Home Blog Page 104

জাপানের মানচুরিয়া প্রকল্প ও উন্নয়নের নামে – সেটলার রাজনীতি

১৯৩১ সালে জাপান উত্তর-পূর্ব চীন আক্রমণ করে একটি পুতুল রাষ্ট্র ‘মানচুকু’ বা মানচুরিয়া প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী ১৪ বছরে জাপানি সরকার সাধারণ পরিবারের কাছে বিনামূল্যে জমি দেওয়ার মাধ্যমে প্রায় ২৭০,০০০ জনকে সেখানে বসতি স্থাপনের জন্য আকৃষ্ট করে। জাপানি প্রচারণায় দাবি করা হয়, এই উপনিবেশিক কর্মসূচি জাতিগত সমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বলা হয়, জাপানি কৃষকরা নতুন কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে আসবে এবং স্থানীয় মানচু, মঙ্গোল ও চীনা জনগণের জীবনমান উন্নত করবে।

জাপানের মানচুরিয়া বসতি স্থাপন প্রকল্পটি সেটলার ঔপনিবেশিকতার একটি উদাহরণ, যা মূলত উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার জাতি-গঠনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে মানবিক বিজ্ঞানে গড়ে উঠেছিল। প্যাট্রিক উল্ফের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেটলার ঔপনিবেশিকতা ঐতিহ্যবাহী ঔপনিবেশিকতা থেকে আলাদা; এখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেবল শোষণ নয়, বরং সম্পূর্ণরূপে স্থানচ্যুত বা প্রতিস্থাপিত করা হয়। এই প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হলো জমি। যেসব অঞ্চলে স্থানীয় জনগণের জমির মূল্য তাদের শ্রমের চেয়ে বেশি, সেখানে তারা হত্যা, জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি বা একীভূতকরণের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সেটলাররা জমির পূর্ণ অধিকার নিতে পারে।

সেটলার ঔপনিবেশিকতা কেবল একটি অতীতের ঘটনা নয়, বরং Indigenous জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার ওপর ভিত্তি করে একটি কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা। এতে জমি দখলের পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতির ধ্বংস ঘটে। সেটলাররা স্থানীয়দের অধিকার ও ঐতিহ্য অবজ্ঞা করে তাদের জমিকে ‘সম্পত্তি’ হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।

১৯৩০-এর দশকে জাপানের নেতৃত্ব মানচুরিয়ার বিস্তীর্ণ শূন্যপ্রান্তকে তাদের দ্রুত বর্ধমান সাম্রাজ্যের খাদ্য চাহিদার সমাধান হিসেবে দেখেছিল। পশ্চিমা দেশগুলোর মতো জাপানও এই বসতি স্থাপনকে ‘সহঅর্থনীতি’ ও ‘জাতিগত সম্প্রীতি’র নামে উপস্থাপন করেছিল, যদিও বাস্তবে ঘটেছিল জমি দখল, বৈষম্য ও স্থানীয় জনগণের জোরপূর্বক একীভূতকরণ।

এ সময় পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের একাংশ যারা বর্ণবৈষম্য ও ঔপনিবেশিকতার বিরোধী ছিলেন, তারা জাপানের মানচুরিয়া দখলকে কঠোরভাবে নিন্দা করতে অনীহা দেখান। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হল মার্কিন পণ্ডিত ডব্লিউ. ই. বি. ডু বোইসের ১৯৩৬ সালের মানচুরিয়া সফর। তিনি জাপানের উত্থানকে রঙিন মানুষের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখতেন। ১৯০৩ সালের ‘The Souls of Black Folk’-এ তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ শতকের সমস্যা হলো বর্ণরেখার সমস্যা’।

জাপানের ১৯০৫ সালের রাশিয়ার ওপর বিজয় তাকে মনে করিয়ে দেয়, রঙিন জাতির উত্থান আসন্ন। মানচুরিয়ায় গিয়ে ডু বোইস বলেন, জাপানের অর্জন ‘অসাধারণ’। সেখানে তিনি বেকারত্বের অনুপস্থিতি, উন্নত অবকাঠামো ও ‘সুখী’ মানুষের উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হন। তাঁর মতে, সেখানে কোনো স্পষ্ট জাতিগত বৈষম্য নেই, ভাষার ভিত্তিতে স্কুল বিভাজন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতা থেকে আলাদা। তিনি জাপানকে দেখেছিলেন ‘রঙিন মানুষের দ্বারা, রঙিন মানুষের জন্য পরিচালিত দেশ’ হিসেবে।

তবে ডু বোইসের এই সমর্থন ছিল একপেশে। তাঁর চীনা বন্ধুদের কাছে জাপানি শাসন ছিল নিপীড়ন ও অত্যাচারের প্রতীক। তিনি বুঝতে পারেননি কেন চীন ও জাপানের মধ্যে শত্রুতা ছিল, যাদের তিনি ‘দুটি রঙিন জাতি’ হিসেবে রাজনৈতিক মিত্র হওয়া উচিত মনে করতেন। মানচুরিয়া ত্যাগের পর তিনি শাংহাইয়ে প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কেন ইউরোপের চেয়ে জাপানকে বেশি ঘৃণা করেন, যখন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানির থেকে বেশি কষ্ট পেয়েছেন?’

১৯৩৭ সালের নাঞ্জিং হত্যাকাণ্ডের পরও ডু বোইস জাপানের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি লেখেন, ‘জাপান চীনকে ইউরোপ থেকে রক্ষা করতে লড়েছিল’ এবং জাপানের সহিংসতা ইউরোপীয় কৌশলের অনুকরণমাত্র। তিনি ইউরোপীয় উপনিবেশিকদেরও ‘অপরাধীদের ধরার জন্য নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ হত্যা’র উদাহরণ টানেন, যা দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাঞ্জাবে ইউরোপীয় শাসকদের কার্যক্রমের সঙ্গে তুলনীয়।

জাপানের মানচুরিয়া দখলের মতো আধুনিক সময়েও বৈশ্বিক দক্ষিণে রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন সেটলার ঔপনিবেশিকতা চলছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়া পশ্চিম নিউগিনি দখল করে সেখানে লক্ষাধিক অভিবাসী পাঠিয়ে স্থানীয় পাপুয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে, যাতে স্বাধীনতার সম্ভাবনা নষ্ট হয়।চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ইরাক ও মিয়ানমারেও একই রকম বসতি স্থাপন প্রকল্প চালু রয়েছে।

এই প্রকল্পগুলো সাধারণত ‘জাতিগত সমতা’ ও ‘উন্নয়ন’-এর নামে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু বাস্তবে ঘটে জমি দখল, সাংস্কৃতিক ধ্বংস ও স্বায়ত্তশাসনের হরণ। পশ্চিমা সেটলার ঔপনিবেশিকতার মতোই, এই আধুনিক প্রকল্পগুলোও Indigenous জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়।

জাপানের মানচুরিয়া দখল ও সেটলার ঔপনিবেশিকতা পশ্চিমা ঔপনিবেশিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং এটি একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া। জাতিগত সমতার মুখোশে পরিচালিত এই বসতি স্থাপনের আড়ালে Indigenous জনগণের ধ্বংস, জমি দখল ও সংস্কৃতি লুপ্ত করার নির্মম বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে।ডু বোইসের মতো বিশিষ্ট চিন্তাবিদদের একপেশে অবস্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে, আজকের বিশ্বে এই ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের প্রকৃত চরিত্র অনুধাবন ও প্রকাশ জরুরি। বৈশ্বিক দক্ষিণেও এই দখলদার বসতি স্থাপন প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন, যাতে Indigenous জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব টিকে থাকে।

একটা ‘ঘৃণা নিয়ন্ত্রণ কমিশন’ এখন সময়ের দাবী : ফারজানা ওয়াহিদ সায়ান , সঙ্গীতশিল্পী

0

“আমি বর্তমান সরকারকে এই বিষয়গুলোতে কঠোর হতে জোর দাবী জানাই। আপনারা ঘৃণা চর্চার বয়ানকে চিহ্নিত করুন, আক্রমণাত্মক ভাষা-ভংগী এগুলো নিয়ে কাজ করুন।

… কেন একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে বেশ্যা ডেকে পার পাবেন? কেন যে কেউ যে কাউকে ভালো না লাগলেই জবাই করার হুমকি দেবেন, এবং তার স্বাভাবিকীকরণ হবে? কেন বিভিন্ন মাহফিলে ঘেন্না ছড়ানোর বয়ান চলতে পারে যুগের পর যুগ, অন্য ধর্মের মানুষদের প্রতি? মেয়েদের প্রতি? একটা ‘ঘৃণা নিয়ন্ত্রণ কমিশন’ এখন সময়ের দাবী।

… এগুলোকে দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে দেখতে চাই। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার করবেন আদালতে। জবাই করার স্লোগানের মধ্যে ২০১৩তেও…বিচারের মানসিকতা ছিল না। এখনো নাই।

… কিছু লোকের পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধের খেলা থেকে মুক্তি পেতে চাই। গা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে সংস্কৃতি পাল্টাবে না। কাজ করতে হবে। ক্যাম্পেইন করতে হবে।…এগুলো বন্ধ করতে হবে।

সরকারকে বলছি।…কোন কথাগুলো violent এবং offensive, সেগুলোর তালিকা করেন। আইনীভাবে ঘৃণা চর্চাকে নিষিদ্ধ করেন। এটা কোন রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার জটিল প্রক্রিয়ার চেয়ে কিছুটা সহজ হবে করা। ঘৃণা চর্চাকে খাটো করে দেখবেন না। সেখান থেকে বৈধতা আসে বড় বড় অপরাধের।”


ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা – ধর্মনিরপেক্ষতার যে সবক পেলেন মোদি ও তাঁর দল : অপূর্বানন্দ ঝা , অধ্যাপক , দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়

” ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ এবং এর সেনাবাহিনী আমাদের সাংবিধানিক মূল্যবোধের এক অপূর্ব প্রতিচ্ছবি।’ ভারত-পাকিস্তান সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময়ে এই কথাগুলো বলেছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল সোফিয়া কুরেশি।

… তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতের শাসক দল বিজেপি ও তাদের মূল আদর্শিক সংগঠন আরএসএস যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে ঘৃণা ও সাম্প্রদায়িক উসকানি প্রচারে ব্যস্ত। অথচ কর্নেল কুরেশির কথাই মনে করিয়ে দেয়, পাকিস্তানের তুলনায় ভারতের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র প্রকৃত ভিত্তি হলো—ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা।

… এ ক্ষেত্রে আদর্শিকভাবে পরাজিত হয়েছে ভারতের শাসক দল বিজেপি ও তাদের ভাবাদর্শ। শুধু যুদ্ধের মাঠে নয়, আদর্শের ময়দানেও হেরে গেছে তারা। কারণ, ভারতের শ্রেষ্ঠত্ব এ জন্য নয় যে, দেশটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বরং এ জন্য যে ভারতের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।

… ভারতীয় বাহিনী মসজিদগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে—পাকিস্তানের এই অভিযোগের জবাবে কুরেশি যখন বলেন, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। তখন তিনি বোঝাতে চাচ্ছিলেন, ভারতের সেনাবাহিনী কোন ধর্মীয় স্থান বা প্রতীক আক্রমণ করতে পারে না।

এই বক্তব্য শুধু পাকিস্তান নয়, বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতাদের জন্যও। এমনকি তাঁদের সমর্থকেরাও—যাঁরা ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বদলে দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর।

বিজেপির আদর্শগত অবস্থান শুরু থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৯ সালে জয়ের পর ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি ২০১৪-এর পর হারিয়ে গেছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেছিলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

২০২৩ সালে সংসদে সংবিধানের যে কপি বিতরণ করা হয়, সেখান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সমাজতন্ত্র’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়। বারবার আদালতেও এই শব্দ বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

… বিজেপির আদর্শিক গুরুগণ, বিশেষত গোলওয়ালকার ও দীনদয়াল উপাধ্যায় বারবার বলেছেন, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের রাজনৈতিক অধিকার থাকা উচিত নয়। আরএসএস যে ধরনের ‘সংস্কৃতি’তে বিশ্বাস করে, সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্যই চূড়ান্ত সত্য।

ধর্মনিরপেক্ষতার মূল অর্থ হলো, সব ধর্মের মানুষ সমান রাজনৈতিক অধিকার পাবেন। কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, প্রতিনিধিত্বের অধিকারও। কিন্তু বিজেপি নেতারা বারবার মুসলিম নেতাদের সম্ভাব্য নেতৃত্বকে ভয়ের অস্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন।

যেমন মোদি গুজরাটে বলেছেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে আহমেদ পটেল মুখ্যমন্ত্রী হবেন!’ এটি যেন ভীতিকর কিছু। আসামেও বলা হয়েছিল, বিজিপি না জিতলে বদরুদ্দিন আজমল মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এসব কথায় প্রশ্ন তোলা হয়নি, মুসলিমরা কেন নেতৃত্ব দিতে পারবেন না?

… ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিচয় সব ধর্মের মানুষের জন্য অংশগ্রহণমূলক হতে পারে না। অথচ, এক দশক ধরে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার লক্ষ্যে পাঠ্যবই, শহরের নাম, ইতিহাস—সবকিছুর হিন্দুকরণ চলছে।

ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিদেশি ধারণা বলে অভিহিত করে তা ত্যাগ করার একটি আদর্শিক অভিযান দশকের পর দশক ধরে চলেছে। কিন্তু আজ সেই ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতের জন্য এক আদর্শিক ঢাল হয়ে উঠেছে। যারা মোদির ভাষাকে আদর্শ মনে করেন, তারা প্রশ্ন করতে পারেন—আজকের ভারতীয় রাষ্ট্র কি তার কুৎসিত, জঘন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী চেহারা লুকিয়ে বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হতে ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরেছে?


গোপন বৈঠকে নেতানিয়াহুর স্বীকারোক্তি , ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে , গাজায় ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন — তাঁর দেশ গাজার আবাসন ধ্বংস করছে যাতে স্থানীয় লোকজন অঞ্চলটিতে না থাকতে পেরে বাধ্য হয়ে অন্য কোথাও চলে যায়। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা কমিটির রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আইনপ্রণেতাদের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি এই কথা বলেন। বক্তব্য থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী—নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘এর একমাত্র ফলাফল হবে গাজাবাসীরা উপত্যকার বাইরে অভিবাসনের পথ বেছে নেবে। তবে আমাদের প্রধান সমস্যা হলো, কোন দেশ তাদের গ্রহণ করবে, তা খুঁজে বের করা।’

নেতানিয়াহু আইনপ্রণেতাদের জানান, সম্প্রতি তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গাজার নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে মিসর ও জর্ডানকে ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু উভয় দেশই দ্রুত এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে। তারা জোর দিয়ে বলে, ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজেদের জমিতেই থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত।

গত রোববারের এই নেসেট কমিটির বৈঠকে নেতানিয়াহু দাবি করেন, গাজাবাসীদের গ্রহণ করার মতো দেশ খুঁজে পেতে ব্যর্থতা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে আগ্রহী।

তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির শুরুতে ট্রাম্পের গাজা দখল পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকে আরব মিত্রদের ব্যাপক বিরোধিতার মুখে তাঁর প্রশাসন এটিকে খুব একটা এগিয়ে নিতে পারেনি।

নেতানিয়াহু কমিটিকে গাজায় ত্রাণ বিতরণ পুনরায় শুরুর ইসরায়েলের পরিকল্পনা সম্পর্কেও জানান। তিনি জানান, এক নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা হবে, যাতে হামাস ত্রাণ আত্মসাৎ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। নেতানিয়াহু বলেন, দক্ষিণ গাজায় নতুন স্থাপিত ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র থেকে যাঁরা ত্রাণ নেবেন, তাঁদের দক্ষিণ গাজায় স্থাপিত নতুন মানবিক অঞ্চলের বাইরের গাজার অন্য কোনো স্থানে ফিরতে দেওয়া হবে না।

ইসরায়েলের এই ত্রাণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার ২০ লক্ষাধিক জনসংখ্যার পুরোটাকেই রাফাহ ও তার আশপাশের একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ করা হবে। এলাকাটি গাজার মোট আয়তনের মাত্র ১০ থেকে ২৫ শতাংশ। পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অঞ্চলে প্রবেশকারীদের ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) পরীক্ষা করবে।

নতুন ত্রাণ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এই সংস্থার কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এটি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এই উদ্যোগে সহযোগিতা বা অর্থায়ন করতে রাজি হয়নি।

প্রযুক্তি বনাম ব্যক্তি – কে কার কাজে লাগছে ?

প্রযুক্তি আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমরা যখন ঘুম থেকে উঠি, তখন থেকেই স্মার্টফোন, ঘড়ি, ইন্টারনেট, এবং নানা যন্ত্র আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।সাধারণভাবে আমরা ভাবি, এই প্রযুক্তি আমাদের কাজকে সহজ করে, যোগাযোগে সুবিধা আনে। কিন্তু আমরা খুব কমই ভাবি যে প্রযুক্তি আসলে আমাদের ভাবনার ধরন, সময় বোঝা, এবং এমনকি আমাদের আত্মপরিচয় পর্যন্ত পাল্টে দিতে পারে। প্রযুক্তির প্রভাব শুধু বাহ্যিক নয়, তা ধীরে ধীরে আমাদের মস্তিষ্ক ও সমাজ কাঠামোর গভীরে প্রবেশ করে। আমরা যেমন প্রযুক্তি ব্যবহার করি, প্রযুক্তিও আমাদের ব্যবহার করে—একটি দ্বিমুখী সম্পর্কের ভেতরে আমরা বন্দি।

সময়ের রূপান্তর: প্রাকৃতিক থেকে যান্ত্রিক
প্রযুক্তির মাধ্যমে সময়ের ধারণা সবচেয়ে বেশি বদলেছে। একসময় মানুষ সূর্য, চাঁদ, ঋতু ও প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে দিন-রাত্রির হিসাব করত। কিন্তু যেদিন ঘড়ি উদ্ভাবিত হলো, সেদিন থেকে সময় হয়ে উঠল সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য — সকাল ৭টা, দুপুর ১২টা, রাত ১০টা।
এই যান্ত্রিক সময় আমাদের জীবনকে গেঁথে ফেলেছে নিয়ম, কর্মঘণ্টা এবং উৎপাদনশীলতার কাঠামোয়। অফিস, স্কুল, চিকিৎসা, যোগাযোগ — সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু এখন সময়ের “স্লট”। আমাদের চিন্তা, বিশ্রাম, এমনকি আবেগ প্রকাশের সময়ও আজ সময়সূচি অনুযায়ী চলে।

স্মার্টফোন ও মনোযোগের বিভাজন
স্মার্টফোন আমাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রযুক্তি। এটি শুধু ফোন নয়—এটা আমাদের ক্যামেরা, ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, বিনোদনকেন্দ্র এবং সামাজিক মাধ্যমের দ্বার। কিন্তু এই যন্ত্রটি আমাদের মনোযোগ, স্মৃতি, এবং বোধশক্তিকেও পরিবর্তন করছে।
আগে মানুষ টেলিফোন নম্বর, ঠিকানা, এমনকি জন্মদিন মুখস্থ রাখত। এখন আমরা গুগল ক্যালেন্ডার বা কন্টাক্ট লিস্টে রাখি। মন যেন ধীরে ধীরে ‘মেমোরি’র দায়িত্ব প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দিচ্ছে। এই প্রবণতাকে বলা হয় External Memory।
আরও গভীর পরিবর্তন ঘটছে আমাদের মনোযোগে। আমরা এখন টিকটক বা রিলসে ১৫–৩০ সেকেন্ডের ভিডিওতে অভ্যস্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ফর্ম্যাট আমাদের মনোযোগের স্থায়ীত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। আমরা স্ক্রল করে যাচ্ছি, কিন্তু গভীরভাবে কিছু ভাবছি না।

প্রযুক্তি আমাদের ভাবনার ধরনই বদলে দেয়
বইয়ের যুগে মানুষ দীর্ঘ পাঠে অভ্যস্ত ছিল। যুক্তির পর যুক্তি গেঁথে চিন্তা গঠিত হতো। কিন্তু এখন মিম, হেডলাইন, কিংবা ১০ সেকেন্ডের ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে আমরা মতামত তৈরি করি। চিন্তা করার ধরনটাই হয়ে যাচ্ছে বিক্ষিপ্ত এবং ফাস্ট-ফরোয়ার্ডেড।
এখানে মিডিয়া বিশেষজ্ঞ মার্শাল ম্যাকলুহান-এর উক্তি প্রাসঙ্গিক: “The medium is the message.” অর্থাৎ, আমরা কী বলছি তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা সেটা কোন মাধ্যমে বলছি। সেই মাধ্যমটাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিক গঠন নির্ধারণ করছে।

ডিজিটাল আত্মপরিচয়: অনলাইন ‘আমি’ বনাম অফলাইন ‘আমি’
আমরা এখন শুধু বাস্তব জগতে নই, ভার্চুয়াল জগতেও বাস করি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা স্ন্যাপচ্যাটে আমরা এমন একটি ‘আমি’ তৈরি করি যা অনেক সময় বাস্তব জীবন থেকে আলাদা। আমাদের পোস্ট, ছবি, ফিল্টার সবকিছু মিলিয়ে গড়ে উঠে একটি ‘পারফেক্ট ভার্সন’ — যেখানে কষ্ট, বিশ্রাম, এবং দুঃখ অনুপস্থিত। এই ‘ডিজিটাল আমি’ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। আমরা অন্যদের “ফিল্টার করা জীবন” দেখে নিজের জীবনকে ছোট ভাবি। এতে বাড়ছে FOMO (Fear of Missing Out), আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, এবং বিষণ্নতা।

তথ্যের অতিভার ও চিন্তার ভারহীনতা
ইন্টারনেট তথ্যের সমুদ্র এনে দিয়েছে। আমরা আজ যে কোনো প্রশ্নের উত্তর গুগলে পেয়ে যাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো: এই তথ্য আমরা কতটা বুঝে ব্যবহার করছি? তথ্যের অতিভারে আমরা দ্রুত পড়ে নিচ্ছি, কিন্তু গভীরভাবে ভাবছি না। বিষয়কে বিশ্লেষণ করা, তার পেছনের কারণ বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া—এই দক্ষতা হ্রাস পাচ্ছে। একে বলা যায় গভীর চিন্তার সঙ্কট (crisis of deep thinking)।

অ্যালগরিদম ও চিন্তার নিয়ন্ত্রণ
আমরা ভাবি, আমরা নিজের ইচ্ছামতো কন্টেন্ট দেখি। কিন্তু বাস্তবে, অ্যালগরিদম আমাদের জন্য ঠিক করে দেয়, কোন পোস্ট আগে আসবে, কোন ভিডিও ভাইরাল হবে, কোন খবর আমরা দেখব না। এই “ফিল্টার বাবল” আমাদের চিন্তার পরিধি সীমিত করে দিচ্ছে। আপনি যা দেখেন, যা পছন্দ করেন, তা থেকেই তৈরি হয় একটি ঘেরা জগৎ — যেখানে ভিন্ন মত, ভিন্ন অভিজ্ঞতা, এবং অসামান্য ভাবনা প্রবেশ করতে পারে না। ফলে চিন্তার স্বাধীনতা আসলে এক ধরনের বিভ্রম হয়ে দাঁড়ায়।

ভবিষ্যতের দোরগোড়ায়: মানুষ-মেশিন সংযোগ
আমরা এমন এক যুগে যাচ্ছি, যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক ও প্রযুক্তির সরাসরি সংযোগ তৈরি হচ্ছে। Neuralink, Brain-Computer Interface (BCI) — এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আমাদের চিন্তা, আবেগ এবং মস্তিষ্কীয় ক্রিয়া প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারবে। এগুলো যেমন বিস্ময়কর, তেমনই বিপজ্জনক। যদি কোনো কোড বা সফটওয়্যার আমাদের চিন্তা-প্রক্রিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ‘স্বাধীন ইচ্ছা’ বলে কিছু থাকবে তো?

কিছু প্রশ্ন নিজেকে করতে পারি –
প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই আমাকে ব্যবহার করছে? প্রতিদিন “ফোকাস” করছি, নাকি শুধু “স্ক্রল” করছি? চিন্তা কি আমার নিজের, নাকি ফিড থেকে পাওয়া?

প্রবাসী আয়ে আবারও শীর্ষে সৌদি আরব

প্রবাসী আয়ে আবারও শীর্ষ অবস্থানে সৌদি আরব। ২০২২ সালের পর থেকে ব্যাংকগুলোর ভুল রিপোর্টিং এর কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় দেখানো হচ্ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় দেশভিত্তিক আলাদাভাবে আয়ের হিসাব করায় গেল মাসে নতুন এ চিত্র উঠে আসে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ২৭৫ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৪৯ কোটি ১৪ লাখ ডলার। যা মোট রেমিট্যান্সের ১৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এক্ষেত্রে, দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসেছে ৩৭ কোটি ২১ লাখ ডলার। মোট রেমিট্যান্সের ১২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ বা ৩৩ কোটি ডলার নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বৈধ চ্যানেলে সরাসরি ব্যাংক এবং এক্সচেঞ্জ হাউস–এ দুই মাধ্যমে দেশে আসে। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের বেশি অংশ আসে এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব – সিজারিয়ন ছিলেন যীশু !

রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে জুলিয়াস সিজারের নাম এক অনন্য অধ্যায়। এক সময়ের এক সাধারণ সেনানায়ক থেকে রোমের সর্বশক্তিমান শাসক হয়ে ওঠা এই ব্যক্তির জীবন ছিল রাজনীতি, যুদ্ধ, প্রেম এবং ষড়যন্ত্রের এক জটিল মিশ্রণ। আর মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা সপ্তম, যিনি তার সৌন্দর্য ও বুদ্ধিমত্তার কারণে শুধু মিশরেই নয়, সমগ্র প্রাচীন বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন, ছিলেন সেই সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী। ইতিহাসের পর্দায় তাদের সম্পর্ক ও প্রেম কাহিনী যেমন রোমান সাম্রাজ্যের ভবিষ্যত বদলে দিয়েছিল, তেমনি তাদের পুত্র সিজারিয়নের জন্মও ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়ের সূচনা করেছিল।

এই দুই মহান ব্যক্তিত্বের সন্তান সিজারিয়ন জন্ম নিলেন রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সাম্রাজ্যিক লড়াইয়ের মাঝখানে। তার জীবনকাল ছিল ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এক ধারাবাহিকতা। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় সিজারিয়নের নাম তুলনামূলক কম আলোচিত হলেও, তাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে সব অদ্ভুত ও বিতর্কিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে, প্রাথমিক খ্রিস্টধর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র যীশু খ্রিস্টের জীবনকাহিনী আসলে সিজারিয়নের জীবন ও ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে রচিত একটি মিথ, যা রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল।

সিজারিয়নের পুরো নাম গাইয়াস জুলিয়াস কাইসারিয়ণে। তিনি ছিলেন জুলিয়াস সিজার ও ক্লিওপেট্রা সপ্তমের পুত্র, যিনি ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মকালীন সময়ে রোম ও মিশরের রাজনীতি ছিল অত্যন্ত জটিল ও উত্তপ্ত। সিজারিয়নের জীবনকাল ছিল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, সাম্রাজ্য বিস্তার ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।

সিজারিয়নের পিতা জুলিয়াস সিজার ছিলেন রোমের এক মহান সামরিক নেতা ও রাজনীতিবিদ, যিনি রোমান প্রজাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেন। তার মাতা ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিশরের শেষ ফারাও, যিনি রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।সিজারিয়নের জন্ম ও তার পরিচিতি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও, তার জীবন ও মৃত্যু নিয়ে অনেক রহস্য ও গুঞ্জন রয়ে গেছে।

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো, প্রাথমিক খ্রিস্টধর্মের যীশু খ্রিস্টের চরিত্র ও জীবনকাহিনী আসলে সিজারিয়নের জীবন ও ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে তৈরি। তত্ত্ব অনুসারে রোমান সাম্রাজ্যের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটি ধর্মীয় মিথ গড়ে তুলেছিলেন, যা জনসমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও একত্রিত করার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। এই মিথের কেন্দ্রে ছিলেন যীশু, যিনি সিজারিয়নের রূপে উপস্থাপিত হয়েছিলেন।

সিজারিয়ন ও যীশুর জীবনকাহিনীর মধ্যে কিছু মিল পাওয়া যায়, যেমন জন্মের রহস্য, পিতার সাথে সম্পর্ক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব এবং মৃত্যুর পর অনুসারীদের দ্বারা তার প্রতিষ্ঠা। রোমান সাম্রাজ্যের শাসকরা জনসমাজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রয়োজন অনুভব করেছিল, যা তাদের শাসনকে বৈধতা দেবে। সেজন্য তারা সিজারিয়নের জীবনকাহিনীকে মিথের আকারে রূপান্তরিত করে যীশুর চরিত্র তৈরি করেছিল। প্রাচীন সভ্যতায় ধর্মীয় মিথ ও কিংবদন্তি তৈরি করা সাধারণ ছিল, যা সমাজে ঐক্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করত। এই প্রেক্ষাপটে সিজারিয়নের জীবনকাহিনী থেকে যীশুর মিথ গড়ে তোলা হয়েছিল।

যীশুর জন্ম সম্পর্কে বাইবেলে বর্ণিত আছে যে তিনি পবিত্র আত্মার দ্বারা জন্মগ্রহণ করেন। সিজারিয়নের ক্ষেত্রেও বলা হয় যে তার জন্ম ছিল বিশেষ ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাস্তবে সিজারিয়ন ক্লিওপেট্রা ও সিজারের পুত্র, তবুও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুসারীরা এই জন্মকাহিনীকে রহস্যময় ও অলৌকিক রূপে উপস্থাপন করে।

যীশু ছিলেন একটি নতুন ধর্মীয় আন্দোলনের নেতা, যিনি রোমান শাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক ন্যায় ও মানবতার বাণী প্রচার করতেন। সিজারিয়নও ছিল রাজনীতির কেন্দ্রে, যার জীবন ও মৃত্যু রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল। যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়া ও পুনরুত্থানের কাহিনী খ্রিস্টধর্মের মূল ভিত্তি।ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুসারে, সিজারিয়নের মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা তাকে দেবতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, যা পরে যীশুর পুনরুত্থান কাহিনীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। যদিও এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি চমকপ্রদ এবং কৌতূহল উদ্রেক করে, তবুও ইতিহাসবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদরা এটিকে ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

তাদের যুক্তি হলো:
সিজারিয়ন ও যীশুর জীবনের মধ্যে সরাসরি কোনো ঐতিহাসিক সংযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। বাইবেল ও অন্যান্য খ্রিস্টীয় ধর্মগ্রন্থে যীশুর জীবন ও শিক্ষা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত, যা সিজারিয়নের জীবনকাহিনীর সঙ্গে মেলানো কঠিন। যীশু ছিলেন ইহুদি ধর্মের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া একজন ধর্মীয় নেতা, যিনি মানবতা ও প্রেমের বাণী প্রচার করেছিলেন। অন্যদিকে, সিজারিয়ন ছিলেন রোমান ও মিশরীয় রাজনীতির অংশ, যার জীবন ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। খ্রিস্টধর্মের বিকাশ ও বিস্তার প্রাচীন ইহুদি ধর্ম ও রোমান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, এটি কোনো এক ব্যক্তির মিথ নয়, বরং বহু শতাব্দীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার ফল। সিজারিয়নকে যীশুর মডেল হিসেবে দেখানো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব একটি চমকপ্রদ ও বিতর্কিত ধারণা, যা ইতিহাস ও ধর্মের জটিল সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করে। যদিও এই তত্ত্বের পক্ষে যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই এবং এটি অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও ধর্মতত্ত্ববিদ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত।

দুঃখ-দুর্দশায় বড় হওয়া শিশুরা , অংকে পিছিয়ে যায় কেন ?

শৈশবের কষ্ট-যেমন দারিদ্র্য, পিতামাতার মানসিক অসুস্থতা, নিরাপদ নয় এমন আশেপাশের পরিবেশ-মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটারের ক্ষতি করে এবং মস্তিষ্কের গঠনেও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনে।

ম্যাসাচুসেটসের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন্স হাসপাতালের গবেষণায় দেখা গেছে, ৯,০০০ এর বেশি ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর মধ্যে যারা এই ধরনের কষ্টের সম্মুখীন হয়েছে, তাদের মস্তিষ্কের হোয়াইট ম্যাটারের সংযোগ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। হোয়াইট ম্যাটার হলো মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পথ, যা বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এই হোয়াইট ম্যাটারের সংযোগের হ্রাস শিশুর ভাষা এবং গণিতের দক্ষতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ শৈশবে যে মানসিক চাপ ও কষ্ট হয়, তা মস্তিষ্কের সেই অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যা গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষাগত কাজের জন্য অপরিহার্য।

গবেষণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২১টি কেন্দ্রে পরিচালিত ‘অ্যাডোলেসেন্ট ব্রেন কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট (ABCD)’ স্টাডির অংশ ছিল। এতে শিশু ও তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে বিভিন্ন শৈশবের কষ্টের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেমন গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি, পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, আশেপাশের পরিবেশের নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক সহায়তার মাত্রা। এই তথ্যের সঙ্গে মস্তিষ্কের সাদা পদার্থের এমআরআই স্ক্যান মিলিয়ে দেখা হয়।

গবেষণার প্রধান লেখক সোপিয়া কারোজ্জা বলেন, “আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, হোয়াইট ম্যাটারের পরিবর্তন মস্তিষ্কের এক বা দুইটি নির্দিষ্ট অংশে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো মস্তিষ্কেই ছড়িয়ে আছে। অর্থাৎ শৈশবের কষ্ট মস্তিষ্কের বিস্তৃত অংশকে প্রভাবিত করে।”

তবে আশার কথা হলো, যারা স্থিতিশীল পারিবারিক জীবন ও শক্তিশালী সামাজিক সমর্থন পেয়েছে তারা এই নেতিবাচক প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে রক্ষা পেয়েছে। অর্থাৎ ভালো অভিভাবকত্ব এবং নিরাপদ পরিবেশ শিশুর মস্তিষ্কের সাদা পদার্থকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।

গবেষকরা বলছেন, শৈশবের এই সংকটগুলো মস্তিষ্কের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঘটে, যা পরবর্তীতে কিশোরাবস্থা ও প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও সমর্থনমূলক পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।

এই গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে পরিবেশের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক অসুস্থতা, নিরাপত্তাহীন আশেপাশের পরিবেশের মতো প্রতিকূলতা শুধুমাত্র শিশুর মানসিক অবস্থাই নয়, তার মস্তিষ্কের কাঠামোতেও পরিবর্তন আনে, যা তার শেখার ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তাকে প্রভাবিত করে।

শিশুদের মস্তিষ্কের সাদা পদার্থের সংযোগ শক্তিশালী রাখতে এবং তাদের ভবিষ্যত সম্ভাবনা উন্নত করতে পরিবারের পাশাপাশি সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। নিরাপদ, স্নেহময় ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে শিশুদের মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশের মূল চাবিকাঠি।

শৈশবের প্রতিকূলতা থেকে সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে বিনিয়োগ করা মানে ভবিষ্যতের প্রজন্মের মেধা ও সম্ভাবনাকে রক্ষা করা। এই গবেষণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শিশুরা শুধু ভালো পরিবেশেই বিকশিত হতে পারে, যা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার ভিত্তি গড়ে দেয়।

শুল্ক কমাতে একমত যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

বাণিজ্য যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। পরস্পরের ওপর আরোপ করা পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য শুল্ক ৯০ দিনের জন্য ব্যাপক পরিসরে কমাতে একমত হয়েছে দুই দেশ। সোমবার যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা কমাতেই এই চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, গঠনমূলক ও দৃঢ় আলোচনার পর উভয় দেশ ৯০ দিনের জন্য শুল্ক স্থগিত করতে রাজি হয়েছে। এর আওতায় দেশ দুটি পারস্পরিক শুল্ক ১১৫ শতাংশ কমাবে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর আরোপিত বর্তমান ১৪৫ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনবে। অন্যদিকে চীন মার্কিন পণ্যের ওপর আরোপ করা ১২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনবে। উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, আগামী ১৪ মে থেকে শুল্কের এই কাঁটছাট কার্যকর হবে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে স্কট বেসেন্ট বলেন, আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে এসেছি যে, আমাদের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। দুই পক্ষের প্রতিনিধিদলই একমত হয়েছে যে তারা বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, এই সময়সীমার মধ্যে চীনের উচিত হবে ফেন্টানিল নামক ভয়াবহ মাদকের অবৈধ রপ্তানি বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া। এ বিষয়ে চীনের সদিচ্ছা দেখে ওয়াশিংটন আশাবাদ প্রকাশ করেছে।

ভাষা ও প্রযুক্তির সন্ধিক্ষণে , ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেস

সিয়াটলের এক নির্জন ভবনে একজন মানুষ চেয়ারে বসে আছেন, তাঁর ডান হাত একটি টাচপ্যাডে রাখা, মাথার পাশে একটি বড় চৌম্বকীয় কয়েল, যা মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে-এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS)। কয়েলটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যাতে একটি পালস পাঠানো হলে তাঁর হাত নড়ে ওঠে। মাইলখানেক দূরে আরেকজন মানুষ একটি স্ক্রিনের সামনে বসে আছেন, মাথায় ৬৪টি ইলেকট্রোডযুক্ত ‘শাওয়ার ক্যাপ’, যা তাঁর মস্তিষ্কের তরঙ্গ (EEG) রেকর্ড করছে। তিনি মনোযোগ দিয়ে একটি ডট স্ক্রীনে সরানোর চেষ্টা করছেন। তাঁর মস্তিষ্কের সিগন্যাল কম্পিউটারে পাঠানো হচ্ছে, যা আবার প্রথম ভবনের কম্পিউটারে পৌঁছায় এবং চৌম্বকীয় কয়েলকে পালস দিতে বলে। ফলাফল-প্রথম ব্যক্তির হাত নড়ে টাচপ্যাডে পড়ে, ভিডিও গেমে একটি ইনপুট হিসেবে রেজিস্টার হয় এবং অবশেষে একসঙ্গে কাজ করে তারা একটি ভার্চুয়াল শহরকে রক্ষা করে।

এই অভিজ্ঞতাটি সাধারণ মনে হলেও, এর তাৎপর্য বিশাল। এটি মানব মস্তিষ্কের সরাসরি সংযোগের (brain-to-brain interface, BBI) এক নতুন যুগের ইঙ্গিত দেয়-যেখানে ভাষা ছাড়াই চিন্তা আদান-প্রদান সম্ভব হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ভাষা কি সত্যিই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে? নাকি ভাষার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?

ভাষা নিয়ে আমাদের সবারই কখনো না কখনো হতাশা এসেছে। প্রতিদিনই আমরা ভুল শব্দ ব্যবহার করি, ভুল বোঝাবুঝিতে পড়ি, অথবা দ্ব্যর্থক বাক্যে আটকে যাই। অনেকেই মনে করেন, ভাষা আমাদের চিন্তাভাবনা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক ভাষাকে বলেছেন “চিন্তার খুবই লসী কম্প্রেশন”। তাই অনেকে ভাবেন, মস্তিষ্কের তথ্য সরাসরি আদান-প্রদান করা গেলে ভাষার দরকারই থাকবে না।

কিন্তু এই ধারণা কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষা করে। ভাষা কেবল তথ্যের বাহক নয়, এটি সামাজিক আচরণের অবকাঠামোও। প্রতিদিনের কথোপকথনে আমরা শুধু তথ্য দেই না, বরং সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলি, সম্মতি বা অসম্মতি প্রকাশ করি, এবং যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিই। ভাষা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচয় গঠনে সহায়ক।

ভাষার মাধ্যমে আমরা শুধু তথ্য আদান-প্রদান করি না, বরং একে অপরের অনুভূতি, মনোভাব, সংস্কৃতি এবং চিন্তার গভীরতা বুঝতে পারি। ভাষার শব্দ, বাক্য গঠন, উচ্চারণ ও প্রসঙ্গ আমাদের মনের ভাব প্রকাশের এক জটিল ও সূক্ষ্ম মাধ্যম। তাই ভাষা ছাড়া মানবিক যোগাযোগের পূর্ণতা অর্জন করা কঠিন।

ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেস:

বর্তমান ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেসে (BBI) একজনের মস্তিষ্কের সংকেত সরাসরি অন্যজনের মস্তিষ্কে পাঠানো হয়। এতে দ্রুত ও নির্ভুল প্রতিক্রিয়া সম্ভব, কিন্তু ব্যক্তিগত এজেন্সি বা স্বাধীনতা কমে যায়। মস্তিষ্কে চৌম্বকীয় পালস পাঠানো হলে, গ্রহণকারী ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং বাইরের নির্দেশে কাজ করেন। এটি কার্যকর হলেও, এতে deliberation বা চিন্তা-ভাবনার সুযোগ থাকে না। এমনকি যদি প্রযুক্তি আরও উন্নত হয়, তবুও ভাষার মতো নির্বাচনী ও আলোচনামূলক ক্ষমতা হারিয়ে যাবে। ভাষা আমাদের কী প্রকাশ করব, কী গোপন রাখব-এই নিয়ন্ত্রণ দেয়। ভাষা ছাড়া এই বাছাই করার ক্ষমতা কমে যাবে, যা মানবিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান দ্রুততর হলেও, এটি এখনও অনেক সীমাবদ্ধ। মস্তিষ্কের সংকেতের জটিলতা এতটাই বেশি যে, সম্পূর্ণ চিন্তা বা অনুভূতি সঠিকভাবে অনুবাদ করা কঠিন। বর্তমানে প্রযুক্তি শুধুমাত্র সহজ সংকেত বা নির্দেশ পাঠাতে সক্ষম, যা ভাষার গভীরতা ও বহুমাত্রিকতা ধারণ করতে পারে না।

ভাষার দুটি প্রধান শক্তি রয়েছে, যা মানবিক যোগাযোগকে কার্যকর করে তোলে, নির্বাচন (selection) এবং আলোচনা (negotiation)।

নির্বাচন
ভাষার মাধ্যমে আমরা ঠিক করি কোন তথ্য প্রকাশ করব, কোনটা গোপন রাখব। সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে এটি অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, “কেমন আছো?”-এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা সম্পর্ক অনুযায়ী উত্তর দিই। ভাষা আমাদের দেয় তথ্য বাছাই ও সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রকাশ করার ক্ষমতা। এটি আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিফলন।

আলোচনা
ভাষা আমাদের দেয় পারস্পরিক বোঝাপড়ার সুযোগ। আমরা পালাক্রমে কথা বলি, সম্মতি বা আপত্তি জানাই এবং যৌথভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। ভুল বোঝাবুঝি হলে, ভাষার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করি। এই আলোচনা আমাদের দেয় স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। ভাষা ছাড়া এই ধরনের জটিল সামাজিক বিনিময় সম্ভব নয়। ভাষা আমাদের শুধু তথ্য নয়, অভিজ্ঞতা ও মূল্যবোধ ভাগ করে নিতে সাহায্য করে। এটি আমাদের চিন্তাকে কাঠামোবদ্ধ করে, নতুন ধারণা তৈরি করে এবং সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলে। ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেস প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘BrainNet’-যেখানে পাঠানো সংকেতের প্রতিক্রিয়া দেখে আবার সংকেত পাঠানো যায়, অর্থাৎ একটি মৌলিক আলোচনা বা feedback loop তৈরি হয়। এতে ভাষার আলোচনামূলক দিকের কিছুটা প্রতিফলন ঘটে।

ভবিষ্যতে প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে, হয়তো আরও বেশি নির্বাচনী ও আলোচনামূলক ক্ষমতা যুক্ত করা যাবে। কিন্তু এতে ভাষার মতো নমনীয়তা, দ্ব্যর্থকতা ও সামাজিকতা আসবে কি? ভাষা আমাদের দেয় ব্যক্তিগত ও যৌথ এজেন্সির ভারসাম্য-এটি প্রযুক্তি দিয়ে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা কঠিন।অন্যদিকে ভাষার বিকল্প হিসেবে ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেস ব্যবহারে কিছু সুবিধাও রয়েছে। যেমন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাদের ভাষা বা চলাফেরার সমস্যা, তারা সহজেই যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়া দ্রুত ও সরাসরি তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে জটিল কাজ সহজতর হবে।

ভাষা ছাড়া যোগাযোগ হলে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। ইতিহাসে দেখা যায়, যখন ভাষার স্বাধীনতা কমে যায় (যেমন-অরওয়েলের ‘নাইন্টিন এইটি-ফোর’ উপন্যাসে), তখন সমাজে মত প্রকাশের সুযোগ কমে যায় এবং মানবিকতা ক্ষুণ্ণ হয়। ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেসেও যদি নির্বাচনী ও আলোচনার সুযোগ না থাকে, তবে তা মানবিক এজেন্সিকে কমিয়ে দেবে। ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেসের মাধ্যমে তথ্য সরাসরি আদান-প্রদান করলে, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। কারো মস্তিষ্ক থেকে তথ্য চুরি বা অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই এই প্রযুক্তির উন্নয়নে কঠোর নৈতিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

ভবিষ্যতে ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেস প্রযুক্তি এবং ভাষা একসঙ্গে কাজ করবে। ভাষার মাধ্যমে আমরা চিন্তা ও অনুভূতি কাঠামোবদ্ধ করব, আর প্রযুক্তির মাধ্যমে তা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে আদান-প্রদান করব। এই সমন্বয় মানবিক যোগাযোগকে নতুন মাত্রা দেবে। তবে ভাষার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব কখনোই কমবে না। ভাষা আমাদের চিন্তা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, ভাষার গভীরতা ও বৈচিত্র্যকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

ভাষা আসলে কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের সামাজিক অস্তিত্বের ভিত্তি। ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেস প্রযুক্তি আমাদের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, কিন্তু ভাষার নির্বাচনী ও আলোচনামূলক শক্তি ছাড়া মানবিক সমাজ কল্পনা করা যায় না। ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হয়তো ভাষার কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠবে, তবে ভাষার মতো নমনীয়, মানবিক ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এখনও অনন্য।