্রতিরক্ষা দেয়াল গড়ে—সানস্ক্রিন এবং ছাতা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি বেশি কার্যকর? সানস্ক্রিন, বিশেষত যার SPF (Sun Protection Factor) ৩০ বা তার বেশি, UVA এবং UVB উভয় রশ্মি প্রতিহত করতে সক্ষম। এটি ত্বকে একটি পাতলা আবরণ তৈরি করে, যা সূর্যের রশ্মিকে প্রতিফলিত বা শোষণ করে ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। তবে সানস্ক্রিনের কার্যকারিতা নির্ভর করে সঠিক ব্যবহারের ওপর: ২০-৩০ মিনিট আগে ব্যবহার, পর্যাপ্ত পরিমাণে লাগানো এবং প্রতি ২ ঘণ্টা পর পুনরায় প্রয়োগ।

অন্যদিকে ছাতা প্রাকৃতিকভাবে ত্বককে ছায়া দেয়। এটি সরাসরি রোদের সংস্পর্শ এড়াতে সাহায্য করে এবং শরীরের তাপমাত্রাও কিছুটা কমায়। কিন্তু এটি কেবলমাত্র সেই অংশগুলোকে রক্ষা করে, যা ছায়ার আওতায় থাকে— মুখ, মাথা বা কাঁধ। হাতে বা পায়ে UV প্রতিরোধ হয় না।

তাহলে সমাধান কোথায়?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছাতা ও সানস্ক্রিন—দুটির সমন্বয়ই সবচেয়ে কার্যকর। ছাতা দেবে ছায়া, আর সানস্ক্রিন রক্ষা করবে ত্বকের প্রতিটি খোলা অংশ। যারা ছাতা বহন করতে পছন্দ করেন না, তাঁদের জন্য সানস্ক্রিন অপরিহার্য। আবার সানস্ক্রিন ভুলভাবে ব্যবহৃত হলে ছাতাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।

শেষ কথা, গ্রীষ্মে রোদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ একক অস্ত্রে নয়, বরং সঠিক কৌশল আর সমন্বয়ে জয়ী হওয়া যায়। ছাতা হোক বা সানস্ক্রিন—নিজের ত্বককে ভালোবাসা মানে সচেতন থাকা।

ট্রাম্প ট্যারিফ – যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় , জোর দিচ্ছে জাপান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান। সেই জাপানে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বন্ধু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ২৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ ছিল ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’র মতোই। এক সময় বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ থেকে বর্তমানে চতুর্থ অর্থনীতির দেশ জাপান আশাই করতে পারেনি পারস্পরিক শুল্কের হার হবে ২৪ শতাংশ। শুধু তাই নয়, জাপানি গাড়ির আমদানির ওপর শুল্ক ১০ গুণ বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে। দ্য জাপান টাইমস জানায়—আশা করা হয়েছিল যেহেতু ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ জাপানে এসেছিল, তাই শুল্ক আরোপের আগে সূর্যোদয়ের দেশটিকে বিবেচনায় রাখা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশও জাপান। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র থেকে জাপানে সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার। এর প্রায় ১০ শতাংশ অর্থ জাপান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করা হয়েছে। মার্কিন ঋণের সবচেয়ে বড় গ্রহীতা জাপান।

এই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু শুক্রবার তার মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেন। চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো উভয় দেশের জন্য পারস্পরিক সুবিধা অর্জন করা। ইশিবা বলেন, মার্কিন শুল্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে লালিত অবাধ ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ষৎএর ভিত্তি থেকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, গাড়ি এবং ইস্পাত খাতসহ জাপানি শিল্পের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির উপর এগুলো বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইশিবা বলেন, “মার্কিন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জাপানি কোম্পানিগুলো কীভাবে ব্যাপক অবদান রাখে তা দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক ব্যবস্থা পর্যালোচনা করার জন্য অনুরোধ করাটা জাপানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” জাপানের শীর্ষ আলোচক আকাযাওয়া রিয়োসেইয়ের বুধবার থেকে ওয়াশিংটন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। তিন দিনের সফরে তিনি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।