স্বর্গদূত বা এঞ্জেল, ধর্মীয় কল্পনায় যাদের স্থান অতি উচ্চ, তাদের কি কোনোভাবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্মে ভূমিকা আছে? এমন প্রশ্ন শুনলে অনেকেই অবাক হবেন। কিন্তু মধ্যযুগীয় দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের কাছে স্বর্গদূত ছিল কেবল আধ্যাত্মিক দূত নয় বরং প্রকৃতির নানা রহস্যের ব্যাখ্যার এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
১২শ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মাইমোনিডিসের মতে, জগতের নানা গতি ও পরিবর্তনের পেছনে ঈশ্বর স্বর্গদূতদের মাধ্যমে কাজ করেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি উল্লেখ করেন ‘lust’-এর জন্য নির্ধারিত এক স্বর্গদূতের কথা, যিনি মানুষের কামাতুরতার শক্তির প্রতীক। অর্থাৎ, অদৃশ্য শক্তি-যেমন চৌম্বকত্ব, মহাকর্ষ বা শক্তি-যেগুলোর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তখনো ছিল না, সেগুলো ব্যাখ্যা করতে স্বর্গদূতের ধারণা ব্যবহার করা হতো।
এই সময়ে বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে পার্থক্য খুব স্পষ্ট ছিল না। প্রকৃতির রহস্য বোঝার জন্য ধর্মীয় ও দার্শনিক ব্যাখ্যা ছিল প্রধান হাতিয়ার। তাই স্বর্গদূতদের মাধ্যমে শক্তি ও প্রভাবের ধারণা অনেক সময় বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হত।
মধ্যযুগীয় দর্শনে স্থান ধারণার গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের পদার্থবিজ্ঞান অনুসারে, স্থান হলো সেই পরিমিতি যেখানে কোনো বস্তু অবস্থান করে। স্থান ও দেহ একে অপরের পরিপূরক; কোনো দেহ ছাড়া স্থান কল্পনা করা যায় না, আবার স্থান ছাড়া দেহও অস্তিত্বহীন। অ্যারিস্টটলের মতে, স্থান ছিল দিকনির্দেশনামূলক-‘উপর’, ‘নিচ’, ‘বাম’, ‘ডান’-এবং বস্তু তার নিজস্ব স্বভাব অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিকে গতি করে।
স্বর্গদূতদের ক্ষেত্রে এই ধারণা একটি বড় প্রশ্ন তোলে। তারা দেহহীন সত্তা, কিন্তু তারা কীভাবে কোনো স্থানে অবস্থান করে? যদি তারা দেহহীন হয়, তাহলে কি তারা স্থান ধারণ করতে পারে? এই প্রশ্ন মধ্যযুগীয় দার্শনিকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
মধ্যযুগীয় প্রধান দার্শনিক টমাস অ্যাকুইনাস স্বর্গদূতের অবস্থান নিয়ে এক অভিনব সমাধান দেন। তিনি বলেন, স্বর্গদূত কোনো শারীরিক অবস্থানে নয়, বরং তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে কোনো স্থানে অবস্থান করে। অর্থাৎ স্বর্গদূত যখন কোনো স্থানে প্রভাব বিস্তার করে, তখনই সে সেখানে অবস্থান করছে। এতে স্বর্গদূত সর্বত্র নয়, বরং সীমিত এবং ঈশ্বরের মতো সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে না।
এই ব্যাখ্যা ছিল একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা, অন্যদিকে যুক্তি ও দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকার প্রয়াস। তবে এই ধারণা পরবর্তীতে বিতর্কের জন্ম দেয়, কারণ এটি স্বর্গদূতের ‘অবস্থান’ নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
১২৭৭ সালে প্যারিসের বিশপ স্টিফেন টেম্পিয়ার ২১৯টি মতবাদ নিষিদ্ধ করেন, যার মধ্যে ২৮টি ছিল স্বর্গদূত নিয়ে। এতে অ্যাকুইনাসের ধারণা-স্বর্গদূত কেবল কার্যকলাপের মাধ্যমে অবস্থান করে-নিষিদ্ধ হয়। প্রশ্ন ওঠে তাহলে স্বর্গদূত যখন কোনো কার্যকলাপ করছে না, তখন কোথায় থাকে? তাদের নিজস্ব সত্তা বা সারবস্তুর ভিত্তিতে স্থান নির্ধারণ করতে হবে, কিন্তু তারা তো দেহহীন! এই সংকট মধ্যযুগীয় চিন্তাবিদদের আরও সৃজনশীল হতে বাধ্য করে। তারা স্থান ও দেহের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা শুরু করে, যা আধুনিক ‘space’ ধারণার সূচনা।
ডান্স স্কোটাস এই সংকট সমাধানে ‘স্থান’ ধারণাকে আরও বিমূর্ত ও গাণিতিক করে তোলেন। তিনি বলেন, স্থান কেবল নির্দিষ্ট অবস্থান নয়, বরং এক ধরনের মাত্রা (dimension)। কোনো বস্তু যখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়, তার ‘place’ অপরিবর্তিত থাকে-কারণ তার মাত্রা অপরিবর্তিত।
স্কোটাসের এই ব্যাখ্যা অ্যারিস্টটলের দিকনির্দেশনামূলক স্থান ধারণাকে ‘নিউট্রালাইজ’ করে, এবং আধুনিক ‘space’ ধারণার জন্ম দেয়, যেখানে ‘উপর’, ‘নিচ’, ‘বাম’, ‘ডান’-এসব বিষয় অন্তর্নিহিত নয়। এটি পরবর্তীতে নিউটনের শূন্য স্থান (absolute space) ও আইনস্টাইনের আপেক্ষিক স্থান (relativity of space) ধারণার জন্য ভিত্তি তৈরি করে।
স্বর্গদূত নিয়ে মধ্যযুগীয় বিতর্কের ধারাবাহিকতা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে স্থান, শক্তি ও কণার ধারণার বিকাশে প্রতিফলিত হয়েছে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে স্থান আর কেবল ‘স্থান’ নয়, বরং সময়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে চার-মাত্রিক স্পেসটাইম তৈরি করে, যা আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বে প্রকাশ পায়।
এছাড়া শক্তি ও প্রভাবের ধারণা-যেমন চৌম্বকত্ব, মহাকর্ষ, নিউক্লিয়ার শক্তি-যা মধ্যযুগে অদৃশ্য ও আধ্যাত্মিক শক্তি হিসেবে স্বর্গদূতের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হত, আজকের বিজ্ঞানে পরমাণু ও কণা পদার্থবিজ্ঞানের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়।
স্বর্গদূত নিয়ে মধ্যযুগীয় বিতর্ক কেবল ধর্মীয় কল্পনা নয়, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ধারণার জন্মেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থান, দেহ, গতি-এসব ধারণা নিয়ে যে বিতর্ক ও চিন্তা হয়েছে, তা-ই আজকের বিজ্ঞানের ভিত্তি। স্বর্গদূতদের নিয়ে ভাবনা আমাদের দেখায়, কল্পনা ও যুক্তি মিলে কীভাবে জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
মধ্যযুগীয় দার্শনিকরা যখন স্বর্গদূতদের অস্তিত্ব ও গতি নিয়ে চিন্তা করতেন, তখন তারা প্রকৃতপক্ষে স্থান, শক্তি ও পদার্থের প্রকৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছিলেন। এই প্রশ্নগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে। তাই বলা যায় স্বর্গদূত থেকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান-এটি এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহাসিক ও দার্শনিক যাত্রা।
আধ্যাত্মিকতা থেকে পদার্থবিজ্ঞান
মাহফুজ আলম কেন টার্গেট : খান মো. রবিউল আলম , যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক
” … সম্প্রতি ফেসবুকে মাহফুজ আলমের এক পোস্টকে ঘিরে নানা রকম বাদানুবাদ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে জীবননাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। … মাহফুজ আলম গণ-অভ্যুত্থানের একজন অগ্রগামী চিন্তক। জুলাই–পরবর্তী সময়ে তিনিসহ আরও অনেকে ‘অন্তর্ভুক্তি’র কথা বলছেন। বিভিন্ন মত ও পথ মিলিয়ে অভিন্ন নিশানা নির্মাণ করতে চান। তাঁর এ চিন্তা ও প্রকাশ মূলত তাঁকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। অনেকে তাঁকে গ্রহণ করতে পারছেন না।
… সম্প্রতি তিনি বলছেন, সবার জন্য দেশ। তাঁর এ প্রস্তাবনায় রাষ্ট্র বোঝার আধুনিক মনোভঙ্গি পাওয়া যায়। রাষ্ট্র মানুষের এক বড় সৃষ্টি। রাষ্ট্র যে সবার, সেই স্পষ্টতাও খুব জরুরি; আরও জরুরি রাষ্ট্র একটি পার্থিব বা ইহজাতিক প্রতিষ্ঠান, তা বোঝা।
রাষ্ট্র এজমালি সম্পত্তি। এর ওপর কোনো দল, মত বা আদর্শের পোশাক পরানো অন্যায্য। এ জন্য মাহফুজ আলম বাইনারি ভাঙতে চেয়েছেন—বাম-ডান, ধর্মনিরপেক্ষতা-ধর্মপ্রবণতা, বাঙালি-বাংলাদেশি। একাত্তর ও চব্বিশের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার মিশেলে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির পাটাতন স্থির করতে চান।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, এ সমাজের পরতে পরতে গড়ে উঠেছে, আদর্শিক ও মতাদর্শিক বিভক্তি, যা ইট-সিমেন্টের মতোই শক্ত। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণে একদল বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিশ্রুতিশীল সঙ্গী পাওয়া সহজ কাজ নয়। ফলে মনে হতে পারে মাহফুজ আলমের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, বোঝাপড়া ও রাজনৈতিক দর্শন তাঁকে নিঃসঙ্গতার দিকে নিয়ে যাবে, তিনি হয়তো সংকটে পড়বেন।
এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আদর্শকেন্দ্রিক অনড় ও অনমনীয় বিশ্বাস। তথাকথিত আদর্শভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের বোধ। … আপাত মনে হতে পারে, মাহফুজ আলমের সতীর্থ ও সহযোগীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বুকে ধারণ করেন। কিন্তু তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা অত সহজ নয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন ধারণ করছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। যমুনার সামনে ও শাহবাগে সম্প্রতি সমাবেশে অংশগ্রহণকারীর ধরন ও স্লোগান সেই প্রশ্ন জোরালো করে তুলছে।
… এনসিপি একটি কথক ও গলাসর্বস্ব শ্রেণি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের প্রকাশের ক্ষুধা তীব্র।…এনসিপির নেতাদের মধ্যে রাত জেগে টক শোতে অংশ নেওয়া এবং ফেসবুকনির্ভর প্রকাশের প্রাবল্য দেখা যাচ্ছে। মাহফুজ আলম গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে চিন্তার অন্যতম প্রধান আধার হয়ে উঠেছিলেন। এখন তাঁর চিন্তাধারা এনসিপির চিন্তার সঙ্গে কতটা মিলছে, তা পরিষ্কার নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঘিরে এক অযৌক্তিক কর্তৃত্বের বিকাশ ঘটেছে। ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবীরা আড়ালে চলে যাচ্ছেন। ফেসবুক ও ইউটিউবকেন্দ্রিক নতুন ইনফ্লুয়েন্সার শ্রেণির উত্থান দেখা যাচ্ছে। এ শ্রেণি হলো আনসেন্সরড ও আনএডিডেট, সেলফ রেগুলেটেড কর্তৃত্ব। তারা সত্য-অসত্যের মিশেলে ভাষ্য ও বয়ান হাজির করছে।…অসত্য, ঘৃণা আর ক্লেদ তাদের কাঁচামাল।
… লি ম্যাকেনটায়ার তাঁর পোস্ট ট্রুথ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, উত্তর-সত্য দুনিয়ায় মানুষ কঠিন সত্যের তুলনায় স্বস্তিদায়ক মিথ্যা শুনতে পছন্দ করে।…যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক ব্যক্তি কর্তৃত্ববাদ নতুন প্রবণতা। কারণ, এখন সবার নিজস্ব সত্য তৈরি হয়েছে, আপাত মনে হচ্ছে সাধারণ কোনো সত্য নেই।
মাহফুজ আলম যে সাধারণ সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, তা ব্যক্তির একান্ত সত্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় ‘অন্তর্ভুক্তি’র সিমেন্টিং সহজ নয়।…শেখ হাসিনার পতনের পর অনেকে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন। গণ-অভ্যুত্থানের অভিন্ন স্পিরিট সর্বজনীন স্পিরিটে দানা বাঁধছে না।
… মাহফুজ আলম যে নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে পারেন, তাঁর কিছু উপলক্ষ্য দেখা যাচ্ছে। মাহফুজ আলমকে ঘিরে প্রত্যাখ্যানের পরিধি বাড়ছে।…সংকট যত গভীর হোক, পিছপা হওয়া যাবে না। অন্তর্ভুক্তির পথেই তাঁকে হাঁটতে হবে। মানবিক, জনকল্যাণমূলক ও কার্যকর রাষ্ট্র বিনির্মাণে ‘অন্তর্ভুক্তি’ দর্শন ছাড়া উন্নত কোনো বিকল্প দেখি না।”
জাপানের স্বাস্থ্যখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিকতার দ্বন্দ
জাপান বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি দেশ, যেখানে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। জনবল সংকট ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তে থাকা চাপ মোকাবেলায় দেশটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারকে ভবিষ্যতের অন্যতম সমাধান হিসেবে দেখছে। তবে চিকিৎসা খাতে এআই ব্যবহারে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জাপানের কঠোর গোপনীয়তা আইন ও সমাজের গভীর সংস্কৃতিক বোধ। এ প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তির সম্ভাবনা এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্বে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি জাপান।
জাপানে প্রযুক্তি জগতের প্রভাবশালী উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন—এআই স্বাস্থ্যখাতকে পুরোপুরি পাল্টে দিতে পারে। রিমোট ডায়াগনোসিস, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরামর্শ, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্য সাপোর্টেও এআই-এর অবদান হতে পারে বিপ্লবাত্মক। ইতোমধ্যে কিছু হাসপাতাল সীমিত পর্যায়ে এআই-ভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ (image recognition) ও রোগের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো প্রযুক্তি প্রয়োগ শুরু করেছে।
বিশেষ করে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা, যেমন ডিমেনশিয়া বা স্ট্রোক-পরবর্তী পুনর্বাসনে এআই খুবই কার্যকর হতে পারে। একাধিক রোবোটিক সিস্টেম ইতোমধ্যে বৃদ্ধদের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জাপানে ব্যক্তিগত তথ্য, বিশেষ করে চিকিৎসা সম্পর্কিত তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত। জাপানের “Act on the Protection of Personal Information (APPI)” আইনটি ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে রোগীর সম্মতি ছাড়া তথ্য ব্যবহার প্রায় অসম্ভব।
জাপানি সংস্কৃতিতে “গোপনীয়তা” শুধুই আইনি বিষয় নয়, এটি ব্যক্তিসত্তার একটি মৌলিক মানদণ্ড। কোনো প্রযুক্তি যদি ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা অতিক্রম করে, তবে তা সামাজিকভাবে স্বীকৃত না-ও হতে পারে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এআই প্রযুক্তি আনলেও তা ব্যবহার করতে গড়িমসি করছে।
বর্তমানে আইনজীবী, চিকিৎসাবিদ ও প্রযুক্তি নীতিনির্ধারকেরা একসঙ্গে বসে আইনি কাঠামোর আধুনিকীকরণ নিয়ে আলোচনা করছেন। তাদের পরামর্শ, একটি কেন্দ্রীয় ডেটা-শেয়ারিং ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা উচিত—যেখানে রোগীর সম্মতিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে, কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণেও কিছু সীমিত স্বাধীনতা থাকবে।
তবে এই প্রস্তাবেরও বিরোধিতা রয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, একবার তথ্য ব্যবহারের নিয়ম শিথিল হলে তা একপ্রকার “নজরদারি চিকিৎসা” (surveillance medicine)-এর দিকে ধাবিত হতে পারে, যেখানে প্রযুক্তি ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে খর্ব করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে এআই ব্যবহারে একটি “সম্মতিভিত্তিক নৈতিক কাঠামো” তৈরি করতে হবে। যেমন—রোগীকে আগে থেকেই জানাতে হবে তাদের তথ্য কীভাবে, কোথায় এবং কেন ব্যবহার করা হবে। এছাড়া ডেটা অ্যানোনিমাইজেশন (ব্যক্তিগত পরিচয় মুছে ফেলা) ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এছাড়া সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধিও প্রয়োজন। অনেকেই এআই-কে এখনো অবিশ্বাসের চোখে দেখেন। এর ব্যবহার, নিরাপত্তা ও উপকারিতা নিয়ে ব্যাপক জনগণমন্থন প্রয়োজন।
জাপান এ মুহূর্তে দ্বিধার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—একদিকে প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে গোপনীয়তার নৈতিক গণ্ডি। তবে সঠিক নীতিমালা ও জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে এআই-কে স্বাস্থ্যখাতে সুফলদায়কভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। জাপানের এই দৃষ্টান্ত হয়তো গোটা বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠবে—যেখানে প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে আগামী দশকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্বের পরিধি ও মেয়াদ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে : মাহফুজ আনাম , সম্পাদক ও প্রকাশক , দ্য ডেইলি স্টার
“দমন-পীড়নকারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোর পর আমাদের উচিত ছিল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, সব ধরনের বৈষম্যের অবসান ঘটানো, দেশে সৎ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা স্থাপন করা, স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গঠন করা এবং এমন আরও অনেক পরিবর্তন আনা।
কিন্তু, আমরা কি তা করছি? … গণতন্ত্র আমাদের মূল লক্ষ্য বলে আজ আর মনে হচ্ছে না। কারণ, তেমনটা হলে আমরা কি নির্বাচন নিয়ে আরও বেশি আলোচনা করতাম না?
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বারবারই নির্বাচনের সম্ভব্য সময়সীমা বলছেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে। শুরু থেকেই তিনি এটা বলছেন। যদি তার মনে হয় জুনে নির্বাচন আয়োজন করা ভালো হবে, তাহলে সেটিই স্পষ্ট করা উচিত এবং সেই অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া উচিত।
নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে এই অহেতুক বিতর্কের এখন অবসান হওয়া উচিত। কেননা, এই বিতর্কের কারণে সেই মানুষটার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, যাকে আমরা শ্রদ্ধা করি, যার ওপর ভরসা করি। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বিশেষ করে তখন, যখন এটা পরিষ্কার যে তার মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য ক্ষমতায় আরও সময় থাকতে চায় এবং সেজন্যই সংস্কারকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচন পেছাতে চাইছে।
… গত ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ছয়টি প্রধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এরপর পেরিয়ে গেছে চারটি মাস। এতদিনেও কি আমাদের কাছে ঐকমত্যে পৌঁছানো সংস্কারের বিষয়ে পরিষ্কার চিত্র থাকা উচিত ছিল না?…সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সরাসরি নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত। যার কারণে ঐকমত্যের ক্ষেত্রে এমন ধীরগতি অস্বস্তিকর সব প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারকে তাদের দায়িত্বের পরিধি ও মেয়াদের স্থিতিশীলতা সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। তাদের দায়িত্ব ছিল সংস্কার বাস্তবায়ন এবং দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে শাসনভার তুলে দেওয়া।…কিন্তু, মেয়াদ সম্পর্কে এই সরকারের যতটা সচেতন হওয়া উচিত ছিল, ততটা আছে বলে মনে হচ্ছে না।
… ড. ইউনূস কি এই বৈচিত্র্যময় ও ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, অনেক ক্ষেত্রে সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতাহীন মানুষদের নিয়ে সীমাবদ্ধ সময়ে সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে গঠিত তার সরকার চালাতে পারবেন?…যেকোনো সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল খুললেই দেখা যাবে, নগর জীবন কতটা অনিশ্চিত ও অসাধ্য হয়ে উঠেছে এবং গ্রামীণ জীবন কতটা অনিরাপদ হয়ে গেছে।
… আমাদের মনে হয়, বর্তমান বাস্তবতা এবং সরকারের দৈনন্দিন বিষয়াদি, বিশেষ করে আইন ও শাসন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতাই আমাদের উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।
অবস্থা দৃষ্টে প্রতীয়মান হচ্ছে যে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত মর্যাদা, সুপরিচিত দেশপ্রেম, তার প্রতি জনগণের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার প্রতি বিশ্বাসের কারণেই এতসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে পারছে। কিন্তু, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে না। আমাদের সর্বোত্তম বিকল্প হলো নির্বাচিত সরকার গঠন করে গণতন্ত্রের যাত্রা পুনরায় শুরু করা, সেটা যেমনই হোক না কেন।
আমরা জানি, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিকতা ও জনগণের সেবা করার দক্ষতা নিয়ে অনেক সন্দেহ রয়েছে। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও আমরা সন্দিহান। কারণ, অতীতে তারা চাঁদ হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে কিছুই করেনি। কিন্তু তারপরও জনপ্রতিনিধি জনগণের ভোটে নির্বাচিত করতে হবে।
কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির মর্যাদা ও তার প্রতি আস্থার ভিত্তিতে একটি অনির্বাচিত সরকারকে টিকিয়ে রাখা কোনো জাতির জন্য অগ্রসর হওয়ার পথ হতে পারে না এবং ড. ইউনূসের মতো একজন মানুষের এমন কোনো অবস্থান দীর্ঘদিন সমর্থন করা উচিত না। “
হিমালয়ের হিমবাহ গলতে থাকায় , পরিবেশ সম্মেলনের আয়োজন করেছে নেপাল
আজ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শুরু হয়েছে এক উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন, যার মূল প্রতিপাদ্য—“জলবায়ু পরিবর্তন, পর্বতমালা ও মানবতার ভবিষ্যৎ”। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে হিমালয়ের গলতে থাকা তুষার ও বরফ, তার ফলে সৃষ্টি হওয়া বিপর্যয় এবং বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে এক গভীর বার্তা দেন: “পর্বত রক্ষা মানে পৃথিবী রক্ষা, পর্বত রক্ষা মানে সাগর রক্ষা, আর পর্বত রক্ষা মানেই মানবতা রক্ষা।” এই বক্তব্য শুধু একটি আবেগপ্রবণ আহ্বান নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির বাস্তব অবস্থা ও পর্বতময় দেশগুলোর চরম ঝুঁকির প্রতিফলন।
নেপাল পৃথিবীর আটটি সর্বোচ্চ পর্বতের আবাসভূমি, যার মধ্যে এভারেস্ট সর্বোচ্চ। তবে এই গৌরব আজ এক অভিশাপে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের গ্লেশিয়ার গলছে অভূতপূর্ব হারে, যার ফলে তুষারহীন হয়ে পড়ছে পর্বতচূড়া, উন্মুক্ত হচ্ছে দুর্বল পাথুরে স্তর এবং বাড়ছে ভূমিধস, পাথরঝরার ও হঠাৎ হিমপ্রপাতের ঝুঁকি।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, আগামী কয়েক দশক কিংবা শতাব্দীতে যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে হিমালয়ের গ্লেশিয়ারের ৮০% পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এটি শুধু পর্বতের জন্য নয় বরং উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এক বিপর্যয়কর ভবিষ্যতের বার্তা বহন করছে। হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোই দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান পানিস্রোত, যা কৃষি, জীবনধারা এবং বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেবা সম্মেলনে বলেন, “বিষাদের বিষয় হলো, হিমালয় এখন এক নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। এটি শুধু আমাদের পর্বত বাস্তুতন্ত্রের ভঙ্গুরতা নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমের ব্যর্থতাও উদঘাটন করছে।”
তিনি আরও বলেন, “নেপালের মতো একটি পার্বত্য দেশ, যেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে আছে, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এক কঠিন বাস্তবতা।”
দেবা স্মরণ করিয়ে দেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেপাল চরম আবহাওয়ার একের পর এক ধাক্কা খেয়েছে। হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, আকস্মিক বন্যা, খরা, পানির ঘাটতি ও বনের আগুনে বিপর্যস্ত হয়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর নেপালের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই সম্মেলনে ভারতের, ভুটানের ও মালদ্বীপের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। অঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য এ সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। আয়োজকরা আশা করছেন, রবিবার আলোচনা শেষে “কাঠমান্ডু ঘোষণা” প্রকাশ করা হবে, যাতে বৈশ্বিক এবং স্থানীয় স্তরে জলবায়ু কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার অঙ্গীকার থাকবে।
এই সম্মেলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়,এটি এখনকার বাস্তবতা। হিমালয়ের পর্বত, যেগুলো হাজার বছর ধরে আমাদের কল্পনা, নদী ও জীবনধারার উৎস ছিল, আজ তারা নিজের অস্তিত্বের জন্য আর্তনাদ করছে। এখনই যদি আমরা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ না নিই, তবে পরবর্তী প্রজন্ম শুধু বরফহীন পর্বতই নয়, শুষ্ক নদী ও ভগ্ন পৃথিবী উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে।
গাজা গণহত্যার প্রতিবাদ – সিনেট থেকে বহিষ্কার হলেন , মার্কিন উদ্যোক্তা
গাজায় চলমান হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে মার্কিন সিনেটের এক শুনানি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে আইসক্রিম কোম্পানি বেন অ্যান্ড জেরির সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রবীণ প্রগতিশীল অ্যাকটিভিস্ট বেন কোহেনকে। ঘটনার পর কোহেন এএফপিকে বলেন, তিনি ‘গাজায় নৃশংসতার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ লাখো আমেরিকানের’ কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরেছেন।
৭৪ বছর বয়সী স্বনামধন্য উদ্যোক্তা কোহেন বুধবার আমেরিকার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটের একটি বাজেট শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। শুনানিতে ট্রাম্প সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র তার দপ্তরের বাজেট প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি দিতে শুরু করলে কোহেনসহ উপস্থিত জনতার একটি অংশ এতে বাধা দেন এবং প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘কংগ্রেস ওইসব বোমার অর্থায়ন করে, যেগুলো ব্যবহার করে গাজায় শিশুদের হত্যা করা হয়, কিন্তু একইসঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত স্বাস্থ্য বীমা কর্মসূচি মেডিকএইডের বরাদ্দ কমিয়ে দেয়।’
ক্যাপিটল পুলিশের হাতে হ্যান্ডকাফ পরার আগমুহূর্তে তিনি আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘ক্ষুধার্ত শিশুদের খাবার পৌঁছাতে ইসরাইলের ওপর চাপ দিন।’ পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়ার পর এএফপিকে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে আমাদের কিছু একটা করতেই হতো। এটা একেবারেই কেলেঙ্কারিকর যে যুক্তরাষ্ট্র সামাজিক সুরক্ষা খাত সংকুচিত করে ইসরাইলের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র অনুমোদন করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ আমাদের দেশের নাম ব্যবহার করে, আমাদের অর্থ দিয়ে যা করা হচ্ছে তা ঘৃণা করে।’ তবে ব্যয় পরিকল্পনার বাইরেও কোহেন পুরো বিষয়টিকে নৈতিক ও ‘আত্মিক’ সংকট হিসেবে দেখেন।
‘হাজারো মানুষকে নির্বিচারে হত্যার বিষয়টিতে নিরব সমর্থন জানানো ও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়া আমাদের মানবিক অস্তিত্ব এবং দেশের নীতিগত অবস্থানের মূলকে নাড়া দেয়’, যোগ করেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার উন্মুক্ত বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি অংশ যুদ্ধ খাতে ব্যয় করে। যদি এর অর্ধেকটাও বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে ব্যবহার করা হতো, তাহলে বিশ্বে এত সংঘাত থাকত না।’
বেন কোহেন আরো বলেন, ‘যদি কয়েকটি দেশের মধ্যে সমস্যা থাকে, তাহলে আপনাকে হত্যাযজ্ঞে না জড়িয়ে সেই সমস্যার সমাধান করতে হবে’। ইসরাইলি নীতির দীর্ঘসময়ের সমালোচক কোহেন গত বছর ইসরাইলপন্থী লবিগ্রুপ এআই প্যাকের বিরুদ্ধে একটি খোলা চিঠিতে অন্যান্য প্রখ্যাত ইহুদি ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে স্বাক্ষর করেন।
গাজা সংকট নিয়ে – ‘কান চলচ্চিত্র উৎসবের’ , তীব্র সাহসী প্রতিবাদ
২০২৫ সালের ৭৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসব শুধু বিশ্বসেরা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মঞ্চই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিবাদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এবারের উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা, প্রযোজক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তারা বিভিন্ন উপায়ে গাজার সংকটের প্রতি সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন এবং মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন।
সবচেয়ে আলোড়ন জাগানো ঘটনা ছিল ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক ফাতিমা হাসসুনার স্মরণ। তিনি গাজা পরিস্থিতি নথিভুক্ত করছিলেন একটি ডকুমেন্টারির মাধ্যমে, যার নাম ছিল “Put Your Soul on Your Hand and Walk”। এটি উৎসবের একটি স্বতন্ত্র বিভাগ ACID-এ নির্বাচিত হয়েছিল।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে ১৬ এপ্রিল গাজায় একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন হাসসুনা। এই হত্যাকাণ্ড কেবল একজন শিল্পীর মৃত্যু নয়, বরং তা ছিল তথ্য, চিত্র ও সত্যের ওপর সরাসরি আঘাত। উৎসব আয়োজকরা তার স্মরণে বিশেষ শোকবার্তা দেন এবং ডকুমেন্টারিটি তার মৃত্যুর মাত্র এক মাস পর কান উৎসবে প্রদর্শিত হয়—ফ্রান্সের নীল সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে গাজার ধ্বংসস্তূপের ছবি তুলে ধরার এই মুহূর্ত ছিল এক ঐতিহাসিক প্রতিবাদ।
ইরানের পরিচালক সেপিদে ফারসি গাজার মানবিক সংকট তুলে ধরতে ‘পুট ইওর সোল অন ইওর হ্যান্ড অ্যান্ড ওয়াক’ নামক তথ্যচিত্রটি নির্মাণ ও প্রদর্শন করেছেন। এই তথ্যচিত্রে বোমাবর্ষণে ধ্বংসস্তূপের মাঝে জীবন যাপন করা গাজার মানুষের কষ্টের চিত্রায়ন করা হয়েছে। সেপিদে ফারসি বলেন, “আমার কাজ শুধু ছবি তোলা নয়, বরং মানবতার জন্য একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া।” তার এই কাজ কান উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
রবার্ট ডি নিরো তার বক্তব্যে বলেন, “মানবতার প্রতি এই আক্রমণ কখনোই অগ্রাহ্য করা যাবে না। আমাদের শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব হলো নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা।” তিনি গাজার বোমাবর্ষণের নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় ভূমিকা নিতে আহ্বান জানান।
লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও বলেন, “শান্তি ও ন্যায়বিচারের পক্ষে আমাদের সবাইকে দাঁড়াতে হবে। গাজার নিরীহ মানুষদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করা অপরিহার্য।” তিনি সামাজিক মাধ্যমে গাজার পরিস্থিতি তুলে ধরে বিশ্ববাসীকে সচেতন করেছেন।
নাতালি পোর্টম্যান তার বক্তব্যে বলেন, “শিল্পীরা নীরব থাকলে অন্যায় বাড়বে। আমাদের অবশ্যই মানবাধিকার রক্ষায় সাহসী হতে হবে।” তিনি কান উৎসবের মঞ্চ থেকে ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতির আহ্বান জানান।
স্কারলেট জোহানসনও ফিলিস্তিনের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করেছেন এবং বলেন, “মানবতার জন্য আমাদের একসাথে কাজ করা উচিত।”
কান উৎসবে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৩৫০ জন প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা এক যৌথ বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তারা ইজরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “আমরা গাজার নিরীহ মানুষের প্রতি আমাদের সহানুভূতি জানাই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানাই।” এই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা মানবাধিকার রক্ষায় নীরব থাকবেন না এবং সাংস্কৃতিক মঞ্চ থেকে এই সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবেন।
ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী রচিদা দাতি কান উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির বিষয়ে বলেন, “রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক নতুন নয়। যখন সৃজনশীলতার ওপর আক্রমণ হয়, তখন শিল্পীর স্বাধীনতার প্রতি আমাদের বিশ্বাস অপরিহার্য।” তিনি আরও বলেন, “ফিলিস্তিনের সংকটের আলোকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাংস্কৃতিক মুক্তি ও মানবাধিকার পরস্পরের পরিপূরক।”
কান উৎসবের সময় সামাজিক মাধ্যমে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রচার ব্যাপক হয়। হাজার হাজার মানুষ টুইটার, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনেতা ও সাধারণ মানুষ ফিলিস্তিনের সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
বিশেষ করে #StandWithPalestine, #SaveGaza, এবং #CannesForPalestine হ্যাশট্যাগগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা কান উৎসবের মঞ্চ থেকে উঠে আসা মানবিক বার্তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
কান উৎসবের আয়োজকরা ফিলিস্তিনের সংকটের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে বিশেষ সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। যেখানে ফিলিস্তিনের পরিস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই সেমিনারে বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, মানবাধিকার কর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অংশগ্রহণ করেন এবং বিশ্বকে সচেতন করার জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
কান উৎসবে অংশগ্রহণকারী ফিলিস্তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাদের কাজের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তারা গাজার মানুষের জীবনযাত্রার কাহিনী, যুদ্ধের প্রভাব এবং প্রত্যাশার গল্প বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।
ফিলিস্তিনি পরিচালক আমজাদ আবু আলি বলেন, “আমাদের কাজ শুধু গল্প বলা নয়, বরং আমাদের মানুষের কষ্ট ও আশা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা।” তার এই বক্তব্য কান উৎসবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির একটি প্রাণবন্ত উদাহরণ।
২০২৫ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসব ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তথ্যচিত্র নির্মাতা সেপিদে ফারসির মানবিক কাজ থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো, লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও, নাতালি পোর্টম্যানের সরাসরি প্রতিবাদ, প্রযোজক ও পরিচালকদের যৌথ বিবৃতি, ফরাসি সংস্কৃতিমন্ত্রীর সাংস্কৃতিক সমর্থন এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া-এসব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী মানবিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
এই উদ্যোগ শুধু ফিলিস্তিনের সংকটকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এনেছে না, বরং বিশ্ববাসীর মধ্যে মানবাধিকার ও শান্তির প্রতি সচেতনতা ও সহানুভূতি বৃদ্ধি করেছে। কান উৎসবের এই বার্তা স্পষ্ট – শিল্প ও সংস্কৃতির শক্তি দিয়ে আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে একত্রিত হতে পারি। ফিলিস্তিনের প্রতি এই সংহতি শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ নয়, এটি মানবতার জয় এবং শান্তির পথে এক নতুন আশা।
ধারের টাকায় মেগা প্রকল্প , হাতে নেওয়া হবে না
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ধার করে টাকা এনে তা দিয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতি নেওয়া হবে না।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট বর্তমান বাজেটের চেয়ে আকারে ছোট হবে কিনা, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি অর্থ উপদেষ্টা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সময় পাস হওয়া চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে ব্যয়ের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্য ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ‘বাজেট কেমন হবে সময় হলেই জানতে পারবেন। মোটামুটি বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি আমরা রাখব না। বাস্তবসম্মত এডিপি বাস্তবায়ন করব। ধার করে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করব না। বাজেটে কিছুটা ঘাটতি তো থাকবেই। কিন্তু ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিয়ে এবং টাকা ছাপিয়ে আমরা বাজেট বাস্তবায়ন করতে যাব না।’
থিওসফি – আত্মার উপনিবেশ ও গোপন সাম্রাজ্যচিন্তা
১৮৭৫ সালের নিউ ইয়র্কে এক অদ্ভুত সন্ধ্যায় জন্ম নেয় এক আধ্যাত্মিক সংগঠন—The Theosophical Society। এই সংগঠনের পেছনের রহস্যময় নারীটি ছিলেন Helena Petrovna Blavatsky, যাঁকে অনেকে আধ্যাত্মিক বিপ্লবের দূত মনে করতেন, আবার কেউ কেউ মনে করতেন একজন অতিচতুর প্রতারক।
কিন্তু থিওসফি কেবল একটি আধ্যাত্মিক চর্চা নয়, এটি ছিল একধরনের গ্লোবাল আন্দোলন, যেখানে পুঁজি, ঔপনিবেশিকতা এবং পূর্ব-পশ্চিমের সংঘাত মিলে এক অদ্ভুত দার্শনিক ভূত তৈরি করেছিল।
Blavatsky ও তার সহযাত্রী Henry Steel Olcott থিওসফি প্রতিষ্ঠার সময় তিনটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। মানবজাতির সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব গঠনের প্রচেষ্টা, ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের তুলনামূলক অধ্যয়ন, প্রকৃতির গোপন নিয়ম এবং মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির অনুসন্ধান।
এই তিন উদ্দেশ্যের আড়ালে ছিল এক রহস্যময় ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব, যার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিকতা ও হরমেটিক ধারার মিশ্রণ।
মাদাম ব্লাভাটস্কি দাবি করতেন তিনি তিব্বতের এক গোপন ‘মাস্টার’ বা ‘মহাত্মা’-দের থেকে জ্ঞানের বার্তা পাচ্ছেন। এই গুরুরা ‘আদি-জ্ঞান’ (Esoteric Wisdom) রক্ষাকারী এক অতীন্দ্রিয় সংগঠন। তাঁর লেখা The Secret Doctrine এবং Isis Unveiled বইগুলোয় এই গোপন জ্ঞান একধরনের বৈশ্বিক আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৮৭৯ সালে Blavatsky ও Olcott ভারতে পা রাখেন এবং Adyar-এ গড়ে তোলেন Theosophical Society-এর আন্তর্জাতিক সদর দফতর। এখান থেকেই থিওসফি রূপ নিতে থাকে একধরনের ‘ঔপনিবেশিক আধ্যাত্মিকতা’য়। ব্রিটিশ রাজের সময় ভারতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংকট চলছিল। থিওসফি একদিকে হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে তা পুনর্মূল্যায়নের কথা বলে, কিন্তু অন্যদিকে এটি ছিল একধরনের সাংস্কৃতিক পুনর্নির্মাণ, যেখানে পশ্চিমা দর্শনের ফ্রেমে প্রাচ্যের জ্ঞানকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ Gauri Viswanathan এই প্রবণতাকে বলেন “Spiritual Imperialism”—আত্মার উপনিবেশ। Blavatsky-এর মৃত্যুর পর থিওসফির নেতৃত্বে আসেন Annie Besant—এক ব্রিটিশ নারীবাদী, সমাজতন্ত্রী এবং পরে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেত্রী। তিনি থিওসফিকে যুক্ত করেন শিক্ষা ও রাজনৈতিক জাগরণের সঙ্গে। বেথুন স্কুল, সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ, এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভূমিকা থিওসফিকে করে তোলে একধরনের আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
তিনি দাবি করেন, ভারতীয় আত্মা আবার জাগছে এবং থিওসফি তার মাধ্যম। কিন্তু এই ‘আত্মা’ কতটা ভারতীয়, আর কতটা Blavatsky ও Besant-এর নির্মিত এক আদর্শ ভারত? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় থিওসফির জটিলতা!
দ্যোতিত আত্মা না কি বর্ণবাদী গন্ধ?
Blavatsky-এর রচনায় ‘Root Races’ বা মূলে থাকা মানবজাতির বিভিন্ন পর্যায়ভিত্তিক বিবর্তন তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে Aryan Race ছিল উন্নততর স্তরের প্রতিনিধি। যদিও থিওসফি সরাসরি জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেনি, কিন্তু এই ‘আধ্যাত্মিক বিবর্তন’ তত্ত্ব পরবর্তীতে কিছু নাৎসি চিন্তকের কাজেও প্রভাব ফেলেছিল বলে ইতিহাসবিদ Nicholas Goodrick-Clarke মত দিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠে—এই থিওসফি কি শুধুই এক আধ্যাত্মিক আন্দোলন, না কি এটি ছিল ছদ্ম-গুপ্তধর্মের মোড়কে এক প্রকার বুদ্ধিদীপ্ত বর্ণবাদ? সব মিলে থিওসফি সরাসরি কোনো মূলধারার ধর্ম হয়ে ওঠেনি, তবে নিউ এইজ আন্দোলন, অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন, রেইকি এবং ‘অকুল্ট’ চর্চার জগতে থিওসফির স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। এমনকি আজকের আত্মোন্নয়নমূলক দর্শনেও এই অতীন্দ্রিয় আবহ পাওয়া যায়।
তবে সমালোচকরা একে বলেন, “একটি ইউরোসেন্ট্রিক আধ্যাত্মিক উগ্রতাবাদ”। কারণ এটি প্রাচ্যের জ্ঞানকে নিজেদের সাংস্কৃতিক ফ্রেমে পুনঃনির্মাণ করে একধরনের ‘exotic mysticism’ হিসেবে বাজারজাত করেছে।
থিওসফি কেবল দর্শনের ইতিহাস নয়, এটি এক আত্মিক ভূতের গল্প—যেখানে আত্মা, ঔপনিবেশিকতা, শ্রেষ্ঠত্ববোধ এবং রহস্য এক সাথে মিলে গড়ে তোলে এক আংশিকভাবে সত্য, আংশিকভাবে মনগড়া এক পরাবাস্তব জগত।
একটা প্রশ্ন রেখে শেষ করা যাক, যদি আত্মা আদতে অদৃশ্য, চিরন্তন ও সার্বজনীন হয়, তবে তার ওপর জাতি, শ্রেণি, সভ্যতা, কিংবা পশ্চিমা কাঠামোর ছায়া কতটা পড়া উচিত?
ক্যান্সার সারাতে আসছে , ব্যক্তিকৃত ‘mRNA’ টিকা
এক সময় ক্যান্সারের জন্য টিকা কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মনে হতো। ছিলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অলীক স্বপ্ন। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবের দোরগোড়ায়। এর পেছনে বড় অবদান রাখছে mRNA প্রযুক্তি, যেটি কোভিড-১৯ টিকা তৈরির ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।
এই একই প্রযুক্তি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক নতুন বিপ্লবের সম্ভাবনা তৈরি করেছে—ব্যক্তিকৃত ক্যান্সার টিকা। অর্থাৎ প্রতিটি রোগীর শরীর ও টিউমারের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি করা হবে আলাদা টিকা, যা রোগীর দেহকে শিখিয়ে দেবে কীভাবে সেই নির্দিষ্ট ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।
এই পদ্ধতিতে প্রতিটি রোগী পাবে একেবারে নিজের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা প্রতিরোধ ব্যবস্থা। ইউকে-র এনএইচএস (NHS)-এর অনকোলজিস্ট লেনার্ড লি এই পরিবর্তনকে বলেছেন কোভিডের “সিলভার লাইনিং”—অর্থাৎ মহামারির একটি অপ্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব।
কোভিড-১৯-এর সময় বিশ্বজুড়ে mRNA টিকা যেভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, তাতে চিকিৎসাবিদরা বুঝে গেছেন এই প্রযুক্তি শুধু ভাইরাসের বিরুদ্ধেই নয়, আরও জটিল রোগের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে।
ক্যান্সার টিকা কীভাবে কাজ করে?
mRNA টিকা মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমকে শেখায় কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ধরনের কোষকে চিহ্নিত করে আক্রমণ করতে হয়। ঠিক যেমনটি হয়েছে কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে। এখন গবেষকরা সেই একই মডেল ব্যবহার করে ক্যান্সারের কোষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছেন। তবে এখানে বিশেষত্ব হলো প্রতিটি টিকা হবে রোগীর টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটাই একে “ব্যক্তিকৃত” করে তোলে। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, বেশ কিছু পরীক্ষামূলক ট্রায়াল আগেভাগেই শেষ হয়ে গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে টিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুধু দ্রুত নয়, সফলতাও দিচ্ছে।
লেনার্ড লি ও তার দল আশা করছেন ২০২৫ সালের মধ্যেই প্রথম অনুমোদিত ব্যক্তিকৃত mRNA ক্যান্সার টিকা বাজারে আনতে পারবেন। এটি সফল হলে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হবে। যেখানে রোগ নির্ণয়ের পর শুধুমাত্র ওষুধ বা কেমোথেরাপি নয়, থাকবে একজন ব্যক্তির শরীর অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রতিষেধক টিকা—একেবারে নিখুঁত, লক্ষ্যে সঠিক ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম।
এই নতুন সম্ভাবনা শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য নয়, মানবজাতির জন্য এক বিশাল আশার আলো। প্রতিদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হাজারো মানুষের জীবনে এটি এনে দিতে পারে নতুন আশার সূর্যোদয়। আর খুব বেশি দেরি নয়। হয়তো আর এক বছরের মধ্যেই আমরা বলতে পারবো ক্যান্সার প্রতিরোধে টিকা আর কল্পনা নয়, বাস্তব।


