Home Blog Page 132

‘বাংলাদেশ যেন আশির দশকের দক্ষিণ কোরিয়া’ : কোরীয় ব্যবসায়ী

0

এশিয়াখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ড জিওর্দানো কোরিয়ার চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী জুনসেওক হান সম্প্রতি বিনিয়োগ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছিলেন। সদ্য সমাপ্ত সম্মেলনের এক ফাঁকে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কয়েক দশক আগে বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং কোরিয়ার প্রবৃদ্ধির মধ্যে তুলনা করে বলেন, ‘এই দেশ আমাকে ৩০ থেকে ৪০ বছর আগে কোরিয়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এখানে বিশেষ করে উৎপাদন ও রপ্তানির অনেক সুযোগ আছে।’ ১৯৮০ এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া রপ্তানিভিত্তিক শিল্পায়ন, কৌশলগত বিনিয়োগ ও ক্রমবর্ধমান দক্ষ শ্রমিকদের পরিচালনায় বৈশ্বিক পণ্য উত্পাদনের ‘পাওয়ার হাউসে’ পরিণত হয়েছিল। তাঁর মতে — প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি ও ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে।

হানের এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো যখন বাংলাদেশের প্রতি কোরিয়ার আগ্রহ ক্রমাগত বাড়ছে। তার এই সফর বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে কাঁচামালের উৎস খোঁজার পাশাপাশি কারখানা গড়ার পরিকল্পনার মাধ্যমে জিওর্দানো কোরিয়া বড় ভূমিকা রাখতে পারে। হানের সফরটি উদীয়মান দেশগুলোয় কাঁচামাল ও উত্পাদিত পণ্য খোঁজার অংশ ছিল। ভিয়েতনাম, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান ক্রয় চুক্তির মতো বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি না হলেও দেশটি সেই ধারাতেই আছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণীয় দিক কোনটি তা জানতে চাওয়া হলে হান বলেন, ‘এখানকার শ্রমশক্তি। আমি যাদের সঙ্গে দেখা করেছি—বিশেষ করে তরুণ পেশাদার ও কারখানার শ্রমিক—তারা দক্ষ ও সুশিক্ষিত। এটা বড় সম্পদ।’

তিনি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে ১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকের দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘এটি এমন এক সময় যখন কোরিয়ার অর্থনীতি কৃষি থেকে শিল্পে বদলে যাচ্ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখন বাংলাদেশকে একই সন্ধিক্ষণে দেখছি। শ্রমিকের মজুরি এখনো কম। এটি পণ্য উত্পাদন বাড়াতে সহযোগিতা করে।’ হান মনে করেন, ‘শ্রমঘন খাতে এদেশের শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যেমন পোশাক শিল্প, ইলেকট্রনিক্স অ্যাসেম্বলিং ও হালকা অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ খাত বিকশিত হওয়ার সুযোগ আছে।’ আশাবাদ সত্ত্বেও, হান সংকটের কথাও বলতে ভুলেননি। বিশেষ করে, লজিস্টিক খাতের সংকট। পরিবহন ব্যবস্থা এখনো ভালো না। পণ্য সরবরাহে অনেক সময় লাগে। বন্দর ও জাহাজীকরণ অবকাঠামোয় দ্রুত মনোযোগ দেওয়া দরকার।’

‘অবকাঠামোর দিকে নজর দিন। রপ্তানি প্রক্রিয়াগুলো সহজ ও পণ্য সরবরাহের সময় কমিয়ে আনুন। এগুলো করা হলে বিশাল পার্থক্য তৈরি হবে।’ তিনি জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার ২৭ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বাংলাদেশে ব্যবসা বাড়াতে আগ্রহী। কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী। হুন্দাই, কেআইএ, স্যামসাং ও এলজি এখানে আছে। আরও অনেকে প্রতিষ্ঠান আসার চেষ্টা করছে। আশা করছি—দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশী কোরিয়ার বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।’

মার্কিন প্রতিনিধিদলের সফর : চীন-ভারত ও মিয়ানমার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা

মার্কিন দুই উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চলতি সপ্তাহে তিন দিনের সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেছেন। দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে ওই প্রতিনিধিদল জানতে ও বুঝতে চেয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে — দুই উপসহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যেসব বিষয় তুলেছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি, বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই শীর্ষ নেতার আলোচনা, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা, মিয়ানমারের সামরিক জান্তার জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে প্রধান উপদেস্টার বৈঠক ও রোহিঙ্গা সংকট।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে — ওয়াশিংটনের ওই দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রধান উপদেস্টাসহ সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারপ্রক্রিয়া, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপসহ ব্যবসাবাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) সহায়তা পুনর্বিবেচনা ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন। শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-ঘাটতি কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনাকাটার প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছে।

জানা গেছে, মিয়ানমারের পরিস্থিতি, বিশেষ করে সামরিক শাসন জারির পর থেকে দেশটির বিভিন্ন অংশ সরকারবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে—বিষয়টি বাংলাদেশ কীভাবে বিবেচনা করছে, তা আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকা আরাকান আর্মির দখলে। আবার দেশটিতে নির্বাচনের সময়সূচিও ঘোষণা করেছে জান্তা সরকার। এমন এক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মির যোগাযোগ বা যুক্ততা কতটা হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি কী হয়েছে, তা জানতে চেয়েছিল মার্কিন প্রতিনিধিদল।

তাদের কৌতূহল ছিল, বাংলাদেশ এখন মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির সামরিক সরকারের পাশাপাশি আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে কি না। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারছে না, সেটি বলেছে। এ জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। ৪ এপ্রিল ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেস্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা মিন অং হ্লাইংয়ের আলোচনা হয়েছিল। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠক নিয়ে মার্কিন কৌতূহলের জবাব দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, আগামী দুই বছরের জন্য বিমসটেকের সভাপতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। ফলে সভাপতিত্বকারী দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে সব কটি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে কথা হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম হয়ে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য বিস্তারের প্রসঙ্গটি আসে। এ সময় মার্কিন প্রতিনিধিরা অভিমত দেন, যেহেতু আন্তর্জাতিক পরিসরেও এসব অপতথ্য আর ভুল তথ্যের বিস্তার ঘটছে, তাই বাস্তব চিত্রটা সরকারের তুলে ধরার জন্য উদ্যোগ নেওয়া উচিত। মার্কিন প্রতিনিধিদল তাদের আলোচনায় চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা বা যুক্ততা প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছে। তখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে চীনকে যুক্ত করে সহযোগিতার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।

সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়া , বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ

0

গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে বিপজ্জনকভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছানো বাংলাদেশিদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ২,৫৮৯ জন বাংলাদেশি ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। গত বছর এই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,২০৬ জন। অবৈধ উপায়ে এভাবে ইউরোপযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তারা সতর্ক করে বলেছেন, ঝুঁকি নিয়ে এভাবে মানুষের বিদেশে যাওয়ায় বোঝা যায় দেশে গভীর আর্থ-সামাজিক সমস্যা রয়েছে।

গতকাল ইউএনএইচসিআরের প্রকাশিত ইতালি সি অ্যারাইভালস ড্যাশবোর্ডের ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে যারা ইতালি যাচ্ছেন তারা সবাই লিবিয়া থেকে যাত্রা করেছেন। উত্তর আফ্রিকায় মানব পাচারকারী চক্রগুলো দীর্ঘদিন ধরেই লিবিয়াকে রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। ঢাকা-ভিত্তিক শ্রম অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এটি শুধু অভিবাসনের বিষয় নয়। এটি দেশে বাড়তে থাকা হতাশার প্রতিফলন।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের অনেক তরুণ বেকার বা স্বল্প বেতনে কর্মরত।তরুণদের মধ্যে যারা বৈধ পথে বিদেশে যেতে পারে না—তারা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নেয়। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই দালালদের খপ্পরে পড়ে, যারা তাদের ইউরোপ নিয়ে মিথ্যা স্বপ্ন দেখায়।’

ইউরোপের উদ্দেশে এই বিপজ্জনক যাত্রা শুরু হয় লিবিয়া যাওয়ার মাধ্যমে। এরপর শুরু হয় আন্তরাষ্ট্রীয় পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রযাত্রা। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মাথাপিছু পাঁচ থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এই টাকা জোগাড় করতে অনেকেই উচ্চ সুদে ঋণ নেন, এমনকি জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। আসিফ মুনীর আরও বলেন, অনেকেই এই ভেবে ঝুঁকি নেন যে, একবার সেখানে পৌঁছাতে পারলে অস্থায়ীভাবে হলেও বসবাসের সুযোগ পাওয়া যাবে এবং তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে না। কারণ অভিবাসীবান্ধব দেশ হিসেবে মনে করা হয় ইতালিকে।’ সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়াও ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকা, ইঞ্জিনের ত্রুটি এবং জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাব প্রায়শই নৌকাডুবে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। যদিও এ বছর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিয়ে কোনো বড় দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি, তবে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো আশঙ্কা করছে যে ঝুঁকি এখনো অনেক বেশি।

আমেরিকার শ্রেণী , স্বপ্ন ও অস্তিত্ববাদী সংকট – দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’র ১০০ বছর

১৯২৫ সালের ১০ এপ্রিল যখন এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড দ্য গ্রেট গ্যাটসবি প্রকাশ করেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি এই বই একদিন “দ্য গ্রেট আমেরিকান নভেল” হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। যদিও লেখক জীবিত থাকাকালীন এটি তেমন পাঠকপ্রিয়তা পায়নি, মৃত্যুর পর তার সাহিত্যকীর্তি নতুন জীবন লাভ করে। আজ এক শতাব্দী পর, গ্যাটসবি কেবল মার্কিন সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বকারী গ্রন্থ নয়, এটি হয়ে উঠেছে মার্কিন সমাজের আত্মপর্যালোচনার এক দর্পণ। গ্যাটসবি চরিত্রটি মার্কিন স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি—বা বলা যায়, প্রতারণা। এক কৃষক পরিবারের সন্তান থেকে ধনকুবেরে পরিণত হওয়া গ্যাটসবি আসলে আমেরিকার সেই মিথ, যেখানে পরিশ্রম করলেই যে কেউ ‘সবকিছু’ পেতে পারে। কিন্তু তার এই অর্জন অবৈধ ব্যবসার উপর দাঁড়িয়ে এবং তা মূলত প্রেমিকাকে ফিরে পাওয়ার জন্য। মার্ক্সবাদী দৃষ্টিতে, গ্যাটসবি শ্রম বা নৈতিকতা নয়, বরং পুঁজির ক্ষমতা দিয়েই সমাজে স্থান করে নিতে চায়। আর এই পুঁজিবাদী কাঠামোই তাকে শেষমেশ ধ্বংস করে।

গ্যাটসবির ধ্বংসের পেছনে অ্যাটেইনমেন্ট নয়, বরং ইলিউশন—একটি কৃত্রিম স্বপ্ন যা সমাজ তাকে দিয়েছে। ২০১৪ সালে সাহিত্য সমালোচক সারাহ চার্চওয়েল লিখেছিলেন, “Gatsby believed in the green light, but what he failed to see was that it was always receding.” এই বিশ্লেষণটিই গ্যাটসবির ট্র্যাজেডিকে সর্বোচ্চ বিশ্লেষণী উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। গ্যাটসবি একমাত্র প্রেমকে বাস্তব সত্য বলে ধরে নেয়, কিন্তু বাস্তবতা তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এই দ্বন্দ্ব অস্তিত্ববাদের কেন্দ্রে থাকা অর্থহীনতার ধারণাকে উস্কে দেয়। স্যাত্র বা সিওরানের ভাষায়, মানুষের বেঁচে থাকা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাচক্র—ঠিক যেমন গ্যাটসবির জন্য জীবন এক অনিবার্য ফাঁদ।

উপন্যাসের কথক নিক ক্যারাওয়ে গ্যাটসবির এই অন্তঃসারশূন্যতায় ক্রমে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁর নিজের চোখে দেখা নিউ ইয়র্ক এবং লং আইল্যান্ড যেন এক আত্মাহীন, মূল্যহীন পৃথিবীর প্রতীক, যেখানে কেবল সামাজিক মুখোশ প্রদর্শনই সার্বভৌম। এটি সিওরানের “The Trouble with Being Born”-এর সাথে এক ধরনের দার্শনিক আত্মীয়তা গড়ে তোলে। ফিটজেরাল্ড নিজেও ছিলেন এই আমেরিকান ড্রিমের শিকার। তার প্রথম উপন্যাস “দিস সাইড অফ প্যারাডাইস” দিয়ে খ্যাতি অর্জনের পর তিনি এবং তার স্ত্রী জেলদা এক উন্মত্ত জীবনে প্রবেশ করেন। গ্যাটসবির মতোই ফিটজেরাল্ডও উচ্চবিত্ত জীবনের মোহে আচ্ছন্ন ছিলেন, এবং তার পতন আসে অ্যালকোহল, মানসিক বিপর্যয় ও আর্থিক দুরবস্থার মাধ্যমে। ১৯৪০ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে, তিনি হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করেন।

ততদিনে গ্যাটসবি বাজারে ব্যর্থ, বিক্রি হয়েছিল মাত্র ২৫,০০০ কপি। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে, ধীরে ধীরে, উপন্যাসটি নতুন পাঠকের মন জয় করে নেয় এবং একসময় মডার্ন লাইব্রেরির বিশ শতকের সেরা মার্কিন উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ডেইজি, টম, কিংবা জর্ডান—তারা সবাই এক ধরনের সাংস্কৃতিক ‘নেটিভ’ যারা জানে কিভাবে অর্থ আর সামাজিক অবস্থানকে ব্যবহার করে শক্তি অর্জন করতে হয়। এই প্রসঙ্গে হারল্ড ব্লুম উল্লেখ করেন, “Gatsby was never accepted because he was not born into the game, only played it.”

গ্যাটসবির ঘরের বারান্দা থেকে দূরের ডকের সবুজ আলো উপন্যাসটির সবচেয়ে বিখ্যাত প্রতীক। এই আলো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, কিন্তু বাস্তবে তা অস্পৃষ্ট। এটি শুধুই প্রেমের নয়, বরং অভিজাত শ্রেণি ও সফলতা-র ধারণার প্রতীক। ফুকো বলেছিলেন, ক্ষমতা এক জায়গায় নেই—তা প্রতীক, ভাষা এবং চেতনার ভেতর ছড়িয়ে থাকে। সবুজ আলো যেন সেই ক্ষমতা ও স্বপ্নের ছায়া, যা আমরা ধরতে পারি না, কিন্তু তাড়িত হই। ২০২১ সালে বইটি পাবলিক ডোমেইনে যাওয়ার পর নানা রূপান্তর ও পুনরায় কল্পনার মাধ্যমে এর পাঠ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই রূপান্তর প্রমাণ করে সাহিত্য কখনো বন্ধ নয়—তা পাঠকের সময় ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বদলায়। দ্য গ্রেট গ্যাটসবি আজ শতবর্ষ অতিক্রম করেও প্রাসঙ্গিক—এটি একদিকে মার্কিন স্বপ্নের মিথ, অন্যদিকে অস্তিত্বের শূন্যতা; একদিকে শ্রেণিচেতনার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার অন্তর্জগৎ।

এই উপন্যাসকে নতুনভাবে পাঠ করা মানে কেবল ফিটজেরাল্ডকে নয়, বরং আমাদের নিজস্ব সময় ও সমাজকেও পর্যালোচনা করা। আর এ কারণেই গ্যাটসবির সবুজ আলো কখনো নিভে না, আমাদের মনে জ্বলে।

হিকিকোমোরি – আত্মগোপনের জাপানি সংস্কৃতি

বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ হিসেবে পরিচিত জাপান, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অতীতের যে কোনো যুগের তুলনায় অভূতপূর্ব উন্নতি অর্জন করেছে। তবে এই উন্নতির পাশাপাশি জাপানের সমাজে এক গভীর সংকটও নিহিত রয়েছে, যার প্রতিফলন ‘হিকিকোমোরি’ নামে পরিচিত সামাজিক অশান্তিতে। “হিকিকোমোরি” শব্দটি জাপানি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো ‘বন্দী হয়ে থাকা’ বা ‘সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা’। এটি একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে বিশেষ করে তরুণরা দীর্ঘ সময় ধরে নিজের ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকে, সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এই প্রক্রিয়া শুধু একটি মানসিক রোগ নয়, সামাজিক সংকট, যা ক্রমেই মহামারি আকার ধারণ করছে।

হিকিকোমোরি শুধুমাত্র জাপানের সমস্যা নয়, এটি বর্তমানে বিভিন্ন দেশে প্রভাব ফেলছে, বিশেষত এমন উন্নত দেশে যেখানে পারফেকশনিজম এবং সামাজিক প্রত্যাশা অত্যধিক চাপ সৃষ্টি করে। ১৯৭০-এর দশক থেকে জাপানে হিকিকোমোরির প্রবণতা শুরু হলেও এটি ১৯৯০-এর দশকে ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে জাপানি সমাজের সংস্কৃতি, মানসিক চাপ এবং পরিবারিক কাঠামোকে দায়ী করা যায়। জাপানে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবারের প্রতি অত্যধিক প্রত্যাশা তরুণদের মধ্যে অবচেতন দুশ্চিন্তা এবং চাপ সৃষ্টি করে, যেটা পরবর্তীতে আত্মবন্দিত্বের দিকে পরিচালিত করে। অনেক ক্ষেত্রে, তরুণরা শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও, তারা পরিবার কিংবা বন্ধুদের কাছে নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করতে পারে না।

জাপানি সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ‘গাম্বারে’ (গো টু দ্য বেস্ট) সংস্কৃতি, যেখানে পারফেকশনিজম এবং কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ব্যক্তির প্রতি সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশা অত্যধিক হয়ে ওঠে। যখন কেউ এই চাপ মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা অস্থির হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত হিকিকোমোরির মতো আত্মবন্দিত্বের পথে চলে যায়। এই প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তরুণেরা সমাজের অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা অনুভব করে এবং এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা দেয়। এছাড়া জাপানি পরিবারে শিশুদের প্রতি অতিরিক্ত শাসন ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতি বাধ্যবাধকতা কিশোরদের জন্য এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

আজকের প্রযুক্তির যুগে, যেখানে ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, সেখানে হিকিকোমোরির সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে অনলাইন গেমিং এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, হিকিকোমোরি ব্যক্তির জন্য এক ধরনের আশ্রয়স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভার্চুয়াল পৃথিবী তাদের বাস্তব জীবনের চাপ এবং বাস্তব সম্পর্কের সমস্যা থেকে পালানোর একটি পথ হয়ে উঠেছে। তারা অনলাইন গেমে, সামাজিক প্ল্যাটফর্মে অথবা ভার্চুয়াল বাস্তবতায় নিজেকে আবিষ্কার করে এবং অনেক সময় এই ভার্চুয়াল যোগাযোগকে তাদের জীবনের মূল অংশ হিসেবে গ্রহণ করে। এটি তাদের জন্য এক ধরনের নিরাপদ আশ্রয়, যেখানে সমাজের প্রত্যাশা এবং চাপের কোনও উপস্থিতি নেই। তবে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক হতে পারে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য আরও খারাপ করে তোলে এবং বাস্তব জীবন থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

হিকিকোমোরির দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান মানসিকভাবে অনেক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় যারা যুক্ত থাকে, তাদের মধ্যে উদ্বেগ, অবসাদ, একাকিত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়। পাশাপাশি তাদের সামাজিক দক্ষতাও ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে যোগাযোগের অভাব তাদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং তারা সমাজে পুনঃপ্রবেশের ক্ষেত্রে ভয় অনুভব করে। একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা এবং নিজের অনুভূতিগুলি প্রকাশ করা তাদের জন্য একটি কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

হিকিকোমোরি কেবল একটি মানসিক অবস্থা নয়, এটি একটি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সংকট, যেখানে ব্যক্তি নিজেকে সমাজ থেকে একেবারে আলাদা করে ফেলে। জাপান সরকার এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যে ‘রিইনটিগ্রেশন প্রোগ্রাম’ অন্যতম, যেখানে হিকিকোমোরি ব্যক্তিদের ধীরে ধীরে সমাজে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। এছাড়াও সমাজে হিকিকোমোরির জন্য বিশেষ কাউন্সেলিং এবং মনোবিদদের সহায়তা প্রদান করা হয়। তবে সমাজের প্রতিক্রিয়া সীমিত। অনেক হিকিকোমোরি ব্যক্তি সরকারের সহায়তা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং তাদের মানসিক অবস্থার কারণে তারা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এটি একটি নীরব সংকট, যেখানে ব্যক্তি কখনওই তার সমস্যার মুখোমুখি হতে চায় না এবং তার আত্মবিস্মরণের দিকে চলে যায়।

হিকিকোমোরি একমাত্র জাপানে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলিতে, যেখানে জীবনের মান ও কর্মস্থলের চাপ অতিরিক্ত হয়ে থাকে, সেখানে তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব এবং আত্মবন্দিত্বের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং এমনকি ইউরোপের কিছু দেশে এই ধরনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে হিকিকোমোরি বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি দেশের সমস্যা আলাদা। কিছু দেশে এটি একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে পরিগণিত, আবার কিছু দেশে এটি একটি সামাজিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হিকিকোমোরি কেবল এক ধরনের মানসিক রোগ বা সামাজিক অবস্থা নয়, এটি একটি সমাজের প্রতিফলন—যেখানে একজন তরুণের ভবিষ্যত, তার মানসিক শান্তি এবং তার অস্তিত্বের প্রতি আগ্রহ উজ্জীবিত করার জন্য তাকে সমাজের কাঠামোর মধ্যে বন্দী করা হয়। সুতরাং সমাজে এই প্রবণতা মোকাবিলা করতে হলে, আমাদের নতুন করে একে অপরকে বোঝার এবং সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পরিবার, স্কুল, এবং সরকার যদি সঠিকভাবে এ সমস্যাটির মোকাবিলা করে, তবে ভবিষ্যতে আমরা একটি সহানুভূতিশীল এবং সমর্থনমূলক সমাজ গড়ে তুলতে পারব, যেখানে তরুণরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে জীবনের সব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সংগ্রাম করবে এবং একাকিত্বের শিকার হবে না।

মেন্সট্রুয়াল কাপ – বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে , এর গ্রহণযোগ্যতা কেমন ?

মহিলাদের ঋতুচক্র একটি স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। যুগ যুগ ধরে নারীরা বিভিন্ন উপায়ে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। তুলো, কাপড়, স্যানিটারি ন্যাপকিন—এসব পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক সময়ের এক উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন হলো মেন্সট্রুয়াল কাপ। এটি শুধু স্বাস্থ্যগত সুবিধা নয়, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড়সড় পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে এসেছে।

মেন্সট্রুয়াল কাপ কী?

মেন্সট্রুয়াল কাপ একটি ছোট, নমনীয়, ঘণ্টার মতো আকারের কাপ যা সাধারণত মেডিকেল গ্রেড সিলিকন, রাবার বা থার্মোপ্লাস্টিক এলাস্টোমার দিয়ে তৈরি। এটি যোনির অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়ে রাখা হয় যাতে ঋতুর সময় নির্গত রক্ত সেখানে জমা হয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে একটি কাপ ৮-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে এবং সঠিক যত্নে এক কাপ ৫-১০ বছর পর্যন্ত টিকে যেতে পারে।

ইতিহাসের পাতা থেকে মেন্সট্রুয়াল কাপ

মেন্সট্রুয়াল কাপের ইতিহাস শতাব্দীরও বেশি পুরনো। ১৯৩০-এর দশকে আমেরিকান অভিনেত্রী ও উদ্ভাবক Leona Chalmers প্রথম বাণিজ্যিকভাবে একটি মেন্সট্রুয়াল কাপ বাজারে আনেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাবারের ঘাটতির কারণে এটি জনপ্রিয়তা পায়নি। পরবর্তীতে ১৯৮০-এর দশকে সিলিকনের ব্যবহার বাড়তে থাকলে কাপটির উন্নত সংস্করণ ফের বাজারে আসে। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে স্যানিটারী পণ্য উৎপাদনকারী বড় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে আবারও ওই কাপ বানানোর চেষ্টা করেন লিওনা। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করাতে হবে বলে তখনকার নারীরা এটি নিয়ে বিব্রতবোধ করেন এবং ব্যবহারে অনীহা দেখান। ফলে সেবারও এই কাপ আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে DivaCup, Mooncup, Lunette প্রভৃতি ব্র্যান্ড বিশ্বব্যাপী পরিচিত। উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এটি ছড়িয়ে পড়ছে।

মেন্সট্রুয়াল কাপের সুবিধা

দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার: একবার কিনলে কয়েক বছর ব্যবহার করা যায়।
পরিবেশবান্ধব: প্লাস্টিক ও টিস্যু বর্জ্য কমে যায়।
স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ: সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কম।
আরামদায়ক: সঠিকভাবে বসালে কাপের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না।
কম বার বদলানোর প্রয়োজন: ব্যস্ত নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত সহায়ক।

অসুবিধা ও সতর্কতা

নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য প্রবেশ করানো কঠিন হতে পারে।
সব যোনি আকারে ফিট না হতে পারে।
পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার নিয়ম না জানলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
জনসচেতনতার অভাব ও কুসংস্কার অন্যতম বাধা।
বাইরে থাকলে অনেকসময় পরিষ্কারের সুযোগের অভাবও ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মেন্সট্রুয়াল কাপ

বাংলাদেশে ঋতুস্রাব এখনো একটি সামাজিক ট্যাবু। যদিও শহরাঞ্চলে সচেতনতা বাড়ছে, গ্রামে এখনো ঋতুকালীন পরিচর্যা গোপনীয়তা ও সংকোচের ঘেরাটোপে বন্দী। মেয়েরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় থেকেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের পরিবর্তে কাপ ব্যবহারের ধারণা পেলে সেটি স্বাভাবিক হতে পারতো। সম্প্রতি কিছু NGO যেমন Simavi, Brac, এবং Ella Pad নারীস্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে মেন্সট্রুয়াল কাপ সরবরাহ শুরু করেছে। Project Red এবং Joya Sanitary এর মতো প্রতিষ্ঠানও মেনস্ট্রুয়েশন-ফ্রেন্ডলি স্কুল চালু করেছে, যেখানে কাপ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যপণ্য সম্পর্কে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

সরকারিভাবে এখনো কোনো বৃহৎ উদ্যোগ দেখা যায়নি, তবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে মাসিক ও স্বাস্থ্যের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকায় একে কেন্দ্র করে কাজ শুরু করা যেতে পারে। অনেক গ্রামীণ নারী প্রথমে কাপ ব্যবহার নিয়ে ভয়, সংকোচ এবং “শরীরে কিছু ঢোকানো যাবে না”—এই বিশ্বাস থেকে সরেন না। কুমারীত্ব হারানোর ভয়, পবিত্রতা সংক্রান্ত ভুল ধারণা এবং পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এই প্রসারে বাধা দেয়। তবে প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা জানার সুযোগ পেলে এই নারীরা অনেকেই কাপ ব্যবহার করে স্বস্তি ও সাশ্রয়ের কথা স্বীকার করেন।

সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি থেকেই মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন, ঋতুচক্র ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে পাঠ চালু রয়েছে। তবে সেখানে মেন্সট্রুয়াল কাপের প্রসঙ্গ প্রায় অনুপস্থিত। মাসিকের সময় কাপ, প্যাড, ট্যামপন—এই সব বিকল্পের মধ্যে স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় আলোচনা থাকা প্রয়োজন। স্কুলে কাপ ব্যবহারের ডেমো ক্লাস, হেলথ ক্যাম্প তৈরি করা হলে মেয়েরা খোলামেলা জানার ও শেখার সুযোগ পাবে ।২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৭২% কিশোরী এখনো পুরনো কাপড় ব্যবহার করে, যেগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করায় সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে। স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের হার শহরে ৪০%-এর বেশি হলেও গ্রামে তা ২০%-এর নিচে। মেন্সট্রুয়াল কাপ ব্যবহারকারী নারীর হার এখনো ১% এর নিচে, তবে তা প্রতিবছর দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।

বিশ্বব্যাপী প্রতিটি নারী গড়ে ১২ হাজার স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করেন জীবদ্দশায়, যার অধিকাংশই অবিনাশযোগ্য। এক্ষেত্রে কাপ একটি বড় পরিবেশগত বিকল্প হতে পারে। মেন্সট্রুয়াল কাপ শুধুমাত্র একটি পণ্য নয়, এটি নারী স্বাস্থ্য ও স্বাধীনতারও প্রতীক। সময় এসেছে, ঋতুচক্রকে সংকোচ নয়, সচেতনতায় রূপান্তর করার—আর মেন্সট্রুয়াল কাপ হতে পারে সেই পরিবর্তনের প্রেরণা।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ : শান্তিচেষ্টায় আমেরিকার সাথে যুক্ত হলো ইউরোপ

ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে বৃহস্পতিবার প্যারিসে ফ্রান্স, ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা একটি বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠক সফল হয়েছে বলেই দাবি করছে সবপক্ষ। গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র একক দায়িত্বে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল। যুদ্ধ বন্ধের প্রাথমিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কার্যত ব্রাত্য ছিল ইউরোপীয় দেশগুলো। এদিন প্যারিস বৈঠকের পর ইউরোপীয় দেশগুলোও এই আলোচনায় যোগ দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ নিজে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফকে। সম্প্রতি রাশিয়ায় গিয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছিলেন উইটকফ।

বৃহস্পতিবার একের পর এক বৈঠক হয়েছে প্রতিনিধিদের মধ্যে। জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরাও প্যারিসে পৌঁছেছেন। বৈঠক শুরুর আগে ম্যাখোঁর অফিস থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের জন্য শান্তিচুক্তি কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করতেই এই বৈঠকের আয়োজন হয়েছে। অবশ্য বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই বৈঠককে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কারণ তারা মনে করেন, ইউরোপের নেতারা চান না যে যুদ্ধ বন্ধ হোক। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করতে মিত্রদের সামনে একটি প্রস্তাব পেশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ প্রস্তাবে যুদ্ধ শেষ করার শর্তাবলি ও টেকসই যুদ্ধবিরতির জন্য মস্কোর ওপর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের রূপরেখা রয়েছে।

এই প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধ কার্যত যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায়ই বন্ধ হবে—অর্থাৎ বর্তমানে রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় অঞ্চলগুলো মস্কোর নিয়ন্ত্রণেই থেকে যাবে। কিয়েভের ন্যাটোতে যোগদানের ইচ্ছাও বাদ দেওয়া হবে। আলোচনার গোপনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, তারা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পূর্ণ যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে চান। ফের আলোচনা করতে মিত্র দেশগুলো আগামী সপ্তাহে লন্ডনে ফের একত্র হবে। প্যারিস ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, তিনি আশা করেন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এ সংকট সমাধানে সহায়তা করবে। তবে তিনি এ-ও ইঙ্গিত দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ধৈর্য দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চলকে রাশিয়ার অধীনে স্বীকৃতি দেওয়ার চিন্তা করছে বলে জানিয়েছেন বিষয়টির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন। রাশিয়া-ইউক্রেন শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবেই এ ধরনের ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব আসছে বলে জানা গেছে।

শুল্কযুদ্ধের প্রভাব – জার্মান ব্যবসায়িক প্রবাহ , নতুন গন্তব্য বাংলাদেশ

এপ্রিল ২০২৫ মাসে একটি উচ্চপর্যায়ের জার্মান ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা। এই প্রতিনিধিদলে জার্মান পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, দেশটির রপ্তানি ঋণ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সফরকালে প্রতিনিধিদল ঢাকায় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫-এ অংশগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করে। সফরের সমন্বয় করে জার্মান এশিয়া-প্যাসিফিক বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন (ওএভি), যা এশিয়াজুড়ে জার্মান ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রচারের জন্য কাজ করে।

সফরের সময় জার্মান পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অস্পিগ জিএমবিএইচের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থমাস ক্যোনিং বলেন, ‘উদীয়মান বাজার হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্রোইকোনমিক তথ্য ও উপকরণগুলো ব্যাপক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ আলমুট রোসনার, ওএভির নির্বাহী বোর্ডের সদস্য, সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে এটি ছিল তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ স্থাপন এবং বাংলাদেশের সংস্কার নীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করার একটি সুযোগ।

জার্মানি ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো (৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার)। জার্মানি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার এবং বাংলাদেশের রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি বস্ত্রপণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দেশে রপ্তানি হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ জার্মানি থেকে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সামগ্রী আমদানি করে।

পোশাক এবং চামড়াজাত পণ্য খাতে বেশ কিছু জার্মান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন কারখানা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে থমাস ক্যোনিংয়ের কোম্পানি অস্পিগ কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়োগ করে জিনস ও জ্যাকেট উৎপাদন করছে। এছাড়া, পিকার্ড, একটি বাংলাদেশ-জার্মান যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি, ১৯৯৫ সাল থেকে চামড়াজাত হ্যান্ডব্যাগ এবং আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি করছে। আরও একটি উদাহরণ হলো হানা সিস্টেম লিমিটেড, যা বাংলাদেশের মেঘনা গ্রুপের সহযোগিতায় কিউব তৈরির কাজ করছে। বর্তমানে প্রায় ৮০টি জার্মান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে বাসফ, বায়ার, বশ এবং সিমেন্সের মতো বহুজাতিক কোম্পানিও রয়েছে।

এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন বিশ্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আক্রমণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেন, যদিও বেশিরভাগ বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য ৯০ দিনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এই নীতির কারণে বাংলাদেশি সরবরাহকারী এবং তাদের অর্ডারের ওপর প্রভাব পড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতটি বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন করে। বর্তমানে, এই শিল্প পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

ক্যোনিং বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং চীনের ওপর উচ্চ মার্কিন শুল্ক জার্মান কোম্পানিগুলোকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র অনুসন্ধানে উৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, ‘বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা এবং অতিরিক্ত শুল্কের কারণে বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য শিল্পপণ্য উপাদানে চীনের বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনা রাখে।’ পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ থিংক ট্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ ক্যোনিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য এক প্রজন্মে একবারের সুযোগ।’ তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান পুরোনো নিয়মকানুন, বাণিজ্য লজিস্টিক দুর্বলতা এবং উৎপাদনশীলতা উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার।

তবে বিনিয়োগকারীদের কিছু সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎসংকট, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জার্মান বিনিয়োগকারীরা এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন। ক্যোনিং উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বেশ উন্নত হয়েছে এবং তিনি মনে করেন, পোশাক খাতে বাংলাদেশের সাফল্য প্রমাণ করে, দেশটি অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করতে পারবে। ওএভির রোসনার বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিনিয়োগকারীরা এসব বিষয়ে সতর্ক আছেন, তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

‘তোয়ান মারত নাইং’ : মাত্র ৩০ বছর বয়সে , আরাকান আর্মির নেতৃত্ব নেন

পাহাড় আর সমুদ্রবেষ্টিত রাখাইন বহুদিন ধরেই অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র। মিয়ানমারের এ রাজ্যটির রাজধানী সিত্তের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন তোয়ান মারত নাইং। কৈশোরে দারিদ্র্য তাকে নিয়ে যায় কাচিনের খনিজ উত্তোলন খনিতে। সেখানেই সামরিক প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি। ২০০৯ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে গড়ে তোলেন আরাকান আর্মি। দায়িত্ব নেন কমান্ডার ইন চিফের। সামরিক কৌশল, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মিশেলে গড়া তার নেতৃত্বে আজ রাখাইনের ৯০ শতাংশ আরাকান আর্মির দখলে, যা বদলে দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির চিত্রপট। কৈশোরে তিনি কাচিন রাজ্যের খনিতে কাজ করার সময় তার পরিচয় হয় কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির সঙ্গে। সশস্ত্র ওই সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। যারা পরবর্তী সময়ে তাকে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেন।

১৯৯৮ সালে তিনি ‘ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকান’-এ যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সেই সংগঠনের প্রধান সেনা অভিযানে নিহত হন। এরপর ২০০৪ সালে তার সঙ্গে যুক্ত হন চিকিৎসক নায়ো তোয়ান অং। দুজন মিলে ২০০৯ সালে গঠন করেন আরাকান আর্মি। যার লক্ষ্য ছিল রাখাইন রাজ্যে স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা। কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মির সহায়তায় মাত্র ২৬ সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে আরাকান আর্মি। বর্তমানে তার বাহিনীর সদস্য ২০-২৫ হাজার। তিনি সরাসরি যুদ্ধে নামার আগে জোট গঠনের দিকে মনোযোগ দেন। ২০১৫ সালে কাচিন, তাআং ও কোকাং বাহিনীর সঙ্গে ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ গঠন করেন, যা আরাকান আর্মিকে সামরিকভাবে আরো শক্তিশালী করে।

ইয়াঙ্গুনে পর্যটন গাইড হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তোয়ান মারত নাইংকে গড়ে তুলেছে একজন দক্ষ ইংরেজিভাষী হিসেবে। এ অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে তিনি সামরিক কৌশল, দর্শন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূগোল ও ইতিহাসেও দক্ষতা লাভ করেন। গেরিলা নেতার বাইরেও হয়ে ওঠেন একজন চিন্তক ও কৌশলবিদ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সামরিক সরকার পতনের দাবিতে মিয়ানমারজুড়ে শুরু হওয়া প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখপাত্র হয়ে ওঠে আরাকান আর্মি। তোয়ান মারত নাইং নিজে ব্যক্তিগতভাবে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। রাজনৈতিকভাবে বৃহত্তর বিপ্লবের পক্ষে নিজের অবস্থান জানান দেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যোগাযোগ বাড়ান।

তিনি বরাবরই জোর দিয়েছেন রাখাইন জনগণের নিজস্ব স্বায়ত্তশাসনের দাবির ওপর। তার মতে, নতুন মিয়ানমার হবে একটি ফেডারেল কাঠামোর দেশ, যেখানে প্রতিটি জাতিগোষ্ঠী নিজের অঞ্চলের ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব বজায় রাখবে। এ ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে তার নেতৃত্বাধীন আরাকান আর্মির সামরিক ও কূটনৈতিক কার্যক্রমে। জাতিগত ঐক্যকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী যেমন কাচিন ইনডিপেনডেন্স আর্মি, কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মিসহ অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলেন। এ ঐক্যের ভিত্তিতে তারা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সামরিক জান্তার পতন ঘটায়।

মিয়ানমারের দক্ষ সামরিক বাহিনীকে কৌশলের যুদ্ধে পরাজিত করেন তিনি। তার কৌশল ছিল তিন স্তরবিশিষ্ট। প্রথমত, গ্রামীণ এলাকাগুলো থেকে জান্তা সেনাবাহিনীকে উৎখাত করা। স্থানীয়দের আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি কৌশলে আরাকানিজ তরুণদের সংগঠিত করতে থাকেন, বিশেষত যাদের মধ্যে অসন্তোষ, বঞ্চনা ও শিকড়চ্যুতির বেদনা ছিল প্রবল। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়া। সর্বশেষ আধুনিক অস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে সরকারি সেনাবাহিনীর ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা। প্রতিটি অভিযানে তার এ কৌশল অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

সামরিক সাফল্যের পর অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে চীনের মধ্যস্থতার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এটা স্পষ্ট করে যে, নাইং চান না রাখাইনের সামরিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বেইজিং দ্বারা নির্ধারিত হোক। কিন্তু তিনি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নও করেননি। কারণ রাখাইন উপকূলে চীনের বিনিয়োগ (বিশেষ করে কিউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর) আরাকান আর্মির কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। এ দ্বৈত নীতির মাধ্যমে নাইং রাখাইন অঞ্চলে চীনের প্রভাবকে সীমিত রাখার চেষ্টা করছেন, আবার তার থেকে সম্ভাব্য কৌশলগত সুবিধাও নিচ্ছেন।

ভারত প্রথম দিকে আরাকান আর্মিকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করলেও সম্প্রতি বিদ্যমান বাস্তবতা ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। নাইং জানেন ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অংশ হিসেবে কৌশলগত কালাদান মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট রাখাইনের মধ্য দিয়ে গেছে, এ রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ভারতের অগ্রাধিকার। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নাইং ভারতকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, রাখাইন অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আরাকান আর্মির সঙ্গে সমন্বয় করাই ভারতের জন্য যুক্তিসংগত। বিশ্লেষকদের মতে, চীন ও ভারত—এ দুই শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় তোয়ান মারত নাইংয়ের মূল কৌশল হলো ভারসাম্য রক্ষা ও কোনো এক পক্ষের ওপর নির্ভর না হয়ে রাখাইন রাজ্যের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করে নেয়া।

তবে আন্তর্জাতিকভাবে তোয়ান মারত নাইংয়ের ভাবমূর্তি শুধু ইতিবাচক নয়। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ, যা তাকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মেজর জেনারেল তোয়ান মারত নাইংয়ের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জাতিগত স্বীকৃতি না দিয়ে নাগরিক হিসেবে অধিকার দেয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। এখন অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। রাখাইনরা সাধারণত বেশ জাতীয়তবাদী। এছাড়া সম্প্রতি রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মির বিপক্ষে অস্ত্র তুলে নেয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। নেতা হিসেবে রোহিঙ্গাদের পক্ষে কথা বললে কট্টর জাতীয়তবাদীদের কাছে তার জনপ্রিয়তা হ্রাসের ঝুঁকি রয়েছে।’

মাত্র ৩০ বছর বয়সে সশস্ত্র সংগঠন গড়া তরুণ তোয়ান মারত নাইং পাহাড়ি এলাকা থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবেন, তা কেউ ভাবেনি। বিপুল জনসমর্থন, সুসংগঠিত বাহিনী, কূটনৈতিক কৌশল ও কাঠামোবদ্ধ রাজনৈতিক অবস্থান মিলিয়ে রাখাইন রাজ্যের এ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা বর্তমানে শুধু মিয়ানমারে নয়, সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হয়েছেন।

অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থিতিশীলতা সম্ভব , বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রেক্ষাপট – আইএমএফের বার্তা

0

বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্কনীতি এবং ভঙ্গুর আর্থিক পরিবেশের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে এই টালমাটাল পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের মন্দার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্কনীতি এবং চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পাল্টা পদক্ষেপ বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে অর্থনৈতিক কাঠামো যেমন চাপে পড়েছে, তেমনি আর্থিক বাজারেও বেড়েছে অস্থিরতা। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে এবং ভোক্তাদের ব্যয়ও প্রভাবিত হচ্ছে।

জর্জিয়েভা বলেন, “এ অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার ফলে খরচ বাড়বে, আমাদের নতুন প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমুখী হবে। তবে এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির মৌল কাঠামো বেশ মজবুত রয়েছে, বিশেষত শ্রমবাজারের শক্ত ভিত্তি এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার কারণে।” আইএমএফ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ এবং এর ফলে উদ্ভূত বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটেছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক আস্থায়ও ভাঙন ধরেছে। এসব বিষয়ে আলোচনা করতেই আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে বসছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বসন্তকালীন সভা। এ সভায় অংশ নেবেন বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধান ও অর্থমন্ত্রীবৃন্দ।

এছাড়া মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড কার্ভের সাম্প্রতিক আচরণকেও এক প্রকার “সতর্ক সংকেত” হিসেবে দেখছেন আইএমএফ প্রধান। এটি ভবিষ্যৎ মন্দার ইঙ্গিত হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন শুল্কনীতি চলতি ও আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মন্দার সম্ভাবনা ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ মাত্রা। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মনে করেন, বাণিজ্যনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। শুল্ক একদিকে পণ্যের মূল্য বাড়াতে পারে, অপরদিকে ভোক্তাদের ব্যয় কমিয়ে অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিতে পারে। যদিও সামগ্রিকভাবে আইএমএফ বড় ধরনের মুদ্রাস্ফীতির পূর্বাভাস দিচ্ছে না, তথাপি সংশোধিত পূর্বাভাসে কিছু দেশে মুদ্রাস্ফীতির উর্ধ্বগতি দেখা যেতে পারে।

উল্লেখ্য জানুয়ারিতে আইএমএফ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, তাতে ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের জন্য প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে নতুন বাস্তবতায় এই পূর্বাভাস সংশোধন করা হয়েছে। শিগগিরই ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এর হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করবে আইএমএফ। বিশ্বের বাণিজ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জর্জিয়েভা বলেন, “অতীতে দেখা গেছে, যখন শুল্ক বাড়ানো হয়, তখন তার বোঝা বহন করে আমদানিকারক ও ভোক্তা—তারা হয় মুনাফা কমায়, নয়তো বেশি দাম দেয়। এ পরিস্থিতি বড় অর্থনীতিগুলোয় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে ছোট দেশগুলোর জন্য।”

তার মতে সুরক্ষাবাদী নীতি উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে, বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়। কারণ এ নীতি প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। তাই আইএমএফ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—অর্থনৈতিক সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে, স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হবে এবং শক্তিশালী আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জর্জিয়েভা বলেন, “আজকের দিনে বিশ্বের ক্ষমতা বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে—একটি বহুমেরু বিশ্ব গড়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে আহ্বান জানান, তারা যেন শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমায় এবং একটি উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলে। কারণ বিশ্বের ছোট দেশগুলো এ অনিশ্চয়তা ও বাজারের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় শিকার হয়।

এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি ন্যায্যতা ও নিয়মমাফিক সমঝোতায় পৌঁছায়, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশগুলোকেও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার আগে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি। প্রতিবেদনের শেষ অংশে জর্জিয়েভা বলেন, “সব দেশ, বড় হোক বা ছোট, এই অনিশ্চিত সময়ের চাপ মোকাবেলায় দায়িত্ব নিতে পারে এবং নেয়া উচিত। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা স্থিতিশীল, সহনশীল এবং সহযোগিতাপূর্ণ, বিভক্ত নয়।”

এই বিবৃতি একদিকে যেমন সতর্কতা বহন করে, তেমনি অন্যদিকে দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা ও সুবিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিটি আন্দোলন-প্রতিক্রিয়ায় আজ সংযুক্ত বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে—এই বার্তাই যেন উঠে আসে আইএমএফের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে।