Home Blog Page 27

অরিয়েন্টালিজম – পাশ্চাত্যের বিকৃত কলমে প্রাচ্যের প্রতিচ্ছবি

প্রাচীনকাল থেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে এক মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন রেখা টানা হয়েছে। এই বিভাজন শুধু ভৌগোলিক নয়, বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার এক গভীর সম্পর্ককে নির্দেশ করে। বিশ শতকের প্রভাবশালী তাত্ত্বিক এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাঈদ তাঁর “অরিয়েন্টালিজম” (Orientalism) নামক কালজয়ী গ্রন্থে এই সম্পর্কের এক বিপ্লবী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্ব সাহিত্যের উপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সাঈদের মতে, প্রাচ্য সম্পর্কে পাশ্চাত্যের যে জ্ঞান তৈরি হয়েছে, তা মূলত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি নয়, বরং এক পরিকল্পিত নির্মাণ।

অরিয়েন্টালিজম কী?

সাঈদ তাঁর তত্ত্বে দেখান, ‘অরিয়েন্টালিজম’ কেবল প্রাচ্য বিষয়ক একটি অধ্যয়নের ক্ষেত্র নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো, যা দীর্ঘকাল ধরে প্রাচ্যকে এক স্থির, রহস্যময়, আদিম ও অসভ্য সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এই উপস্থাপনা ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে বৈধতা দিয়েছে। অরিয়েন্টালিস্ট ডিসকোর্সে প্রাচ্যকে প্রায়শই পাশ্চাত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে – যেখানে পাশ্চাত্য যুক্তিবাদী, উন্নত, শৃঙ্খলিত এবং সভ্য, সেখানে প্রাচ্য হলো আবেগপ্রবণ, পশ্চাৎপদ, বিশৃঙ্খল ও বর্বর। এই দ্বৈতবাদ (dichotomy) প্রাচ্যকে এমন এক ‘অন্য’ (Other) সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যাকে শাসন, নিয়ন্ত্রণ এবং ‘সভ্য’ করার প্রয়োজন।সাঈদের মূল যুক্তি হলো, প্রাচ্য সম্পর্কে পাশ্চাত্যের জ্ঞান ঔপনিবেশিক শক্তির প্রয়োজনে উৎপাদিত হয়েছে। এটি শুধু বর্ণনা নয়, বরং এক ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগ।

এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রাচ্যকে একটি দুর্বল, অধীনস্থ সত্তা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে, যা পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও আধিপত্যের ওপর নির্ভরশীল। সাঈদ দেখিয়েছেন যে কীভাবে অরিয়েন্টালিস্টরা প্রাচ্যের ভাষা, ইতিহাস, ধর্ম ও সমাজকে এমনভাবে অধ্যয়ন করেছেন যাতে প্রাচ্যকে একটি অপরিবর্তনীয়, অনাধুনিক সত্তা হিসেবে দেখানো যায়। এই জ্ঞান উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরোপ তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং উপনিবেশিক শাসনের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

সাহিত্যে অরিয়েন্টালিজমের প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং সূক্ষ্ম। ঔপনিবেশিক যুগের বহু সাহিত্যকর্মে প্রাচ্যের চিত্রায়ণ ঘটেছে এই অরিয়েন্টালিস্ট কাঠামোর মধ্যে। এই সাহিত্য প্রাচ্যকে এক বহিরাগত, বিচিত্র ও রহস্যময় জগত হিসেবে উপস্থাপন করে, যা পাঠকের মনে উপনিবেশিক ধ্যানধারণা বদ্ধমূল করে তোলে। প্রাচ্যের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতিকে প্রায়শই সরলীকৃত, গতানুগতিক (stereotypical) এবং অমানবিক চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে।

জোসেফ কনরাডের “হার্ট অফ ডার্কনেস” (Heart of Darkness) উপন্যাসে আফ্রিকা মহাদেশকে এক অন্ধকার ও আদিম জঙ্গল হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যেখানে ইউরোপীয়দের আগমন জ্ঞান ও সভ্যতার আলো নিয়ে আসে। কুর্টজ চরিত্রটি ঔপনিবেশিকতার নৈতিক অধঃপতনকে তুলে ধরলেও, উপন্যাসের মূল পটভূমি আফ্রিকার এক রহস্যময় ও ভয়ংকর স্থান হিসেবেই রয়ে গেছে। এখানে আফ্রিকা বা তার অধিবাসীদের নিজস্ব কোনো কণ্ঠস্বর নেই; তারা কেবল ইউরোপীয় অ্যাডভেঞ্চার ও আবিষ্কারের প্রেক্ষাপট হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। এই উপন্যাসে কনরাড আফ্রিকার অধিবাসীদেরকে এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যেন তারা মানুষ নয়, বরং প্রাকৃতিক দৃশ্যের অংশ। এটি অরিয়েন্টালিজমের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য—অন্যকে মানবিক মর্যাদার বাইরে স্থাপন করা।

রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের “কিম” (Kim) এবং “দ্য হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন” (The White Man’s Burden) কবিতায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে এক মহৎ দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিপলিংয়ের লেখায় ভারত এক বিচিত্র ও বর্ণিল স্থান হলেও, এখানকার মানুষেরা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকতে বাধ্য, কারণ তারা নিজেদের শাসন করার মতো যথেষ্ট উন্নত নয়। এটি ছিল ঔপনিবেশিকতার এক প্রচ্ছন্ন ন্যায্যতা প্রদান। কিপলিং ব্রিটিশদেরকে এমন এক মহান জাতিরূপে দেখিয়েছেন, যাদের দায়িত্ব হলো ‘অসভ্য’ জাতিগুলোকে সভ্যতার পথে নিয়ে আসা, যদিও এই পথ তাদের জন্য বহু দুর্ভোগ নিয়ে আসে।

শুধুমাত্র ইউরোপীয় সাহিত্যেই নয়, উপনিবেশোত্তর সাহিত্য (Postcolonial Literature) এবং প্রাচ্যের নিজস্ব সাহিত্যেও এর প্রভাব দেখা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই সাহিত্য অরিয়েন্টালিস্ট ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। চিনুয়া আচেবের “থিংস ফল অ্যাপার্ট” (Things Fall Apart) উপন্যাসে তিনি ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে একটি স্বতন্ত্র আফ্রিকান দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। আচেবে কনরাডের ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’-এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই উপন্যাসটি লেখেন, যেখানে তিনি দেখান যে উপনিবেশ-পূর্ব আফ্রিকান সমাজে একটি সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধ জীবনধারা ছিল। তিনি উপন্যাসের মাধ্যমে কলোনির মানুষের কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে দেন।

ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা সাহিত্যিকরাও অরিয়েন্টালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হয়েছেন। যেমন, উপমহাদেশের সাহিত্যিকদের অনেকে প্রাচ্য সম্পর্কে ব্রিটিশদের দেওয়া ধারণাগুলোকে নিজেদের লেখায় অজান্তেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সাহিত্যিকরা উপনিবেশিক চিন্তাধারাকে চ্যালেঞ্জ করে এক স্বতন্ত্র প্রাচ্যবোধের সৃষ্টি করেছেন। তাঁর লেখায় প্রাচ্যকে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক ও রহস্যময় হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান, দর্শন ও মানবতার কেন্দ্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিনি পাশ্চাত্যের যান্ত্রিক সভ্যতার বিপরীতে প্রাচ্যের মানবিক মূল্যবোধকে তুলে ধরেছেন।

সাঈদের অরিয়েন্টালিজম তত্ত্বের আবেদন শুধু ঔপনিবেশিক যুগেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বে এর নতুন নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। বর্তমানের হলিউড সিনেমা, টেলিভিশন সিরিজ এবং কিছু সাহিত্যকর্মে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোকে প্রায়শই সন্ত্রাসবাদী, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বা রহস্যময় স্থানে হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এই চিত্রায়ণ অনেকটা পুরাতন অরিয়েন্টালিস্ট কাঠামোরই আধুনিক সংস্করণ।

বর্তমান সময়ের কিছু থ্রিলার উপন্যাসে মধ্যপ্রাচ্যের চরিত্রগুলোকে প্রায়শই একপেশে ও গতানুগতিক রূপে দেখানো হয়, যা তাদের সাংস্কৃতিক ও মানবিক জটিলতাকে উপেক্ষা করে। এটি নতুন ধরনের অরিয়েন্টালিজম, যা সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রাচ্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। সাঈদ তাঁর তত্ত্বে দেখিয়েছেন, প্রাচ্যকে বোঝার জন্য আমাদের উপনিবেশিক জ্ঞানের বাইরে যেতে হবে। আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের কাজ হলো এই পূর্বনির্ধারিত ছাঁচ ভেঙে প্রতিটি সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তায় উপস্থাপন করা।

এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম তত্ত্ব এক বিপ্লবী বিশ্লেষণ, যা আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে লুকায়িত ক্ষমতার সম্পর্ককে উন্মোচন করে। তাঁর তত্ত্বের মূল বার্তা হলো, জ্ঞান নিরপেক্ষ নয়, এটি সর্বদা ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। বিশ্বসাহিত্যে অরিয়েন্টালিজমের প্রভাব একটি সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করে: যখন আমরা অন্য কোনো সংস্কৃতিকে বর্ণনা করি, তখন আমাদের সচেতন থাকতে হবে আমরা কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি কিনা। সাহিত্যের কাজ কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি করা নয়, এটি মননশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার জন্মও দেয়। সাঈদের অরিয়েন্টালিজম তত্ত্ব আমাদের সেই সমালোচনামূলক দৃষ্টি দিতে সাহায্য করে, যার মাধ্যমে আমরা বিশ্বসাহিত্যকে আরও গভীর ও বহুস্তরীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে পারি। সাহিত্যকে যদি আমরা সত্যিই মানব সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে অরিয়েন্টালিস্ট দৃষ্টি থেকে মুক্তি লাভ করা অপরিহার্য। এটি শুধু প্রাচ্যের নয়, বরং পুরো মানবজাতির গল্পকে সম্মান জানানোর এক আহ্বান।

জীবনের অর্থহীনতার অর্থ কি?

আলবেয়ার কামু বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ফরাসি সাহিত্যিক ও দার্শনিক। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মনীষীর দর্শনকে অনেকেই অস্তিত্ববাদ (Existentialism) বলে ভুল করেন, যদিও তিনি নিজে এই মতবাদ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। তাঁর দর্শন মূলত অ্যাবসার্ডিজম (Absurdism) বা অর্থহীনতাবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

কামুর মতে, অ্যাবসার্ড হলো মানব জীবনের একটি মৌলিক সত্য। এটি এমন এক সংঘাত যা মানুষের অর্থ খোঁজার সহজাত আকাঙ্ক্ষা এবং মহাবিশ্বের চরম নীরবতা ও অর্থহীনতার মধ্যে বিদ্যমান। মানুষ সবসময় তার জীবনের একটি চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, একটি নৈতিক কাঠামো বা একটি সুস্পষ্ট অর্থ খুঁজে ফেরে। কিন্তু এই মহাবিশ্বের কোনো নিজস্ব উদ্দেশ্য নেই, এটি কোনো নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলে না এবং এটি মানুষের এই জিজ্ঞাসাগুলোর কোনো উত্তর দেয় না। এই সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় অ্যাবসার্ড। এটি কোনো একটি বস্তুগত অবস্থা নয়, বরং এটি মানুষ এবং জগতের মধ্যেকার একটি সম্পর্ক। কামু তাঁর ‘দ্য মিথ অফ সিসিফাস’ গ্রন্থে বলেন, “অ্যাবসার্ড হলো সেই সংঘাত যা মানুষের যুক্তিনির্ভর মন এবং জগতের অযৌক্তিক নীরবতার মধ্যেকার বিভাজন থেকে উদ্ভূত হয়।”

কামু মানুষের এই অর্থহীনতার মুখোমুখি হওয়ার পর তিনটি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন:

আত্মহত্যা : এটি অ্যাবসার্ডের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। আত্মহত্যা করে মানুষ জীবনের অর্থহীনতাকে এড়িয়ে যেতে চায়। কামুর মতে, এটি কোনো সমাধান নয়, কারণ এটি জীবনের সমস্যাকে শেষ করে দেয়, কিন্তু সমস্যাটির কোনো সমাধান করে না। এটি একটি পলায়ন, এক ধরনের পরাজয়।

বিশ্বাস বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আশ্রয় : এই প্রতিক্রিয়াতে মানুষ যুক্তিকে ত্যাগ করে এমন একটি অতিপ্রাকৃত বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আশ্রয় নেয় যা জীবনের অর্থহীনতাকে ব্যাখ্যা করে। কামু এটিকে “দার্শনিক আত্মহত্যা” (Philosophical Suicide) বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এটি অ্যাবসার্ডের মুখোমুখি হওয়া থেকে পালানো এবং এমন একটি ধারণাকে গ্রহণ করা যা যৌক্তিক প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নয়।

বিদ্রোহ : এটিই কামুর প্রস্তাবিত একমাত্র সঠিক প্রতিক্রিয়া। বিদ্রোহ হলো অ্যাবসার্ডকে পুরোপুরি মেনে নেওয়া, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ না করা। এর অর্থ হলো জীবনের অর্থহীনতাকে স্বীকার করে নিয়েও পূর্ণ উদ্যম নিয়ে বেঁচে থাকা। বিদ্রোহ মানে হলো প্রতিদিন জীবনের অর্থহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা, নিজের অস্তিত্বকে উদযাপন করা এবং এই অর্থহীনতাকে একটি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা। এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই মানুষ তার স্বাধীনতা এবং মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে। এটি কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ নয়, বরং এটি সৃষ্টিশীলতার চূড়ান্ত প্রকাশ। এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি তার জীবনের মূল্য তৈরি করে।

কামুর দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপক হলো সিসিফাসের পৌরাণিক কাহিনী। সিসিফাসকে দেবতাদের দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তাকে একটি বিশাল পাথরকে একটি পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তুলতে হবে এবং যখনই সে চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছাবে, পাথরটি আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবে। তাকে এই কাজটি অনন্তকাল ধরে করে যেতে হবে।

কামুর মতে, সিসিফাসের এই নিরর্থক কাজটি আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। আমাদের সকলের জীবনেই এমন অনেক কাজ আছে যা অর্থহীন মনে হয়।আমরা প্রতিদিন একই রুটিনে কাজ করি, একই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করি, কিন্তু প্রায়শই সেই লক্ষ্যগুলো আমাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

তবে কামু সিসিফাসের ট্র্যাজেডিতে একটি মহৎ দিক খুঁজে পান। যখন সিসিফাস পাহাড়ের চূড়া থেকে পাথর নিচে গড়িয়ে পড়তে দেখে, তখন সে মুহূর্তের জন্য তার নিয়তির দিকে তাকায়। এই মুহূর্তেই সে তার ভাগ্যের উপর জয়লাভ করে। সে তার নিয়তিকে জানে এবং তা সত্ত্বেও সে আবার পাথরটি ঠেলে তোলার জন্য নিচে নেমে যায়। এই সচেতনতা এবং প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই সে মুক্ত হয়। সে তার ভাগ্যকে গ্রহণ করে।

কামুর মতে, “আমাদের সিসিফাসকে সুখী কল্পনা করতে হবে।” কেন? কারণ যখন সে তার নিয়তিকে মেনে নেয় এবং তা সত্ত্বেও তার কাজ চালিয়ে যায়, তখন সে স্বাধীনতা অর্জন করে। সে তার জীবনের অর্থহীনতাকে অস্বীকার না করে, বরং তার মধ্যে নিজের উদ্দেশ্য খুঁজে নেয়। তকন সিসিফাসের পাথর ঠেলার কাজটি আর শাস্তি থাকে না, বরং তা তার নিজের ইচ্ছার প্রকাশে পরিণত হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে সে তার জীবনের অর্থহীনতাকে পরাজিত করে এবং নিজেকে একজন স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

আলবেয়ার কামুর দর্শন হতাশার বার্তা দেয় না, বরং এটি মানব জীবনের একটি গভীর আশাবাদ। তিনি আমাদের শেখান জীবনের কোনো চূড়ান্ত বা পূর্বনির্ধারিত অর্থ না থাকলেও, আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের অর্থ তৈরি করতে পারি। অ্যাবসার্ডের মুখোমুখি হয়ে আমরা হয় পলায়ন করতে পারি, অথবা বিদ্রোহ করতে পারি। কামু বিদ্রোহকেই বেছে নিতে বলেছেন। এটিই সত্যিকারের মানবীয় মর্যাদা। সিসিফাসের মতো, আমরাও আমাদের নিজেদের পাথর ঠেলে জীবনের অর্থ তৈরি করতে পারি। আমাদের জীবনে অর্থহীনতা থাকতে পারে, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং তাকে মোকাবিলা করে আমরা আমাদের অস্তিত্বকে মহিমান্বিত করতে পারি।

সিপিডি’র রিপোর্ট – ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে৫ গিগাওয়াট নবায়নর ৩যোগ্য শক্তির প্রয়োজন

সিপিডি-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার বিদ্যুতের ৩০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপন্ন করার লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রায় ৩৫ গিগাওয়াট (৩৫,৭১৩ মেগাওয়াট) নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন ক্ষমতার প্রয়োজন হবে। রিপোর্টের শিরোনাম “Revisiting Targets Set for Renewable Energy-based Power Generation by 2040: Projection of ‘SMART’ Target and Required Investment”। এটি ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি-এর প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মেহাদি হাসান শমিম উপস্থাপন করেন।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ থেকে ২০৪০ পর্যন্ত নবায়নযোগ্য শক্তির কার্যকর সংযোজনের জন্য প্রায় ৩৫.২ থেকে ৪২.৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎজালে নবায়নযোগ্য শক্তির অবদান মাত্র ৩.৬%, যেখানে গ্যাসভিত্তিক জ্বালানির অংশ ৪৩.৪%।

রিপোর্টে আরও সতর্ক করা হয়েছে, ফসিল ফুয়েল উৎপাদন ক্ষমতা আগামী বছরগুলিতে চাহিদার চেয়ে বেশি থাকবে। ২০৩০ সালে ফসিল ফুয়েল ভিত্তিক ক্ষমতা প্রায় ২৯,৭৭৩ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে, যা প্রক্ষেপিত চাহিদা ২২,৭০২ মেগাওয়াটের চেয়ে প্রায় ৪,০০০ মেগাওয়াট বেশি। এ ধরনের ভারসাম্যহীনতা নবায়নযোগ্য শক্তির গ্রহণযোগ্যতা সীমিত করতে পারে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ চেয়ারম্যান প্রফেসর এম রেজওয়ান খান বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, “পাওয়ার প্ল্যান্ট মালিকদের কাছে নিয়মিত অর্থ প্রদান না করা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে একটি বড় বাধা।”

বিপিপা-এর প্রাক্তন সভাপতি ইমরান করিম বলেন, বর্তমানে নবায়নযোগ্য শক্তি দেশের মোট উৎপাদনের মাত্র ২% এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% অর্জনের জন্য ১২–১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি দ্রুত টেন্ডার নিষ্পত্তি ও প্রাইভেট সেক্টরের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দেন।

রিপোর্টে বিভিন্ন নীতি প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: উৎস-নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, মধ্যবর্তী লক্ষ্য ২০৩০ ও ২০৩৫-এর জন্য নির্ধারণ, ফসিল ফুয়েল ধাপে ধাপে বন্ধ করার পরিকল্পনা প্রকাশ, গ্রিড আধুনিকীকরণ, স্টোরেজ সিস্টেম স্থাপন এবং নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ আমদানি। এছাড়া মাল্টিল্যাটারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ক্লাইমেট ফান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন পাওয়ার গ্রিড চেয়ারম্যান রেজওয়ান খান, প্রাক্তন বিপিপা সভাপতি ইমরান করিম, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সহকারী অধ্যাপক শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান, ইইউ ডেলিগেশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার তানজিনা দিলশাদ এবং বিএপিডিবি আইপিপি সেল-৩-এর পরিচালক জারিফা খাতুন। সেশনটি পরিচালনা করেন সিপিডি-এর গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুহারে শীর্ষে বাংলাদেশ, বিশ্বে অবস্থান দ্বিতীয়

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুহারে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে এবং বিশ্বব্যাপী মৃত্যুহারের দিক থেকে দেশটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংলাপ আগস্ট ২০২৫: প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও নিরসন’ শীর্ষক সমন্বয় সভায় নাগরিক সচেতনতা ও বহুমাত্রিক উদ্যোগের ওপর জোর দেয়া হয়।

সভায় প্রকাশিত পূর্বাভাস প্রতিবেদনে জানানো হয়, চলতি আগস্ট ও আসন্ন সেপ্টেম্বর মাস ডেঙ্গুর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। আগস্টে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে পারে এবং হাসপাতালগুলোতে ভর্তির চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। তবে বর্ষা শেষ হওয়ার পর অক্টোবরে সংক্রমণ কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সভায় বক্তারা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন। তাদের মতে, জনগণের সচেতনতার অভাব, সঠিকভাবে কীটনাশক প্রয়োগ না করা, অপর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং জলবায়ুগত প্রভাব মশার প্রজনন বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বাসাবাড়িতে প্রবেশে বাধা, কীটনাশকের প্রতি মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শুধুমাত্র ফগিংকে কার্যকর সমাধান হিসেবে ধরে নেওয়ার ভ্রান্ত ধারণা পরিস্থিতিকে জটিল করছে।

ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, বর্তমানে ব্যবহৃত লার্ভিসাইডের কার্যকারিতা যাচাই করতে একাধিক স্বীকৃত ল্যাবে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। মশক কর্মীদের কাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে মনিটরিংয়ের ফলে পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি এসেছে। এছাড়া ডেঙ্গু ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কিট ও সরঞ্জাম সরবরাহের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে।

সভায় বিশেষজ্ঞরা শুধু ডেঙ্গুই নয়, বরং জিকা ও চিকুনগুনিয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকির দিকেও সতর্ক করেন। তারা বলেন, এসব ভাইরাসবাহিত রোগ প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ ও নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত সার্ভে পরিচালনা করে মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ সভায় বলেন, “ফুটপাত দখল করে বসা বাজার শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কঠিন করে তুলছে, যা মশার প্রজননকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা রাতভর শহরের আবর্জনা পরিষ্কার করি, কিন্তু দুপুরের মধ্যেই আবার তা জমে যায়। ডেঙ্গু মোকাবেলা শুধু সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একক দায়িত্ব নয়, বরং এর জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময়োপযোগী উদ্যোগ, সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।

নৈরাশ্যবাদ ডিজাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ – লুসি ইস্টহোপ

“ডিজাইনে নৈরাশ্যবাদকে অন্তর্ভুক্ত করা একটি কঠিন কাজ। যদি আপনি ভাবেন যে আপনার করা ডিজাইনে কোনো কিছুই তৈরি হবে না, সঠিকভাবে কাজ করবে না, বা সফল হবে না, তাহলে আপনি আর কিছুই ডিজাইন করতে চাইবেন না। কিন্তু নৈরাশ্যবাদও ডিজাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আশাবাদ কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করে, কিন্তু তার বিষণ্ণ সঙ্গী, অর্থাৎ নৈরাশ্যবাদ, নিশ্চিত করে যেন কাজটি সঠিকভাবে করা হয়।

“ব্যর্থতাকে বুঝতে হলে ডিজাইনারদের একটি বিতর্কিত ধারণা মেনে নিতে হবে: যে কোনো ব্যর্থতার বীজ বহু বছর আগেই বোনা হয়। এর জন্য প্রয়োজন কল্পনাশক্তি। এর জন্য আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত, বা কোনো পূর্ব-সতর্কতা ছাড়া ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের ধারণাটিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন।”

“একটি বিধ্বংসী ব্যর্থতা ঘটে যাওয়ায় রয়েছে দারুণ ব্যঙ্গাত্মক এক বাস্তবতা। যা ঘটেছিল টাইটানিকের মিশনের সময় উত্তর আটলান্টিকের ৩.৮ কিলোমিটার গভীরে। দুই ট্র্যাজেডি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, মূলত অতিরিক্ত আশাবাদের কারণে। অবাধ আশাবাদ বিপর্যয় ডেকে আনে।”

নরওয়েতে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক CO₂ ভূ-সংরক্ষণ প্রকল্প চালু

নরওয়ের উপকূলে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক কার্বন সংরক্ষণ পরিষেবা “নর্দার্ন লাইটস” (Northern Lights) তাদের প্রথম CO2 নিঃসরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

নর্দার্ন লাইটস কনসোর্টিয়ামটি তেল শিল্পের বড় কোম্পানি Equinor, Shell এবং TotalEnergies দ্বারা পরিচালিত। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো ইউরোপের বিভিন্ন শিল্প স্থাপনাগুলি থেকে ধোঁয়া ও উৎপাদিত CO2 সংগ্রহ করে তা স্থায়ীভাবে সমুদ্রতলের নিচে সংরক্ষণ করা, যাতে এই গ্যাস বাতাসে মুক্ত না হয় এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধে সাহায্য করে।

নর্দার্ন লাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম হেইন জানিয়েছেন, “আমরা নিরাপদভাবে প্রথম CO2 সংরক্ষণ করেছি। আমাদের জাহাজ, সুবিধা এবং কূপগুলি এখন সম্পূর্ণভাবে কার্যক্রমে রয়েছে।”

প্রকল্পটি কার্যকর করতে, প্রথমে CO2 তরল আকারে রূপান্তরিত করা হয় এবং নরওয়ের পশ্চিম উপকূলের বার্গেনের কাছে অবস্থিত Oygarden টার্মিনালে জাহাজে পরিবহন করা হয়। এরপর তা বড় ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করা হয় এবং ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে সমুদ্রতলের প্রায় ২.৬ কিলোমিটার গভীরে স্থায়ীভাবে সঞ্চিত করা হয়।

CO2 সংগ্রহ ও সংরক্ষণ (Carbon Capture and Storage – CCS) প্রযুক্তি জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC) এবং আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) দ্বারা বৈশ্বিক জলবায়ু রক্ষার জন্য প্রস্তাবিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বিশেষ করে সিমেন্ট, ইস্পাত ও অন্যান্য এমন শিল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, যা সহজে কার্বন নিরপেক্ষ করা সম্ভব নয়।

প্রথম CO2 নিঃসরণটি জার্মানির Heidelberg Materials সিমেন্ট কারখানা থেকে নেওয়া হয়েছে, যা নরওয়ের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ব্রেভিকে অবস্থিত।তবে CCS প্রযুক্তি জটিল এবং ব্যয়বহুল হওয়ায় এটি অর্থনৈতিকভাবে এখনও সীমিত। ইউরোপীয় কার্বন বাজারে “দূষণ অনুমতি” কেনা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য CCS-এর চেয়ে বেশি লাভজনক।

এখন পর্যন্ত নর্দার্ন লাইটস ইউরোপে মাত্র তিনটি বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে একটি নেদারল্যান্ডসের Yara অ্যামোনিয়া কারখানার সাথে, দুটি ডেনমার্কের Orsted-এর বায়োফুয়েল কারখানার সাথে এবং একটি সুইডেনের স্টকহোম এক্সারজি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাথে।

নরওয়েজিয়ান সরকারের অর্থায়নে এই প্রকল্পের বার্ষিক CO2 সংরক্ষণ ক্ষমতা ১.৫ মিলিয়ন টন। আশা করা হচ্ছে, দশকের শেষে এটি পাঁচ মিলিয়ন টনে পৌঁছাবে। এটি বিশ্বব্যাপী কার্বন নিরপেক্ষ শিল্প স্থাপনার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দেশে দারিদ্র বেড়েছে ২৮%

তিন বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য কমেনি, উল্টো বেশ বেড়েছে। দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিশিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র ওঠে এসেছে। ‘ইকনোমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। পিপিআরসির গবেষণা অনুসারে অতি দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালের অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। ২০২৫ সালে এসে অতি দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫–এ। এর মানে হলো, গত তিন বছরের মধ্যে দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এখনো ১৮ শতাংশ পরিবার যেকোনো সময় গরিব হয়ে যেতে পারে। গত মে মাসে ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ৩৩ হাজার ২০৭ জন ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়।

পিপিআরসি বলেছে, দেশের এখন তিন ধরনের সংকটের প্রভাব চলমান আছে। এগুলো হলো—কোভিড (২০২০-২০২২), মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। পিপিআরসি আরও বলেছে, গত বছরের আগস্টের পর ঘুষ কমলেও তা বন্ধ হয়নি। গত বছরের আগস্ট মাসের আগে গবেষণায় মতামত প্রদানকারীদের ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ সেবা নিতে ঘুষ দিয়েছেন। আগস্ট মাসের পর এই হার ৩ দশমিক ৬৯–এ নেমেছে। সবচেয়ে বেশি ঘুষ দেওয়া হয়েছে সরকারি অফিসে। এর পরে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের বেশি ঘুষ দিয়েছে মানুষ।

পিপিআরসি গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে শহরের পরিবারের মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়ে গেছে। শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। ২০২২ সালে শহরের একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা।

অন্যদিকে গ্রামের পরিবারের গড় আয় কিছুটা বেড়েছে। গ্রামের একটি পরিবারের গড় আয় ২৯ হাজার ২০৫ টাকা, খরচ ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। ২০২২ সালে গ্রামের পরিবারের গড় আয় ছিল ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা। সার্বিকভাবে জাতীয়ভাবে একটি পরিবারের মাসে গড় আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। খরচ হয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। সঞ্চয় নেই বললেই চলে।

একটি পরিবার কোন খাতে কত খরচ করে, এর একটি চিত্র দিয়েছে পিপিআরসি। সেখানে দেখা গেছে, একটি পরিবারের মাসের মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাবার কেনায়। একটি পরিবার খাবার কিনতে মাসে গড়ে ১০ হাজার ৬১৪ টাকা খরচ করে। এ ছাড়া প্রতি মাসে শিক্ষায় ১ হাজার ৮২২ টাকা, চিকিৎসায় ১ হাজার ৫৫৬ টাকা, যাতায়াতে ১ হাজার ৪৭৮ টাকা ও আবাসনে ১ হাজার ৮৯ টাকা খরচ হয়।

অনুষ্ঠানে পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারও সংগত কারণে ক্ষুদ্র অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি (পিপলস লেন্স) থাকা খুবই জরুরি হয়ে গেছে। শুধু জিডিপির ওপর আলোচনাটা সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিকের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে।

হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় পাঁচটি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। প্রথমত আমাদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রনিক রোগ মোকাবিলার জন্য একটি নতুন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন। নারীপ্রধান পরিবারগুলো সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরে পড়ে আছে, তাই এদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। এছাড়া ঋণের বোঝা বাড়ছে, যা একটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠছে। চতুর্থত, ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা। এটি এখনো ব্যাপক আকারে হয়নি, তবে ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং যা উদ্বেগজনক। স্যানিটেশন সংকট উত্তরণ করে এসডিজি অর্জনের জন্য আমাদের হাতে মাত্র পাঁচ বছর আছে, কিন্তু এখনো প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ নন-স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করছে।ফলে নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কর্মসংস্থান নিয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, আমাদের মাঝে এখন কর্মসংস্থানের জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বেকারত্বের দুর্যোগের বাস্তবতার মধ্যে আমরা অবস্থান করছি। কর্মসংস্থান নিয়ে বড় ধরনের ভাবনা এবং জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। এ বিষয়ে এখনই আমাদের আলোচনা এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ট্রয় যুদ্ধের মহিমা থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হতাশায় সাহিত্যে যুদ্ধের আখ্যান

যুদ্ধ মানব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একইসাথে এই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ ও বীরত্ব বারবার সাহিত্যের পাতায় উঠে এসেছে। সাহিত্য যুদ্ধকে শুধু ঘটনার বিবরণ হিসেবেই তুলে ধরেনি, বরং এর মানবিক, নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে।

সাহিত্যে যুদ্ধের প্রথম ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলন দেখা যায় হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড-এ। এই মহাকাব্যে ট্রয় যুদ্ধের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যেখানে দেব-দেবী ও মানুষেরা একাকার। ইলিয়াড মূলত বীরত্ব, সম্মান ও ভাগ্যের ওপর জোর দেয়। এখানে যুদ্ধ হলো বীরদের শৌর্য প্রদর্শনের চূড়ান্ত ক্ষেত্র। অ্যাকিলিস, হেক্টর, ওডিসিয়াসের মতো চরিত্রগুলো তাদের বীরত্ব ও নৈতিকতার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। হোমারের মতে, যুদ্ধ হলো মহিমান্বিত এক কর্ম, যেখানে বীরেরা অমরত্ব লাভ করে।
এই মহাকাব্যগুলোতে যুদ্ধের ভয়াবহতা থাকলেও, তা প্রায়শই বীরত্বের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত। যুদ্ধকে দেখা হতো এক নিয়তি হিসেবে, যা এড়ানো অসম্ভব। যোদ্ধারা ব্যক্তিগত আবেগ বা ভয়কে ছাপিয়ে গোত্রের সম্মান ও দেবতাদের সন্তুষ্টির জন্য লড়াই করত। এখানে যুদ্ধের মানবিক দিকগুলো – যেমন ট্রমা, মানসিক যন্ত্রণা, বা পরিবারের ওপর এর প্রভাব – তেমনভাবে গুরুত্ব পায়নি। বরং, যুদ্ধ ছিল এক মহৎ উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে মানব চরিত্র তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর সময়ে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট কিছুটা পরিবর্তিত হয়। উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ঐতিহাসিক নাটকগুলো, যেমন হ্যামলেট বা হেনরি V, যুদ্ধে শুধুমাত্র বীরত্ব নয়, বরং ক্ষমতা, নৈতিকতা ও মানবিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। শেক্সপিয়র দেখিয়েছেন যুদ্ধ শুধু রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা রাজনৈতিক চক্রান্ত, বিশ্বাসঘাতকতা ও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল। তার চরিত্রগুলো শুধুমাত্র যোদ্ধা নয়, বরং এমন মানুষ যাদের মনে ঘৃণা, লোভ ও ভালোবাসার মতো জটিল আবেগ কাজ করে।

শেক্সপিয়রের লেখায় যুদ্ধ এক ধরনের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের দুর্দশা প্রায়শই উপেক্ষিত। তবে তিনি যুদ্ধের পেছনের কারণ এবং তার ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হেনরি V নাটকে রাজা তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে যে উদ্দীপনামূলক ভাষণ দেন, তা যুদ্ধের আপাত মহিমাকে তুলে ধরে, কিন্তু একইসাথে যুদ্ধের নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন জাগায়। শেক্সপিয়র যুদ্ধকে কেবল বাহ্যিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি, বরং একে মানুষের অন্তরের এক নৈতিক সংকট হিসেবে তুলে ধরেছেন।

১৯শ শতাব্দীতে রোমান্টিক আন্দোলনের সময়, সাহিত্যে যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ হয়। এই সময়ের লেখকেরা যুদ্ধকে প্রায়শই জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। যুদ্ধের মহিমা, দেশপ্রেমের জন্য আত্মত্যাগ, এবং বীরত্বের আদর্শ এই সময়ের কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছে।

আলফ্রেড টেনিসনের “The Charge of the Light Brigade” কবিতাটি ব্রিটিশ সৈন্যদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগের এক আবেগময় চিত্র তুলে ধরে, যদিও তাদের এই আত্মত্যাগ ছিল এক ভুল সামরিক আদেশের ফল।

তবে এই রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই যুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে আড়াল করে রাখে। এই সময়ে যুদ্ধ-বিরোধী সাহিত্যও রচিত হয়েছে, কিন্তু রোমান্টিক আদর্শের কারণে যুদ্ধের মহিমান্বিত রূপটিই বেশি জনপ্রিয় ছিল। রোমান্টিক কবিরা যুদ্ধকে এক ধরনের রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার হিসেবে দেখেছেন, যেখানে মৃত্যুর চেয়ে গৌরব অর্জনই ছিল মুখ্য।

সাহিত্যে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাঁকবদল আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। এই যুদ্ধ ছিল প্রযুক্তির কারণে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধগুলোর একটি। ট্রেঞ্চ যুদ্ধ, গ্যাস আক্রমণ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা সাহিত্যিকদের মনে এক গভীর ছাপ ফেলে। এই সময়ের লেখকেরা, যেমন উইলফ্রেড ওয়েন, সিগফ্রিড সাসুন বা এরিখ মারিয়া রেমার্ক, যুদ্ধের রোমান্টিক ধারণা ভেঙে চুরমার করে দেন।

রেমার্কের “All Quiet on the Western Front” উপন্যাসটি যুদ্ধের ভয়াবহতা, সৈনিকদের মানসিক যন্ত্রণা এবং যুদ্ধের অর্থহীনতাকে নির্মমভাবে তুলে ধরে। এই উপন্যাসে কোনো বীরত্ব নেই, আছে কেবল হতাশা, ভয় ও মৃত্যু। সৈনিকেরা এখানে দেশপ্রেমের জন্য লড়ছে না, বরং তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো কোনোভাবে বেঁচে থাকা। এই সময়ে রচিত কবিতাগুলো, যেমন ওয়েনের “Dulce et Decorum Est,” যুদ্ধের ভয়াবহতার এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এবং যুদ্ধের আপাত মহিমান্বিত আদর্শকে উপহাস করে। এই সময়ের সাহিত্য যুদ্ধকে আর বীরত্বের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেনি, বরং একে মানবতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে-এর মতো লেখকেরা যুদ্ধের সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রা দেন। হেমিংওয়ের “A Farewell to Arms” উপন্যাসে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে এক ব্যক্তিগত ও নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। তার লেখায় যুদ্ধ কোনো মহাকাব্যিক ঘটনা নয়, বরং ব্যক্তির ওপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবই মুখ্য। হেমিংওয়ে যুদ্ধের ট্রমা, হতাশা ও মানসিক ক্ষতকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তার চরিত্রগুলো প্রায়শই নীরব, তাদের যন্ত্রণা প্রকাশ পায় তাদের অকথিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ও তার পরে যুদ্ধ সাহিত্য আরও বিশ্লেষণাত্মক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপ নেয়। জোসেফ হেলারের “Catch-22” উপন্যাসে যুদ্ধের অযৌক্তিকতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই সময়ে লেখা উপন্যাসগুলোতে যুদ্ধ শুধু সৈনিকের জীবন নয়, বরং সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব, হলোকাস্টের মতো ভয়াবহ ঘটনা এবং যুদ্ধ পরবর্তী সমাজের নৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে।

হোমারের মহাকাব্য থেকে শুরু করে হেমিংওয়ের উপন্যাসে যুদ্ধের বিবর্তন এক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। প্রথমে যুদ্ধ ছিল বীরত্ব ও নিয়তির এক মহৎ ক্ষেত্র, যা সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এই রোমান্টিক ধারণা ভেঙে দেয় এবং যুদ্ধের বাস্তবতাকে তার সমস্ত ভয়াবহতা সহ তুলে ধরে। অবশেষে হেমিংওয়ের মতো আধুনিক লেখকেরা যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেন, যা যুদ্ধের সাহিত্যকে এক নতুন গভীরতা প্রদান করে। যুদ্ধ সব সময়ই সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে, তবে সময়ের সাথে সাথে এর উপস্থাপনার ধরণ পাল্টেছে। মহিমা থেকে বাস্তবতায় – বাহ্যিক বীরত্ব থেকে মানুষের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণায়।

ভারতে তৈরি হবে iPhone 17, রপ্তানি করা হবে যুক্তরাষ্ট্রেও

সম্প্রতি India Times Bangla-এর একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অ্যাপল তাদের পরবর্তী প্রজন্মের iPhone 17 ভারতে উৎপাদন করার পরিকল্পনা করেছে। শুধু তাই নয়, এই ফোনটি ভারত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও রপ্তানি করা হবে। এই খবরটি ভারতের জন্য এক বিশাল সাফল্য এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে দেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

ভারতের প্রযুক্তি উৎপাদন ক্ষমতা এবং দক্ষতা এখন বিশ্বমানের। গত কয়েক বছর ধরে “মেক ইন ইন্ডিয়া” (Make in India) প্রকল্পের অধীনে ভারত সরকার ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে বিশেষ নজর দিয়েছে। এর ফলস্বরূপ, অ্যাপল-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভারতে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে আগ্রহী হয়েছে। অ্যাপল ইতিমধ্যেই ভারতে বেশ কয়েকটি মডেলের আইফোন উৎপাদন করছে এবং iPhone 17-এর মতো একটি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাগশিপ মডেলের উৎপাদন ভার ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এক নতুন আস্থার প্রতীক।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। ভারতের দক্ষ শ্রমশক্তি এবং তুলনামূলকভাবে কম উৎপাদন খরচ অ্যাপল-এর মতো সংস্থার জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভারত সরকারের নীতি এবং প্রণোদনাগুলো বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। এছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে অ্যাপল তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো চীনের বাইরে সরিয়ে আনতে চাইছে। এক্ষেত্রে ভারত একটি আদর্শ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।

তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে কিছু চ্যালেঞ্জও আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো কিছু মার্কিন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। বিশেষত ট্রাম্পের ৫০% শুল্ক আরোপের হুমকি সত্ত্বেও অ্যাপল তাদের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি। এটি অ্যাপল-এর দীর্ঘমেয়াদী কৌশল এবং ভারতের উৎপাদন ক্ষমতার প্রতি তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিফলন। এই পদক্ষেপটি শুধুমাত্র অ্যাপল-এর জন্য নয়, ভারতের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এতে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে তিন হাজার জলপাই গাছ উপড়ে ফেলল ইসরায়েলি সেনারা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লার কাছে অবস্থিত আল-মুগাইর গ্রামে ইসরায়েলি সেনারা প্রায় তিন হাজার জলপাইগাছ উপড়ে ফেলেছে। গ্রাম পরিষদের উপপ্রধান মারজুক আবু নাইম ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফাকে জানান, শনিবার ভোর থেকে সেনারা গ্রামে প্রবেশ করে ৩০টিরও বেশি বাড়িতে ঢুকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পদ ও গাড়ি ধ্বংস করেছে। আল-মুগাইর গ্রামটির আয়তন মাত্র ০.২৭ বর্গকিলোমিটার এবং এখানে প্রায় চার হাজার মানুষ বসবাস করেন।

জলপাইগাছ ফিলিস্তিনিদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি সেনারা দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে আসছেন। ফিলিস্তিনি পক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই কাজ মূলত ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব জমি থেকে উৎখাত করার প্রচেষ্টার অংশ। গবেষক হামজা জুবেইদাত বলেন, “১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীরের শহর ও গ্রাম থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করে আসছে। যা ঘটছে, তা নতুন কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার অংশ।”

ইসরায়েলি সেনারা এই জলপাইগাছগুলোকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবি, গাছগুলো গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে আসা প্রধান সড়কটির নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছিল। তবে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনি জমি দখল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর ২,৩৭০-এর বেশি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে রামাল্লা এলাকায় (৫৮৫টি), এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় নাবলুস এলাকা (৪৭৯টি)। একই সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে কমপক্ষে ৬৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১২৯ জন শিশু।

জুবেইদাতের মতে, আল-মুগাইরের কৃষি সম্প্রদায়ের ইতিহাস বহু প্রাচীন। গ্রামের মানুষ মূলত কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। তিন হাজারেরও বেশি জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা, পানির উৎস দখল এবং খামার ও পানি উৎসের কাছে প্রবেশে বাধা দেওয়া ফিলিস্তিনিদের খাদ্য ও পানির নিরাপত্তাকে বিপজ্জনকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। তিনি বলেন, “এই এলাকা রামাল্লার সবচেয়ে উর্বর ভূমিগুলোর একটি। কৃষি ও জলবায়ু সরঞ্জাম ধ্বংস করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রা আরও অসচ্ছল হচ্ছে।”

এদিকে গাজা উপত্যকাতেও ইসরায়েলি হামলা চলছেই। সাম্প্রতিক হামলায় ৬৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত হামলায় ৬২,৬০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, ফিলিস্তিনের এই চলমান সংকট মানবাধিকার ও স্থায়ী শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে।

এই ঘটনা শুধু একটি গ্রামের জলপাইগাছের ধ্বংস নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ক্রমবর্ধমান উচ্ছেদ, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তার হুমকি, এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনিদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করছে।