Home Blog Page 123

পহেলগাম সন্ত্রাসী হামলা – হুমকি-হেনস্থার মুখে ভারতের কাশ্মীর , মুসলমান ও ধর্মনিরপেক্ষরা

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পহেলগামে বন্দুকধারীদের হামলার পরে গত কয়েকদিনে ভারতের নানা জায়গায় কাশ্মীরি মানুষদের হেনস্তা, মারধর এমনকি হত্যার হুমকি দেওয়ার খবর এসেছে। এ ধরনের হেনস্তা ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে মূলত কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রীদের যারা অন্যান্য রাজ্যে পড়াশোনা করছেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও কাশ্মীরিদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হচ্ছে। হেনস্তার ভয়ে অনেক কাশ্মীরি ছাত্র-ছাত্রী গত কয়েকদিন ধরে ঘরবন্দি হয়ে রয়েছেন। একই সঙ্গে মুসলমান-বিরোধী ঘৃণাও ছড়ানো হচ্ছে সামাজিক এবং গণমাধ্যমে। কাশ্মীরি এবং মুসলমান-বিদ্বেষ ছড়ানোর পাশাপাশি প্রবলভাবে মৌখিক আক্রমণ করা হচ্ছে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মানুষদেরও।

পহেলগামের হামলার জন্য ভারত সরকার পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলেছে, তাই ভারতের মানুষদের মধ্যেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। নানা জায়গায় পাকিস্তানের পতাকাও পোড়ানো হচ্ছে। জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় আহ্বায়ক নাসির খুয়েমি বিবিসি বাংলাকে বলেন — “দেরাদুন, চণ্ডীগড়, প্রয়াগরাজের মতো বড় শহরসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত আটটি গুরুতর মারধর, হুমকি ও হেনস্তার ঘটনা হয়েছে। এছাড়াও অসংখ্য ঘটনার খবর আসছে সারা দেশ থেকে যেখানে আমাদের রাজ্যের ছাত্রছাত্রীরা হেনস্তা বা হুমকির শিকার হওয়ার কথা জানাচ্ছেন।”

তার কথায়, “পহেলগামের হামলার পরে এমনিতেই পরিস্থিতি তেতে আছে। তার ওপরে কাশ্মীরি ছাত্রদের হয়রানির এসব ঘটনা প্রকাশ করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে সরকারের একটা আশঙ্কা আছে। তাই একটা প্রশাসনিক চাপ আছে ঘটনাগুলো প্রকাশ না করার। আমরা চেষ্টা করছি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে তাদের মাধ্যমে যাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।” অথচ, পহেলগামের হামলায় যে ২৬ জন নিহত হয়েছেন, তার মধ্যে একজন কাশ্মীরিও ছিলেন যিনি মুসলমান এবং পর্যটকদের ঘোড়ায় করে ঘুরিয়ে রুটি-রুজি চালাতেন। তিনি হামলাকারীদের একজনের বন্দুক কেড়ে নিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন বলে জানা গেছে।

আবার হামলার পরে স্থানীয়রা আহতদের পিঠে চাপিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বা কাশ্মীরি গাড়িচালকরা পর্যটকদের দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, এরকম বর্ণনাও প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনার দিনই রাতে পহেলগামের ট্যাক্সিচালকরা মোমবাতি মিছিল বের করেছিলেন, পর দিন ওই হামলার প্রতিবাদে পুরো জম্মু-কাশ্মীর জুড়েই হরতাল পালিত হয়েছে। সেখানে অনেক প্রতিবাদ মিছিলও হয়েছে। আবার পহেলগামের ঘটনার দুদিন পরেই ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে গুলি বিনিময়ে নিহত হন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এক সেনা সদস্য। তিনি মুসলমান, নাম ঝন্টু আলি শেখ। পহেলগামের হামলার বিস্তারিত বর্ণনা সামনে আসার পর জানা যায় যে, হত্যাকারীরা পর্যটকদের ধর্মীয় পরিচয় জানতে চেয়েছিল। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই হিন্দু। এই বর্ণনার পরেই মুসলমান-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি।

হিন্দুত্ববাদী প্রচারযন্ত্র সামাজিক মাধ্যমে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়াতে থাকলেও ভারতের সব মুসলমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাই কিন্তু পহেলগামের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন। কলকাতা হোক বা কাশ্মীর – মুসলমানরাও ‘সন্ত্রাসবাদ’-এর বিপক্ষে স্লোগান তুলে মিছিল করেছেন। আসামসহ কয়েকটি রাজ্য হাতে গোনা কয়েকজন মুসলমান উসকানিমূলক পোস্ট করে গ্রেফতার হয়েছেন। মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হিন্দুত্ববাদী প্রচার যন্ত্রের একটা নিয়মিত কাজ। কিন্তু এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মনোভাবের মানুষজনও। কিছু গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের। হিন্দুত্ববাদীরা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাভাবনার মানুষদের কটাক্ষ করে থাকেন ‘সেকু-মাকু’ বলে, অর্থাৎ ‘সেকুলার এবং মার্কসিস্ট’।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলেন — “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে আগেও দেখা গেছে, তবে ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার বিরুদ্ধে এই পরিমাণ ঘৃণার বিস্ফোরণ আগে দেখিনি। আমার মনে হয় মুসলমানদের ওপরে সংখ্যাগুরুর যে বিদ্বেষ যতটা ছড়ানো যেত, সেটা করতে পারছে না হিন্দুত্ববাদী প্রচারযন্ত্র – কারণ মাঝখানে এই ধর্মনিরপেক্ষরা একটা ঢাল হয়ে কাজ করছেন। এবারের আক্রমণ তাই মুসলমানদের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষদেরও।”

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি , চীনের ঘাটতি পূরণ করছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আবারও দারুণ গতি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬.৯৯% বেড়ে ৩.৬৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোস্টাটের বরাতে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এসব তথ্য জানিয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, আমদানি প্রবৃদ্ধির তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি — যা বাংলাদেশের বাজার দখলের সক্ষমতা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের বাজার শেয়ার কমার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান দখলে বাংলাদেশ সফল হয়েছে।

এই প্রবৃদ্ধি যতটা না দামে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণনির্ভর। ইইউ বাজারে ইউনিট দামে গড়ে ১.৪৬% হ্রাস পেয়েছে, অথচ পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি ৩৯.০২%। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ক্রেতাদের চাহিদামতো সাশ্রয়ী দামে পণ্য সরবরাহ করছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তারপরও চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৭.২৩%, রফতানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫.৭৪ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক মন্দা ও কিছু সুরক্ষাবাদী-নীতির মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশি পোশাক শিল্পের টেকসই প্রতিযোগিতাশক্তির প্রমাণ দিচ্ছে।

বিশ্লেষক ও উদ্যোক্তারা বলছেন, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে একাধিক শক্ত ভিত। এগুলো হলো — উচ্চমানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন। পরিবেশবান্ধব কারখানা (গ্রিন ফ্যাক্টরি)। সামাজিক ও শ্রমিক নিরাপত্তায় অগ্রগতি। দ্রুত ডেলিভারি সক্ষমতা। ইইউতে জিএসপি সুবিধা তথা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। ইইউ’র বাজারে চলতি সময়ে চীনের রফতানি বেড়েছে মাত্র ২৫%, যা দাঁড়িয়েছে ৪.৫৪ বিলিয়ন ডলারে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩৭%, যা স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে নির্দেশ করে। তুরস্কের রফতানি কমেছে ৩.৬৪%। ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া ২১-২২% হারে বাড়লেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রেও চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য কমছে। ২০১৮ সালে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পোশাক রফতানি ছিল বাংলাদেশের তুলনায় ৫ গুণ বেশি, ২০২৪ সালে সেই ব্যবধান কমে এসেছে মাত্র ২ গুণে। বাংলাদেশের রফতানি দাঁড়িয়েছে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারে এবং চীনের কমে ১৬.৫০ বিলিয়ন ডলারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে ১৫.০৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেক (৪৯.৮২%)। বিজিএমইএ’র তথ্য বলছে, যুক্তরাজ্যেও রফতানি বেড়েছে, যদিও হার তুলনামূলকভাবে কম— মাত্র ৪.১৪%। অন্যান্য বাজার যেমন- জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতেও রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে গড়ে ৬.৬৬%।

উদ্যোক্তারা বলছেন — বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে ক্রেতারা বিকল্প বাজার হিসেবে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে নতুন কার্যাদেশ আসার সম্ভাবনাও বাড়ছে। তবে প্রতিযোগিতা, শুল্কনীতি পরিবর্তন এবং ইউরোপের বাজারে চাহিদা কমার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি টেকসই করা সম্ভব। এজন্য নতুন বাজারে প্রবেশ ও পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি জরুরি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে।

প্রিসেন্টিমেন্ট থিওরি – ভবিষ্যৎ দেখার নীরব প্রতিভা

আপনার কখনও কি এমন অনুভূতি হয়েছে, অকারণেই বুকের ভেতর এক অজানা অস্থিরতা, যেন কিছু খারাপ ঘটতে চলেছে? হয়তো কিছুক্ষণ পরই শুনলেন কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের মৃত্যুসংবাদ, কিংবা হঠাৎ দুর্ঘটনার খবর। এই অজানা, শব্দহীন, অদৃশ্য সতর্কবার্তাকেই বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন প্রিসেন্টিমেন্ট। এক ধরনের “ভবিষ্যৎ দেখার নীরব প্রতিভা”, যেখানে আমরা অজান্তেই অনুভব করি যা এখনও ঘটেনি। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ এই অনুভূতির অস্তিত্বের কথা বলে আসছে। রোমান সাম্রাজ্যের জেনারেলরা যুদ্ধের আগে তাদের সৈনিকদের অস্থিরতা ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনে সিদ্ধান্ত নিতেন। মধ্যযুগের ইউরোপে ‘দূরদর্শিতা’ বা ‘ফোরনোটিশ’ ক্ষমতাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মনে করা হতো। বাংলার লোককথাতেও আমরা পাই, মা-পিতামাতারা বলতেন, “মন খারাপ লাগছে—নিশ্চয় কিছু হয়েছে।” যুগে যুগে সংস্কৃতি বদলেছে, কিন্তু এই অনুভূতি থেকেই গেছে মানুষের অবচেতন মনে।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে?

১৯৯০-এর দশক থেকে কিছু সাহসী গবেষক এই রহস্যময় অনুভূতির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করেন। ডিন র‍্যাডিন (Dean Radin), ড্যারিল বেম (Daryl Bem) প্রমুখ গবেষকরা দাবি করেন, মানুষের শরীর বিশেষ করে স্নায়ুব্যবস্থা অনেক সময় এমনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় যা ভবিষ্যতের ঘটনাকে আগেভাগে আভাস দেয়। ডিন র‍্যাডিন একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেন যেখানে অংশগ্রহণকারীদের সামনে এলোমেলোভাবে ভালো ও খারাপ ইমেজ দেখানো হয়। দেখার আগেই গবেষকরা তাদের স্কিন কন্ডাক্ট্যান্স (electrodermal activity) মেপে নেন। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায়, খারাপ ছবি দেখার ঠিক আগে তাদের ত্বকের বৈদ্যুতিক প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে, কিন্তু ভালো ছবির আগে তেমন হচ্ছে না।

অন্য এক গবেষণায়, হার্ট রেট এবং ব্রেন ওয়েভও আগেভাগে সংকেত পাঠানোর ইঙ্গিত দেয়। যেন শরীর জানে কিছু আসছে, অথচ মস্তিষ্ক তখনও জানে না।

তবে এই গবেষণাগুলোকে কেন্দ্র করে প্রবল বিতর্কও রয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এসব ফলাফল হতে পারে ছোট স্যাম্পল সাইজ, পরীক্ষার নকশার ত্রুটি বা পরিসংখ্যানগত কাকতালীয়তার ফল। তারা যুক্তি দেন মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই খারাপ কিছুর আশঙ্কা করে থাকে—এটি বিবর্তনগতভাবে আত্মরক্ষার অংশ। তাই কখনো কখনো “সঠিক অনুমান” হলে সেটাকে বিশেষ ক্ষমতা ভাবা হয়, কিন্তু ভুল অনুমানগুলো আমরা ভুলে যাই। ড্যারিল বেম ২০১১ সালে তার গবেষণাপত্র “Feeling the Future” প্রকাশের পর একদিকে যেমন আলোড়ন সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্রচণ্ড সমালোচনাও হয়। বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে প্রশ্ন ওঠে “প্রিসেন্টিমেন্ট কি সত্যিই ভবিষ্যতের পূর্বাভাস, নাকি কেবল আমাদের মস্তিষ্কের তৈরি ছায়া?”

অবচেতনের খেলা নাকি অজানা ইন্দ্রিয়?

সমালোচনার মধ্যেও প্রিসেন্টিমেন্ট থিওরি একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে, আমাদের অবচেতন মন কি এমন কোনো তথ্যের সন্ধান পায় যা সচেতন মস্তিষ্ক বুঝতে পারে না? বিজ্ঞান বলে, মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ তথ্য গ্রহণ করে, যার এক ক্ষুদ্র অংশই আমরা সচেতনভাবে উপলব্ধি করি। তাই সম্ভাবনা থেকেই যায়, হয়তো অবচেতন মনে আমরা বাতাসের চাপ, গন্ধের ক্ষীণ পরিবর্তন, অন্যদের মুডের অদৃশ্য সংকেত ধরতে পারি—যা আসন্ন বিপদের আভাস দেয়। অথবা, হয়তো সময় নিজেই এমন এক তরল বাস্তবতা যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক বিন্দুতে মিলিত হয়, আর আমাদের শরীর কোনো অজ্ঞাত পদ্ধতিতে সেই কম্পন অনুভব করতে পারে।

প্রিসেন্টিমেন্টের ব্যাপারে সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো, এর অভিজ্ঞতা প্রায়ই খুব ব্যক্তিগত। গবেষণাগারে হয়তো সবসময় ধরা পড়ে না, কিন্তু জীবনের বাস্তব মুহূর্তে আমরা এর অস্তিত্ব টের পাই। কখনো সন্তান দূরে থাকা মায়ের কাছে অকারণ অস্থিরতার মাধ্যমে বিপদের বার্তা পাঠায়, কখনো নিজের জীবনেও কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে মনে হয়, “এটা যেন না করি।” কেউ কেউ মনে করেন এটা কাকতালীয়। আবার অনেকে বলেন, এটাই আত্মার নীরব বার্তা।

প্রিসেন্টিমেন্ট থিওরি হয়তো এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে সময়, চেতনা আর বাস্তবতার সম্পর্ক কি এতটা সোজাসাপ্টা? হতে পারে, সময় একটা সরল রেখা নয় বরং একটা জটিল জাল, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত অন্যটির সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত। আমরা যখন এক গভীর স্তরে প্রবেশ করি হোক সেটা স্বপ্নে, নীরব একাকিত্বে, কিংবা হঠাৎ আসা ভয়ের অনুভূতিতে তখন হয়তো সেই জালের আরেক প্রান্তের নড়াচড়া টের পাই। প্রিসেন্টিমেন্ট হলো সেই ছায়া, যা এখনো অন্ধকারে রয়ে গেছে। তা হয়তো কখনো স্পষ্ট আলোয় আসবে, হয়তো কখনো নয়। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মানুষের হৃদয় এবং মন এখনো এমন এক রহস্যের আধার যা বিজ্ঞানের মেপে ফেলা সম্ভব হয়নি।

ভালো কোলেস্টেরল কতোটা ভালো ?

অনেকদিন ধরেই আমরা শুনে এসেছি ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) মানেই হৃদরোগের বিরুদ্ধে এক নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা। নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আর জীবনযাপনের নানা ভালো অভ্যাসের সঙ্গে ভালো কোলেস্টেরলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে গল্পটা অতটা সরল নয়। হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষক জেরেমি ফুরটাডো এবং তার দল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করেছেন—ভালো কোলেস্টেরল যদি হৃদরোগ কমায়, তবে কেন এইচডিএল বাড়ানোর ওষুধগুলো তেমন কোনো সুফল আনতে পারেনি? গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত তাদের গবেষণা বলছে, আসলে সব ভালো কোলেস্টেরল সমান নয়!

গবেষণায় দেখা গেছে, এইচডিএলেরও অনেক উপপ্রজাতি আছে যার প্রত্যেকটির প্রোটিন-কাঠামো আলাদা। কিছু উপপ্রজাতি সত্যিই হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, আবার কিছু কোনো উপকার করে না বরং ঝুঁকি বাড়ায়! বিশেষ করে, যেসব এইচডিএল উপপ্রজাতিতে অ্যাপোলিপোপ্রোটিন সি৩ বা আলফা-২-ম্যাক্রোগ্লোব্যুলিন থাকে, সেগুলো স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে, অ্যাপোলিপোপ্রোটিন ই বা সি১ যুক্ত উপপ্রজাতি আমাদের হার্টের জন্য সত্যিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।

তাই দেখা যাচ্ছে, রক্তে এইচডিএলের সংখ্যা বাড়ানো মানেই স্বাস্থ্যের উন্নতি নয়। বরং জানতে হবে কোন ধরনের এইচডিএল বাড়ছে। এর ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো সিইটিপি নিরোধক ওষুধ। এগুলো রক্তে ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ালেও, ক্লিনিকাল ট্রায়ালে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে ব্যর্থ হয়। কারণ ওষুধগুলো ভালো এবং খারাপ দুই ধরনের উপপ্রজাতিকেই বাড়িয়ে দেয়।

এই নতুন তথ্য আমাদের জীবনধারার পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দেয়। এখন থেকে কেবল রক্তে কোলেস্টেরলের সংখ্যা নয়, তার গুণগত মানও বিবেচনা করতে হবে। ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম—এসব অভ্যাস যেহেতু প্রাকৃতিকভাবে শরীরের ভালো উপপ্রজাতির বৃদ্ধি ঘটায়, তাই এগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে গেল। জেরেমি এবং তার দল বলছেন, এইচডিএল শুধু কোলেস্টেরল বহন করে না, এর রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ইমিউন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মতো ক্ষমতাও। কাজেই সামনে গবেষকরা চেষ্টা করবেন নির্দিষ্ট করে এমন খাদ্য এবং জীবনধারা চিহ্নিত করতে, যেগুলো আমাদের শরীরে সঠিক উপপ্রজাতির ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করবে।

তাদের নতুন গবেষণা শিগগিরই প্রকাশিত হবে, যেখানে জানানো হবে কোন ধরনের খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর। এই তথ্যগুলো আমাদের শেখাচ্ছে, স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হলে শুধু পরিমাণ নয়, গুণগত দিকেও নজর দিতে হবে। আর এই চর্চা শুরু হতে পারে প্রতিদিনের সহজ কিছু অভ্যাস থেকে—সুষম খাবার, নিয়মিত হাঁটা, মানসিক চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত ঘুম। কারণ স্বাস্থ্য সচেতন জীবনযাপনই আসলে আমাদের হৃদয়ের আসল বন্ধু।

চীন বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধ করেছে , অস্ট্রেলিয়া কি ঘাটতি পূরণ করতে পারবে?

মার্কিন চীন বাণিজ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ঘোষণা দিয়েছেন — তিনি আগামী মাসের নির্বাচনে জয়ী হলে ‘বিরল মৃত্তিকা খনিজ'(rare earth materials/elements)-এর মজুদ গড়তে ১.২ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার বিনিয়োগ করবেন। এ ঘোষণা এসেছে এমন সময়ে, যখন চীন সাতটি বিরল খনিজ উপাদানের রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এসব উপাদান বৈদ্যুতিক গাড়ি, যুদ্ধবিমান ও রোবট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। চীনের এই নিষেধাজ্ঞা সব দেশের উপরই প্রযোজ্য হলেও এটি মূলতঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিরল মৃত্তিকা হলো ১৭টি মৌলের একটি গোষ্ঠী — “বিরল” বলা হয় না, কারণ এগুলো উত্তোলন এবং পরিশোধন করা অত্যন্ত কঠিন। চীন এবং অস্ট্রেলিয়া উভয়েরই বিরল মৃত্তিকার রিজার্ভ রয়েছে। কিন্তু ৯০% বিরল খনিজ পরিশোধন চীনে ঘটে, যা এগুলোকে প্রযুক্তিতে ব্যবহারযোগ্য করে। ফলে দেশটি সরবরাহের উপর বড় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এবং সেটাই পশ্চিমা দেশগুলোকে আতঙ্কিত করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বেড়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫% বিরল খনিজ আমদানি চীন থেকে এসেছে।

অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত আয়রন অর রিসার্চের পরিচালক ফিলিপ কিরক্লেচনার বিবিসিকে বলেন — গত কয়েক দশকে চীন যখন দ্রুত পরিশোধন প্রক্রিয়ায় আধিপত্য স্থাপন করেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি যোগ করেন, “চীন এখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার লাইফলাইন নিয়ন্ত্রণ করছে।” টেসলার সিইও এলন মাস্ক এই সপ্তাহে বলেছেন, উন্নত ম্যাগনেটে ব্যবহৃত বিরল মৃত্তিকা রপ্তানি বন্ধ হওয়ার ফলে মানবাকৃতির রোবট তৈরিতে টেসলার সক্ষমতা প্রভাবিত হয়েছে — যা দেখাচ্ছে, মার্কিন কোম্পানিগুলোর উপর চীনের প্রভাব কতটা বড় হতে পারে। আলবানিজের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এই খনিজ মজুদ দেশীয় ও মিত্র দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঁচামাল থাকলেও পরিশোধন এখনো চীনের হাতে, তাই শুধু খনিজ মজুদ করে সমাধান আসবে না।

লিথিয়াম — যদিও বিরল খনিজ নয়, তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং সৌর প্যানেল তৈরির জন্য অপরিহার্য একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ খনিজ’ (critical minerals) — এর একটি উদাহরণ। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের ৩৩% লিথিয়াম উত্তোলন করে, কিন্তু এর মাত্র সামান্য অংশ পরিশোধন ও রপ্তানি করে। বিপরীতে, চীন মাত্র ২৩% লিথিয়াম উত্তোলন করলেও, ৫৭% পরিশোধন করে (আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী)। অস্ট্রেলিয়া বিরল খনিজ পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মতে — ২০২৬ সালের আগে পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া চীনের উপর নির্ভর করতেই বাধ্য থাকবে।

নেটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ আলিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বিবিসিকে বলেছেন — যদি চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে অস্ট্রেলিয়া তার খনিজ রিজার্ভ বিক্রি শুরু করে বিশ্ববাজারে দাম কমাতে সাহায্য করতে পারে, এবং চীনের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা কমাতে পারে।তবে তিনি সতর্ক করেছেন, অস্ট্রেলিয়া এখনো পুরোপুরি চীনের বিকল্প হতে পারবে না। “যদি [অস্ট্রেলিয়ার] লক্ষ্য হয় পশ্চিমা বিশ্বকে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করা, তাহলে কিছু দুর্বল দিক রয়েছে যেগুলিতে চীন প্রবেশ করতে পারে — আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিশোধন।”

টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণ – যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ বন্ধে , ট্রাম্পকেই উদ্যোগ নিতে হবে

যুক্তরাষ্ট্র-চীন শুল্ক আরোপের ফলে যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা থামানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি গত সপ্তাহে এক বক্তব্যে প্রথমবারের মতো নমনীয়তা দেখিয়েছেন। ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল, চীনের ওপর আরোপ করা ১৪৫ শতাংশ শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। পরে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টও বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে ‘উত্তেজনা হ্রাস’ পাওয়ার পূর্বাভাস দেন। টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে অবশ্যই চুক্তিতে আসতে হবে। তবে সংকট সমাধানে ট্রাম্পকেই আগে হাত বাড়াতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ মার্কিন শেয়ার বাজার থেকে কেড়ে নিয়েছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার। পড়ে গেছে ডলারের দাম।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে চীনা মালবাহী জাহাজের বুকিংও কমে গেছে। ফলে চীনের রপ্তানি খাতেও নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এরপরও দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হচ্ছে না। সংকট সমাধানের ব্যাপারে এখনও উদাসীন ওয়াশিংটন-বেইজিং। এর নেপথ্যে কতকগুলো কারণ রয়েছে। বিশেষ করে সংকট সমাধানের মেজাজ চীনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। দেশটির নেতারা বিশ্বাস করেন, তাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনায় শৃঙ্খলিত। বাণিজ্যযুদ্ধ মোকাবেলায় তারা কঠোর ও বেশি ঐক্যবদ্ধ।

তাছাড়া চীনের হাতে এমন বিরল খনিজ আছে, যা মার্কিন অর্থনীতিকে আঘাত হানতে পারে। বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘ হলে এই বিরল খনিজের মাধ্যমে চীন মার্কিন কারখানাগুলোকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিতে পারে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করতে পারে। আর এসব ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দ্রুত আসার আশঙ্কা রয়েছে, যা ট্রাম্পের জন্য ক্ষতিকর হবে। সেক্ষেত্রে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এরকম কোনো চাপ নেই। এসব কারণেই চীন বাণিজ্যযুদ্ধ বন্ধে আগে থেকেই কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তারা ট্রাম্পের পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করবে।

ইতোমধ্যে ট্রাম্প বলেছেন, বল চীনের কোর্টে। তবে তার জোর দাবি, চীনকে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে আসতেই হবে। ট্রাম্পের এই মনোভাব সম্পর্কে বেইজিং চুপ। ব্যাপারটি তারা কানেই নিচ্ছে না। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, বাণিজ্যযুদ্ধ অবসানের পদক্ষেপগুলো ট্রাম্পের কাছ থেকেই আসতে হবে। সংকটের সমাধান বেইজিং থেকে উদ্ভূত হবে না। সেক্ষেত্রে ট্রাম্পকেই চুক্তির ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ চিন আন্তর্জাতিকভাবে নিজেকে জয়ী উপস্থাপন করতে চায়।

মৃত্যুর পরও সুর তুলছেন ‘আলভিন লুসিয়ার’ , আছে নৈতিকতার প্রশ্ন – কিন্তু অবিশ্বাস্য সুন্দর : রোজামুন্ড ব্রেনান , দ্য গার্ডিয়ান

এক অন্ধকার ঘরে, বিচ্ছিন্ন এক সিম্ফনি – ঝনঝনানি, গুনগুন, আর কাঁপুনি – দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেন কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বের অর্কেস্ট্রা সুর মিলিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো সঙ্গীতজ্ঞ নেই। তবে ভালো করে দেখলে আপনি একজন ‘পারফর্মার’-এর ক্ষুদ্র এক টুকরো দেখতে পাবেন। যদিও তার কোনো স্পন্দন নেই। ঘরের কেন্দ্রে একটি উঁচু চৌবাচ্চার চারপাশে দর্শকরা ভিড় করে আছে, চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে, যেন তারা এই রহস্যময় সঙ্গীতের পিছনে কার মাথা কাজ করছে সেটা দেখতে চায়। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচে দুটি সাদা ফোঁটা বসে আছে, যেন জেলিফিশের জোড়া। এ দু’টোই মিলেই গড়ে উঠেছে প্রয়াত মার্কিন সুরকার আলভিন লুসিয়ারের ‘মিনি-মস্তিষ্ক’ – যা এখনো বাস্তব সময়ে এক পোস্টহিউমাস সঙ্গীত রচনা করে চলেছে।

আলভিন লুসিয়ার ছিলেন পরীক্ষামূলক সঙ্গীতের পথিকৃৎ। তিনি ২০২১ সালে মারা যান। তবে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার আর্ট গ্যালারিতে, এই সর্বাধুনিক নিউরোসায়েন্সের মাধ্যমে তাকে যেন পুনর্জন্ম দেওয়া হয়েছে। ‘যখন আপনি নিচের সেই চৌবাচ্চার ভেতরে তাকান, তখন আপনি এক ধরনের সীমা অতিক্রম করছেন,’ বলেন নাথান থম্পসন, এই প্রকল্পের একজন শিল্পী ও নির্মাতা, যার নাম Revivification। ‘আপনি এক অতল গহ্বরের দিকে তাকাচ্ছেন এবং এমন কিছু দেখছেন যা জীবিত – তবে আপনার মতো করে নয়।’

Revivification হলো এক দল বিজ্ঞানী ও শিল্পীর কাজ, যারা নিজেদের বলেন ‘চার-মাথাওয়ালা দানব’। দলের সদস্যরা হলেন শিল্পী নাথান থম্পসন, গাই বেন-আরি ও ম্যাট গিনগোল্ড এবং নিউরোসায়েন্টিস্ট স্টুয়ার্ট হজেটস। তারা গত কয়েক দশক ধরে বায়োলজিক্যাল আর্টের সীমানা টানছেন। আলভিন লুসিয়ার ছিলেন তাদের আদর্শ সহযোগী। ১৯৬৫ সালে, তিনি তাঁর বিখ্যাত কাজ Music for Solo Performer-এ প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সরাসরি শব্দ তৈরি করেন। লুসিয়ারের ভক্ত হয়ে, Revivification টিম ২০১৮ সাল থেকেই তাঁর সাথে আইডিয়া নিয়ে কথা বলা শুরু করে। তবে ২০২০ সাল পর্যন্ত, যখন লুসিয়ার ৮৯ বছরে পা দেন এবং পারকিনসন রোগে ভুগছিলেন, তখন তিনি তাঁর রক্ত এই প্রকল্পের জন্য দান করতে রাজি হন।

প্রথমে তাঁর শ্বেত রক্তকণিকা (white blood cells) স্টেম সেলে রূপান্তর করা হয়। তারপর হজেটসের নেতৃত্বে সেই স্টেম সেলগুলো থেকে তৈরি করা হয় cerebral organoids – অর্থাৎ মস্তিষ্কের নিউরন ক্লাস্টার, যা মানব মস্তিষ্কের নকল রূপ তৈরি করে। মহামারির সময়, টিমটি প্রতি দুই সপ্তাহে একবার জুমের মাধ্যমে লুসিয়ারের সাথে দেখা করত, যতক্ষণ না ২০২১ সালে তিনি মারা যান। তখন তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে তিনি ফিসফিস করে কথা বলতেন, কখনও সহকারীর মাধ্যমে মেসেজ পাঠাতেন, তবে তাঁর দিকনির্দেশনা কখনোই থেমে থাকত না। ‘আমরা যেন কোন শিল্প বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, আর তিনিই ছিলেন আমাদের অধ্যাপক,’ বলেন থম্পসন।

বেন-আরিও যোগ করেন- ‘তবে এটা পুরোপুরি সহযোগিতামূলক ছিল। আমরা বায়োলজিক্যাল আর্টসে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলাম… আর লুসিয়ারের কাছে এটা ছিল একদম সাই-ফাই কল্পনার মতো।’ শুরুতে আলোচনা চলাকালীন লুসিয়ার এমন সব ধারণা দিয়েছিলেন – যেমন শব্দতরঙ্গ চাঁদে পাঠানো! তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ও টিম একটি এমন পারফরম্যান্সের দিকে মনোনিবেশ করেন, যা মস্তিষ্কের সংকেত, ধ্বনি ও স্থান নিয়ে তাঁর আজীবন গবেষণাকে সম্মান জানায়। এই ইনস্টলেশনের ভেতর ২০টি বিশালাকার প্যারাবলিক ব্রাস প্লেট দেয়াল থেকে বাঁকা হয়ে বেরিয়ে এসেছে, ঠিক যেন সোনালী স্যাটেলাইট ডিস্ক। প্রতিটি প্লেটের পেছনে একটি ট্রান্সডিউসার (স্পীকারের মতো) এবং একটি হাতুড়ি বসানো আছে। এগুলো মিনি-ব্রেইনের নিউরাল সংকেতের প্রতিক্রিয়ায় আওয়াজ তৈরি করে, যেন এক নিঃশ্বাসবিহীন, বিচ্ছিন্ন সাউন্ডস্কেপ ঘরের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে।

Revivification টিম কাস্টম প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই কাজটিকে জীবন্ত করেছে। লুসিয়ারের organoid (মস্তিষ্কের নকল অংশ) একটি ৬৪ ইলেকট্রোডের সূক্ষ্ম জালে বসানো হয়েছে, যা জার্মান বায়োইঞ্জিনিয়ারের সাথে মিলে তৈরি করা হয়েছিল। এই ইলেকট্রোডের মাধ্যমে নিউরাল সংকেতগুলি বিভিন্ন স্তর থেকে সংগ্রহ করা যায়, অনেকটা একটি বিকাশমান মস্তিষ্কের মতো। এরপর গিনগোল্ড একটি ওপেন-সোর্স প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করে এই নিউরাল অ্যাক্টিভিটিকে ধ্বনিতে অনুবাদ করেছেন, যাতে এই কৃত্রিম মস্তিষ্ক একটি লাইভ সংগীতশিল্পীতে রূপ নেয়।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, লুসিয়ারের organoid কেবল শব্দ তৈরি করে না, বরং শব্দ গ্রহণও করে। গ্যালারিতে বসানো মাইক্রোফোন আশপাশের পরিবেশের আওয়াজ, মানুষের কথা, এবং প্লেটগুলোর অনুরণন সংগ্রহ করে এবং এই অডিও তথ্য বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত করে মস্তিষ্কে পাঠানো হয়। ‘আমরা খুবই আগ্রহী এটা জানার জন্য, যে ভবিষ্যতে এই organoid কি নতুন কিছু শিখবে বা পরিবর্তিত হবে কিনা,’ বলেন বেন-আরি। এই প্রকল্প জীববিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বত্বাধিকারের নতুন প্রশ্ন তোলে। তবে, Revivification টিম বলছে, এটা আগে শিল্প, তারপর বিজ্ঞান।

‘সৃষ্টিশীলতা আসলে কোথায় জন্ম নেয়?’ ভাবেন থম্পসন। ‘আমরা সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে এই বড় প্রশ্নগুলির প্রতি আগ্রহী। কিন্তু আমাদের কাজ উত্তর দেওয়া নয়, বরং আলোচনা তৈরি করা… সৃষ্টিশীলতা কি মানুষের শরীরের বাইরে থাকতে পারে? আর তা কি নৈতিক?’ টিমের আশা, তারা যে বিশাল নিউরাল ডেটা সংগ্রহ করেছে, তা ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সহায়ক হবে। ‘আমরা যখন এইরকম বিশাল শিল্প-ভিত্তিক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করি, তখন সম্ভাবনার সীমানা ঠেলে দিই,’ বলেন গিনগোল্ড। ‘কারণ বিজ্ঞান এখনো এই প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করাও শুরু করেনি।’

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, টিম চায় Revivification প্রকল্পটি সত্যিকারের অর্থে বেঁচে থাকুক – সৃষ্টিশীলভাবেও। বেন-আরি বলেন, তাঁর স্বপ্ন হলো লুসিয়ারের এই প্রতিস্থাপিত সংগীতজ্ঞ ‘নতুন স্মৃতি, নতুন গল্প’ রচনা করুক চিরকাল। এমনকি তাঁরা ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকা বা মহাকাশেও এই সিস্টেম পাঠানোর স্বপ্ন দেখছেন। এখনও পর্যন্ত, পার্থ শহরের সেই অন্ধকার ঘরে, লুসিয়ারের প্রতিভা অদৃশ্য সুরের মাধ্যমে জীবিত, যেখানে তাঁর মস্তিষ্ক চলতে থাকছে, তাঁর দেহ ছাড়াই। ‘যখন আমি লুসিয়ারের মেয়ে অ্যামান্ডাকে এই প্রকল্প সম্পর্কে বলি, সে হেসে ফেলেছিল,’ বলেন বেন-আরি। ‘… বলেছিল, এ তো পুরোপুরি আমার বাবার মতো। মৃত্যুর আগেই সে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যেন সে চিরকাল বাজাতে পারে। সে কখনো থামতে চায় না। বাজিয়েই যেতে চায়।’

জার্মানিতে ‘ফ্রি মানি’ বা , ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের বিস্তৃত পরীক্ষা : কী শিখলাম আমরা ?

0

মার্কসবাদী চিন্তাবিদ থেকে শুরু করে পোপ ফ্রান্সিস এবং ইলন মাস্কের মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তাও এই ধারণার পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা মনে করেন, আগামীদিনে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং অটোমেশনের ফলে যে বিপুল কর্মসংস্থান হ্রাস ঘটবে, তা মোকাবিলা করতে ইউবিআই একটি কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে। জার্মানি ১৯৭০-এর দশক থেকে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম নিয়ে আলোচনায় আছে। তবে, বাস্তবে এখন পর্যন্ত তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক যেমন বেকার ভাতা বা সামাজিক সহায়তা – সেগুলো নির্দিষ্ট শর্তের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃত ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম হবে সম্পূর্ণ শর্তহীন: প্রত্যেককে নির্দিষ্ট একটি মাসিক পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে, চাইলেই তারা চাকরি করতে পারবে বা না-ও করতে পারবে।

কিন্তু মূল প্রশ্ন ছিল: যদি মানুষ মাসে একটি নিশ্চিত অর্থ পায়, তাহলে কি তারা কাজ করা বন্ধ করে দেবে? জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই জার্মান গবেষকরা একটি বৃহৎ পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যার নাম “বেসিক ইনকাম পাইলট প্রজেক্ট”।

কিভাবে পরিচালিত হলো গবেষণা?

“Mein Grundeinkommen” নামে একটি অলাভজনক সংস্থা এবং জার্মান ইকোনমিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (DIW Berlin) সহ অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এই প্রকল্প শুরু হয়। দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য আবেদন করেন, যাদের মধ্য থেকে এলোমেলোভাবে ১২২ জনকে নির্বাচিত করা হয়।

এই ১২২ জনকে প্রতি মাসে তিন বছর ধরে ১২০০ ইউরো করে দেওয়া হয় – একেবারে বিনা শর্তে। একইসঙ্গে, আরও ১৫৮০ জনের একটি নিয়ন্ত্রণ (control) গ্রুপ একই রকম প্রশ্নাবলির উত্তর দিয়েছিল, তবে তারা কোনো অতিরিক্ত অর্থ পায়নি। সব অংশগ্রহণকারীই ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী, একা বসবাসকারী এবং তাদের মাসিক নেট আয় ছিল ১১০০ থেকে ২৬০০ ইউরোর মধ্যে। এইভাবে গবেষকরা একটি তুলনামূলক এবং নিরপেক্ষ ডেটাসেট তৈরি করেন।

ডকুমেন্টারি সিরিজ: “সবার জন্য টাকা”

এই প্রকল্পের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে একটি ডকুমেন্টারি সিরিজ – “Der große Traum: Geld für alle” (বড় স্বপ্ন: সবার জন্য টাকা), পরিচালনায় আলেকজান্ডার ক্লেইডার। পরিচালক বলেন, “আমি কখনোই একটি প্রচারমূলক সিনেমা বানাতে চাইনি, আমি চেয়েছিলাম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প বলতে। ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম যেন পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মাঝখানে এক নতুন বিকল্প পথের সন্ধান।” ডকুমেন্টারিতে পাঁচজন অংশগ্রহণকারীর জীবনযাত্রা অনুসরণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ থাকেন বার্লিনে, আবার কেউ থাকেন ছোট শহরগুলোতে। একজন উদ্যোক্তা, একজন নার্স, আবার কেউ চাকরি ছেড়ে নতুন পড়াশোনা শুরু করেছেন – তাদের জীবনযাপনের ধরন আলাদা হলেও, সবার জীবনে এই ফ্রি মানির প্রভাব ছিল দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সবসময় যে সবাই অর্থ ব্যবহারে সচেতন ছিলেন তা নয়। কেউ কেউ হঠাৎ বাড়তি টাকা পেয়ে অতিরিক্ত ভোগবাদে লিপ্ত হন, যেন কোনো গেম শোর বিজয়ী! মাইকেল বোহমেয়ার, যিনি প্রকল্পের প্রধান উদ্যোক্তা, স্বীকার করেন, “যদি মানুষ শুধু ভোগবিলাস বাড়ায় আর অন্য কিছু না করে, তাহলে আমি হতাশ হব।”

গবেষণার ফলাফল কী বলছে?

তিন বছরের পরীক্ষার শেষে গবেষকরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন:

কাজ চালিয়ে যাওয়া: বেসিক ইনকাম পাওয়া অংশগ্রহণকারীরা গড়ে সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ চালিয়ে গেছেন। অর্থাৎ, ‘ফ্রি মানি পেলে সবাই অলস হয়ে পড়বে’ – এই আশঙ্কা ভিত্তিহীন।

চাকরি পরিবর্তন: এই গ্রুপে চাকরি পরিবর্তনের হার কন্ট্রোল গ্রুপের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। অতিরিক্ত অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পেয়ে তারা ঝুঁকি নিতে সাহসী হয়েছেন।

পড়াশোনায় অগ্রগতি: অনেকে নতুন কোনো কোর্সে ভর্তি হয়েছেন বা বিদ্যমান চাকরির পাশাপাশি স্কিল ডেভেলপমেন্টে মনোযোগ দিয়েছেন।

মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের সন্তুষ্টি: যারা বেসিক ইনকাম পেয়েছেন, তারা তাদের জীবনের প্রতি আরও বেশি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মনোবিজ্ঞানী সুজান ফিডলার বলেন, “বেসিক ইনকাম শুধু আর্থিক নিরাপত্তা নয়, এটি আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”

বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: বাস্তব জীবনে পুরো দেশে কীভাবে ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকাম চালু করা যাবে?

Mein Grundeinkommen সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ধনী ১০% নাগরিকদের অতিরিক্ত করের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে পুরো জনগণকে এই সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। তাদের মতে, এর ফলে ৮৩% জনগণ আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, আর ৭% মধ্যবিত্তের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। তাদের বিশ্বাস, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং গণতন্ত্র শক্তিশালী করার জন্য বেসিক ইনকাম অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। ক্লারা সিমন, Mein Grundeinkommen-এর বর্তমান প্রধান, বলেন: “আমরা প্রমাণ করেছি, বেসিক ইনকাম মানুষকে অলস করে না। বরং এটা সামাজিক উন্নয়নের জন্য এক বিশাল সুযোগ। যারা এই ফলাফল জানার পরও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না, তারা সমগ্র সমাজের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন।”

শেষ কথা

জার্মানির এই পরীক্ষামূলক প্রয়াস দেখিয়েছে, মানুষ যদি আর্থিক নিরাপত্তা পায়, তবে তারা শুধু জীবিকার জন্য কাজ করেন না, বরং নিজের জীবনকে আরও অর্থবহ করে গড়ে তুলতে চান। এই গবেষণা প্রমাণ করে, বেসিক ইনকাম কোনো বিলাসিতা নয় – এটি হতে পারে ভবিষ্যতের ন্যায্য, সমান এবং উন্নত সমাজের এক শক্ত ভিত্তি।

ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করার , মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের

নিজস্ব বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রাখার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে ইরান। ওমানে শনিবার অনুষ্ঠিত আলোচনার তৃতীয় দফায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন দলের দাবি ছিল, ইরান যেন কেবল আমদানিকৃত পারমাণবিক জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। তবে তেহরান এই প্রস্তাব স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের পারমাণবিক বোমা তৈরির পথ বন্ধ করা এবং এর বিনিময়ে দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করাই এই আলোচনার লক্ষ্য। এই অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনড় থাকলে চলমান আলোচনাটি একটি বড় জটিলতায় পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রুবিওর প্রস্তাবটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের দুইটি ভিন্ন মতের মধ্যে একটি আপসের চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। এক পক্ষ বলছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে ফেলাই একমাত্র উপায়। আরেক পক্ষ বলছে, কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের আওতায় ইরানকে স্বল্পমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজের মতে, তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতেই হবে। তবে রুবিও সম্প্রতি ‘দ্য ফ্রি প্রেস’ পডকাস্টে বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই ইরান চাইলে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে পারে।’তিনি বলেন, এক্ষেত্রে তেহরানকে অবশ্যই ‘আমদানিকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ ব্যবহার করতে হবে।

এ বিষয়ে ইরানের প্রধান আলোচক আব্বাস আরাঘচি চীনে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র দাবি যদি হয় যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না, তবে এটি একটি বাস্তবসম্মত দাবি। কিন্তু যদি তারা অবাস্তব ও অযৌক্তিক দাবি তোলে, তাহলে সমস্যা হওয়াটা স্বাভাবিক।’

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অনুষ্ঠানে এই সপ্তাহে ভার্চুয়ালি বক্তব্যে আরাঘচি বলেন, ‘ইরানের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে আচরণ করা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির স্বাক্ষরকারী হিসেবে আমাদের অধিকার (যেমন, নিজেদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জ্বালানি উৎপাদনের ক্ষমতা)। আমাদের বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ কাঠামোর মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা চলবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছি, আমাদের গোপন করার কিছু নেই। এজন্যই ২০১৫ সালের চুক্তির অধীনে আমরা ইতিহাসের সবচেয়ে ‘কঠোর পর্যবেক্ষণ’ ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছিলাম।’

আরাঘচি জানান, ইরানের দীর্ঘমেয়াদে অন্তত ১৯টি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। তিনি বলেন, এই প্রকল্পে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে, যার মাধ্যমে ‘দশ হাজার কোটি ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি’ হতে পারে। শুধু এই একটি কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের স্থবির হয়ে পড়া পারমাণবিক শিল্পে নতুন প্রাণ ফিরবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে এক বক্তব্যে সিআইএর সাবেক পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না, ইরানের বর্তমান সরকার দেশীয় সমৃদ্ধিকরণ পুরোপুরি ছেড়ে দিতে রাজি হবে। আগের করা চুক্তিতেও এটা ৫ শতাংশের নিচে সীমাবদ্ধ ছিল, যা বেসামরিক কর্মসূচির জন্য যথেষ্ট, অস্ত্র তৈরির জন্য নয়। তবে এটাই হবে আলোচনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।’

প্রাচীন চীন থেকে কোয়ান্টাম জগত পর্যন্ত – তাওবাদ

তাও—চীনা ভাষায় যার অর্থ পথ। কিন্তু এই “পথ” কোনো রাস্তা নয়, এটি সেই অদৃশ্য ধারাবাহিকতা, যার উপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অস্তিত্ব গড়ে উঠেছে এবং যার ধ্যানে ডুবে আছে তাওবাদ। দেড় হাজার বছরের বেশি সময় আগে অশান্ত চীনের বুকে এক রহস্যময় জ্ঞানী, লাওৎসে রেখে গিয়েছিলেন ৫০০০ চিহ্নের একটি গীতিকবিতাময় গ্রন্থ। নাম তাও তে চিং। এই বইই তাওবাদের মূল, এবং সেইসঙ্গে মানবজগতের একটি আত্মিক প্রশ্নের নিরব প্রতিধ্বনি।খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর চীন ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ আর সামাজিক ভাঙনের সময়। কনফুসিয়াস যখন সমাজকে নৈতিক শৃঙ্খলায় বাঁধতে চাইছিলেন, তখন লাওৎসে বললেন—

“Everything is done.” এই “Wu Wei” ধারণা তখনকার কঠোর সামাজিক কাঠামোর বিপরীতে এক বিপ্লব। তাওবাদ বলল তুমি কিছু না করেই থাকো, প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলাও। এ দর্শনের জন্মই যেন ছিল ক্ষমতা ও কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে একটি নিরব প্রতিরোধ। তাওবাদ বিশ্বাস করে জগতের সবকিছুই একটি ধ্রুব প্রবাহের অংশ। এই প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বিভ্রান্তি জন্মায়। তাই ‘Wu Wei’ মানে আসলে নির্জীবতা নয়, বরং এমন কাজ যা প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়। এই ভাবনার সঙ্গেই জড়িয়ে আলোর মধ্যে অন্ধকার, অন্ধকারে আলোর বীজ। বিপরীতের মধ্যেই ভারসাম্য।

তাওবাদ এবং উপনিষদীয় দর্শনের মধ্যে রয়েছে চমৎকার সাদৃশ্য। উপনিষদ বলে “তৎ ত্বম আসি” মানে তুমিই সেই ব্রহ্ম। তাওবাদ বলে—তুমিই তাও।অন্যদিকে বৌদ্ধ দর্শনের শূন্যতা ও তাওবাদের নিরাকার তাও অনেকটা অভিন্ন, যেখানে অস্তিত্ব মূলত অস্ফুট, নিরব ও পরিবর্তনশীল।

এমনকি আধুনিক দর্শনে Nietzsche-এর “Will to Power” যেখানে শক্তির উদ্দীপনায় আত্মপ্রতিষ্ঠা ঘটে, তাওবাদ সেখানেও বলে—“ছায়া হও, দীপ্তি নয়; নরম হও, কঠিন নয়”। দুটি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এক অলঙ্ঘনীয় দূরত্ব থেকেও এক অদ্ভুত প্রতিস্পর্ধা রয়েছে। তাওবাদ শুধু দর্শন নয়, চীনের ঐতিহ্যিক চিকিৎসাবিদ্যা, মার্শাল আর্টস, স্থাপত্য, এমনকি পরিবেশনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্সে যখন বলা হয় কণিকা ও তরঙ্গ একসাথে থাকে, বা পর্যবেক্ষণ করলেই বাস্তবতা বদলায়, তখন তাও যেন Tao-র মতোই অদৃশ্য শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়।
System Theory বা Cybernetics-এ “Self-Organizing Systems”-এর ধারণা তাওবাদী Wu Wei-র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—নিয়ন্ত্রণ নয়, বিকাশকে জায়গা করে দাও। এমনকি বর্তমানের ইকো-থেরাপি বা জাপানি Forest Bathing-এর ধারণাও Tao-র নৈঃশব্দ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার পথেই গড়ে ওঠা।

স্টোয়িক দর্শন বলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করো, নিয়তির মুখোমুখি হও। তাওবাদ বলে, আবেগ বর্জন নয়, বরং আবেগের স্রোতে ভেসে চলাই জীবনচর্চা ।স্টোয়িকরা নিজেদের শাসন করে প্রকৃতি জয় করতে চায়। Taoists নিজেদের বিলিয়ে দেয় প্রকৃতির বুকে। তফাতটা এক আত্মার সুর আর শরীরের ছায়ার মতো। তাওবাদ আমাদের শেখায় জীবনের প্রতিটি কিছুর মধ্যে একধরনের ছন্দ আছে। তুমি যখন জোর করে সেই ছন্দ বদলাতে চাও, তখনই ক্লান্তি, অবসাদ, ও অহম দেখা দেয়। তাওবাদের দৃষ্টিতে আমরা কেউই আসলে আলাদা নই, সবকিছুই এক প্রবাহের অংশ, আর আমরা কেবল সেই নদীর একটি ঢেউ।

“Nature does not hurry, yet everything is accomplished.” — লাওৎসে । আজকের দুনিয়ায় যেখানে প্রতিদিন আমাদের উপর দ্রুত সিদ্ধান্ত, সাফল্য আর নিয়ন্ত্রণের চাপ পড়ে সেখানে তাওবাদ একটা বিপরীত দিক নির্দেশ করে। একটি নরম, অনুচ্চারিত আহ্বান— “তুমি যা করছো তা বন্ধ করো না, শুধু তা নিয়ে লড়াই করে তোমাকেই শেষ করে দিও না যেন।”