“… আমরা যাঁরা গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধিত্ব করছি, আমরাও মনে করি যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বা নৈতিক অধিকার নেই এই দেশে এই (আওয়ামী লীগ) নামে বা এই আদর্শ নিয়ে আর রাজনীতি করার। এটার লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কটা (আইনি কাঠামো) কী হবে, এ বিষয়ে সরকার এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া এগোলে আদালত থেকে সুপারিশ আসতে পারে, নির্বাচন কমিশন থেকে সুপারিশ আসতে পারে এবং রাজনৈতিক দলগুলোরও মতামত থাকবে। এসব বিবেচনায় হয়তো আমরা আওয়ামী লীগের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। তার আগে বিচার কার্যক্রমটা প্রধান। বিচারের মধ্য দিয়েই আমরা বুঝতে পারব আওয়ামী লীগের দল হিসেবে অংশগ্রহণ (গণহত্যায়) কতটুকু, দলটির নেতা-কর্মীদের কত অংশ জড়িত এবং কীভাবে অপরাধটা সংঘটিত করেছিলেন।
… আমাদের সমাজের একটা বাস্তবতা আছে। তখন জাতি নারীদের অংশগ্রহণকে সেলিব্রেট (স্বাগত) করেছে। কিন্তু রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি মানুষ এখনো ওইভাবে সেলিব্রেট করে না। আপনি দেখবেন, আমাদের যাঁরা নারী আন্দোলনকারী বা সমন্বয়ক আছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁরা কিন্তু নানা ধরনের ‘বুলিংয়ের’ শিকার হচ্ছেন। আমাদের রাজনীতিতে পেশি শক্তির ব্যবহার, মারামারি-হানাহানির সংস্কৃতি আছে, যেটা এখনো যায়নি। সেই জায়গা থেকে পরিবারগুলোর শঙ্কা থাকে। সমাজ তাঁদের নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। সেই জায়গা থেকে নারীদের বড় অংশ ঘরে ফিরে গেছে।
তারপরও আমি মনে করি তাদের মধ্যে এখনো সেই বিপ্লবী চেতনাটা আছে। তাঁরা আমাদের সঙ্গে নানাভাবে অংশগ্রহণ করতে চায়, যুক্ত থাকতে চায়। আমরাও বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করছি। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই একটা কর্মসূচি করেছেন জুলাই কন্যাদের নিয়ে, যে নারী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলায় আন্দোলনে ছিলেন। … নারীদের রাজনীতি বা নেতৃত্বে আরও বেশি অংশগ্রহণের জন্য আসলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটা দরকার।
… গণমাধ্যমের ওপর সরকারের জায়গা থেকে কোনো ধরনের চাপ নেই। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সরকার কিন্তু গণমাধ্যমকে সহযোগিতা করেছে।… তবে আমাদের রাজনৈতিকভাবে অনুসন্ধান করা উচিত, কেন জনগণের একটা অংশ গণমাধ্যমের ওপর ক্ষুব্ধ, গত ১৫ বছরে গণমাধ্যমের কী ভূমিকা ছিল। …কোন পরিস্থিতিতে বা কেন তারা সংবাদ প্রচার করতে পারেনি, কোন ধরনের চাপে তারা ছিল, গণমাধ্যমগুলোর জায়গা থেকেও আসলে এই বক্তব্যগুলো আসা প্রয়োজন।
… মানুষ চেয়েছিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়া যাবে… কিন্তু এই সরকার তো আগের সরকারের ধ্বংসাবশেষের ওপর তৈরি হয়েছে। আমরা আমলাতন্ত্র, পুলিশকে যে জায়গায় পেয়েছি… সরকারকে সেই জায়গা থেকে উঠে দাঁড়াতে হয়েছে। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা, ষড়যন্ত্র…। আগে শত্রু মনে হতো একটা, এখন মনে হচ্ছে চতুর্মুখী। নানা ধরনের শত্রু আছে। যেভাবে চাঁদাবাজি বেড়েছে… মানুষের তো এটাও প্রত্যাশা ছিল যে গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হবে। যে দলগুলো অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছে, তাদের কর্মীরাই তো চাঁদাবাজিতে। সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা তো তাদের পক্ষ থেকেও লাগবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে শুধু গ্রেপ্তার করে বা আইনশৃঙ্খলা দিয়ে তো এটার পরিবর্তন হবে না।
… আমরা যদি সংস্কার ছাড়া নির্বাচন করে কোনো দলের হাতে ক্ষমতা দিয়ে দিই, তাদের জন্যই সরকার চালানো কঠিন হবে। মানুষের প্রত্যাশা যদি পূরণ না হয়, পরিবর্তন যদি না দেখে, মানুষের সেই ক্ষোভ কিন্তু যাবে না। … (জনপ্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে সরকারকে) আমি ৫০ শতাংশের কিছু কম দেব। সরকারের সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ আছে। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছাটা সম্পূর্ণভাবে আছে। যদি রাজনৈতিক দল, অভ্যুত্থানের শক্তি এবং সাধারণ মানুষের জায়গা থেকে আরও সহযোগিতা পাওয়া যায়, আমরা আশা করি সরকার আরও কার্যকর হতে পারবে। … নানা আন্দোলন কিন্তু সেভাবে আগের মতো দমন করা হচ্ছে না। আমরা সেটা করতেও চাই না। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা হচ্ছে। “


