Home Blog Page 105

ইউরোপে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সংঘাত ও সমঝোতা

ইউরোপে ধর্ম, আইন ও রাজনীতির সম্পর্ক এক অনন্য ও জটিল বাস্তবতা, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। এখানে রাজনৈতিক জীবনে ধর্মীয় প্রভাব তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মুখপাত্র আলাস্টেয়ার ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত উক্তি ‘রাজনীতিবিদরা সাধারণত গড নিয়ে কথা বলেন না’ ইউরোপের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোবারোমিটার জরিপে দেখা যায়, ধর্মের রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও ভোটারের আচরণে প্রভাব খুব সীমিত। আমেরিকার মত শক্তিশালী ‘রিলিজিয়াস রাইট’ বা ইসলামী দেশগুলোর মত ধর্মীয় বিতর্ক ইউরোপের রাজনীতিতে নেই বললেই চলে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে ধর্ম ও রাজনীতির এই দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অভিবাসন অন্যতম কারণ হিসেবে ধর্মকে আবারও জনজীবনের কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনেছে। মুসলিম সংখ্যালঘুরা ধর্ম অবমাননা ও বাকস্বাধীনতা নিয়ে প্রতিবাদ করেছে, ক্যাথলিক নেতারা সমকামী বিয়ে ও গর্ভপাত নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে হস্তক্ষেপ করেছেন, আবার রক্ষণশীলরা ইউরোপের খ্রিস্টান অতীত হারিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী এরিক কাউফম্যান দাবি করেছেন, ধর্মবিশ্বাসীদের উচ্চ জন্মহার ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতাকে শতকের শেষে উল্টে দিতে পারে।

ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতার শিকড় খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বে ‘সিজারকে সিজারের এবং ঈশ্বরকে ঈশ্বরের’ নীতিতে থাকলেও, এর প্রকৃত ভিত্তি ১৬ ও ১৭ শতকের ধর্মযুদ্ধের যন্ত্রণায় নিহিত। সেই সময়ের ভয়াবহ সংঘাত ইউরোপকে এমন রাজনৈতিক কাঠামো গড়তে বাধ্য করেছিল, যাতে ধর্মীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়ার শান্তিচুক্তি ইউরোপে সার্বভৌম রাষ্ট্র ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেয়। গ্রোটিয়াস, হবস, লক, হিউমের মতো চিন্তাবিদরা ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করার দর্শন গড়ে তোলেন।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও, ইউরোপে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। অনেক দেশে খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতীক, উৎসব, এমনকি সরকারি অর্থায়নে চার্চ ট্যাক্স, ধর্মীয় স্কুল ও হাসপাতাল বিদ্যমান। জাতীয় পতাকায় ক্রুশ, সরকারি ছুটিতে খ্রিস্টান উৎসব, সাংবিধানিকভাবে খ্রিস্টধর্মের উল্লেখ-এসবই ইউরোপের ধর্ম-রাষ্ট্র সম্পর্কের ‘আধা-ধর্মনিরপেক্ষ’ চরিত্রকে তুলে ধরে।

আধুনিক ইউরোপে অভিবাসনের ফলে ধর্মীয় বৈচিত্র্য বেড়েছে। একসময় জাতীয়তা ও ধর্ম ছিল সমার্থক-স্পেন মানেই ক্যাথলিক, সুইডেন মানেই লুথারান, গ্রিস মানেই গ্রীক অর্থডক্স। এখন বহু জাতিগোষ্ঠী ও নাস্তিক-অজ্ঞেয়বাদীর সংখ্যা বাড়ায় ধর্মীয় পরিচয় আর জাতীয় পরিচয়ের সমার্থকতা হারিয়েছে। ফলে ধর্মীয় প্রতীক-যেমন স্কুলে ক্রুশ, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রার্থনা-নিয়ে আইনি ও সামাজিক বিতর্ক বেড়েছে। আইরিশ পুলিশে শিখ অফিসারের পাগড়ি, ইতালির স্কুলে ক্রুশ, ইউরোপিয়ান কোর্টে বাইবেলের শপথ-এসবই এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক যেমন হিজাব, বোরকা ইত্যাদি ইউরোপের কিছু দেশে ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করার প্রবণতা বাড়িয়েছে। ২০০৪ সালে ফ্রান্সে সব ধরনের ‘প্রদর্শনযোগ্য’ ধর্মীয় প্রতীক স্কুলে নিষিদ্ধ হয়; বার্লিনে সরকারি অফিসে, ডেনমার্কে আদালতে ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও লক্ষ্য ছিল মুসলিম প্রতীক, বাস্তবে সব ধর্মীয় প্রতীকই নিষিদ্ধ হচ্ছে, ফলে ধর্ম আরও ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ হচ্ছে।

ধর্ম ও রাজনীতির আলাদা রাখার যে সামাজিক রীতি ছিল, এখন তা স্পষ্ট আইনি নিয়মে পরিণত হচ্ছে। ব্লাসফেমি আইন বাতিল, নাগরিকত্ব পরীক্ষায় ধর্ম-রাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতার স্বীকৃতি, সমতার নীতিতে ধর্মীয় অনুশীলন সীমাবদ্ধ করা-এসবই ইউরোপের নতুন বাস্তবতা। অনেক দেশেই এখন নাগরিকত্ব পেতে ধর্মীয় ও সামাজিক সমতার নীতিগুলো মেনে নিতে হয়।

বহুত্ববাদের চাপে ইউরোপে ধর্মের প্রতীকী ও আইনি ভূমিকা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। একসময় ধর্ম ছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, এখন তা বিতর্কিত। নতুন প্রজন্ম, অভিবাসী ও নাস্তিকদের কারণে ধর্মীয় প্রতীকের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। সরকারগুলো ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

ইউরোপীয় ধর্ম-রাষ্ট্র সম্পর্কের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি আমেরিকার মত সম্পূর্ণ আলাদা। আমেরিকা একটি ধর্মীয় বহুত্ববাদী দেশ যেখানে ‘চার্চ ও স্টেট’ সম্পূর্ণ আলাদা করার কঠোর আইন রয়েছে। ইউরোপে যদিও অনেক দেশেই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু আইনি ও সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়ে গেছে। যেমন, ইংল্যান্ডে অ্যাঙ্গলিকান চার্চ সরকারি স্বীকৃতি পায়, অনেক দেশে চার্চ ট্যাক্স আদায় করা হয়, সরকারি স্কুল ও হাসপাতালগুলোতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকে। ইউরোপে ধর্মীয় উৎসবগুলো জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়, যা আমেরিকার তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্য।

ইউরোপে ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্কের এই পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বেড়ে যাওয়ার কারণে ধর্মীয় অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নগুলো জটিল হচ্ছে। অভিবাসন ও গ্লোবালাইজেশনের ফলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো নতুন রাজনৈতিক দাবিতে এগিয়ে আসছে, যা ইউরোপীয় সমাজের ঐতিহ্যগত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক সংহতিকে প্রভাবিত করছে।

ইউরোপে ধর্ম, আইন ও রাজনীতির সম্পর্ক একটি দীর্ঘ ইতিহাসের ফলাফল। ধর্মনিরপেক্ষতা এখানে সংঘাত এড়ানোর উপায় হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, এখন তা আরও কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে ইউরোপের জনজীবনে ধর্মের ভূমিকা আরও সীমিত হবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনই হয়তো ইউরোপের বহুত্ববাদ, সমতা ও উদারনৈতিকতার স্বার্থেই জরুরি। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে একটি নতুন ইউরোপীয় পরিচয় গড়ে তোলা হবে, যেখানে ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তার প্রভাব সীমিত থাকবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে অ্যালার্জির প্রভাব –

নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালার্জির মৌসুম দীর্ঘতর এবং তীব্র হয়ে উঠেছে ও লক্ষ লক্ষ মানুষকে শ্বাসকষ্ট, চোখে জ্বালা ও অন্যান্য অ্যালার্জিক উপসর্গে ভুগাচ্ছে।

এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পোলেনের পরিমাণ ও মৌসুমের সময়কাল বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বসন্ত ও শরৎকালে পোলেনের উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গাছপালা দীর্ঘ সময় পোলেন ছড়াচ্ছে এবং বাতাসে পোলেনের ঘনত্বও বেড়ে গেছে। এর ফলে অ্যালার্জির উপসর্গ যেমন নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং চোখে জ্বালা আরও তীব্র হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অ্যালার্জির কারণে হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসার সংখ্যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা এই পরিবর্তনের কারণে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অ্যালার্জির মৌসুমের সময়কাল বাড়ার ফলে আগামী দিনে এই সমস্যা আরও জটিল রূপ নিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা বৃদ্ধিও পোলেনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, যা অ্যালার্জির উপসর্গকে তীব্র করে। এছাড়া বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ার ফলে পোলেন আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে, যা শ্বাসনালীতে জ্বালা ও প্রদাহ সৃষ্টি করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্বন নির্গমন কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে অ্যালার্জি রোগীদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও অ্যালার্জির মৌসুমে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এই সমস্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাই দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া ভবিষ্যতে অ্যালার্জি ও অন্যান্য শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।

ড. ইউনূসের অনুরোধে , উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সাড়া মেলেনি –

0

২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে যখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় তখন দেশের অর্থনীতি ছিল চরম সংকটে—ডলারের ঘাটতি, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার ও মূল্যস্ফীতিতে জনগণ বিপর্যস্ত।

এই পরিস্থিতিতে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা চায়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজে জাতির উদ্দেশে ভাষণে বিষয়টি জানান এবং বিদেশ সফরে গিয়েও এই অনুরোধ করেন।

তবে আট মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কেউ সাড়া দেয়নি। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি আগের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কমেছে। মূলত নতুন প্রকল্প না থাকায় এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতায় দাতারা পিছিয়ে আছে।

গত বছরের তুলনায় অর্থ ছাড়ও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থিতিশীলতা না এলে দাতারা সহায়তা বাড়ায় না। প্রকল্প বাস্তবায়নের হারও দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এ অবস্থায় আগামী বাজেটে বড় আকারের বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা থাকবে। তবে দরকার রাজনৈতিক স্থিতি, দক্ষ আলোচনা এবং সঠিক প্রকল্প পরিকল্পনা। এখন পর্যন্ত সরকারের নানা চেষ্টার পরও কাঙ্ক্ষিত অর্থ আসেনি। এ থেকে উত্তরণে বাস্তবায়ন ও নীতিগত অগ্রগতি জরুরি।

নিউইয়র্ক টাইমসের কলাম – ভারত-পাকিস্তান আরও বিপজ্জনক , এক যুগে ঢুকে পড়েছে : আসফান্দয়ার মির , ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টার দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো ।

“… ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ও বিপজ্জনক দিকে মোড় নিয়েছে। দুই প্রতিবেশীকে ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষে জড়ানো থেকে নিবৃত্ত রাখার মতো কূটনৈতিক তৎপরতার পরিসর সীমিত হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনটা দুই দেশের একেবারে ভিন্নমুখী পথচলার মধ্যে শনাক্ত করা যায়।

ভারত এখন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতকে শুধু একটি মহান দেশ হিসেবে নয়, এক সুমহান প্রাচীন সভ্যতার এমন এক গৌরবময় উত্তরসূরি হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে চান, বিশ্বমঞ্চে যেটি কিনা তার পদচিহ্ন রেখেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটা আপসহীন মনোভাব তৈরি করেছে।

এতে করে পাকিস্তানকে শুধু ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং ভারতের ন্যায়সংগত জাগরণে বিশাল হুমকি সৃষ্টিকারী দেশ হিসেবে দেখার প্রবণতা বেড়েছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল, দুই দেশই তাদের নিজেদের অংশ বলে) ওপর পাকিস্তানের দাবি এবং ভারতবিরোধী সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের সমর্থন—ভারত আর সহ্য করবে না।

অন্যদিকে পাকিস্তান দুই দশক ধরে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংকটে জর্জরিত। পাকিস্তানে একটি প্রতিষ্ঠানই সর্বময় ক্ষমতাধারী। দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনী নীতিনির্ধারণে কর্তৃত্ব করে এবং তাদের হাতে রয়েছে উল্লেখ করার মতো প্রচলিত যুদ্ধ ও পারমাণবিক সামরিক শক্তি।

বিপর্যয়ের পরও, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখনো রয়েছে পাকিস্তানের। কাশ্মীরের মতো বিষয়গুলো পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়ের একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়, এসব বিষয়ে ইসলামাবাদ দিল্লির সঙ্গে আপস করতে রাজি নয়।

গত কয়েক দশকে, পাকিস্তানের নানা উসকানির মুখেও ভারতকে সাধারণত সংযম প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। একটা সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে সেটা সহায়তা করত। এমনকি ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীদের হামলায় ১৬৬ জন নিহত হওয়ার পরও, ভারত শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল।

মোদির আমলে ভারতের আগের অবস্থানটা বদলে গেছে। গত এক দশকে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একঘরে করার কৌশল তিনি নিয়েছেন। এর পাশাপাশি গোপন অভিযান, অন্তর্ঘাত ও লক্ষ্যবস্তু করে হত্যার ঘটনাও ভারত ঘটাচ্ছে।

একই সময়ে পাকিস্তান এবং নির্দিষ্ট করে দেশটির সেনাবাহিনী তাদের ঐতিহ্যের বাইরে বেরিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ২০১৯ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর পাকিস্তান অনেক বেশি সংযত আচরণ করে, ২০২১ সালে যুদ্ধবিরতি পুনরায় চালু করে। কিন্তু এর পর থেকে ভারত তার পথ বদল করে।

এমনকি যদি দুই পক্ষ বর্তমান উত্তেজনা থেকে সরে আসে, এরপরও ভারত খুব স্পষ্টভাবে পাকিস্তানকে দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে রাখার কৌশল অবলম্বন করবে। ভারতের লক্ষ্য হচ্ছে পাকিস্তানের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দেওয়া এবং শক্তির মূল কেন্দ্র সেনাবাহিনীর অপূরণীয় ক্ষতি করা।

গত মাসে কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে, ভারতের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের চূড়ান্ত ধরনের কঠোর অবস্থান নিতে দেখা গেছে। তাঁরা বলেছেন, পাকিস্তান একটি ব্যর্থ ও উচ্ছৃঙ্খল রাষ্ট্র। ভারতকে অবশ্যই পাকিস্তানকে ধ্বংসের পথ কার্যকরভাবে খুঁজে বের করতে হবে।

ভারতের কৌশলগত এই পরিবর্তন পাকিস্তান বুঝতে পেরেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আশা ছেড়ে দিয়ে তারা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। … দক্ষিণ এশিয়ার সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ক্রমেই কমে আসছে।

… ১৯৯৯ সালে, কাশ্মীরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষ থামাতে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ২০০১ সালে ভারতের আইনসভায় সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ত্বরিত কূটনীতিতে উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছিল। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে এবং এ ঘটনার পেছনে দায়ীদের কয়েকজনকে বিচারের আওতায় আনতে সহায়তা করেছিল।

কিন্তু আজ সেই ‘সৎ মধ্যস্থতাকারী’ ভূমিকার সম্ভাবনা ক্রমেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন মূলত বেইজিংয়ের প্রভাব মোকাবিলায় নয়াদিল্লিকে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে পাশে পেতে চাওয়ায় ভারত-পাকিস্তান ইস্যু থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানালেও, তাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থেকেছে বাণিজ্যযুদ্ধ, ইউক্রেন ও গাজায় সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে কূটনীতিতে।

তদুপরি নয়াদিল্লি এখন তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকে পাকিস্তানের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে এবং ইসলামাবাদও পশ্চিমা দেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতায় সন্দিহান। ফলে একসময়কার কার্যকর যোগাযোগ চ্যানেলগুলোও এখন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।

… মার্কিন প্রশাসনের কেউ কেউ হয়তো ভারতকে আরও একপাক্ষিকভাবে সমর্থন দেওয়ার এবং পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার অবস্থান নিতে পারেন।

কিন্তু চীনের সঙ্গে ভারসাম্য, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তায় বড় অবদানকারী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে ভারতের কার্যকারিতা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়বে; যদি ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যয়বহুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনন্তকাল ধরে আটকে থাকে।

অন্যদিকে পাকিস্তান তাতে করে চীনের প্রভাব বলয়ে আরও বেশি ঝুঁকে যাবে। এতে করে ২৫ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশ পাকিস্তানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ আরও কমে যাবে। আর এই জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশটিই এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব পোষণ করে। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাজে ফলাফল নিয়ে আসবে এবং ভারতের চ্যালেঞ্জগুলো আরও গভীর হবে।”

সংবিধান সংস্কার আলোচনা – ‘প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো জরুরি’

0

কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এটিসহ সংবিধান সংস্কারে ৭টি প্রস্তাব তুলে ধরেছে নাগরিক জোট।এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, দেশের বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা দেওয়া আছে। দেশের আইনি কাঠামো, প্রতিষ্ঠানগুলো এমন ছিল যে এখানে স্বৈরাচারের আবির্ভাব সুনিশ্চিত ছিল। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতার ভারসাম্য এনে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো।

এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন—এ প্রস্তাবের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এটি খুব জনপ্রিয় দাবি, এটি তাঁরও দাবি। কিন্তু এই দাবি শুধু করলেই হবে না, ‘কনভিন্সিং আর্গুমেন্ট’ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদে থাকতে পারবেন, এমন বিধান আসলে ভারত, যুক্তরাজ্য কোথাও নেই। এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, এমন বিধান করা হলেও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো। ভারতে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বা পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। আর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাহী বিভাগের কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। প্রধানমন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর প্রসঙ্গ টেনে আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশ যখন সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রবেশ করল, তখন রাষ্ট্রপতির হাতে যে অভাবনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, সেই ক্ষমতার প্রতিটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তির আধিপত্য—সবকিছু মিলেই এই ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন তৈরি হয়েছে।

আলী রীয়াজ বলেন, ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর ‘টার্ম লিমিট’ করা হয় না। তাই বাংলাদেশেও এটা করা যাবে না—এই যুক্তি তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করেছে। এর আগে কোথাও এই ব্যবস্থা ছিল?

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের প্রস্তাব করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, অতীতে ব্যক্তিগত পছন্দে নিয়োগ হয়েছে। এনসিসি গঠন করা হলে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের প্রতিনিধিরা একত্রে বসে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ১৯৯০ সালের লিখিত চুক্তিও রাজনৈতিক দলগুলো মানেনি। ‘নন বাইন্ডিং’ হলে জাতীয় সনদ শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।

নাগরিক জোটের অন্যান্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আছে — নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা।

সাংবিধানিক নিয়োগ-সংক্রান্ত তারা দুটি বিকল্প বলেছে। একটি হলো নির্বাহী বিভাগের মনোনয়নের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের অনুমোদনের মাধ্যমে, আরেকটি হলো জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদের মাধ্যমে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির দুই মাস আগে ১০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। সেখানে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে ৫ জন করে সদস্য থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিটির অন্তত ৮ সদস্যের সম্মতির প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘জুলাই সনদের’ উল্লেখ এবং পরিশিষ্ট হিসেবে জুলাই সনদ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভূমি ও ক্ষমতা – মালিকানার ইতিহাস , সংকট ও ভবিষ্যৎ

মানুষের ইতিহাসে ভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। আজ থেকে প্রায় ১০,০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা আধুনিক সান ডিয়েগো বা নিউ ইয়র্ক শহরের সমান ছিল, তখন মানুষ ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়াত, সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় জমির মালিকানা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। কৃষি ও স্থায়ী বসতির আবির্ভাবের পর, ভূমি হয়ে ওঠে শক্তি, সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদার মূল উৎস। ভূমি দখল মানে উৎপাদন ও উদ্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণ, যা দিয়ে গড়ে ওঠে শ্রেণিবিভাগ, শাসন ও সামাজিক নিয়ম।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে শুরু করে রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত ভূমি নিয়ে সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে, ভূমি হয়ে ওঠে আরও মূল্যবান ও বিরল। ১৮০০ সালের দিকে বিশ্ব জনসংখ্যা ১ বিলিয়নে পৌঁছায়, ভূমি নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়। ইউরোপ, রাশিয়া, পূর্ব এশিয়া, লাতিন আমেরিকায় জমিদার ও কৃষক, হেসিয়েন্ডা ও সের্ফডমের মতো শোষণমূলক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে সাধারণ কৃষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হন।

গত দুই শতাব্দীতে, রাষ্ট্রগুলো শক্তিশালী হয়ে ব্যাপকভাবে ভূমি পুনর্বিন্যাস করেছে। কোথাও আদিবাসীদের জমি দখল করে সেটলারদের দিয়েছে, কোথাও বড় জমিদারদের জমি কেড়ে কৃষক বা সমবায়ীদের হাতে তুলে দিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান ভূমি সংস্কার করে জমিদারদের জমি ছোট ছোট কৃষক পরিবারে ভাগ করে দেয়। সরকারের সহায়তায় এই পরিবারগুলো দ্রুত শিক্ষিত হয়, শহরায়ণ ও শিল্পায়ণ ঘটে, দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যায়।

অন্যদিকে অনেক দেশ ব্যর্থও হয়েছে। চীনে গৃহযুদ্ধের পর কমিউনিস্ট পার্টির সব ব্যক্তিগত জমি রাষ্ট্রীয়করণ করে, বিশাল সমবায় গড়ে তোলে, যার ফলাফল ছিল কৃষি উৎপাদনে পতন ও দুর্ভিক্ষ। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনে কৃষ্ণাঙ্গদের জমি কেড়ে শ্বেতাঙ্গদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যার ফলে ১৯৯৪ সালের শেষে ১১% শ্বেতাঙ্গ ৮৬% কৃষিজমির মালিক ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে ভূমি পুনর্বিন্যাসের নানা ফলাফল দেখা গেছে। আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে সেটলারদের হাতে জমি তুলে দেওয়া হয়, যার ফলে নিউ ইংল্যান্ডে ছোট কৃষকের গণতন্ত্র, দক্ষিণে দাসপ্রথা ও প্ল্যান্টেশন ব্যবস্থা এবং পশ্চিমে ইন্ডিয়ান রিজার্ভেশন গড়ে ওঠে।

এতসব পুনর্বিন্যাস সমাজকে নতুন পথে চালিত করেছে-কোথাও সমতা ও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, কোথাও বৈষম্য, বর্ণবাদ ও স্থবিরতা স্থায়ী হয়েছে। ভূমি নিয়ে সংঘাত, উচ্ছেদ, পুনর্বাসন, এবং নতুন মালিকানার ইতিহাস ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্মৃতিতে গেঁথে আছে। দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি-সব জায়গায়ই দেখা যায়, কখনো জমি ব্যক্তিগত থেকে সমবায়ে, আবার কখনো রাষ্ট্রীয় মালিকানা থেকে ব্যক্তিগত বা কমিউনিটির হাতে গেছে।

বর্তমানে আমরা আবারও এক ‘মহা পুনর্বিন্যাস’-এর মধ্যে আছি। জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে-শতাব্দীর শেষে ১০ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে-ফলে জমির ওপর চাপ বাড়বে। আবার কিছু দেশে (যেমন: জাপান, চীন) জনসংখ্যা কমছে। আফ্রিকায় জনসংখ্যা দ্রুত বাড়বে, ফলে কৃষিজমির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তন নতুন করে ভূমি নিয়ে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে। পৃথিবীর উত্তরের দেশগুলো-কানাডা, রাশিয়া-তুষার গলে নতুন কৃষিযোগ্য জমি পাবে, সেখানে অভিবাসন ও নতুন মালিকানা নিয়ে সংঘাত বাড়তে পারে। আবার কিছু অঞ্চল বাসযোগ্যতা হারাবে, মানুষ অভ্যন্তরীণ বা আন্তঃদেশীয়ভাবে স্থানান্তরিত হবে, নতুন ভূমি পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন হবে।

পশ্চিমা ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা ঔপনিবেশিকতা ও বৈশ্বিকীকরণের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে মালিকানার ‘লেয়ার্ড’ বা স্তরভিত্তিক পদ্ধতি দেখা যাচ্ছে-যেখানে ব্যক্তিগত ও কমিউনিটি মালিকানা পাশাপাশি চলে। মেক্সিকো, পেরু, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে আদিবাসী বা কমিউনিটির জমির স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। আবার পরিবেশ সংরক্ষণে মালিকরা স্বেচ্ছায় কিছু জমির ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে।

এই নতুন পদ্ধতিগুলো হয়তো ভুল-ত্রুটি নিয়েই এগোবে, কিন্তু ভবিষ্যতের ভূমি পুনর্বিন্যাসে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জনসংখ্যা, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও রাজনীতির পরিবর্তনে ২২তম শতাব্দীতে ভূমি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আজকের চেয়ে অনেক ভিন্ন হবে। তাই ভূমিকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে মালিকানার নতুন ধারণা ও নীতিমালা প্রয়োজন।

ভূমি এখনও পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ভূমির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বারবার বড় পরিবর্তন এসেছে-এতে কেউ লাভবান হয়েছে, কেউ ক্ষতিগ্রস্ত। সামনে আরও বড় পরিবর্তন আসছে-জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে। এই পুনর্বিন্যাস যেন সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে হয়, সেজন্য মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় নতুন চিন্তা ও নীতিমালা জরুরি।

একাত্তরে গণহত্যা – সহযোগীদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে ঐক্যের আহ্বান : এনসিপি

0

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সোমবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে — ‘যারা ১৯৭১ সালে এই জনপদের মানুষের জনযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিল এবং যাদের বিরুদ্ধে গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে, আমরা চাই, তারা নিজেদের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান জাতির সামনে ব্যাখ্যা করে জাতীয় সমঝোতা ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে এবং চব্বিশের অভ্যুত্থানের জন-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নে সহযোগী হবে।’

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলন চলাকালে জাতীয় সংগীত পরিবেশনে বাধা, গোলাম আজমের নামে স্লোগান দেওয়ার কয়েকটি ভিডিও সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এটি নিয়ে ফেসবুকে বিতর্ক চলছে। এর মধ্যে ‘সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিতর্কে এনসিপির অবস্থান’ শীর্ষক এই বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।

গত শনিবার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পর উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একাত্তর ও মুজিববাদী বাম ইস্যুতে একটি স্ট্যাটাস দেন।এতে তিনি লেখেন, ‘একাত্তরের প্রশ্ন মীমাংসা করতেই হবে। যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাইতে হবে। পাকিস্তান এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে।সহযোগীদের ইনিয়ে বিনিয়ে গণহত্যার পক্ষে বয়ান উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। জুলাইয়ের শক্তির মধ্যে ঢুকে স্যাবোটাজ করা বন্ধ করতে হবে। সাফ দিলে আসতে হবে।’

ফেসবুক পোস্টে একাত্তর ইস্যু টানায় ফেসবুকে মাহফুজ আলমের সমালোচনায় ফেটে পড়ে একটি দল। ফেসবুকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংয়ের সময়ের কিছু ছবি ভাইরাল হয়। এগুলোকে তার শিবির সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন মাহফুজ আলম।

এ বিষয়গুলোকে তুলে ধরে এনসিপি বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে — যেসব স্লোগান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, তার দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষেরই বহন করা উচিত। এনসিপি সদস্যদের বক্তৃতা ও স্লোগানে ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক অধ্যায়গুলোর প্রতিফলন ছিল। আন্দোলনকারীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করলে একটি পক্ষ আপত্তি জানালেও তারা দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে।

বিবৃতিতে বলা হয় — বিগত ফ্যাসিবাদি জমানায় নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাংলাদেশের নাগরিকদের পক্ষে চব্বিশের অভ্যুত্থানে যারা ভূমিকা পালন করেছেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে তাদেরকে আবশ্যিকভাবে ‘বাংলাদেশপন্থি’ ভূমিকা পালন করে যেতে হবে ।এনসিপি মনে করে, বাংলাদেশে রাজনীতি করার পূর্বশর্ত হলো ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের সংগ্রামের যথাযথ স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়া।

মানবদেহ থেকে নির্গত অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে দূষিত হচ্ছে নদী –

বিশ্বের কোটি কোটি কিলোমিটার নদী মানবদেহ থেকে নির্গত অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে দূষিত হচ্ছে, যা জলজ পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এটি প্রথমবারের মতো মানবদেহে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে বিশ্বব্যাপী নদীগুলোর দূষণের পরিমাণ নিরূপণ করেছে এবং তার প্রভাব বিশ্লেষণ করেছে।

সংক্রমণ প্রতিরোধে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধগুলি মানুষের জীবনে অপরিহার্য। তবে এই ওষুধগুলোর ব্যবহারের পর অনেক অংশ বর্জ্য জলসহ নদীতে প্রবাহিত হয়। যদিও অনেক সময় বর্জ্য জল পরিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব রাসায়নিক দূষণ কমানোর চেষ্টা করা হয়, তবুও অনেক ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণরূপে দূষণ রোধ করতে পারে না। এই কারণে নদীগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ জমা হয় এবং তা জলজ জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গবেষকরা প্রায় ৯০০টি নদীর তথ্য সংগ্রহ করে একটি বৈশ্বিক মডেল তৈরি করেছেন, যা নদীগুলোর অ্যান্টিবায়োটিক দূষণের মাত্রা নিরূপণ করেছে। তাদের হিসেব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৮,৫০০ টন অ্যান্টিবায়োটিক নদীজলে প্রবাহিত হয়, এটি মানুষের বার্ষিক ব্যবহারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

গবেষণায় দেখা গেছে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক অ্যামোক্সিসিলিন নদীগুলোতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে, যেখানে জনসংখ্যা ঘনত্ব বেশি এবং বর্জ্য জল পরিশোধনের সুযোগ সীমিত, সেখানে এই দূষণের মাত্রা সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ নদীতে খুবই কম মাত্রায় থাকে, যার কারণে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন। তবে দীর্ঘমেয়াদি ও সঞ্চিত পরিবেশগত সংস্পর্শ মানব স্বাস্থ্য এবং জলজ পরিবেশের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এই দূষণ জলজ জীবজন্তুদের মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে, যা পরবর্তীতে মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ শুধু জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, এটি জীবাণুদের মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যবহৃত ওষুধগুলো কার্যকরতা হারাতে পারে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি।

গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, এই গবেষণায় পশুপালন বা ওষুধ কারখানার অ্যান্টিবায়োটিক দূষণের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা পরিবেশে আরও বেশি দূষণ সৃষ্টি করতে পারে। তাই শুধুমাত্র মানব ব্যবহারের কারণে নদীগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ একটি গুরুতর সমস্যা।

ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গ্লোবাল হাইড্রোলজি প্রফেসর বার্নহার্ড লেনার বলেন, “এই গবেষণার উদ্দেশ্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করা নয়, কারণ আমরা সবার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন আছে। তবে আমাদের ফলাফল দেখায় যে, জলজ পরিবেশ এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধে অপ্রত্যাশিত প্রভাব থাকতে পারে, যা মোকাবেলা ও ব্যবস্থাপনার কৌশল প্রণয়নের আহ্বান জানায়”।

এই গবেষণার আলোকে বলা যায়, বিশ্বব্যাপী নদীগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ একটি অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক হুমকি। এটি শুধুমাত্র জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য নয়, মানুষের স্বাস্থ্য ও বৈশ্বিক ওষুধ ব্যবস্থার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই নদীজল দূষণ নিরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ, উন্নত বর্জ্য জল পরিশোধন ব্যবস্থা এবং সচেতন ওষুধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ একটি জটিল সমস্যা, যার সমাধানের জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সরকারী নীতি, শিল্প ও জনগণের সচেতনতা একযোগে প্রয়োজন। নদীগুলোকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে হলে, আমাদের অবশ্যই বর্জ্য জল ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে এবং অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে হবে।

এই গবেষণাটি একটি সতর্কবার্তা যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য ওষুধগুলোও পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

চর্যাপদ – উড়িষ্যা ও পূর্ব ভারতের বৌদ্ধ তান্ত্রিক ঐতিহ্য

চর্যাপদ ৭ম থেকে ১২শ শতকের মধ্যে রচিত বৌদ্ধ সহজযান তান্ত্রিক সাধকদের পদসমূহের সংকলন, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন। চর্যাপদ শব্দের অর্থ ‘আচরণ বা সাধনার গান’। এটি বাংলা, উড়িষ্যা, আসাম ও বিহারের আদি কথ্য ভাষার মিশ্রণে লেখা, যা বাংলা ভাষার পূর্বসূরী অপভ্রংশের প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত। চর্যাপদ শুধু সাহিত্য নয়, বরং প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও বৌদ্ধ তান্ত্রিক সহজযান ধর্মের গভীর আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিফলন।

১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের কাঠমান্ডুর রাজদরবার থেকে চর্যাপদের মূল পাণ্ডুলিপি ‘চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়’ আবিষ্কার করেন। এতে মোট ৪৭টি পদ ছিল, যা পরে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা ছিল বাংলা, আসামীয়া ও উড়িষ্যার আদি কথ্য ভাষার মিশ্রণ, যেগুলো প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার প্রভাব বহন করে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের ভাষাকে ‘সন্ধ্যা ভাষা’ বা ‘আলো-আঁধারি ভাষা’ উল্লেখ করেছেন, কারণ এটি আংশিক প্রকাশিত ও আংশিক গোপনীয় অর্থ বহন করে।

চর্যাপদের কবিরা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য, যেমন সরহপা, শবরপা, লুইপা, কাহ্নপা, মীনপা প্রমুখ। তাঁরা বৌদ্ধ তন্ত্র ও সহজিয়া মতবাদের অনুসারী ছিলেন, যারা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে মুক্তির পথ অনুসন্ধান করতেন। চর্যাপদে বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার মর্মবাণী কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে ‘মাতৃ ডাকিনী পূজা’, ‘শাকি উপাসনা’ ও ‘কায়া সাধনা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

উড়িষ্যা অঞ্চলকে চর্যাপদের উৎপত্তিস্থল হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ বৌদ্ধ বজ্রযান তন্ত্র ও নারী পূজার প্রচলন এখানে ব্যাপক ছিল। ‘মাতৃ ডাকিনী পূজা’ এবং ‘কায়া সাধনা’ উড়িষ্যার বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল অংশ, যা চর্যাপদে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। লক্ষ্মীঙ্করা ও পদ্মসম্ভবের মতো প্রভাবশালী বৌদ্ধ পণ্ডিতগণও উড়িষ্যার বৌদ্ধ তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। চর্যাপদের ভাষা ও সংগীতের দিক থেকে উড়িষ্যা অঞ্চলের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চর্যাপদের পদগুলোর রাগ ও তাল উড়িষ্যার ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

চর্যাপদের রাগগুলি ওডিসি সংগীতের রাগের সঙ্গে মিল রয়েছে, যা ১২শ থেকে ১৯শ শতকের ওড়িয়া ধ্রুপদী সংগীতের বিকাশে প্রভাব ফেলেছে। ভাষাগত দিক থেকে চর্যাপদ বাংলা, আসামীয়া ও উড়িষ্যার আদি কথ্য ভাষার মিশ্রণ, যা বাংলা ভাষার পূর্বসূরী হিসেবে বিবেচিত।

চর্যাপদ শুধু আধ্যাত্মিক গান নয়, তৎকালীন সমাজ ও সংস্কৃতির জীবন্ত চিত্র বহন করে। এতে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা দিক যেমন শিকার, নৌকা চালনা, বিয়ের রীতি, পোশাক ও অলঙ্কার, অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

চর্যাপদে ব্যবহৃত শব্দ ও রূপ বাংলার আদি ভাষার ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করে। আধ্যাত্মিক দিক থেকে চর্যাপদ বৌদ্ধ সহজযান ধর্মের তান্ত্রিক সাধনার মর্মবাণী বহন করে, যেখানে কায়া সাধনা ও মুক্তির পথের বর্ণনা পাওয়া যায়।

বর্তমানে চর্যাপদ নিয়ে ভাষাবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদরা গভীর গবেষণা করছেন। চর্যাপদ বাংলা ভাষার বিকাশ ও আদি সাহিত্যিক রীতির চিত্র তুলে ধরায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদের প্রভাব স্পষ্ট, বিশেষ করে আধ্যাত্মিক ও লোকসাহিত্যিক ধারায়।

চর্যাপদ ও উড়িষ্যা বৌদ্ধ তান্ত্রিক সংস্কৃতি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক অনন্য ও প্রাচীন অধ্যায়। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন এবং বৌদ্ধ সহজযান তান্ত্রিক সাধনার কবিতার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক চিন্তা ও সমাজের জীবন্ত চিত্র বহন করে। উড়িষ্যা অঞ্চলের বৌদ্ধ তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে চর্যাপদের গভীর সম্পর্ক বাংলা ভাষা, সংগীত ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই সংস্কৃতি বাংলা জাতীয় ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ, যা আমাদের পূর্বপুরুষদের আধ্যাত্মিক সাধনা, সাংগীতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি , ‘উদ্বেগজনক’ গোয়েন্দা তথ্য পেয়ে , চাপ দেয় যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন রিপোর্টে বলা হয়েছে — ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। গত শুক্রবার সকালে তাঁদের কাছে একটি ‘উদ্বেগজনক’ গোয়েন্দা তথ্য আসে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছেন। উদ্বেগজনক ওই তথ্য স্পর্শকাতর হওয়ায় তার প্রকৃতি সিএনএনের কাছে খোলাসা করা হয়নি।

তবে সূত্র হিসেবে কাজ করা ট্রাম্প প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা বলেছেন, এ তথ্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে আরও সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখার বিষয়ে একমত হন ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলস।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোনে ভ্যান্স বলেন — হোয়াইট হাউস বিশ্বাস করে যে, নাটকীয়ভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধির উচ্চ সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতকে সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য ফোনকলে মোদির প্রতি আহ্বান জানান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি উত্তেজনা হ্রাসে সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করার পরামর্শও দেন তিনি। ফোনকলে মোদির কাছে সমঝোতার এমন একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়, যা পাকিস্তান গ্রহণ করতে পারে বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।

সূত্র বলেছে, ভ্যান্স-মোদির ফোনালাপের পরপরই শুক্রবার রাতভর রুবিওসহ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্য কর্মকর্তারা ভারত ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ চালিয়ে যান।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সমঝোতার খসড়া তৈরিতে সরাসরি যুক্ত ছিল না যুক্তরাষ্ট্র। দুই পক্ষকে আলোচনায় বসানোর ওপরই গুরুত্ব দিয়েছিল তারা। পরে শনিবার বিকেলে যুদ্ধবিরতিতে একমত হয় নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ।

ওয়াশিংটন পোস্টের আরেকটি রিপোর্টে বলা হয় — যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলেন পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিতে। ভ্যান্স মোদিকে একটি সম্ভাব্য ‘প্রস্থান পথ’ প্রস্তাব করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশা করছিলেন যে পাকিস্তানিরাও এই ঝামেলা থেকে বের হয়ে আসতে সম্মত হবে। পরবর্তী ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা উভয় দেশের সমকক্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ চালিয়ে যান।

শনিবার ইসলামাবাদ দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার স্বীকৃতি দেয়। এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির ভিত্তি ছিল দুটি প্রধান বিষয়—এক, গুরুতর যুদ্ধবিস্তার বা সংঘর্ষ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা, এবং দুই, হোয়াইট হাউস প্রশাসনের হস্তক্ষেপ, অর্থাৎ বাইরের চাপে সমাধান।’

তবে ভারতীয় কর্মকর্তারা এই প্রসঙ্গে অনেকটাই নিশ্চুপ ছিলেন। নয়াদিল্লির কয়েকজন বিশ্লেষক প্রকাশ্যে রুবিওর বক্তব্য নিয়ে আপত্তি জানান। রুবিও বলেছিলেন যে, ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে ‘খুঁটিনাটি বিষয়ে আলোচনা’তে রাজি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তা এই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে কারগিল যুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানান এবং ভারত-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।

শনিবার সন্ধ্যায় ভারতীয় গণমাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি জানান — ভারত তার ‘যুদ্ধনীতি পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে’ এবং যদি আরেকটি সন্ত্রাসী হামলা হয়, তাহলে ভারত ‘আরও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ খোলা রাখছে’।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের ক্রিস্টোফার ক্ল্যারির মতে, ‘আমরা হয়তো এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করছি। এর সঙ্গে গত তিন দশকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল যে অবস্থায় আছে তার মিল আছে।’ ক্ল্যারির কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে এর মানে, ভবিষ্যতেও ভারত আর পাকিস্তানের মাঝে অনবরত হামলা ও পাল্টা হামলা চলতেই থাকবে।