Home Blog Page 164

লুসি রোজের বেস্টসেলার ‘দ্য ল্যাম্ব’ – সামাজিক অন্ধকারের ভয়াবহ প্রতিচিত্র

২০২৫ সালে প্রকাশিত লুসি রোজের প্রথম উপন্যাস দ্য ল্যাম্ব সাহিত্য জগতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটি শুধুমাত্র একটি উপন্যাস নয়, সাহিত্যে ভয়ের নতুন সংজ্ঞা, নারীবাদী শক্তি এবং সমাজের অন্ধকার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করার এক দুঃসাহসী প্রচেষ্টা। প্রকাশের পরপরই এটি সানডে টাইমস বেস্টসেলার তালিকায় উঠে আসে এবং সাহিত্যবোদ্ধাদের মধ্যে এক তীব্র আলোচনা তৈরি করে। উপন্যাসটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এর অস্বাভাবিক ও শকিং কাহিনী, যা একদিকে যেমন ভয়াবহ, অন্যদিকে তেমনই মানবিক গভীরতায় পূর্ণ।

লুসি রোজ ইংল্যান্ডের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের জগতে এক পরিচিত নাম। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং-এর প্রতি আগ্রহী ছিলেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণেও দক্ষ, যার প্রতিফলন আমরা দ্য ল্যাম্ব উপন্যাসের সিনেম্যাটিক ভাষার মধ্যে পাই। তার লেখনীতে আধুনিক গথিক, সাইকোলজিক্যাল হরর এবং নারীবাদী টোনের মিশ্রণ দেখা যায়, এ সব তাকে বর্তমান সময়ের অন্যতম আলোচিত লেখকে পরিণত করেছে। তার লেখার মূল উপজীব্য হলো মানবিক দুর্বলতা, নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং সীমারেখা অতিক্রম করার মনস্তাত্ত্বিক প্রয়াস। দ্য ল্যাম্ব-এর মাধ্যমে তিনি আধুনিক সাহিত্যে নারীদের উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা ‘ফেমগোর’ ঘরানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

প্রথমেই বলা দরকার, দ্য ল্যাম্ব শুধুমাত্র ক্যানিবালিজম বা হিংস্রতা নিয়ে লেখা কোনো সাধারণ হরর উপন্যাস নয়। বরং এক গভীর প্রতীকী কাহিনী, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন, সমাজের নিষ্ঠুরতা এবং অস্তিত্বের সংকট একটি জটিল আখ্যানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন তরুণী, যিনি এক বিপর্যস্ত জীবনের মধ্য দিয়ে যান এবং এমন এক অবস্থায় পৌঁছান যেখানে বেঁচে থাকার জন্য তাকে নিজের আদর্শের বিপরীতে যেতে হয়। সমাজের নিপীড়ন ও নির্যাতনের মুখে পড়ে তার একমাত্র পথ হয়ে ওঠে এক চরম সিদ্ধান্ত নেওয়া—মানুষের মাংস খাওয়া। কিন্তু এটি শুধু শারীরিকভাবে বেঁচে থাকার লড়াই নয় বরং এটি এক গভীর মানসিক ও অস্তিত্বের সংকট, যেখানে প্রশ্ন উঠে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কতদূর যাওয়া সম্ভব!

ক্যানিবালিজম এখানে শুধু হিংস্রতার প্রকাশ নয় বরং সমাজের লোভ, নিষ্ঠুরতা, ও নির্যাতনের প্রতিচিত্র। এখানে নারী চরিত্রটি সমাজের দ্বারা শোষিত হয়, অবহেলিত হয়, এবং যখন সমস্ত বিকল্প শেষ হয়ে যায়, তখনই সে চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। এই উপন্যাস নারীবাদী সাহিত্যের একটি দুঃসাহসী সংযোজন। এটি নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, সমাজের আরোপিত নিয়ম, এবং আত্মরক্ষার মনস্তাত্ত্বিক সংগ্রামের গল্প। এখানে নায়িকা শুধু শিকার নয় বরং সে তার নিজের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ‘ল্যাম্ব’ শব্দটি বিশেষ করে খ্রিস্টান ধর্মীয় প্রতীকে সাধারণত নির্দোষতা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। লুসি রোজ এই নাম ব্যবহার করে এক অমোঘ প্রশ্ন তুলেছেন—কোনো ব্যক্তি কি সত্যিকার অর্থে নির্দোষ থাকতে পারে, যদি তার অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্য অপরাধমূলক কিছু করতে হয়?

উপন্যাসটি প্রকাশের পর থেকেই এটি সাহিত্য সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অনেকে এটিকে “একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সাহসী উপন্যাস” বলে আখ্যায়িত করেছেন, আবার অনেকে এর চরম সহিংসতা ও গ্রাফিক উপস্থাপনার কারণে একে বিতর্কিত বলেও অভিহিত করেছেন। বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক রেবেকা কনরাড বলেন, “‘দ্য ল্যাম্ব’ শুধুমাত্র ভয়াবহ ও রক্তাক্ত উপন্যাস নয়, এটি আধুনিক সমাজের একটি নগ্ন প্রতিফলন। লুসি রোজ দেখিয়েছেন, আমরা কেবল হিংস্র জগতের অংশই নই, বরং নিজেরাই একসময় হিংস্র হয়ে উঠতে পারি।”

অন্যদিকে দ্য গার্ডিয়ান এটিকে “একটি নতুন ঘরানার জন্ম” বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে যে এটি কেবল সাহিত্য নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক এক শক্তিশালী ভাষ্য। সাহিত্য জগতে ‘ফেমগোর’ ঘরানার উত্থান এই উপন্যাসের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পেয়েছে। নারীর শক্তি ও ভয়াবহ বাস্তবতাকে একত্রিত করে এটি নারীবাদী সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত কাজ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে দ্য ল্যাম্ব নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে, ইতিমধ্যেই এটি একটি চলচ্চিত্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা চলছে বলে জানা গেছে। যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তবে উপন্যাসটির কল্পনাপ্রবণ, গ্রাফিক ও ভয়াবহ দৃশ্যাবলী রূপালী পর্দায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।

সাহিত্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে লুসি রোজের এই উপন্যাসের মাধ্যমে ফেমগোর ঘরানাটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে এই ঘরানায় আরও সাহিত্যিক কাজ আসবে। একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যে দ্য ল্যাম্ব শুধু একটি উপন্যাস নয় বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করবে আমরা আসলেই কে? বেঁচে থাকার জন্য আমরা ছুটে ছুটে কতদূর যেতে পারি?

সাইবার সিকিউরিটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

0

ডিজিটাল দুনিয়া দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সাইবার সিকিউরিটি উন্নতির শীর্ষে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। তবে শক্তির সাথে আসে দায়িত্বও! সাইবার সিকিউরিটিতে AI-এর নৈতিক বাস্তবায়ন শুধুমাত্র একটি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়, এটি নৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু AI প্রযুক্তি আরও উন্নত হচ্ছে, এর ব্যবহার এবং ব্যবহারের নৈতিক গাইডলাইনগুলি সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা আবশ্যক। দ্বৈত চ্যালেঞ্জটি পরিষ্কার, ডিজিটাল সিস্টেম রক্ষা করতে AI-এর শক্তি ব্যবহার করা, তবে নৈতিক নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করা নিশ্চিত করা।

AI সাইবার সিকিউরিটি ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে, যেখানে এটি দুর্দান্ত গাণিতিক দক্ষতা নিয়ে সম্ভবত সাইবার হুমকিগুলিকে আগেভাগেই সনাক্ত করতে সাহায্য করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ৭৫% এরও বেশি কোম্পানি তাদের সাইবার সিকিউরিটি রক্ষায় AI-চালিত সমাধান ব্যবহার করছে, যা পাঁচ বছর আগে মাত্র ৪০% ছিল। কোম্পানিগুলি AI-এর উপর নির্ভরশীল হচ্ছে, কারণ এটি সাইবার আক্রমণগুলিকে সনাক্ত করতে এবং থামাতে অত্যন্ত দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে সক্ষম। AI সিস্টেমগুলি ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে এবং হুমকিগুলিকে ত্বরিতভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হওয়ায় সিকিউরিটি দলগুলি অনেক দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিতে পারে, ফলে মূল্যবান সময় বাঁচানো সম্ভব হয়।

তবে অপরাধীরা এখন আরও দক্ষ হয়ে উঠেছে, AI ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং স্ক্যাম এবং অত্যন্ত দ্রুত সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে, যা প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহজেই ভেদ করে ফেলছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাইবার অপরাধ একটি বহুমূল্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যার বার্ষিক ক্ষতি ১০.৫ ট্রিলিয়ন ডলার পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে AI-চালিত সুরক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। AI সিস্টেমের অন্যতম প্রধান নৈতিক সমস্যা হলো গোপনীয়তা। AI নেটওয়ার্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে, প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করতে এবং এমনকি আক্রমণ পূর্বাভাস দিতে সক্ষম, তবে এর মূল্য কি ব্যক্তি গোপনীয়তার ক্ষতির জন্য? নজরদারি এবং অবাঞ্ছিত নজরদারি করার মধ্যে সূক্ষ্ম সীমানা একটি বিতর্কিত বিষয়।

AI-চালিত সিস্টেমগুলি অনেক সময় অজান্তেই বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ডেটা সংগ্রহ করতে পারে, যা সুরক্ষা লক্ষ্য পূরণ করতে নৈতিক সীমা অতিক্রম করতে পারে। এটি ভোক্তাদেরকে ফ্রি VPN ব্যবহার করতে উত্সাহিত করে, যদিও সেগুলির কিছু ঝুঁকি থাকে। তবে VeePN-এর মতো সুরক্ষিত বিকল্পগুলি ব্যবহার করলে আপনি ডেটা লিকেজ সম্পর্কে চিন্তা না করেও নিরাপত্তা পেতে পারেন। এছাড়াও স্বচ্ছতা এবং সম্মতির প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের শেষের দিকে পরিচালিত একটি জরিপে ৬০% ভোক্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে AI-চালিত সুরক্ষা সরঞ্জামগুলি তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিপন্ন করতে পারে।

AI সিস্টেমগুলি ডেটা থেকে শিখে, তবে যদি সেই ডেটাতে পক্ষপাতিত্ব থাকে, তবে AI সেই পক্ষপাতিত্ব পুনরাবৃত্তি করতে পারে, এমনকি তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এই পক্ষপাতিত্ব সাইবারসিকিউরিটির ক্ষেত্রে একটি বড় নৈতিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এটি “দুর্বৃত্ত” আচরণ চিহ্নিত করার সময় ভুল বা অসম্পূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। কিছু সিস্টেম বিশেষ অঞ্চলের ট্রানজ্যাকশনগুলিকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে, যা ভৌগোলিক অবস্থান বা জনগণের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে। এই সমস্যা মোকাবিলায়, অনেক প্রতিষ্ঠান এখন পক্ষপাতিত্ব সনাক্তকরণ সরঞ্জাম ব্যবহার করছে, যাতে AI সিস্টেমগুলি পক্ষপাতিত্ব সনাক্ত করতে এবং সংশোধন করতে পারে। ২০২৫ সালে ধারণা করা হচ্ছে যে সাইবারসিকিউরিটি AI ব্যবস্থার ৫০% এরও বেশি পক্ষপাতিত্ব প্রতিরোধক প্রোটোকল অন্তর্ভুক্ত করবে।

এছাড়াও একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন উঠছে AI সিস্টেমগুলির নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্ব সম্পর্কে। এই অ্যালগরিদমগুলির নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে এবং AI সিস্টেমগুলিকে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া উচিত? অনেক ক্ষেত্রেই অত্যন্ত স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমগুলি দ্রুত এবং কার্যকরী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, কিন্তু এগুলিকে অত্যধিক স্বাধীনতা দেওয়া উচিত নয়, কারণ এতে বিপদ সৃষ্টি হতে পারে। যেমন একটি AI সিস্টেম যদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্দেহজনক ব্যবহারকারীদের অ্যাক্সেস ব্লক করে দেয়, তবে সঠিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া এটি বৈধ ব্যবহারকারীদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর সমাধান হলো স্পষ্ট শাসন কাঠামো স্থাপন করা, যাতে মানব হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা যায় এবং ৭০% এরও বেশি প্রতিষ্ঠান এখন এই প্রোটোকল তৈরি করছে।

AI-এর ব্যবহারে সুরক্ষা সিস্টেমের সুরক্ষার পাশাপাশি নৈতিক হ্যাকিং একটি জনপ্রিয় পন্থা হয়ে উঠেছে, তবে এটির ব্যবহারও কিছু সমস্যা তৈরি করতে পারে। AI-চালিত “পেনেট্রেশন টেস্টিং” সরঞ্জামগুলি সিস্টেমের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে আক্রমণ সিমুলেট করে, কিন্তু এই পদ্ধতিগুলি প্রায়শই সিস্টেমের চলমান সেবাগুলির ক্ষতি করতে পারে। ২০২৫ সালে ৪০% সাইবারসিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান এখন সীমিত “স্যান্ডবক্স পরিবেশ” ব্যবহার করছে, যা AI-চালিত আক্রমণ পরীক্ষা করতে সিস্টেমের বাস্তব সময়ের কার্যক্রম থেকে আলাদা রাখা হয়। সাইবার সিকিউরিটিতে AI ব্যবহারের জন্য একটি নৈতিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। তিনটি মৌলিক নীতি থাকবে এর অভ্যন্তরীণ কাজ প্রকাশ করা, ভুল স্বীকার করা এবং ব্যক্তিগত ডেটা রক্ষা করা। সুরক্ষা সংস্থাগুলিকে তাদের কর্মীদের নৈতিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নিয়মিত মূল্যায়ন পরিচালনা করতে হবে।

সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এখন AI সুরক্ষার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নিয়ম চালু করতে কাজ করছে। ২০২৫ সালে গ্লোবাল AI এথিকস কনসোর্টিয়াম একটি নির্দিষ্ট নীতি তৈরি করতে কাজ করবে যা ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক গাইডলাইন হিসেবে প্রকাশ পাবে। আগামী বছরগুলিতে AI শুধু সাইবার সিকিউরিটিতে একটি অতিরিক্ত সুবিধা হবে না, এটি ডিজিটাল সুরক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। তবে AI-এর ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথেই, এর নৈতিক দিকগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, যাতে গোপনীয়তা এবং সুরক্ষার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।








ওদের হাতের কোনো সংস্কার আমরা সহজে মেনে নেব না : মির্জা আব্বাস

0

রবিবার বিএনপি ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখার ইফতার মাহফিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন – ‘ওদের হাতের, ওদের কলমের কোনো সংস্কার আমরা সহজে মেনে নেব না। সংস্কার যদি করেন, আমরা কারেকশন (সংশোধন) করব। বিএনপি সেই কারেকশন অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে ঠিক করে তা জাতির কাছে তুলে ধরবে। ওই সমস্ত তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, যারা এ দেশের নাগরিক পর্যন্ত নয়, তাদের দিয়ে আপনারা সংস্কার করবেন, এটা আমরা মেনে নেব না।’ বিশেষ কিছু দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য সংস্কার চলছে বলে অভিযোগ করেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কার দরকার, ততটুকু করে নির্বাচন দিন। নিবার্চনের পর যে–ই ক্ষমতায় আসুক, তাকে আমরা সালাম দিয়ে মেনে নেব। কোনো অনির্বাচিত সরকারের, ব্যক্তির কোনো কথা আমরা মেনে নেব না।’

সংস্কার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আপনারা নির্বাচনী সংস্কার করুন। বাকি সংস্কার নির্বাচিত সরকার করবে।’ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংশয়, সন্দেহ থাকার কথা উল্লেখ করে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই, ড. ইউনূস যে কথা বলেছেন তাঁর কথা রাখবেন। আশা করছি, ডিসেম্বরের মধ্যে একটা নির্বাচন পাব। আমরা দেখছি, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একদল লোক বোকা পেয়েছে, যা খুশি বলে যাচ্ছে, করে যাচ্ছে। ওই লোকগুলো, যারা সংবিধান নতুন করে লিখতে চায়।’ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনার ডান পাশে, বাঁ পাশে যারা পরামর্শ দেয়, তারা কারা? তাদের সাথে জনগণের সম্পর্ক কতটুকু? কয়েকজন তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর পরামর্শে দেশকে অশান্তির দিকে ঠেলে দেবেন না।’

অন্যদিকে, রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক ইউনিয়নের ইফতার মাহফিলে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন “অহেতুক কোনো বিলম্ব না করে জাতির আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শেষ করতে যতটুকু সময়ের প্রয়োজন, সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ও রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত।” জামায়াতের এই নেতা বলেন, অন্তত একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে অবিলম্বে একটি নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা উচিত।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র – এনডিটিভিকে মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান

0

বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবাদকে’ পরাজিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সোমবার (১৭ মার্চ) সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়েছে। ভারত সফরে এসে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালে সঙ্গে বৈঠক করার মধ্যে সোমবার এনডিটিভিকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন তুলসি, সেখানেই বাংলাদেশের প্রসঙ্গ আসে।

এনডিটিভি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড বলেন, ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন, হত্যা ও নিপীড়ন যুক্তরাষ্ট্র সরকার এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।’ তুলসি গ্যাবার্ড বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। বাংলাদেশে ইসলামি চরমপন্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নতুন মন্ত্রিসভা এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তবে এটি আমাদের উদ্বেগের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

সাক্ষাৎকারে তুলসি গ্যাবার্ড ‘ইসলামি খিলাফত’-এর আদর্শের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বজুড়ে চরমপন্থি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এমন একটি ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে। ইসলামি সন্ত্রাসীদের হুমকি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বৈশ্বিক প্রচেষ্টা একই আদর্শ ও লক্ষ্যে নিবদ্ধ—যা হলো ইসলামি খিলাফতের মাধ্যমে শাসন বা শাসন করা। তিনি আরও বলেন, এটি স্পষ্টতই অন্য যে কোনও ধর্মের মানুষকে প্রভাবিত করে, বিশেষ করে যারা তাদের গ্রহণযোগ্য ধর্মের বাইরে। তারা এটিকে সন্ত্রাস ও সহিংসতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে চায়। গ্যাবার্ড আরও বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন আদর্শ চিহ্নিত করে তা পরাজিত করতে এবং তিনি যাকে ‘মৌলবাদী ইসলামি সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেন, তার উত্থান বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রধান বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসলামি সন্ত্রাসবাদের পেছনে যে আদর্শ কাজ করে তা চিহ্নিত করতে এবং এই আদর্শ ও তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে পরাজিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইউএস ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্সের (ডিএনআই) পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পর মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিয়ে এবার ভারতে এলেন তুলসি। দিল্লিতে অন্তত ২০টি দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে যোগ দেন তুলসি। ৪৩ বছর বয়সী তুলসি গ্যাবার্ড যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম হিন্দু সদস্য।

রোহিঙ্গা সংকট কি চাপা পড়ে যাচ্ছে ?

বাংলাদেশে কর্মরত আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে জরুরি ও সাহসী বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে তারা একথা জানিয়েছে, “বিশ্ব আমাদের সময়ের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকটকে ভুলে যাওয়ার বিলাসিতা বহন করতে পারে না। এখন সময় এসেছে এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার, যেখানে রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং স্বাগতিক জনগোষ্ঠী অনিশ্চয়তার মধ্যে নয় বরং নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা পাবে,”।

এই বিবৃতিতে একাত্মতা প্রকাশ করেছে ACF, ActionAid, Cordaid, Concern Worldwide, DRC, Handicap International, International Rescue Committee, Islamic Relief, Oxfam, Plan International, Save the Children এবং World Vision-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তারা বলেছে, রোহিঙ্গা সংকট শুধু একটি সম্পদের সংকট নয়, এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এই সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও বিনিয়োগ করতে হবে। এই বিবৃতি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফরের সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যা এই সংকটের প্রতি বৈশ্বিক দৃষ্টি আকর্ষণের একটি প্রচেষ্টা।

“রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার জন্য মানবিক সহায়তার অর্থায়ন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে এবং বৈশ্বিক অগ্রাধিকার পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নতুন ও টেকসই আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি জরুরি হয়ে পড়েছে,” বিবৃতিতে বলা হয়েছে। তারা অবিলম্বে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখা, নতুন কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ এবং কক্সবাজারে অবস্থানরত এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়। তহবিলের ঘাটতির ফলে এপ্রিল থেকে খাদ্য রেশন অর্ধেকে নেমে আসবে, যা স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলবে। খাদ্য ও পুষ্টি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (WASH), নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং জীবিকা সহায়তার মতো মৌলিক সেবাগুলো চরম সংকটে পড়েছে।

“জরুরি সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া, এই সংকট অগ্রহণযোগ্যভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। আট বছরে গড়ানো এই সংকট বাংলাদেশের সম্পদের ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করেছে, যখন বিশ্বব্যাপী অন্যান্য সংকটের কারণে দাতাদের প্রতিশ্রুতি কমে আসছে,” বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিবৃতির স্বাক্ষরকারীরা বলেছেন, এই সংকট মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ, বাংলাদেশ সরকার, উন্নয়ন অংশীদার, আন্তর্জাতিক এনজিও, স্থানীয় এনজিও এবং প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। “সহায়তা প্রদানের বর্তমান মডেলকে আরও টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি ও সহনশীলতাভিত্তিক কৌশলে রূপান্তরিত করতে হবে, যেখানে জীবিকা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সুযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠী উভয়ই উপকৃত হতে পারে,” তারা যোগ করেন।

তারা আরও বলেন, মানবিক সহায়তা, উন্নয়ন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী ‘ট্রিপল নেক্সাস অ্যাপ্রোচ’ গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে নির্ভরশীলতা কমানো যায় এবং আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানো সম্ভব হয়। International Rescue Committee-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিনা রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট শুধু সম্পদের সংকট নয়, এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার সংকট। জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই টেকসই সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বিনিয়োগ করতে হবে।”

ActionAid Bangladesh-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, “যদি এখনই কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে আমরা রোহিঙ্গা সংকটকে একটি বিস্মৃত ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে দেব। জীবিকা, দক্ষতা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করে একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই সঠিক পথ।” Oxfam Bangladesh-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর আশীষ দামলে বলেন, “এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি হয়ে যাওয়ায়, আমরা বৈশ্বিক অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানাই যে, একটি কাঠামোগত ও নিবেদিত মিশন গঠনের মাধ্যমে টেকসই সাড়া নিশ্চিত করা হোক।”

নারী – শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ বিচার ঝুলে থাকে কেন ?

0

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্ষণ মামলার বিচারে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পরও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। আইনি মারপ্যাঁচে অধিকাংশ অপরাধী আদালত থেকে খালাস পাচ্ছে। বিচারের পাশাপাশি মামলার তদন্তেও হয় কালক্ষেপণ । নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এ ধরনের মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার কথা বলা হলেও তা হচ্ছে না। প্রায় ৩৩ হাজার মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা থাকায় আসামিরাও আদালত থেকে জামিনে বের হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৩২ হাজার ৯৭২টি মামলা। উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে অন্য ১ হাজার ৬০৭টি মামলা। এদিকে পুলিশের কাছে তদন্তাধীন ২০ হাজার ১৩৫টি মামলা, যা মোট মামলার ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ সমকালকে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করেই সংশ্লিষ্টরা দায় এড়িয়েছে। এটিকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সেটি অনেকাংশেই উপেক্ষিত। আইনে অনেক কঠোর ব্যবস্থা থাকলেও বিচারের জন্য সেটা কি কার্যকরের উপায় আছে? বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতায় বরং আসামিরা জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে।’

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অনেকগুলো অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। গণদাবির মুখে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এটি মনে রাখা দরকার, আইনে শাস্তি যত কঠিন হবে, এর প্রয়োগ ততই জটিল হবে। এতে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।’ তাঁর মতে, অপ্রিয় হলেও সত্য, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় শাস্তির বিধান কমানো উচিত। তাতে বিচারের গতি কিছুটা হলেও বাড়বে এবং যে আদেশ বা রায় হবে, সেটা কার্যকর হবে। বিচারপ্রার্থীরা বিচার পাবেন। শাস্তি কমলে আইনের প্রয়োগের ধাপগুলো সহজতর হবে।

ইয়েমেনে মার্কিন হামলা শুরু , ট্রাম্পের আমলে প্রথম বড় সামরিক অভিযান

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনে হুতিদের নিশানা করে বড় ধরনের হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। শনিবার শুরু হওয়া এই ‘চূড়ান্ত ও শক্তিশালী’ হামলা কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও চলতে পারে। মার্কিন বিমান হামলায় এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ ২৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা বন্ধ করা, অন্যথায় ‘নরক বৃষ্টির’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া শিগগির বন্ধ করতে হুতিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানকেও হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। হুতিদের রাজনৈতিক ব্যুরো ‘আবাসিক এলাকায়’ এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

গত জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্যে হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান এই হামলাই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। এমন এক সময়ে এই হামলা শুরু হলো, যখন নিষেধাজ্ঞা বাড়িয়ে তেহরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য করতে চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন। এক দশকের বেশি সময় ধরে হুতিরা সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। ইয়েমেনের অধিকাংশ অঞ্চল বর্তমানে তাদের নিয়ন্ত্রণে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে তারা ১০০ এর বেশি হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, গাজায় ইসরায়েলি হামলার শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। হুতির নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র ও পাঠানো ড্রোন জব্দ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হচ্ছে।

ইরানের মিত্রগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহ এরই মধ্যে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ গত ডিসেম্বরে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু হুতিদের এখনো হামলার চালানোর মতো সক্ষমতা রয়ে গেছে। এবার ট্রাম্প তাদের বিরুদ্ধে আরও বেশি আক্রমণাত্মক হামলা চালাতে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা।

‘ ফাঁসি ’ নয় , ইনসাফ চাই : সহুল আহমদ , লেখক ও গবেষক

0

“…বাংলাদেশে ধর্ষণের দৃশ্যমান কোনো বিচার হয় না। যেমন ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে যত ধর্ষণের মামলা হয়েছিল, তার মধ্যে রায় ঘোষণার হার ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং সাজার হার শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ (বাংলা ট্রিবিউন, ২০১৭)। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বেহাল দশা, আইনি ও পুলিশি ব্যবস্থার ঔপনিবেশিক খাসলত, দিনের পর দিন মামলার হয়রানি, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনের ভেতরকার সংকট—সব মিলিয়ে বিচারহীনতার এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যে জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়ে আছে, এ রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়।

জনগণের মধ্যে যখন এমন ধারণা দৃঢ় হয়, তখন তারা একদিকে ফাঁসির মতো সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করে, অন্যদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ধর্ষকের মৃত্যু হলে উল্লসিতও হয়। ক্রসফায়ারের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনে ‘ধর্ষণ’কে ব্যবহার করার নজির আমরা দেখেছি আওয়ামী শাসনামলে। … আইন-আদালতে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং পৃথিবীতে এমন অনেক নজির আছে, যেখানে বহু বছর পর কাউকে নির্দোষ প্রমাণিত হতেও দেখা গিয়েছে। কিন্তু শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেলে ভুল শোধরানোর আর কোনো উপায় থাকে না। … শুধু ধর্ষণ কেন, পৃথিবীতে কোনো অপরাধই মৃত্যুদণ্ডের কারণে কমেছে, এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।…অনেকেই বলে থাকেন, ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হলে ধর্ষণের পর হত্যা করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে। মৃত্যুদণ্ডকেন্দ্রিক এ আলোচনা নারীর প্রতি সহিংসতার কাঠামোগত বিভিন্ন দিক রয়েছে এবং তার সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ককে উপেক্ষা করে।

বাংলাদেশের বাস্তবতাও যদি আমরা আমলে নিই, তাহলে দেখব যে এখানে দুটো ঘটনা খুব বেশি ঘটে। একদিকে প্রচুর ভুয়া ধর্ষণের মামলা হয় এবং অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে ঘটনা ‘নথিভুক্ত’ করার প্রবণতাও কম। ভুক্তভোগীকে থানায় গিয়ে মামলা করতে গেলে যে ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বা সামাজিক চাপে ঘটনাকে তারা চেপে যান, হয়তোবা নানাবিধ ‘আপস’ করতে বাধ্য হন। …. যেহেতু প্রমাণিত হলে মৃত্যুদণ্ড, সেহেতু নানা চাপ দিয়ে আপসে মিটমাট করার চেষ্টাই বেশি করা হবে আমাদের সমাজবাস্তবতায়। অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ‘ধর্ষণ’ মামলাকে ব্যবহারের প্রবণতাও বৃদ্ধি করবে।

… ধর্ষণের সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড—এ ধারণার গোড়ায় রয়েছে এক পুরুষতান্ত্রিক পূর্বানুমান। ধর্ষণ যেন হত্যা বা খুনের চেয়ে ভয়াবহ এক পরিণতি। ‘ইজ্জত’-এর পুরুষতান্ত্রিক ধারণা থেকে এটার জন্ম হয়, নারীর জীবনে ধর্ষণই সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার মাধ্যমে নারীর ‘ইজ্জত’ ভূলুণ্ঠিত হয়। সে নারীর যেন সমাজে আর কোনো স্থান নেই। জীবনের চেয়ে ‘সতীত্ব’কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। … এমন সংকটকালীন মুহূর্তে বহু জনতুষ্টিবাদী দাবি উঠতে পারে, যেগুলো পরবর্তী সময়ে নিপীড়নমূলক হাতিয়ার হয়ে উঠবে। নিপীড়নমূলক সব আইনের ন্যায্যতা উৎপাদন করা হয়ে থাকে এমন সংকটের অজুহাতেই।

… বিচারপ্রক্রিয়াকে ধীর করে বা খোদ ভুক্তভোগীর জন্য বিচার পাওয়াকে কঠিন করে তোলে বা ভুক্তভোগীকে আরেক দফা ভিকটিমে রূপান্তর করে, সেগুলোকে তাড়াতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে সচল করতে হবে। বিচারব্যবস্থায় যত গাফিলতি হবে, তত বেশি সমাজে আরও ‘কঠোর’ দাবির উত্থাপন ঘটতে থাকবে। এমনকি ‘ক্রসফায়ার’ হাজির হতে পারে এ অছিলায়। ইনসাফের দাবিকে কোনো বে-ইনসাফির উপলক্ষ হয়ে উঠতে দেওয়া যাবে না। “


পোস্ট – মডার্নিজম আধুনিকতা , সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও সত্যের আপেক্ষিকতার যুগে

পোস্ট-মডার্নিজম (Post-modernism) হলো একটি সাংস্কৃতিক, দার্শনিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন যা ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় এবং আধুনিকতাবাদ, (Modernism)-এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে ওঠে। এটি একদিকে যেমন শিল্প, সাহিত্য ও স্থাপত্যে পরিবর্তন এনেছে, তেমনি সমাজ, রাজনীতি ও দর্শনের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। পোস্ট-মডার্নিজম মূলত প্রচলিত কাঠামো, স্থির সত্য এবং সর্বজনীন ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই প্রবন্ধে পোস্ট-মডার্নিজমের সংজ্ঞা, এর সমাজে প্রভাব এবং বর্তমান অবস্থার বিশ্লেষণ করা হবে। পোস্ট-মডার্নিজম এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা আধুনিকতাবাদের যুক্তিনির্ভর ও সর্বজনীন সত্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি একাধিক বাস্তবতা, বহুমাত্রিকতা ও আপেক্ষিক সত্যের ওপর জোর দেয়। পোস্ট-মডার্ন চিন্তাবিদদের মতে, জ্ঞান ও সত্য কেবল সামাজিক নির্মাণ (social construct) মাত্র, এবং এগুলো নির্দিষ্ট ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

আধুনিকতাবাদ বড় গল্পের (যেমন বিজ্ঞান, উন্নয়ন, ইতিহাসের একক ব্যাখ্যা) ওপর নির্ভর করলেও, পোস্ট-মডার্নিজম এগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একক সত্যের বদলে, পোস্ট-মডার্নিজম বলে যে সত্য আপেক্ষিক এবং তা নির্ভর করে ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।সাহিত্য ও শিল্পে পূর্ববর্তী রচনার সঙ্গে সম্পর্ক ও মিশ্রণের প্রবণতা দেখা যায়। পোস্ট-মডার্ন চিন্তাবিদ মিশেল ফুকো (Michel Foucault) ও জ্যাক দেরিদা (Jacques Derrida) ভাষার মাধ্যমে ক্ষমতা কিভাবে পরিচালিত হয় তা বিশ্লেষণ করেছেন।
পোস্ট-মডার্নিজম কোনো নির্দিষ্ট অর্থ বা একক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে না।

পোস্ট-মডার্নিজম শুধু দর্শন ও সাহিত্যেই নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে গভীর পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে, একে দেখা যায় প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। ডিজিটাল যুগে পোস্ট-মডার্ন চিন্তাধারা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের উত্থান, তথ্যের বহুমুখিতা, সত্য ও মিথ্যার সীমার বিলোপড়এসব কিছু পোস্ট-মডার্ন ভাবনারই প্রতিফলন।উদাহরণস্বরূপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনার একাধিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, যা সত্যকে আপেক্ষিক করে তোলে। গণমাধ্যম গুলোতে ‘ফেক নিউজ’ বা বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে, যা পোস্ট-মডার্নিজমের “সত্যের আপেক্ষিকতা” ধারণার প্রতিফলন।

পোস্ট-মডার্ন চিন্তাধারা আধুনিক রাজনৈতিক প্রবণতাকেও পরিবর্তন করেছে। এখন আর কোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা মতবাদ এককভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। জনগণ বিভিন্ন মতবাদকে একত্রিত করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। উদাহরণ হিসেবে পপুলিজম (populism)-এর উত্থান বা বিকল্প রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম দেওয়া যায়। পোস্ট-মডার্নিজমের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে শিল্প ও স্থাপত্যে। এখানে বিন্যাসের নির্দিষ্ট নিয়ম ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্থাপত্যে মারিনা তাবাসসুমের মতো স্থপতিরা নতুন ধরনের ডিজাইন তৈরি করেছেন, যেখানে স্থানীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির মিশ্রণ ঘটেছে। চিত্রকলা ও ভাস্কর্যেও বিমূর্ততা, প্যারোডি, ও বহুমাত্রিকতা দেখা যায়।

শিক্ষাক্ষেত্রে পোস্ট-মডার্নিজম বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উৎসাহিত করে। এটি ঐতিহ্যবাহী একক পাঠ্যক্রমের বদলে বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চাকে গুরুত্ব দেয়। ইতিহাস এখন আর একক দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ানো হয় না বরং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা ইতিহাস গুরুত্ব পাচ্ছে। পোস্ট-মডার্নিজমের কারণে নৈতিকতার সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। এককভাবে ‘ভালো’ বা ‘মন্দ’ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশ্বায়ন ও মিডিয়ার কারণে সংস্কৃতি এখন একক পরিচয়ে আবদ্ধ নয়, বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল। লিঙ্গ, জাতি, ধর্মের মতো পরিচয় এখন আগের চেয়ে বেশি তরল হয়ে উঠেছে এবং এগুলো আপেক্ষিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

পোস্ট-মডার্নিজম আজকের বিশ্বে বিতর্কিত একটি বিষয়। একদিকে এটি বহুমাত্রিকতা ও স্বাধীনন্তার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে এটি বিভ্রান্তি, সত্যের আপেক্ষিকতা ও নৈতিক অরাজকতা বাড়িয়েছে। সমালোচনা করতে গেলে পোস্ট-মডার্নিজম কোনো নির্দিষ্ট সত্যকে স্বীকার করে না, ফলে এটি বিজ্ঞান ও যৌক্তিকতার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়াকে কঠিন করে তোলে। যখন সব কিছুই আপেক্ষিক হয়, তখন নৈতিকতার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি থাকে না। পোস্ট-মডার্নিজমের সত্যের আপেক্ষিকতা ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর মতবাদ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উস্কে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলে পোস্ট-মডার্নিজম এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও বহুমাত্রিক চিন্তাধারা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি সমানে অবদান রাখছে।



ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ – শিল্প ও বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সংযোগ

ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ‘দ্য স্টারি নাইট’ শুধু একটি চিত্রকর্ম নয় বরং এটি বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বের প্রতিচ্ছবি। তার আঁকা এই বিখ্যাত ছবিটি তরল গতিবিদ্যার বিশৃঙ্খল প্রবাহ তত্ত্ব বা টার্বুলেন্স থিওরির সঙ্গে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে তার তুলির আঁচড়ে আঁকা সর্পিল আকাশ ও ঘূর্ণায়মান মেঘগুলো প্রকৃত টার্বুলেন্সের একটি চিত্র তুলে ধরে। ১৮৮৯ সালে, দক্ষিণ ফ্রান্সের সেন্ট-রেমি-দ্য-প্রোভঁস শহরের একটি মানসিক হাসপাতালের জানালা দিয়ে আকাশের দৃশ্য দেখেছিলেন ভ্যান গঘ। সেই দৃশ্য অনুপ্রাণিত করেছিল তাকে ‘দ্য স্টারি নাইট’ আঁকতে। এটি শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এতে লুকিয়ে আছে গভীর বিজ্ঞান।গবেষকদের মতে, ভ্যান গঘ সম্ভবত স্বাভাবিক প্রবাহের জটিলতা বোঝার একটি বিশেষ ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন, যদিও তিনি বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখা সম্পর্কে জানতেন না।

সোভিয়েত গণিতবিদ আন্দ্রে কলমগোরোভ ১৯৪০-এর দশকে তরল প্রবাহের শক্তির স্থানান্তর সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখান যে, বড় ঘূর্ণির শক্তি কীভাবে ছোট ঘূর্ণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষক ইয়ংজিয়াং হুয়াং ও তার দল ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর ডিজিটাল বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এর ব্রাশস্ট্রোক ও উজ্জ্বলতা কলমগোরোভের টার্বুলেন্স থিওরির সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, তরল প্রবাহে যখন শক্তি স্থানান্তর হয় তখন তা বিশৃঙ্খলভাবে ছোট ছোট অংশে ছড়িয়ে পড়ে। এই একই প্যাটার্ন দেখা গেছে ভ্যান গঘের তুলির আঁচড়ে। এর অর্থ দাঁড়ায়, চিত্রকর্মটি শুধু কল্পনার ফসল নয় বরং বাস্তবতার গভীরতম স্তরের একটি প্রতিফলন।

ভ্যান গঘের এই বিশেষ ক্ষমতা শুধু ‘দ্য স্টারি নাইট’-এ সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকরা আরও কিছু চিত্রকর্ম ও প্রকৃতির ঘটনায় একই ধরনের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী জন কনস্টেবলের আঁকা ‘চেইন পিয়ার, ব্রাইটন’ ছবিতেও এই একই টার্বুলেন্স প্যাটার্ন দেখা যায়। এছাড়া ১৯৭৯ সালে নাসার ভয়েজার ১ মহাকাশযানের তোলা বৃহস্পতির গ্রেট রেড স্পটের ছবিতেও মিল পাওয়া গেছে। বৃহস্পতির এই মহা ঝড় কয়েক শতাব্দী ধরে সক্রিয় রয়েছে এবং এটি একটি প্রকৃত টার্বুলেন্সের নিদর্শন। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আবিষ্কার। কারণ যদি আমরা প্রকৃতির জটিল টার্বুলেন্স বোঝার জন্য এই চিত্রকর্মগুলোর বিশ্লেষণ করতে পারি, তবে এটি আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বিমান চলাচলে ঝাঁকুনি কমানো এবং সমুদ্রস্রোতের গবেষণায় সহায়ক হতে পারে।

তবে গবেষক জেমস বিটি মনে করেন এটি প্রকৃত টার্বুলেন্স নয়। কারণ চিত্রকর্মটি নিজে কোনো গতিশক্তি বহন করে না। প্রকৃত টার্বুলেন্স এমন একটি প্রক্রিয়া যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং শক্তি স্থানান্তরিত করে। কিন্তু ভ্যান গঘের চিত্রকর্মটি স্থির, যেখানে কোনো গতির পরিবর্তন নেই। এটি নিশ্চিত যে ভ্যান গঘ প্রকৃতির গভীরতম জটিলতাকে অনুভব করেছিলেন। তার মনের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আবেগ হয়তো তাকে এমনভাবে প্রকৃতিকে দেখতে সাহায্য করেছিল, যা সাধারণ মানুষ দেখে না। তিনি তার তুলির আঁচড়ের মাধ্যমে সেই বিশৃঙ্খলা ও শক্তির অনন্য প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

ভ্যান গঘের মানসিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্থিতিশীল। তিনি সারাজীবন বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক সমস্যায় ভুগেছেন। ‘দ্য স্টারি নাইট’ চিত্রকর্মটি আঁকার সময় তিনি একটি মানসিক হাসপাতালে ছিলেন। এই মানসিক অবস্থার কারণে তার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল, যা হয়তো তাকে বাস্তবতার জটিলতা অনুভব করার এক অনন্য শক্তি দিয়েছিল। গবেষকরা মনে করেন, শিল্প ও বিজ্ঞানের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক শিল্পী হয়তো অবচেতনভাবে প্রকৃতির বিভিন্ন জটিল প্যাটার্ন ও বিজ্ঞানকে ফুটিয়ে তোলেন তাদের চিত্রকর্মে। ভ্যান গঘের ক্ষেত্রে এটি আরও স্পষ্ট, কারণ তার তুলির আঁচড়ের প্যাটার্ন একেবারেই প্রকৃতির জটিল গতিবিদ্যার সঙ্গে মিলে যায়।