জীবনের অর্থহীনতার অর্থ কি?

আলবেয়ার কামু বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী ফরাসি সাহিত্যিক ও দার্শনিক। ১৯৫৭ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এই মনীষীর দর্শনকে অনেকেই অস্তিত্ববাদ (Existentialism) বলে ভুল করেন, যদিও তিনি নিজে এই মতবাদ থেকে দূরত্ব বজায় রাখতেন। তাঁর দর্শন মূলত অ্যাবসার্ডিজম (Absurdism) বা অর্থহীনতাবাদের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

কামুর মতে, অ্যাবসার্ড হলো মানব জীবনের একটি মৌলিক সত্য। এটি এমন এক সংঘাত যা মানুষের অর্থ খোঁজার সহজাত আকাঙ্ক্ষা এবং মহাবিশ্বের চরম নীরবতা ও অর্থহীনতার মধ্যে বিদ্যমান। মানুষ সবসময় তার জীবনের একটি চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, একটি নৈতিক কাঠামো বা একটি সুস্পষ্ট অর্থ খুঁজে ফেরে। কিন্তু এই মহাবিশ্বের কোনো নিজস্ব উদ্দেশ্য নেই, এটি কোনো নৈতিক মানদণ্ড মেনে চলে না এবং এটি মানুষের এই জিজ্ঞাসাগুলোর কোনো উত্তর দেয় না। এই সংঘাত থেকেই জন্ম নেয় অ্যাবসার্ড। এটি কোনো একটি বস্তুগত অবস্থা নয়, বরং এটি মানুষ এবং জগতের মধ্যেকার একটি সম্পর্ক। কামু তাঁর ‘দ্য মিথ অফ সিসিফাস’ গ্রন্থে বলেন, “অ্যাবসার্ড হলো সেই সংঘাত যা মানুষের যুক্তিনির্ভর মন এবং জগতের অযৌক্তিক নীরবতার মধ্যেকার বিভাজন থেকে উদ্ভূত হয়।”

কামু মানুষের এই অর্থহীনতার মুখোমুখি হওয়ার পর তিনটি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন:

আত্মহত্যা : এটি অ্যাবসার্ডের কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেওয়া। আত্মহত্যা করে মানুষ জীবনের অর্থহীনতাকে এড়িয়ে যেতে চায়। কামুর মতে, এটি কোনো সমাধান নয়, কারণ এটি জীবনের সমস্যাকে শেষ করে দেয়, কিন্তু সমস্যাটির কোনো সমাধান করে না। এটি একটি পলায়ন, এক ধরনের পরাজয়।

বিশ্বাস বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আশ্রয় : এই প্রতিক্রিয়াতে মানুষ যুক্তিকে ত্যাগ করে এমন একটি অতিপ্রাকৃত বা ধর্মীয় বিশ্বাসে আশ্রয় নেয় যা জীবনের অর্থহীনতাকে ব্যাখ্যা করে। কামু এটিকে “দার্শনিক আত্মহত্যা” (Philosophical Suicide) বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এটি অ্যাবসার্ডের মুখোমুখি হওয়া থেকে পালানো এবং এমন একটি ধারণাকে গ্রহণ করা যা যৌক্তিক প্রমাণের উপর ভিত্তি করে নয়।

বিদ্রোহ : এটিই কামুর প্রস্তাবিত একমাত্র সঠিক প্রতিক্রিয়া। বিদ্রোহ হলো অ্যাবসার্ডকে পুরোপুরি মেনে নেওয়া, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ না করা। এর অর্থ হলো জীবনের অর্থহীনতাকে স্বীকার করে নিয়েও পূর্ণ উদ্যম নিয়ে বেঁচে থাকা। বিদ্রোহ মানে হলো প্রতিদিন জীবনের অর্থহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করা, নিজের অস্তিত্বকে উদযাপন করা এবং এই অর্থহীনতাকে একটি শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা। এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই মানুষ তার স্বাধীনতা এবং মূল্যবোধ তৈরি করতে পারে। এটি কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ নয়, বরং এটি সৃষ্টিশীলতার চূড়ান্ত প্রকাশ। এই বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি তার জীবনের মূল্য তৈরি করে।

কামুর দর্শনের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপক হলো সিসিফাসের পৌরাণিক কাহিনী। সিসিফাসকে দেবতাদের দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তাকে একটি বিশাল পাথরকে একটি পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তুলতে হবে এবং যখনই সে চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছাবে, পাথরটি আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যাবে। তাকে এই কাজটি অনন্তকাল ধরে করে যেতে হবে।

কামুর মতে, সিসিফাসের এই নিরর্থক কাজটি আমাদের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। আমাদের সকলের জীবনেই এমন অনেক কাজ আছে যা অর্থহীন মনে হয়।আমরা প্রতিদিন একই রুটিনে কাজ করি, একই লক্ষ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করি, কিন্তু প্রায়শই সেই লক্ষ্যগুলো আমাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়।

তবে কামু সিসিফাসের ট্র্যাজেডিতে একটি মহৎ দিক খুঁজে পান। যখন সিসিফাস পাহাড়ের চূড়া থেকে পাথর নিচে গড়িয়ে পড়তে দেখে, তখন সে মুহূর্তের জন্য তার নিয়তির দিকে তাকায়। এই মুহূর্তেই সে তার ভাগ্যের উপর জয়লাভ করে। সে তার নিয়তিকে জানে এবং তা সত্ত্বেও সে আবার পাথরটি ঠেলে তোলার জন্য নিচে নেমে যায়। এই সচেতনতা এবং প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই সে মুক্ত হয়। সে তার ভাগ্যকে গ্রহণ করে।

কামুর মতে, “আমাদের সিসিফাসকে সুখী কল্পনা করতে হবে।” কেন? কারণ যখন সে তার নিয়তিকে মেনে নেয় এবং তা সত্ত্বেও তার কাজ চালিয়ে যায়, তখন সে স্বাধীনতা অর্জন করে। সে তার জীবনের অর্থহীনতাকে অস্বীকার না করে, বরং তার মধ্যে নিজের উদ্দেশ্য খুঁজে নেয়। তকন সিসিফাসের পাথর ঠেলার কাজটি আর শাস্তি থাকে না, বরং তা তার নিজের ইচ্ছার প্রকাশে পরিণত হয়। এই বিদ্রোহের মাধ্যমে সে তার জীবনের অর্থহীনতাকে পরাজিত করে এবং নিজেকে একজন স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

আলবেয়ার কামুর দর্শন হতাশার বার্তা দেয় না, বরং এটি মানব জীবনের একটি গভীর আশাবাদ। তিনি আমাদের শেখান জীবনের কোনো চূড়ান্ত বা পূর্বনির্ধারিত অর্থ না থাকলেও, আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের অর্থ তৈরি করতে পারি। অ্যাবসার্ডের মুখোমুখি হয়ে আমরা হয় পলায়ন করতে পারি, অথবা বিদ্রোহ করতে পারি। কামু বিদ্রোহকেই বেছে নিতে বলেছেন। এটিই সত্যিকারের মানবীয় মর্যাদা। সিসিফাসের মতো, আমরাও আমাদের নিজেদের পাথর ঠেলে জীবনের অর্থ তৈরি করতে পারি। আমাদের জীবনে অর্থহীনতা থাকতে পারে, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং তাকে মোকাবিলা করে আমরা আমাদের অস্তিত্বকে মহিমান্বিত করতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন