থিওসফি – আত্মার উপনিবেশ ও গোপন সাম্রাজ্যচিন্তা

১৮৭৫ সালের নিউ ইয়র্কে এক অদ্ভুত সন্ধ্যায় জন্ম নেয় এক আধ্যাত্মিক সংগঠন—The Theosophical Society। এই সংগঠনের পেছনের রহস্যময় নারীটি ছিলেন Helena Petrovna Blavatsky, যাঁকে অনেকে আধ্যাত্মিক বিপ্লবের দূত মনে করতেন, আবার কেউ কেউ মনে করতেন একজন অতিচতুর প্রতারক।

কিন্তু থিওসফি কেবল একটি আধ্যাত্মিক চর্চা নয়, এটি ছিল একধরনের গ্লোবাল আন্দোলন, যেখানে পুঁজি, ঔপনিবেশিকতা এবং পূর্ব-পশ্চিমের সংঘাত মিলে এক অদ্ভুত দার্শনিক ভূত তৈরি করেছিল।

Blavatsky ও তার সহযাত্রী Henry Steel Olcott থিওসফি প্রতিষ্ঠার সময় তিনটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেন। মানবজাতির সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব গঠনের প্রচেষ্টা, ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের তুলনামূলক অধ্যয়ন, প্রকৃতির গোপন নিয়ম এবং মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির অনুসন্ধান।

এই তিন উদ্দেশ্যের আড়ালে ছিল এক রহস্যময় ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব, যার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় হিন্দু, বৌদ্ধ, নাস্তিকতা ও হরমেটিক ধারার মিশ্রণ।

মাদাম ব্লাভাটস্কি দাবি করতেন তিনি তিব্বতের এক গোপন ‘মাস্টার’ বা ‘মহাত্মা’-দের থেকে জ্ঞানের বার্তা পাচ্ছেন। এই গুরুরা ‘আদি-জ্ঞান’ (Esoteric Wisdom) রক্ষাকারী এক অতীন্দ্রিয় সংগঠন। তাঁর লেখা The Secret Doctrine এবং Isis Unveiled বইগুলোয় এই গোপন জ্ঞান একধরনের বৈশ্বিক আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৮৭৯ সালে Blavatsky ও Olcott ভারতে পা রাখেন এবং Adyar-এ গড়ে তোলেন Theosophical Society-এর আন্তর্জাতিক সদর দফতর। এখান থেকেই থিওসফি রূপ নিতে থাকে একধরনের ‘ঔপনিবেশিক আধ্যাত্মিকতা’য়। ব্রিটিশ রাজের সময় ভারতে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংকট চলছিল। থিওসফি একদিকে হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক দিককে গুরুত্ব দিয়ে তা পুনর্মূল্যায়নের কথা বলে, কিন্তু অন্যদিকে এটি ছিল একধরনের সাংস্কৃতিক পুনর্নির্মাণ, যেখানে পশ্চিমা দর্শনের ফ্রেমে প্রাচ্যের জ্ঞানকে বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ Gauri Viswanathan এই প্রবণতাকে বলেন “Spiritual Imperialism”—আত্মার উপনিবেশ। Blavatsky-এর মৃত্যুর পর থিওসফির নেতৃত্বে আসেন Annie Besant—এক ব্রিটিশ নারীবাদী, সমাজতন্ত্রী এবং পরে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেত্রী। তিনি থিওসফিকে যুক্ত করেন শিক্ষা ও রাজনৈতিক জাগরণের সঙ্গে। বেথুন স্কুল, সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজ, এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তার ভূমিকা থিওসফিকে করে তোলে একধরনের আধ্যাত্মিক-রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।

তিনি দাবি করেন, ভারতীয় আত্মা আবার জাগছে এবং থিওসফি তার মাধ্যম। কিন্তু এই ‘আত্মা’ কতটা ভারতীয়, আর কতটা Blavatsky ও Besant-এর নির্মিত এক আদর্শ ভারত? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় থিওসফির জটিলতা!

দ্যোতিত আত্মা না কি বর্ণবাদী গন্ধ?

Blavatsky-এর রচনায় ‘Root Races’ বা মূলে থাকা মানবজাতির বিভিন্ন পর্যায়ভিত্তিক বিবর্তন তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে Aryan Race ছিল উন্নততর স্তরের প্রতিনিধি। যদিও থিওসফি সরাসরি জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেনি, কিন্তু এই ‘আধ্যাত্মিক বিবর্তন’ তত্ত্ব পরবর্তীতে কিছু নাৎসি চিন্তকের কাজেও প্রভাব ফেলেছিল বলে ইতিহাসবিদ Nicholas Goodrick-Clarke মত দিয়েছেন।

প্রশ্ন উঠে—এই থিওসফি কি শুধুই এক আধ্যাত্মিক আন্দোলন, না কি এটি ছিল ছদ্ম-গুপ্তধর্মের মোড়কে এক প্রকার বুদ্ধিদীপ্ত বর্ণবাদ? সব মিলে থিওসফি সরাসরি কোনো মূলধারার ধর্ম হয়ে ওঠেনি, তবে নিউ এইজ আন্দোলন, অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন, রেইকি এবং ‘অকুল্ট’ চর্চার জগতে থিওসফির স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। এমনকি আজকের আত্মোন্নয়নমূলক দর্শনেও এই অতীন্দ্রিয় আবহ পাওয়া যায়।

তবে সমালোচকরা একে বলেন, “একটি ইউরোসেন্ট্রিক আধ্যাত্মিক উগ্রতাবাদ”। কারণ এটি প্রাচ্যের জ্ঞানকে নিজেদের সাংস্কৃতিক ফ্রেমে পুনঃনির্মাণ করে একধরনের ‘exotic mysticism’ হিসেবে বাজারজাত করেছে।

থিওসফি কেবল দর্শনের ইতিহাস নয়, এটি এক আত্মিক ভূতের গল্প—যেখানে আত্মা, ঔপনিবেশিকতা, শ্রেষ্ঠত্ববোধ এবং রহস্য এক সাথে মিলে গড়ে তোলে এক আংশিকভাবে সত্য, আংশিকভাবে মনগড়া এক পরাবাস্তব জগত।

একটা প্রশ্ন রেখে শেষ করা যাক, যদি আত্মা আদতে অদৃশ্য, চিরন্তন ও সার্বজনীন হয়, তবে তার ওপর জাতি, শ্রেণি, সভ্যতা, কিংবা পশ্চিমা কাঠামোর ছায়া কতটা পড়া উচিত?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন