Home Blog Page 102

সিএনএন-এর বিশ্লেষণ : ট্রাম্প পিছু হটায় , কি মন্দার কবল থেকে বাঁচবে যুক্তরাষ্ট্র ?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে স্বপ্রণোদিত মন্দা ও সরবরাহব্যবস্থা ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে ৯০ দিনের বিরতি দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, উভয় দেশই উচ্চ শুল্কের পথ থেকে ফিরে আসবে। শুল্ক ও পাল্টা শুল্কের এই খেলায় বিশ্বের প্রধান দুই অর্থনীতির মধ্যে বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্যে যে ১৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তা ছিল একেবারে অস্বাভাবিক। এটা কার্যত চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একপ্রকার নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো। সরবরাহব্যবস্থা–বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন, এতে দোকানের তাক খালি হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর সমস্যা হতে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলেন, ট্রাম্পের এই ফিরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে আপাতত রক্ষা করেছে। তাঁরা মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন যখন ১৪৫ শতাংশ শুল্ক থেকে সরে আসে, তখন বোঝা যায় যে তারা উপলব্ধি করেছে, এই হারে শুল্ক থাকলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হবে।

অর্থনীতিবিদেরা অবশ্য বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুরোপুরি বিপদমুক্ত—এ কথা এখনই বলা যাবে না। মন্দার ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে, যদিও অর্থনৈতিক পতনের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।

শুল্ক এখনো বেশি। গত কয়েক দশকে এমন উচ্চ শুল্ক ছিল না। অনিশ্চয়তা এর চেয়ে বেশি। আস্থা ও বাণিজ্যপ্রবাহের যে ক্ষতি হয়েছে, তা রাতারাতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। অনিশ্চয়তা শেষ হচ্ছে না। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, চীনের পণ্যে শুল্ক আবার বাড়তে পারে। ৯০ দিনের মধ্যে চুক্তি না হলে শুল্ক আবার ১৪৫ শতাংশে ফিরে যাবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, তবে অনেকটাই বেড়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, শেষ পর্যন্ত চুক্তি একটা হবেই।’

সংবাদে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি, যদিও উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। খাতভিত্তিক শুল্ক (যেমন কাঠ, সেমিকন্ডাক্টর, ওষুধ, খনিজ ইত্যাদি) আরোপের সম্ভাবনা এখনো আছে। সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ, যেমন বিমান ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নিরাপত্তা তদন্ত ভবিষ্যতে আরও শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত দেয় বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বিশেষজ্ঞ মহল বলছে, এটা সম্পূর্ণ কৃত্রিম বা তৈরি করা সংকট। ব্যবসা ও বিনিয়োগ মহলে এখনো আতঙ্ক রয়ে গেছে—পরবর্তী ধাক্কা কবে আসবে, তা নিয়ে। শুল্কনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাজারে স্থায়ীভাবে আস্থার অভাব তৈরি করেছে। এখন সবার প্রশ্ন, এই অস্থিরতা কি সাময়িক, নাকি নতুন কোনো অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত সামনে আসছে?

দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ : ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘শান্তিচুক্তি’ , ইসরায়েল কি একা হয়ে পড়ছে ?

ইয়েমেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপ্রত্যাশিত শান্তি চুক্তি’ আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ঝড় তুলেছে। সাত সপ্তাহ ধরে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ওপর হাজারের বেশি বোমা বর্ষণের পর, হঠাৎ করেই সেই অভিযান বন্ধ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। গত ৬ মে কানাডার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, হুতিদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর কারণেই এই বোমা বর্ষণ বন্ধ করা হয়েছে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি, যিনি এই চুক্তির মধ্যস্থতা করেছেন, তিনি এক টুইটে জানান, লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতার বিনিময়ে হুতিরা ওপর আক্রমণ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র রাজি হয়েছে। ট্রাম্পের এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথমত, এই সামরিক অভিযানে খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি ডলার, যা আমেরিকার জন্য একটি বড় বোঝা। দ্বিতীয়ত, এই আক্রমণগুলো হুতিদের দমাতে ব্যর্থ হয়েছে। তৃতীয়ত, প্রেসিডেন্ট যখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সফর করছেন, তখন এই সংঘাত আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ হুতিদের ‘সমর্থন’ দেওয়ার জন্য ইরানকে ‘মূল্য দিতে হবে’ বলে সতর্ক করার পর ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত করেছিল। ৪ মে, হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে তেল আবিবের প্রধান বিমানবন্দরের উপকণ্ঠে আঘাত হানে। এর জবাবে ইসরায়েল ইয়েমেনের হোদেইদা বন্দর, রাজধানী সানার বিমানবন্দর, তিনটি বেসামরিক বিমান এবং দুটি বড় সিমেন্ট কারখানা ধ্বংস করে দেয়। এতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিপরীতে ইরান ও তার মিত্রদের সংঘাতের পুরোনো মধ্যপ্রাচ্য ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দেয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতেই ট্রাম্প হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। হুতিরাও তাদের বিজয় উদ্‌যাপন করছে। ট্রাম্প বলেছিলেন তারা আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু বিদ্রোহীরা জোর দিয়ে বলছে, আমেরিকা পিছু হটেছে। আমেরিকার হামলা হুতিদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ক্ষতি করেছে, কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। তারা এখনো ইয়েমেনে সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তি। ইরান-সমর্থিত হামাস ও হিজবুল্লাহর নেতারা যখন দুর্বল, তখন আব্দুল-মালিক আল-হুতি এখনো টিকে আছেন। ইয়েমেনের বিশ্লেষক আব্দুল-গণি আল-ইরিয়ানি বলেন, ‘আমরা আশা করিনি যে ট্রাম্প হুতিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তাদের বিজয় উপহার দেবেন।’

… অন্যদিকে, এই চুক্তির ফলে ২ কোটি ৫০ লাখ ইয়েমেনিকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে এক দশক ধরে বিমান হামলায় দেশটির অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে।…ইয়েমেনের অন্য কোনো বাহিনী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। ২০১৫ সালে সানা দখলের পর থেকে তাদের বাহিনী ১২ গুণ বেড়ে ৩ লাখ ৫০ হাজার হয়েছে। ইয়েমেনে বিরোধীদের বিপরীতে, তারা অনেক সুশৃঙ্খল এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

… সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ট্রাম্প সম্ভবত ইসরায়েলকেও পরিত্যাগ করেছেন। হুতিরা যখন ইসরায়েলে নতুন করে হামলা শুরু করে, তখন তিনি ইয়েমেনে অভিযান শুরু করেছিলেন। কিন্তু এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা ঠেকাতে কোনো কাজে আসবে না। হুতিরা বারবার বলে আসছে, ইসরায়েল গাজায় অবরোধ বহাল রাখা পর্যন্ত তারা হামলা চালিয়ে যাবে।

এই অবস্থান সম্ভবত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের হতাশারই ইঙ্গিত দেয়। অথবা ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশও হতে পারে। সে যাই হোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলকে এই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে। … এই আপাত শান্তির প্রধান সুবিধাভোগী হলো ইরান। হুতি সমস্যা সমাধান করে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছেন।

ইরান কয়েক দিনের মধ্যে চতুর্থ দফা আলোচনা শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। একটি খসড়া চুক্তি এরই মধ্যে প্রচারিত হয়েছে, যেখানে ইরান এবং আমেরিকা ৪৫ বছর পর কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারে। যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কারিগরি দলগুলো এমন একটি চুক্তি চূড়ান্ত করবে, যা ইরানকে স্থায়ীভাবে নিম্ন স্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেবে।

নাগার্জুনার বৌদ্ধ যুক্তি ও পশ্চিমা দর্শনের দ্বন্দ্ব – সত্য-মিথ্যার অতীত

এক সময়ের কথা, যখন পশ্চিমা দর্শনের আকাশে অ্যারিস্টটলের যুক্তি ছিল একমাত্র তারা, তখন বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুনা এক নতুন আলোয় চিন্তার দরজা খুলে দিলেন। পশ্চিমা দর্শনের প্রথাগত যুক্তিবিদ্যার ভিত্তি ছিল একদম সহজ-কোনো বক্তব্য হয় সত্য, নয় মিথ্যা। এই নিয়মে কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু নাগার্জুনার বৌদ্ধ যুক্তি সেই একমাত্র পথকে প্রশ্নবিদ্ধ করল এবং দেখাল যে সত্য-মিথ্যার বাইরেও আছে আরও অনেক সম্ভাবনার জগৎ।

নাগার্জুনা ছিলেন দ্বিতীয় শতকের এক মহান বৌদ্ধ দার্শনিক। তিনি বৌদ্ধ দর্শনের ‘মধ্যমক’ ধারাকে সবচেয়ে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল ‘শূন্যতা’ ধারণা, যা বলে কোনো বস্তু বা ধারণার নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই, সবকিছুই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। এই ভাবনাকে তিনি যুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং তার জন্য তিনি ব্যবহার করলেন ‘কাতুষ্কোটি’ বা চার-কোণ যুক্তি।

কাতুষ্কোটি কি? সহজ ভাষায় বললে এটি হলো একটি বিশেষ ধরনের যুক্তি যেখানে কোনো বক্তব্য চারভাবে সত্য হতে পারে-সত্য, মিথ্যা, সত্য ও মিথ্যা উভয়, অথবা সত্যও নয় মিথ্যাও নয়। এই ধারণা পশ্চিমা দর্শনের জন্য ছিল একেবারেই অচিন্তনীয়।

পশ্চিমা দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা অ্যারিস্টটল যেখানে বলেছেন, কোনো বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণে মধ্যবর্তী কোনো বিকল্প নেই, নাগার্জুনা বললেন, বাস্তবতা এত সরল নয়। কখনো কখনো সত্য ও মিথ্যা একসাথে থাকতে পারে, আবার কখনো কিছু এমনও থাকে যা ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, যা সত্যও নয় মিথ্যাও নয়।

এই ধারণা শুনলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে-কীভাবে কোনো বিষয় একই সাথে সত্য ও মিথ্যা হতে পারে? অথবা সত্যও নয় মিথ্যাও নয় কীভাবে সম্ভব? নাগার্জুনার যুক্তি ছিল ভাষা ও চিন্তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে। তিনি বলতেন, আমাদের ভাষা ও যুক্তি পার্থিব বাস্তবতার কিছু অংশই ধারণ করতে পারে; কিন্তু চূড়ান্ত বাস্তবতা ভাষার বাইরে, অবর্ণনীয়। তাই অনেক সময় আমরা যখন কোনো বিষয়ের সত্যতা নির্ধারণের চেষ্টা করি, তখন ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সঠিক উত্তর পেতে পারি না।

পশ্চিমা দর্শনের অনেকেই এই ধারণাকে গ্রহণ করতে পারেননি। তারা মনে করতেন আত্মবিরোধিতা যুক্তির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নাগার্জুনার যুক্তি ছিল একেবারে ভিন্ন। তিনি দেখিয়েছিলেন, আত্মবিরোধিতা কখনো কখনো বাস্তবতার প্রকৃত রূপ প্রকাশ করে। যেমন, মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্ব আছে কি নেই-এই প্রশ্নের উত্তর এককভাবে দেওয়া যায় না। কারণ আত্মার ধারণা নিজেই শূন্যতা ও নির্ভরশীলতার মধ্যে আবর্তিত।

আধুনিক গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা ও কম্পিউটার বিজ্ঞান এই প্রাচীন বৌদ্ধ যুক্তির অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছেছে। ১৯৬০-এর দশকে First Degree Entailment (FDE) নামে একটি যুক্তি পদ্ধতি তৈরি হয়, যেখানে কোনো বক্তব্য একই সময়ে সত্য ও মিথ্যা বা সত্যও নয় মিথ্যাও নয় হতে পারে। এটি অসম্পূর্ণ বা দ্বৈত তথ্য বিশ্লেষণে কার্যকর। আজকের তথ্য প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও এই ধরনের যুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

একবার ভাবুন, আমরা যখন ভবিষ্যতের কথা বলি, যেমন-“আগামী শতাব্দীতে পৃথিবীতে কী ঘটবে”-তখন সেই বক্তব্য সত্য বা মিথ্যা হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। পশ্চিমা দর্শনের অ্যারিস্টটল নিজেও এই ধরনের ভবিষ্যৎবাণীকে সত্য-মিথ্যার বাইরেই রেখেছিলেন। আর নাগার্জুনার কাতুষ্কোটি এই জটিলতাকে যুক্তির মাধ্যমে বুঝতে সাহায্য করে।

নাগার্জুনার দর্শন শুধু যুক্তির সীমাবদ্ধতা নয়, ভাষার সীমাবদ্ধতাকেও তুলে ধরে। তিনি বলেন, ভাষা দিয়ে সব কিছু বলা সম্ভব নয়। অনেক সময় কিছু জিনিস দেখানো যায়, কিন্তু বলা যায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা দর্শনের আধুনিক চিন্তাধারার সঙ্গেও মিলে যায়। যেমন, ইমানুয়েল কান্ট বলেছিলেন, আমরা কেবলমাত্র ‘জ্ঞানযোগ্য বস্তু’ সম্পর্কে জানতে পারি, ‘বস্তু-স্বয়ং’ আমাদের উপলব্ধির বাইরে। লুডউইগ উইটগেনস্টাইন বলেছিলেন, “যা বলা যায় না, তার বিষয়ে চুপ থাকা উচিত।”

পশ্চিমা দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শনের এই দ্বন্দ্ব ও সংলাপ আমাদের শেখায়, বাস্তবতা একক সত্য-মিথ্যার বাইরে অনেক গভীর ও জটিল। নাগার্জুনার শূন্যতা দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের চিন্তা ও ভাষার সীমা আছে এবং সেই সীমার বাইরে গিয়ে বাস্তবতার প্রকৃত রূপ উপলব্ধি করতে হয়।

আজকের আধুনিক বিশ্বে, যেখানে তথ্যের আধিক্য ও দ্বন্দ্বপূর্ণ তথ্য আমাদের চারপাশে, সেখানে নাগার্জুনার কাতুষ্কোটি যুক্তি ও শূন্যতার দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের শেখায় কোনো বিষয় একক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায় না। সত্য-মিথ্যার বাইরেও আছে আরও অনেক রঙ, আরও অনেক সম্ভাবনা।

পশ্চিমা দর্শনের দ্বৈতবাদ ও বৌদ্ধ দর্শনের কাতুষ্কোটি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। একদিকে যেখানে স্পষ্টতা ও নির্ভুলতার দাবি, সেখানে অন্যদিকে বহুমাত্রিকতা ও অস্পষ্টতার গ্রহণযোগ্যতা। এই দুইয়ের সমন্বয় আমাদের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।

নাগার্জুনার দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাস্তবতা কখনো সরল নয়, কখনোই একমাত্র সত্য বা মিথ্যা নয়। এটি আমাদের শেখায় নম্র হতে, ভাষার সীমা বুঝতে এবং গভীরতর উপলব্ধির পথে হাঁটতে।

এইভাবে নাগার্জুনার বৌদ্ধ যুক্তি ও পশ্চিমা দর্শনের দ্বন্দ্ব শুধু একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, এটি আমাদের চিন্তা ও উপলব্ধির সীমা প্রসারের এক মহান গল্প। এই গল্পে আমরা দেখতে পাই, কিভাবে দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক ঐতিহ্য একে অপরকে প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ করে এবং অবশেষে একে অপরকে সমৃদ্ধ করে।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা , ঝুঁকির দিকগুলো কী : ডেভিড বার্গম্যান , সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

0

” … নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, স্বাধীন চিন্তা দমন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দ্রুত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোও এ ধরনের অসদাচরণের বাইরে ছিল না। তবে আওয়ামী লীগের অধীনে এর মাত্রা ও তীব্রতা ছিল অভূতপূর্ব, যা একে স্বৈরাচারী শাসন হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি তৈরি করে।…তবে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকে বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি চরম সংস্করণ হিসেবেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত প্রতিবাদকে সরকার নির্মমভাবে দমন করতে থাকে।…স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুরতা কখনোই দেখা যায়নি। এটাকে পূর্ববর্তী কোনো সরকারের বা দলের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা চলে না।

… আওয়ামী লীগের এখনো উদ্ধত, সংস্কারহীন ও অনুশোচনাহীন মনোভাব। একই সঙ্গে যৌক্তিক ধারণা করা যেতে পারে–তারা দেশকে অস্থিতিশীলও করে তোলায় সচেষ্ট। এসব বিষয় দলের কার্যক্রম স্থগিত রাখার পক্ষে যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে মূল যে যুক্তিগুলো রয়েছে, তার সারাংশ হলো আওয়ামী লীগ সরাসরি হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছে এবং পরে তার কোনো জবাবদিহি করেনি; ফলে দলটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার হারিয়েছে। কিন্তু এরপরও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বড় ধরনের কিছু ঝুঁকি রয়েছে।

প্রথমত, এটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল। এর শিকড় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রোথিত। তাদের রয়েছে এক বিশাল জনসমর্থনের ভিত্তি। তাদের অনেকেরই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।

নানা কারণে এই দলটিকে অনেকে সমর্থন করে। কেউ করে দলটির সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থানের কারণে, কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থানের কারণে, কেউ উন্নয়নমূলক কাজ অথবা শুধু তার ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে এই লাখ লাখ সমর্থক বস্তুত তাদের রাজনৈতিক অধিকার হারাবে। আওয়ামী লীগের পক্ষে যেকোনো মতপ্রকাশ—মৌখিক, লিখিত বা অনলাইনে শেয়ার করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। দলটির সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ জমায়েত, এমনকি সামাজিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এতে ভয়ের এক পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে নজরদারি, হয়রানি ও ইচ্ছামতো গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকবে আর মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার সংকুচিত হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও এতে বড় ধাক্কা খাবে। কারণ, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলোকে আওয়ামী লীগ–সম্পর্কিত যেকোনো কিছু প্রকাশে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে।

… তার ওপর একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে পুরোপুরি বাইরে রাখার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিপুলসংখ্যক ভোটারকে কার্যত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করবে। অধিকাংশ আওয়ামী লীগ সমর্থক অন্য কোনো দলকে সমর্থন করবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম; বরং তারা হয়তো শ্রেফ ভোট দিতেই আগ্রহ হারাবে। এর ফলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী আবারও এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি হবে, যেখানে তাদের সমর্থিত দল ব্যালটে অনুপস্থিত থাকবে।

… তাহলে এই লাখ লাখ মানুষ, যাঁদের এখন রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে না, তাঁরা কোথায় যাবেন? নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এক বিশ্লেষক যেমন বলেছিলেন, ‘বাদ দেওয়া থেকে ক্ষোভ জন্মায়, তা শান্তিপূর্ণ রূপান্তরকে অকার্যকর করে তোলে এবং প্রায়ই নতুন অস্থিতিশীলতার চক্রকে উসকে দেয়।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা মানে একটি ইতিমধ্যেই ক্ষতবিক্ষত গণতন্ত্রকে প্রতিশোধমূলক ও একপক্ষীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করা, যেখানে অপরাধীরাও শহীদে পরিণত হতে পারে এবং একটি বিভক্ত সমাজ আরও গভীরভাবে মেরূকৃত হয়ে উঠতে পারে।’ এটাই এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।

সমানভাবে উদ্বেগজনক হলো নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার যে প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে। মনে হচ্ছে সরকার উচ্চকণ্ঠ একদল বিক্ষোভকারীর চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।…অথচ এর আগের দিনই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

… নৈতিক দায়বদ্ধতাই যদি একমাত্র বিবেচ্য মানদণ্ড হতো, তাহলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের যথার্থতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই থাকত না। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে, যেখানে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাবকে বিবেচনায় নিতে হয়।

এসব দিক বিচার করলে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঝুঁকি এর সম্ভাব্য উপকারিতার তুলনায় বেশি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। এখন এর ফলাফল দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। “


দেশে ছোট হয়ে আসছে পরিবারের আকার

বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, চাচা-চাচি নিয়ে একসঙ্গে যৌথভাবে থাকা-খাওয়ার মতো পরিবার কমে যাচ্ছে। আর্থসামাজিক কারণে এমন পরিবার থাকছে না। অণুপরিবার (নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি) অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী ও তাঁদের সন্তান নিয়ে ছোট পরিবারের সংখ্যাই এখন বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন — এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে শিশু ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ওপর। যদিও পরিবারের এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ, তা নিয়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে আলোচনা এখনো কম।

আজ ১৫ মে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘে প্রতিবছর ১৫ মে আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়।

জাতিসংঘ বলছে — পরিবারের নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। পরিবারের সদস্যদের অধিকার, সক্ষমতা ও দায়িত্বের ব্যাপারে দৃষ্টি রাখাও সরকারের দায়িত্ব। সরকার থাকবে শক্তিশালী পরিবারের পক্ষে।

পরিবারের আকার যে ছোট হয়ে আসছে, তা দেখা যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের পরিসংখ্যানে। ২৮ বছর আগে ১৯৯৪ সালে পরিবারে গড়ে সদস্যসংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৪। ২০০৪ সালের জরিপে দেখা যায়, সদস্যসংখ্যা ৫। ২০২২ সালে দেখা যাচ্ছে, পরিবারের সদস্য কমে ৪ জনে এসেছে।

১৯৯৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শহরে পরিবারগুলোর আকার ছোট হওয়ার প্রবণতা গ্রামের চেয়ে কিছুটা বেশি।

দ্রুত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ এবং ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ যৌথ পরিবার ভেঙে অণুপরিবার হওয়ার পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে।

অণুপরিবারে শিশু ও বয়োজ্যেষ্ঠদের নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ধরনের পরিবারে শিশুদের দেখাশোনা ও প্রবীণদের যত্ন নেওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমে শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র ও প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশেও শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। তবে দুটি ক্ষেত্রেই ধীরগতি লক্ষ করা যায়। তবে এ বিষয় নিয়ে দেশে বড় পরিসরে গবেষণা হওয়া দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পরিবার যেন ভালো থাকে — সে বিষয়ে রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কর্মকৌশল থাকা দরকার। সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে, সমাজকে সচেতন করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুক্রবার ‘নারীর ডাকে মৈত্রীযাত্রা’ : বৈষম্য-নিপীড়নের প্রতিবাদ , সমঅধিকার ও সমমর্যাদার দাবি

0

বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘নারীর ডাকে মৈত্রীযাত্রা’ শীর্ষক সমাবেশ। আগামী ১৬ মে (শুক্রবার) বিকেল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে (সংসদ ভবনের সামনে) এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

মৈত্রীযাত্রার আয়োজকরা বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন — ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ে জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে দেশে স্বৈরাচারের পতন ঘটলেও অনেক কিছুই রয়ে গেছে অপরিবর্তিত। অন্য অনেক অন্যায়-অনিয়ম, বিচারহীনতার পাশাপাশি নারীদের ওপর সহিংসতা ও প্রকাশ্যে হয়রানিও অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে এটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যানের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা আমরা লক্ষ করেছি। ন্যায্যতা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকেও ‘অযৌক্তিক’ বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আমরা এই অপচেষ্টাকে এবং অসততার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করছি। এ ধরনের প্রচারণা বিভিন্ন ধর্ম, শ্রেণি ও পেশার নারী ও মেয়েদের প্রতি অসম্মান ও সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে।’

তাঁরা বলেন — ‘মৈত্রীযাত্রার লক্ষ্য হচ্ছে নারী অধিকার সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি, চরমপন্থা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বাইরে গিয়ে সংলাপের পরিসর তৈরি করা এবং নারী ও প্রান্তিকজনের অধিকারের প্রশ্নে সরকার ও রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তার থেকেও বড় একটি লক্ষ্য হচ্ছে, নারী এবং বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে জানানো যে আমরা কেউ একা নই।…মানুষ হিসেবে সমান সুযোগ তথা সমঅধিকার আর সমমর্যাদা আমাদের সবার ন্যূনতম প্রাপ্য।’

বিবৃতিতে আরো বলা হয় — ‘ক্রমবর্ধমান আক্রমণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের পরিপ্রেক্ষিতে মৈত্রীযাত্রার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সমমনা নারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি।…আমরা বিশ্বাস করি, একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধানের মূল চেতনা হবে সাম্য ও মর্যাদা। সমাজে সমমর্যাদার সঙ্গে বসবাসের অধিকার সবার। পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য নয়, সম্মানজনক সহাবস্থানই হোক আমাদের ভবিষ্যৎ।…এ লড়াই কেবল নারীর একার নয়, এ লড়াই বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের।’


মালয়েশিয়ার নিয়োগ সিন্ডিকেটকে দমনের প্রস্তুতি চলছে

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে শ্রমিক প্রেরণের নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একটি কুখ্যাত সিন্ডিকেট পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট অতীতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের শোষণ করেছে, যার ফলে ২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। এখন যদি একই সিন্ডিকেট আবার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়, তাহলে আগের মতোই শ্রমিকদের দুর্ভোগের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত নানা অনিয়ম দেখা গেছে। সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি ছিল ৭৮,৯৯০ টাকা, অথচ বাস্তবে একজন শ্রমিককে মালয়েশিয়া যেতে ৫.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। এটি শুধু মাত্র একটি অব্যবস্থাপনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত শোষণ কাঠামোর প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক সহায়তায় গঠিত এই সিন্ডিকেট স্বচ্ছ এবং দক্ষ নিয়োগ এজেন্সিগুলোকে পেছনে ফেলে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।

ফলে বহু বাংলাদেশি শ্রমিক প্রতারণার শিকার হয়েছে, তারা চাকরি না পেয়ে, বেতন না পেয়ে বা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৮,৯৮,৯৭০ জন বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও, অবৈধ বা অনিয়মিত শ্রমিকদের কোন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গত বছর প্রায় ১ থেকে ২ লাখ শ্রমিক বেকার অবস্থায় ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে মালয়েশিয়া “বড় পরিসরে” বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছে এবং তাদের মজুরি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে, সরকার প্রায় ১৮,০০০ শ্রমিককে অগ্রাধিকার দিতে চায়, যারা ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু টিকিট সংকট বা নিয়োগকর্তা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় যেতে পারেনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র এই শ্রমিকদের নয়, বরং অনিয়মিত বা ‘অবৈধ’ হয়ে পড়া বহু বাংলাদেশিকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত, যাদের এই পরিস্থিতিতে পড়ার পেছনে তাদের কোনো দোষ নেই। অনেক সময় নিয়োগকর্তা ভিসা নবায়ন করে না বা পাসপোর্ট নবায়নের সমস্যা দেখা দেয়। আবার কিছু ভুয়া কোম্পানি চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হলো — নিশ্চিত করা যে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোন সিন্ডিকেট যেন গঠিত না হয় এবং আবারও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুর্নীতি ও শোষণের সুযোগ না পায়। পাশাপাশি, মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা দরকার।

এই পুরো প্রক্রিয়া সফল করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়া। দুই দেশের সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যেন অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতি পুনরাবৃত্তি না ঘটে, এবং শ্রমিকরা প্রকৃত সুযোগ ও সুরক্ষা পায়।

ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত , আঞ্চলিক অস্থিরতায় চাপে বাংলাদেশ : আলতাফ পারভেজ , দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক

0

“… ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের মতো উভয়ের গোলাগুলিতেও মানসিকভাবে নিরপেক্ষ বা নির্মোহ থাকতে পারেন না বাংলাদেশ-সমাজ। এটা কেবল ধর্মের কারণে ঘটে না, ভৌগলিক অতীতের কারণেও হয়। যা আবার পুরোপুরি অতীত হয়েও যায়নি।

সামাজিক স্তরে অবস্থাটা অনেক সময় এমনই মনে হয় যে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারত যেন পারস্পরিক ঝগড়ায় লিপ্ত একটা যৌথ পরিবার। ‘অতীত’ এই তিন সমাজকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করেছে, কিন্তু পৃথক ‘বর্তমান’ তাদের নিরাসক্ত করতে পারেনি।…এই সম্প্রদায়গত উত্তেজনা এখনো অমীমাংসিত পরিচয়গত প্রশ্নগুলোর প্রতিফলন, যা উপমহাদেশের বিভাজনের বেদনাদায়ক ইতিহাস ও তার পরবর্তী পরিণতি থেকে এখনও মানুষের মনে সক্রিয়।

… পাকিস্তানে গোলা ছোঁড়ার পাশাপাশি ভারত যুদ্ধের প্রথম দিনই তার আঁচ ছড়িয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তেও ব্যাপকভাবে ‘পুশইন’ কর্মসূচি নিয়ে।…খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রামসহ অনেক সীমান্তে…শত শত মানুষকে ইতোমধ্যে তারা পুশইন করতে সমর্থ হয়েছে। দরিদ্র প্রকৃতির এই মানুষদের একাংশ বাংলাভাষী এবং তাদের গুজরাট অঞ্চল থেকে ধরে এনে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—বাংলাভাষী হলেই কি কেউ বাংলাদেশি হয়ে যায়? আর, ভারতে যদি অবৈধভাবে কোনো বাংলাদেশি থাকেন, সেই বিষয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে কথাবার্তা বলা যেতো। তার বদলে যেভাবে সীমান্তের অনেকগুলো জায়গা দিয়ে একযোগে পুশইন কর্মসূচি নেওয়া হলো, তা উসকানিমূলক।

… পুশইন সামাল দিতে নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের সামনে পুশব্যাক কর্মসূচি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, সেটা অমানবিক হলেও। পাল্টাপাল্টি পুশইন ও পুশব্যাক সীমান্ত পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করতে বাধ্য। সে কারণেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, ভারত কি তবে পাকিস্তান সীমান্তের মতো বাংলাদেশ সীমান্তেও উত্তেজনা ছড়াতে চায়?

… এখানকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে ভারত সরকার তার জন্য সুখকর মনে না করার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সেজন্য পুরো দেশকে এবং এখানকার সব মানুষকে জড়িয়ে লাগাতার অসত্য প্রচারণাকে এক ধরনের পদ্ধতিগত বৈরিতা হিসেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।

… ভারতের দিক থেকে ক্রমাগত এরকম বৈরী প্রচারণা এবং ব্যাপক হারে পুশইন চেষ্টার পাশাপাশি দক্ষিণ সীমান্তেও উত্তেজনাকর এক অবস্থায় পড়েছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আরাকান থেকে নতুন করে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ বেশ বেড়ে গেছে।…নতুন শরণার্থী দল বলছে, আরাকান আর্মির রাখাইন গেরিলাদের তরফ থেকে তাদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার চাপ তৈরি হয়েছে।

… যুদ্ধ পরিস্থিতি সেখানে মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি করছে। তার উত্তর হিসেবে জাতিসংঘ সম্প্রতি বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে আরাকান অভিমুখী একটা ‘করিডোর’ বা ‘চ্যানেল’ খুলে দেওয়ার জন্য, যা দিয়ে তারা আরাকানে ‘আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা’ পাঠাতে চায়।

… বাংলাদেশেও আরাকানমুখী করিডোর প্রস্তাব শুরু থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অনেকগুলো প্রশ্ন উঠেছে এ নিয়ে।…দেশে পার্লামেন্ট থাকলে এ বিষয়গুলো নিয়ে নিশ্চিতভাবে জনপ্রতিনিধিরা কথা বলতেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার স্পর্শকাতর এ বিষয়ে রাজনীতিবিদদের সঙ্গেও আলোচনা করেনি বলেই মনে হচ্ছে।

… সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা…অসমন্বিত ও বিরোধাত্মক এসব বক্তব্যে জনমনে এই মর্মে উদ্বেগ বাড়ছে যে, বাংলাদেশ তার দক্ষিণ সীমান্তে সামরিক ধাঁচের কোনো উদ্যোগে জড়াচ্ছে কি না।

… গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত এই সরকারের পেছনে জনগণের সমর্থন থাকলেও এটা অনির্বাচিত সরকার। আবার পাশাপাশি দেশে বর্তমানে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। নির্বাচন কবে হবে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছড়াচ্ছে। এরকম অবস্থায় আরাকানের দিকে মানবিক চ্যানেল দেওয়ার বিষয় নির্বাচনকেন্দ্রীক অনিশ্চয়তায় বাড়তি উপাদান হয়ে গেছে।

তাছাড়া, সীমান্তে করিডোরের সামরিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হতে পারে যেকোনো সময়। সবমিলে দেশের সব সীমান্তের চলমান অবস্থা এবং পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সামাজিক ফলকে বিবেচনায় নিলে উদ্বিগ্ন হতে হয়। …”


আওয়ামী লীগ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় লেখাও কি নিষেধ ?

0

বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বতী সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করার পর দলটি নিয়ে সামাজিক মাধ্যম বা গণমাধ্যমে কতটা লেখা বা বলা যাবে এনিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সোমবার প্রকাশিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গণহত্যায় অভিযুক্ত দলটির নেতাকর্মীদের বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যে কোনো ধরনের “প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো”।

আইনজীবীরা বলছেন, যে আইনের ক্ষমতাবলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেটির পরিধি বিস্তৃত এবং কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা নেই। ফলে আইনটির অপব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

বাংলাদেশে সন্ত্রাস বিরোধী আইনটি করা হয়েছিলো ২০০৯ সালে। এতে ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার’ বিধান যুক্ত করে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেছে সরকার।

ওই আইনের ২০ নং ধারার ‘ঙ’ উপধারায় বলা হয়েছে, “নিষিদ্ধ সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যে কোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা, মুদ্রণ বা প্রচারণা, সংবাদ সম্মেলন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।”

ঠিক কী ধরনের বক্তব্য প্রকাশ করা যাবে অথবা কোন ধরনের বক্তব্য প্রকাশিত হলে সেটি নিষিদ্ধ সত্তার ‘পক্ষে বা সমর্থনে’ গেছে বলে বিবেচনা করা হবে, আইনে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার পর বিষয়টি নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে আসায় ওই দিনই প্রজ্ঞাপনের বিষয়ে ব্যাখ্যা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

সোমবার মধ্যরাতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “…এই নিষেধাজ্ঞা সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মী ও সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য হবে। উক্ত প্রজ্ঞাপন অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা মুক্তমতের মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে না। আওয়ামী লীগ, এর কোনো কর্মকাণ্ড, দলটি সম্পর্কে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের যৌক্তিক, গঠনমূলক বা আইনানুগ বিশ্লেষণ বা মতামত প্রদান এই প্রজ্ঞাপন দ্বারা খর্বিত করা হয়নি।”

এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য ও মতামত তো বটেই, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরেও আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে জানাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন।

“এখন যদি ষাটের দশকের বা একাত্তরের আওয়ামী লীগের ইতিবাচক ভূমিকা ও ইতিহাস নিয়ে যদি গণমাধ্যমে বা অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বক্তব্য বা বিবৃতি, লেখা বা যে কোনো প্রচারণা প্রকাশ করা হয় — সেটাও কি এর মধ্যে পড়ে যাবে কি-না এগুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন,” বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

“এমনকি, সরকারের পক্ষ থেকে এই যে যৌক্তিক ও গঠনমূলক বিশ্লেষণের কথা বলা হচ্ছে; কে ঠিক করবে কোনটা যৌক্তিক বা গঠনমূলক, আর কোনটা যৌক্তিক নয়?” — প্রশ্ন রাখেন সারা হোসেন।

আইনের এমন অস্পষ্টটার কারণে অপপ্রয়োগের ঝুঁকিও রয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনজ্ঞরা বলছেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ সত্ত্বাকে সমর্থন করে কোনো বক্তব্য দিলে বা প্রচারণা চালালে একজন ব্যক্তির সর্বনিম্ন দুই বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সাজা এবং আর্থিক জরিমানা হতে পারে।

ইতিহাসের প্রথম কবি – এনহেদুয়ানা

সাহিত্য ও ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে একজন নারীর নাম বারবার উঠে আসে—এনহেদুয়ানা। খ্রিস্টপূর্ব ২৩শ শতাব্দীর এই সুমেরীয় পুরোহিত্রী কেবল দেবতার বন্দনার কবিতা লিখেই থেমে যাননি, বরং নিজেকে, নিজের কণ্ঠকে ও নিজের অভিজ্ঞতাকে কবিতায় উচ্চারণ করেছেন। তিনি হলেন মানব ইতিহাসের প্রথম পরিচিত কবি, যার নাম, পরিচয় ও সাহিত্য আজও সংরক্ষিত। তার আগে কোনো কবির নাম ইতিহাসে নেই। ফলে এনহেদুয়ানার আবির্ভাব একটি সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক বিপ্লব—যেখানে “আমি” প্রথমবারের মতো কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।

এনহেডুয়ানা ছিলেন একোডিয়ান সম্রাট সারগনের কন্যা। তাঁকে উর নগরীর দেবী নান্নার প্রধান পুরোহিত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে সারগনের সাম্রাজ্য সুমের ও আক্কাদ অঞ্চলের মধ্যে ধর্মীয় ঐক্য গড়ে তোলে। তবে এনহেডুয়ানার কৃতিত্ব কেবল রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নয়—তার প্রধান পরিচয় তিনি বিশ্বসাহিত্যের প্রথম আত্মসচেতন কবি।

তাঁর রচিত প্রধান সাহিত্যকর্মগুলো হলো, “Inninsagurra” (The Exaltation of Inanna), “Ninmesarra”, “Inanna and Ebih”। এই কবিতাগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে “The Exaltation of Inanna” তাঁকে ইতিহাসের কবিতার ধারায় অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই কবিতায় তিনি আত্মপরিচয়, নির্বাসন, ঈশ্বরীর প্রতি বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে একইসঙ্গে ভাষায় প্রকাশ করেন।

এনহেদুয়ানার কবিতায় একটি মৌলিক দিক হলো আত্মপরিচয় ও বিপর্যয়ের সংমিশ্রণ। তিনি কেবল দেবতাকে ডাকেননি, বরং নিজের দুঃখ, অবসাদ এবং নির্জনতাকেও কবিতায় তুলে ধরেছেন।

“The Exaltation of Inanna” কবিতায় তিনি লেখেন:
“They approached me in that dreadful storm, cast me out of the temple; I, Enheduana, wandered the alleys like a homeless bird…”

এই পঙক্তির মাধ্যমে দেখা যায়, একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার চাপে এক নারীর পতন এবং তার অন্তর্জগতের বিশৃঙ্খলা। এই ভাঙন শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি এক বৃহৎ অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি, যা আজকের সময়ের সাথেও সাদৃশ্যপূর্ণ।

প্রাচীন সমাজে নারীর কণ্ঠস্বর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অদৃশ্য। এনহেদুয়ানা সেই নীরবতা ভেঙে কবিতায় নিজের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন—”I, Enheduana”। এই উচ্চারণ একটি বিপ্লব। তা শুধু সাহিত্যিক নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকও।

তাঁর কবিতা নারীর আত্মসংবেদন, বেদনা এবং প্রতিরোধকে প্রকাশ করে। ইনান্না দেবীর প্রতিমূর্তিতে তিনি যেন নিজের প্রতিবাদ, প্রত্যাবর্তন ও আত্মমর্যাদাকে একত্রিত করেন। ইনান্নার শক্তি ও উগ্রতা এনহেডুয়ানার নিজের জীবন-সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে।

এনহেডুয়ানার কবিতা পড়লে বোঝা যায়, সেগুলো শুধু ধর্মীয় স্তবগান নয়, এক ধরণের রাজনৈতিক প্রতিবাদপত্র। মন্দির থেকে তাঁকে বহিষ্কার করার ঘটনা এবং পরবর্তীতে তাঁর প্রত্যাবর্তন কেবল ধর্মীয় ঘটনাই নয়, তা এক রাজনৈতিক সঙ্কট ও পুনর্বাসনের আখ্যান। ইনান্নার বন্দনার মাধ্যমে তিনি তাঁর অবস্থান পুনর্দাবি করেন এবং রাজশক্তিকে ঈশ্বরীয় বৈধতা দিয়ে নিজের স্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন।

তার সাহিত্য দুই সাংস্কৃতিক বলয়ের সুমেরীয় ও আক্কাদীয়—মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। ফলে এনহেডুয়ানার কবিতা ছিল এক ধরণের সাংস্কৃতিক অনুবাদ ও সমন্বয়ের প্রচেষ্টা।

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়েও এনহেডুয়ানার কবিতা আশ্চর্যজনকভাবে প্রাসঙ্গিক। শরণার্থী সংকট, রাজনৈতিক পতন, নারীর দমন, ধর্ম ও রাজনীতির দ্বন্দ্ব—এসবই তার কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয়। তাঁর নির্বাসনের বেদনা যেন আজকের শরণার্থী নারীর আর্তি; তাঁর আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা যেন আধুনিক নারীবাদের পূর্বাভাস।

এনহেদুয়ানার কবিতায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ একটি নতুন সাহিত্যিক ধারার সূচনা করে—আত্মজৈবনিক কবিতা। তিনি কেবল ঘটনাবলীর বর্ণনা দেননি, বরং তাদের মধ্য দিয়ে নিজের আত্মার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এই ধারা পরবর্তীতে বহু সাহিত্যিক আন্দোলনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। রোমান্টিক কবিদের আত্মবিস্ময়, আধুনিক কবিদের অস্তিত্ব সংকট ইত্যাদি ধারার পূর্বসূরি এনহেদুয়ানা।

এনহে্দুয়ানা কেবল প্রথম পরিচিত লেখক নন, তিনি মানব সভ্যতার প্রথম কবি—যিনি নিজের অভিজ্ঞতা, নাম ও আত্মপরিচয় নিয়ে সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেন। তার কবিতা একাধারে ধর্ম, রাজনীতি, আত্মজিজ্ঞাসা এবং নারীর কণ্ঠের একটি মিলিত প্রতিচ্ছবি।