Home Blog Page 129

পুঁজিবাদ বিষয়ে ৮ টি ভুল মিথ –

0

পুঁজিবাদ একটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা, যা ব্যক্তি মালিকানা, মুক্ত বাজার এবং মুনাফা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এটি আজকের আধুনিক বিশ্বের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত বেশ কিছু মিথ বা ভুল ধারণা রয়েছে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে গভীর প্রভাব ফেলছে।

১. ট্রিকল-ডাউন অর্থনীতি কাজ করে না

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলটি বিশ্বাস করে যে, ধনী ও বড় ব্যবসায়ীরা যদি আরও বেশি মুনাফা অর্জন করেন, তবে সেই মুনাফা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এটি “ট্রিকল-ডাউন” অর্থনীতি নামে পরিচিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এর মাধ্যমে সমাজের একাধিক স্তরের মধ্যে আর্থিক বৈষম্য আরও গভীর হয়। ধনীরা তাদের মুনাফা নিজেরাই জমিয়ে রাখেন এবং এই অর্থ সাধারণ মানুষের জন্য কোনো উপকারে আসে না। উল্টে ধনীদের মধ্যেও সংকীর্ণ মুনাফা-অর্জন ভিত্তিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে নিজেদের লাভ বাড়ানোর চেষ্টা করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য উন্নতি কিংবা উপকারের সুযোগ কমে যায়।

২. ধনকুবের মানেই উন্নত সমাজ

পুঁজিবাদী সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো, ধনীরা সমাজের উন্নতির প্রতীক। কিন্তু এই ধারণা যে কতটা বিপথগামী, তা বোঝা যায় উন্নত দেশগুলোর বাস্তবতা থেকে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে ধনীদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েছে, কিন্তু একই সময়ে গরিবদের সংখ্যা ও দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৃথিবীর শীর্ষ ১% মানুষ পৃথিবীর প্রায় ৪৪% সম্পদ দখল করে রেখেছে। এর অর্থ, ধনীর সংখ্যা বাড়ানোর মাধ্যমে সমাজের উন্নতি হয় না বরং এতে বৈষম্য আরও বাড়ে।

৩. গরিবরা কাজ না করায় গরিব, ধনীরা কঠোর পরিশ্রম করে ধনী

এই মিথটি প্রায়ই পুঁজিবাদের মূল বিশ্বাস হিসেবে গৃহীত হয়, যে গরিবরা অলস এবং তাদের পরিশ্রমের অভাবের কারণে তারা দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ গরিবই অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেন এবং তাদের জীবিকা অর্জন করতে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে অনেক ধনীরাই তাদের সম্পদ অর্জন করেছেন উত্তরাধিকারসূত্রে বা অন্য কোনো সুবিধাজনক উপায়ে, যা কঠোর পরিশ্রমের ফল নয়।
একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, শীর্ষ ধনীদের প্রায় ৪৫% তাদের সম্পদের ৫০% পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে, যা তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের ফল নয়। তাই শুধুমাত্র পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষ ধনী হতে পারে, তা সঠিক নয়।

৪. পুঁজিবাদ উদ্ভাবন ও প্রতিভাকে পুরস্কৃত করে

পুঁজিবাদ যে উদ্ভাবনকে পুরস্কৃত করে, তা আসলে একটি ভুল ধারণা। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো উদ্ভাবনকে সীমিত রাখে, যাতে তারা অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারে। প্রযুক্তির অনেক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন, যেমন মাইক্রোচিপ, ইন্টারনেট বা ক্লোনিং প্রযুক্তি, প্রথমে সরকারি গবেষণাগারে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো তা গ্রাস করে নিজস্ব মুনাফা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছে, সাধারণ মানুষের জন্য তা সহজলভ্য হয়নি।

৫. বেশি কাজ মানেই বেশি উৎপাদন

এই মিথটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় খুবই প্রচলিত। এটি বলে, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সময় কাজ করলে কর্মীশক্তির অবসাদ ঘটে, যা উৎপাদনশীলতাকে হ্রাস করে। গবেষণা দেখিয়েছে, সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে শ্রমিকের কর্মদক্ষতা কমে যায় এবং মানসিক চাপ বাড়ে। এমনকি কিছু দেশে যেমন ডেনমার্ক বা নেদারল্যান্ডসে কম ঘণ্টার কাজেও উৎপাদনশীলতা বেশি, কারণ সেখানে শ্রমিকদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

৬. ন্যূনতম মজুরি বাড়ালে মানুষ অলস হয়ে যায়

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় প্রচলিত একটি মিথ হলো, ন্যূনতম মজুরি বাড়ালে কর্মীরা অলস হয়ে যাবে এবং কর্মসংস্থান কমে যাবে। এটি সঠিক নয়। বাস্তবতা হলো উপযুক্ত মজুরি দিলে কর্মীরা তাদের কাজের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়, এবং কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পায়। মিনি-প্রজেক্টগুলো বা পরিষেবা খাতে যদি শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি দেয়া হয়, তবে তাদের কাজে স্বতঃস্ফূর্ততা ও মানসিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।

৭. জনসংখ্যা নয়, পুঁজিবাদই জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বর্জ্য উৎপাদনের সাথে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এর আসল কারণ হলো পুঁজিবাদী অর্থনীতি সীমাহীন প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে, যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা থেকে বাঁচতে এবং মুনাফা বৃদ্ধির জন্য পরিবেশ দূষণকারী প্রক্রিয়াগুলো চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমশ নিঃশেষিত হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে।

৮. স্টক মার্কেট মানেই ভালো অর্থনীতি

পুঁজিবাদে স্টক মার্কেটকে অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবে দেখা হয়, তবে এর বাস্তবতা হলো, স্টক মার্কেটের ওঠানামা সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, স্টক মার্কেট মূলত ধনীদের মধ্যে অর্থ বণ্টন করে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো সুবিধা আসে না। শেয়ার বাজারের মুনাফা অনেক সময় মানুষের জন্য কোনো ভালো ফলাফল এনে দেয় না।

৯. টাকা সুখ কিনতে পারে না

এই মিথটি সাধারণত প্রচলিত থাকে, যা বলে যে টাকা সুখ আনে না। তবে বাস্তবতা হলো, টাকা মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে সহায়তা করে এবং তার মাধ্যমে একটি মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। কোনো দেশ যদি তার নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সুখী হয়।

পুঁজিবাদী মিথগুলো অনেক সময় আমাদের সমাজের কাঠামো, শ্রমিকদের অবস্থা এবং সামাজিক ন্যায্যতার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে বাধা দেয়। এই মিথগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার মাধ্যমে আমরা একটি আরো ন্যায্য ও সমতার ভিত্তিতে গড়া পৃথিবী গড়তে পারি, যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং তারা সুষম সুযোগ পাবে।

সরকারের উচিত এ বছরের মধ্যেই নির্বাচন দিয়ে দেওয়া : বদরুদ্দীন উমর

0

” … একটা রিগ্রেসিভ (নিপীড়নমূলক) সরকারকে ফেলে দিয়েছে এই অভ্যুত্থান। যারা ফেলে দিয়েছে, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না। … তারা সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছিল। কোটার বৈষম্য আর সামাজিক বৈষম্য তো এক জিনিস নয়। অথচ অনেকেই দুটি বিষয়কে এক জিনিস বলে ধরে নিয়েছে। … নতুন পার্টি ঠিক কী করবে, সেটা ভবিষ্যতেই দেখবে মানুষ; কিন্তু পার্টি হওয়ার পর তাদের যে পারফরম্যান্স, সেখানে এমন কিছু নেই, যেখানে বোঝা যাবে, তারা খুব একটা বড় ধরনের পরিবর্তন দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে আনতে পারবে। তারা বলছে, সংবিধান পরিবর্তন করতে চায়। কী ধরনের পরিবর্তন চায়, কেন পরিবর্তন চায়, তার বিস্তারিত তো কিছু দেখছি না। একটা পার্টি হয়ে গেল, অথচ তাদের ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্র নেই এখনো।

অল্পবয়স্ক ছেলেপেলে একটা পার্টি করল। তাদের প্রথম কথা হচ্ছে, কীভাবে ক্ষমতায় যাবে।…তাদের তো স্থানীয় ভিত্তি বলে কিছু নেই। গ্রামাঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক পরিচিতিও নেই। … প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও অন্য উপদেষ্টারা তো বলেননি যে তাঁরা সরকার গঠন করবেন।…ছাত্র ও অন্যরা মিলে যে এ ধরনের একটা সরকার দাঁড় করিয়েছে, সেটা বাস্তব পরিস্থিতিতে একটা সঠিক কাজ হয়েছে। কারণ, সেই মুহূর্তে সরকার গঠন না করা হলে সেই শূন্যতা পূরণের ক্ষমতা ছিল সামরিক বাহিনীর। … সরকারের একটা দুর্বল জায়গা তো রয়েছে। তারা নির্বাচিতও নয়। তাদের নিজস্ব কোনো শক্তিও নেই। হাসিনা চলে যাওয়ার পর দেশে যে একটা নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, সে জন্য তারা কাজ করেছে। সেদিক থেকে তারা তো ভালো কাজ করেছে।

… ফিন্যান্সিয়াল, ব্যাংকিংসহ অনেক জায়গায় তারা একটা মোটামুটি স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে এনেছে। সেটা না করলে তাহলে দেশে একটা ভীষণ অবস্থা দাঁড়াত। … সাময়িকভাবে তাদের যে পরিস্থিতি মোকাবিলার কথা ছিল, সেটা তারা করেছে। নির্বাচনের জন্য যেসব প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, সেটা করে তাদের উচিত তাড়াতাড়ি নির্বাচন দিয়ে দেওয়া। আমি মনে করি, এ বছরের মধ্যেই তাদের কাজ শেষ করা দরকার। … নির্বাচিত সরকার দেশের মানুষকে দুধেভাতে রাখবে, এমন নয়; কিন্তু একটা নির্বাচিত সরকার হয়ে গেলে তাদের একটা শক্তি থাকে, সামাল দেওয়ার যে ক্ষমতা, সেটা থাকে। বেশি দিন যদি অস্থায়ী সরকার থাকে, দেশে নানা রকম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। সেটা সামাল দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।

সব সংস্কার তাদের করতে হবে, তা তো নয়। তারা কমিশন করেছে। কমিশন রিপোর্ট দিয়েছে। সেই রিপোর্ট পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাজে লাগবে।… প্রথমকাজেই তাদের মূল সংস্কার যেটা নির্বাচনের ব্যাপারে, সেটা করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করাটা দরকার। “

বিশ্ব বই দিবস – সবচেয়ে বেশি বই পড়েন মার্কিনরা , ২য় ভারতীয়রা , বাংলাদেশিরা পেছনের দিকে

আজ বিশ্ব বই দিবস। দিনটিকে অনেকে ‘বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস’ও বলে থাকেন। বই পড়া, বই ছাপানো, বইয়ের কপিরাইট সংরক্ষণসহ ইত্যাদি বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেসকো) উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হয়। দিনটিকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ সাহিত্যজগতের তিন কিংবদন্তী উইলিয়াম শেকস্‌পিয়ার, মিগেল দে থের্ভান্তেস ও ইনকা গার্সিলাসো দে ভেগার প্রয়াণ দিবস ২৩ এপ্রিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বই পড়া শুধু বিনোদনের উপায় নয়, বরং কাজের চাপ, শিক্ষাজীবনের ক্লান্তি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের সংকট থেকে মুক্তি পেতেও বই হয়ে ওঠে পাঠকের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।

সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন কোন দেশের নাগরিকেরা কত বই পড়েন, বই পড়ায় কত সময় যায়, তা নিয়ে একটি জরিপ করে। বিশ্বের ১০২টি দেশে এ জরিপ চালানো হয়। ২০২৪ সালে ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পাঠকের ওপর চালানো জরিপের ভিত্তিতে সিইওওয়ার্ল্ড জানিয়েছে – দেশগুলোর পাঠকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বই পড়েন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা। বছরে গড়ে ১৭টি বই পড়েন তাঁরা। বই পড়ে শেষ করার ক্ষেত্রে তাদের পরেই ভারতীয়রা। বছরে গড়ে ১৬টি বই পড়েন ভারতের নাগরিকেরা। আমেরিকানরা বছরে বইয়ের পেছনে ব্যয় করেন ৩৫৭ ঘণ্টা, ভারতীয়রা ৩৫২ ঘণ্টা। বাংলাদেশও আছে এই তালিকায়, তবে তা ৯৭তম অবস্থানে।

ই-বুক বা অডিও বুকের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় পাঠকেরা এখনো কাগজের বইয়ের ডুবে থাকেন। তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা দেশটি যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ নাগরিকেরা বছরে গড়ে ১৫টি বই পড়েন। বইয়ের পেছনে ব্যয় করেন ৩৪৩ ঘণ্টা। যুক্তরাজ্যের পরই আছে ফ্রান্স। দেশটির একজন পাঠক বছরে গড়ে ১৪টি করে বই পড়েন, বইয়ের পেছনে ফ্রান্সের নাগরিকদের সময় যায় ৩০৫ ঘণ্টা ।সবচেয়ে বেশি বই পড়ার তালিকার পঞ্চম স্থানের দেশটি ইতালি। বছরে গড়ে ১৩টি বই পড়েন দেশটির পাঠকেরা। বইয়ের পেছনে ব্যয় করেন ২৭৮ ঘণ্টা। আর প্রতি মাসে একটি করে বই পড়েন কানাডার পাঠকেরা। বছরে ১২টি বইপড়ুয়ার দেশের নাগরিকেরা বইয়ের পেছনে সময় ব্যয় করেন ২৩২ ঘণ্টা।

কানাডার পরই আছে রাশিয়া। সপ্তমে থাকা দেশটির নাগরিকেরা বছরে ১১টি বই পড়েন। বই পড়ার পেছনে সময় ব্যয় করেন ২২৩ ঘণ্টা। অষ্টমে থাকা দেশটির নাম অস্ট্রেলিয়া। বছরে ১০টি বই পড়ে শেষ করেন অস্ট্রেলিয়ানরা। বছরের ২১৭ ঘণ্টা সময় বই পড়েন তাঁরা। এরপরই নবম স্থানে আছে স্পেন। বছরে ১৮৭ ঘণ্টা সময় বইয়ের পেছনে ব্যয় করেন স্প্যানিশরা। বছরে বই পড়েন গড়ে ৯টি। স্পেনের পরের স্থান অর্থাৎ ১০ম স্থানে থাকা দেশটি টিউলিপের দেশ নেদারল্যান্ডস। গড়ে বছরে ৮টি বই পড়েন এ দেশের পাঠকেরা। আর বইয়ের পেছনে সময় কাটে ১৮২ ঘণ্টা।

এদিকে জরিপ অনুযায়ী বই পড়ার ক্ষেত্রে পেছনের দিকে বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশ আছে ৯৭তম অবস্থানে। একজন বাংলাদেশি বছরে গড়ে বই পড়েন মাত্র তিনটি (২ দশমিক ৭৫)। বই পড়ায় বছরে আমাদের পাঠকের সময় কাটে মাত্র ৬২ ঘণ্টা। বাংলাদেশের পরের অবস্থানগুলোতে আছে – আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও পাকিস্তান। বিশ্বের অন্যতম একটি ম্যাগাজিন সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক ম্যাগাজিনটি সিইও, সিএফওসহ উচ্চস্তরের নির্বাহী পেশাদার, ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যক্তিদের জন্য নানা খবর প্রকাশ করে। বছরে ১ কোটি ২৪ লাখ পেজভিউয়ের ম্যাগাজিনটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক ম্যাগাজিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় – ৯০% এর বেশি ফেল , শিক্ষার মানে উদ্বেগ

0

২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ১,৮৯৬টি আসনের বিপরীতে ১,৪৬,৬৯৪ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেন।ভর্তি পরীক্ষায় পাস করেন মাত্র ৭,৪৩৭ জন। পাস করেন মাত্র ৫.৯৩% শিক্ষার্থী, ফেল করেছেন ৯৪.০৭%। এ বছর কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ১,১৪,৯০৪ জন। পাস করেছেন ১১,৩১০ জন শিক্ষার্থী। পাসের হার মাত্র ৯.৮৫%, ফেল করেছেন ৯০.১৫% । এসএসসি ও এইচএসসিতে ডবল জিপিএ ৫ পেয়েও প্রায় সোয়া লাখ শিক্ষার্থীর ভর্তি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর মেধা যাচাই করা হয়। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নে এসএসসি ও এইচএসসির বেসিক লেভেলটা ঠিক রেখেই প্রশ্ন করা হয়। যখন ফল প্রকাশিত হয়, তখন আমরাও হোঁচট খাই। একজন শিক্ষার্থী এসএসসি-এইচএসসির দুটিতেই ইংরেজিতে ৮০ প্লাস নম্বর পেয়ে এখানে সে পাস মার্কই উঠাতে পারছে না।’ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমার মনে হয়, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থীকে যেভাবে তৈরি করা হচ্ছে, সেটা রাইট ওয়েতে হচ্ছে না। একজন শিক্ষার্থীর দুর্বল ভিত্তির কারণে এ অবস্থা হচ্ছে। আবার ফলাফলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক একটা প্রতিযোগিতা থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে সেটা নেই।

আমরা আসলে মানের জায়গায় অনেক পিছিয়ে আছি। যারা শিখছে, তারা ঠিকভাবে শিখছে না। যাঁরা শেখাচ্ছেন, তাঁরাও ঠিকভাবে শেখাচ্ছেন না। ভর্তি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেলের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটিটাই প্রকাশ পায়।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আমাদের শিক্ষার মানের দিক দিয়ে খুবই খারাপ জায়গায় আছি। আমাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষা ব্যবস্থাটা খুবই দুর্বল। স্কুল-কলেজে পড়ানো হয় না। যা পড়ানো হয়, তা প্রাইভেট-কোচিংয়ে। কোনো মনিটরিং নেই, জবাবদিহি নেই।’ শিক্ষাবিদরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী প্রথাগত পড়াশোনায় ভালো ফল করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকার তার সাফল্য দেখাতে জিপিএ ৫ বাড়িয়েছে। শিক্ষকদের ওভার মার্কিংয়ে বাধ্য করা হয়েছে। আবার অদক্ষ শিক্ষকরা কম সময়ে তাড়াহুড়া করে খাতা দেখতে গিয়ে গড়পড়তা নম্বর দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষার মান তুলে ধরে—এমন তিনটি বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেশ খারাপ। এর মধ্যে দুটি সূচকে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। ২০২২ সালে ইউএনডিপি এবং মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত ২০২১ সালের বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৫৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০তম। ফ্রান্সভিত্তিক বিজনেস স্কুল ইনসিয়েড এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক পোর্টুল্যান্স ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের গ্লোবাল ট্যালেন্ট কম্পিটিটিভনেস ইনডেক্সে ১৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩ নম্বরে। প্রতিভা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে।

জাতিসংঘের সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের প্রকাশিত ২০২১ সালের বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে ১৩২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৬ নম্বরে। উদ্ভাবন সূচকেও দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে আছে বাংলাদেশ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের তদারক ও মূল্যায়ন বিভাগের ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে — ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬১% শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে অবস্থা খারাপ। এর মধ্যে ২৯%-এর অবস্থা খুবই খারাপ এবং ৩২%-এর অবস্থা খারাপ বা গড়পড়তা। একই শ্রেণিতে গণিতে ৪৩%-এর অবস্থা খারাপ বা গড়পড়তা। এর মধ্যে ১৩%-এর অবস্থা খুব খারাপ। অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজি বিষয়ে মাত্র ২৮% মোটামুটি ভালো। অষ্টম শ্রেণিতে গণিতে ২২% খারাপ অবস্থায় এবং ৩৬% মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষা বাংলায়ও পিছিয়ে আছে।

কামনার প্রত্নতাত্ত্বিক পাঠ – খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের নারীবাদ এবং কবি স্যাফো

প্রাচীন সভ্যতাগুলোর যৌনতা বিষয়ক বয়ান, আধুনিক পর্নোগ্রাফির তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্পতাত্ত্বিক। এই সূক্ষ্মতার শিখরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী কবি—স্যাফো। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর লেসবস দ্বীপের এই কবির কবিতাগুলো দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমা জগতের অন্যতম রহস্যময় ইরোটিক সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। তাঁর কাজ একাধারে কামনা ও সৌন্দর্যের, ব্যক্তিগত যন্ত্রণার এবং প্রাচীন নারীবাদী কণ্ঠের নিদর্শন।

স্যাফোর কবিতায় যেভাবে কামনা প্রকাশ পায়, তা আধুনিক ভোগবাদী যৌনতার বিপরীতে এক ধরণের কাব্যিক প্রতিস্পর্ধা। তাঁর কবিতা ‘Fragment 31’—যেখানে তিনি বর্ণনা করেন প্রেমিকাকে দেখে শরীর কাঁপা, জিহ্বা বেঁধে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা—সে একধরনের pathos বা গভীর শারীরিক-আত্মিক প্রতিক্রিয়া। ক্লাসিক্যাল স্কলার অ্যান কারসনের মতে, এটি “one of the earliest recorded descriptions of erotic shock in literature” (Carson, Eros the Bittersweet, 1986)। এই কবিতা পড়ে অনেকেই ধরে নেন, এটি নারীর প্রেমে নারীর আকুলতা—তবে এখানে কেবল যৌন আকর্ষণ নয়, বরং একধরনের অস্তিত্ববাদী টানাপড়েনও উপস্থিত। কামনা এখানে একটি নিঃশব্দ মৃত্যুপ্রক্রিয়া, শরীরের অন্তর্গত পতনের ছায়া। এবং এই মৃত্যুবোধই স্যাফোর কবিতায় ইরোটিকতাকে করে তোলে অতলস্পর্শী।

গ্রীক সমাজে কামনা ও সৌন্দর্য একটি নৈতিক ও দার্শনিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। প্লেটো তাঁর সংলাপে ‘Phaedrus’ এবং ‘Symposium’-এ ইরোসকে বিভক্ত করেন দুইভাগে: common love এবং heavenly love। পরবর্তীটি ছিল প্লেটোনিক, দেহ অতিক্রম করে আত্মিক সংযুক্তির এক রূপ। কিন্তু স্যাফোর কবিতা প্লেটোর চিন্তার সাথে দ্বান্দ্বিক, কারণ তিনি কামনাকে আত্মিক হলেও গভীরভাবে শারীরিক বোধের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর কবিতায় প্রেমিক বা প্রেমিকা হয়ে ওঠে ঈশ্বরতুল্য, যেমন ‘অ্যানাক্টোরিয়া’-কে তিনি বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। এখানে প্রিয়তমা কেবল দৃষ্টির বস্তু নয় বরং এক ধরণের মহাজাগতিক সৌন্দর্যের আধার।

স্যাফোর কবিতা একটি ব্যতিক্রমী জায়গায় দাঁড়ায় কারণ এগুলো সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি নারীকণ্ঠে কামনার চিত্রায়ন। প্রাচীন বিশ্বে যেখানে অধিকাংশ সাহিত্য পুরুষের চোখে নারীর শরীর ও কামনার বয়ান রচনা করে, সেখানে স্যাফো উল্টো পথ ধরেন। এই কণ্ঠস্বর শুধু সাহসী নয় বরং গঠনমূলক—কারণ এটি কামনাকে ভাষা দেয়, একধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে রূপ দেয়। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ মেরিলিন ইয়ালোম উল্লেখ করেন, “স্যাফোর কবিতা সম্ভবত নারী কামনার ইতিহাসে প্রথম সরাসরি আত্মপ্রকাশ, যা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বরাজ্যের সূচনা করে” (Yalom, A History of the Wife, 2001)।

আধুনিক পর্নোগ্রাফির সঙ্গে স্যাফোর কবিতাকে তুলনা করলে যে দ্বন্দ্বটি প্রকট হয়, তা হলো ‘representation vs. sensation’। পর্নোগ্রাফি দ্রুত চূড়ান্ততায় পৌঁছানোর একটি নির্দিষ্ট ভোগের উদ্দেশ্যে নির্মিত। সেখানে দেহ দৃশ্যায়নের উপায় পণ্যের মতো তুলে ধরা হয়। স্যাফোর কবিতায় দেহ নেই, আছে দেহের অবর্তমানতা—অর্থাৎ স্মৃতি, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা। কামনা এখানে এক অসম্পূর্ণতা, পূর্ণ হওয়ার আগেই কবিতার মধ্যেই বিলীন হয়। এটি ‘delay of gratification’ এর এক চূড়ান্ত শিল্পরূপ। ফরাসি মনোবিশ্লেষক লাকান বলেছিলেন, “desire is the desire of the Other”—স্যাফো যেন তার কবিতায় এই ‘অন্য’র জন্য অপেক্ষা করছেন; একজন ঈশ্বরের মতো প্রেয়সী, যার অস্তিত্ব বাস্তবের চাইতেও বেশি তীব্র।
প্রাচীন বিশ্বে নারী ইরোসের অন্যান্য রূপ

স্যাফোর মতো নারীকণ্ঠে ইরোটিকার উদাহরণ শুধু গ্রীসে নয়, খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, ভারত, আরব এবং আন্দালুসিয়ায়। এমনকি আন্দালুসিয়ান মুসলিম কবি ওয়ালাদা বিনতে মুস্তাকফির কবিতা—যেখানে তিনি লেখেন, “আমি ভালোবাসি তাকে, যে ভালোবাসা জানে”—এই সমস্ত বয়ানে যৌনতা হয় আত্মপ্রকাশের ভাষা, ভোগ নয়। স্যাফোর কবিতা আজ আমাদের কাছে আসে খণ্ড খণ্ড ফ্র্যাগমেন্ট হিসেবে। তিনি মোট ৯টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়, সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। এই কবিতাগুলি মূলত সংরক্ষিত হয়েছে প্রাচীন প্যাপাইরাস, খণ্ডিত মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরো এবং মধ্যযুগীয় গ্রন্থকারদের উদ্ধৃতির মাধ্যমে।

স্যাফোর বিরুদ্ধে ইতিহাসে কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক গোঁড়ামি কাজ করেছে, তা বোঝা যায় খ্রিস্টীয় মধ্যযুগের একাধিক দৃষ্টান্তে। চার্চ-নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থায় নারী-কামনা ছিল ‘পাপ’ হিসেবে বিবেচিত। চতুর্থ শতকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদ গ্রেগরি নাজিয়ানজেন সরাসরি স্যাফোর কবিতা ধ্বংস করার আহ্বান জানান। অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন এর ফলে তার কবিতার বিরাট অংশ হারিয়ে যায়। স্যাফোর জন্মলগ্ন থেকেই তার নাম যুক্ত হয়ে যায় এক বিশেষ ভূখণ্ডের সাথে—লেসবস দ্বীপ, যা পরবর্তীকালে ‘লেসবিয়ান’ শব্দের উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু এই নামকরণের পেছনে রয়েছে ইতিহাস, যৌনতা ও ভাষার জটিল সম্পর্ক।

‘Lesbian’ শব্দটি ১৯শ শতকে ইউরোপে যৌনতার ভাষায় ব্যবহার শুরু হয়, যেখানে স্যাফোর নামই নারীর প্রতি নারীর প্রেমের সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে এই ব্যবহার সবসময় মুক্তচিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেনি। অনেকসময় এটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক, অপমানসূচক কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মনোবিকৃতি চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত। তারপর আসে ‘heterosexual erasure’—এক ধরণের সাহিত্যিক পুনর্লিখন, যেখানে নারী-নারী প্রেমকে মুছে দিয়ে স্যাফোর কবিতাকে ‘নিরপেক্ষ’ রূপে উপস্থাপন করা হয়। নারীর কামনা ও কণ্ঠকে পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাস ‘অস্থিতিশীল’ ও ‘অশ্লীল’ হিসেবে দমন করেছে, আর স্যাফো ছিলেন তার প্রধান শিকার।

স্যাফোর কবিতা আমাদের শেখায় যে কামনা কেবল শরীর নয় বরং ভাষার এক অন্তর্নিহিত কম্পন। তাঁর কবিতা একটি কাব্যযন্ত্র—যার মাধ্যমে আমরা ইরোসকে উপলব্ধি করি, কিন্তু কখনোই তাকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারি না। এটি আমাদের মনে করায়, “desire” শব্দটির উৎপত্তি ‘de-siderare’—অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে। একটি অসম্পূর্ণ, কিন্তু অতল জার্নি।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য –

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল, যাকে “ডেভিলস ট্রায়াঙ্গল”ও বলা হয়,। এটি আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে অবস্থিত, যেখানে তিনটি পবিত্র স্থান—ফ্লোরিডা, বারমুডা দ্বীপপুঞ্জ, এবং পুয়ের্তো রিকো একত্রিত হয়ে এক রহস্যময় ত্রিভুজ সৃষ্টি করে। এই ত্রিভুজের মধ্যে একাধিক বিমান, জাহাজ এবং ভ্রমণকারী নিখোঁজ হয়ে গেছে, যাদের খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নিখোঁজ হওয়ার পরও এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, এটি যেন এক অমীমাংসিত রহস্যের অন্তর্গত।

১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর, মার্কিন নৌবাহিনীর পাঁচটি যুদ্ধবিমান “ফ্লাইট ১৯” একটি সাধারণ প্রশিক্ষণ মিশনে বের হয়েছিল। যাত্রাপথটি ছিল নির্দিষ্ট—কিন্তু হঠাৎই তাদের সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়। বিমানগুলি এমনভাবে হারিয়ে যায়, যেন তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে, এবং তার পরবর্তী সপ্তাহে আর একটি উদ্ধারকারী বিমানও হারিয়ে যায়, যেটি তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়েছিল। সবচেয়ে রহস্যজনক হলো, বিমানগুলোর অবস্থান বা কোনো ধ্বংসাবশেষও কখনো পাওয়া যায়নি। এটি ছিল বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের প্রথম বিরল রহস্য, কিন্তু তারপর থেকেই নানা অদ্ভুত ঘটনা এই অঞ্চলে ঘটে চলেছে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে বহু তত্ত্ব রয়েছে, তবে এই সবই কেবল অনুমান। কোনো ব্যাখ্যা পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়, কারণ এই অঞ্চলের অদ্ভুততা কোনো সাধারণ কারণকে চ্যালেঞ্জ করে। এখানকার ঘটনার প্রকৃতি এমন যে, সহজ কোনো ব্যাখ্যা এর সাথে মানানসই নয়।

কিছু বিশেষজ্ঞ বিশ্বাস করেন যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে অদৃশ্য, অতিপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। তারা দাবি করেন, এখানকার পরিবেশ এমন এক ধরনের ভৌত প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত, যা সময় এবং স্থানকে নষ্ট করতে পারে। অতিপ্রাকৃত শক্তির আক্রমণ, অথবা কোনো অজানা পৃথিবীজীবন এসব বিষয় সম্পর্কিত তত্ত্ব প্রচলিত। কখনও কখনও শোনা যায়, যে জাহাজ এবং বিমান এখানে এক অদৃশ্য শক্তির দ্বারা টেনে নেওয়া হয়, এমন এক গহ্বরের দিকে যেখানে বাস্তবতা নিজেই ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, এই অঞ্চলের গভীরে মিথেন গ্যাসের বড় মজুত রয়েছে। এটি যদি হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়, তাহলে ভয়াবহ ঢেউ সৃষ্টি হতে পারে, যা সমস্ত জাহাজ এবং বিমানকে নিঃশেষ করে ফেলতে পারে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি কি শুধু এক প্রাকৃতিক নিয়ম, না কি এর পিছনে কোনো গভীর রহস্য রয়েছে, সেটা আজও জানা যায়নি।

অনেকে মনে করেন যে বেমুডা ট্রায়াঙ্গল হলো এমন একটি স্থান, যেখানে সময় এবং স্থান পরস্পর মিলিয়ে যেতে পারে। একে “টাইম হোল” বা সময়ের গর্ত বলা হয়, যেখানে কোনো কিছু হারিয়ে যেতে পারে বা তা অন্য একটি সময়ের মধ্যে চলে যেতে পারে। এমনকি কিছু তত্ত্ব মনে করেন, যে বিমান ও জাহাজগুলো হারিয়ে গিয়েছিল, তারা কোনো এক নতুন পৃথিবী বা মহাবিশ্বে চলে গেছে। এলিয়েনদের উপস্থিতি নিয়ে এক ধরনের রহস্যময় তত্ত্বও রয়েছে, যেখানে বলা হয় যে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে এলিয়েনদের কোনো শক্তির হাত রয়েছে। কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন যে এই এলিয়েনরা এই অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এটি মানুষের প্রবাহে বাধা দিচ্ছে। এটির কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ না থাকলেও, অদৃশ্য শক্তি ও অজানা প্রযুক্তি নিয়ে এসব ধারণা কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন তত্ত্ব প্রদান করেছেন এই অঞ্চলের রহস্যের ব্যাখ্যা দিতে, তবে সেগুলি সবই একে অপরের সাথে সংযুক্ত নয়। যেমন, সমুদ্রের গভীরতা, মিথেন গ্যাস এবং প্রকৃতির অসম্মানজনক পরিস্থিতি—এই সব কিছুই বেমুডা ট্রায়াঙ্গলের ঘটনাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুধুমাত্র প্রকৃতি ও পরিবেশের কথা বলছে, কিন্তু এর অস্বাভাবিকতা ও রহস্যের গভীরতা সে অনুযায়ী পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল আজও মানুষের কৌতূহল ও ভয়কে নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে। নানা তত্ত্ব এবং অস্বাভাবিক ঘটনা এই অঞ্চলের রহস্যকে আরও ঘনীভূত করেছে।যদিও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কিছুটা অস্বস্তিকর হলেও, আজও এই রহস্যের শিকড় গভীর। হয়তো একদিন আমরা জানতে পারব, এই রহস্যের মধ্যে কতটুকু বাস্তবতা এবং কতটুকু অতিপ্রাকৃত শক্তি রয়েছে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত, বেমুডা ট্রায়াঙ্গল রয়ে যাবে আমাদের কল্পনা, ভয় এবং রহস্যের অন্ধকারে।

পুরুষদের জন্য গর্ভনিরোধক পিল –

পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব এতদিন মূলত নারীর কাঁধেই ছিল। কিন্তু এবার সেই ধারা বদলানোর পথে। যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন এমন একটি মুখে খাওয়ার ওষুধ, যেটা পুরুষের জন্য গর্ভনিরোধক হিসেবে কাজ করবে। এই ওষুধটির নাম YCT-529 এবং এটি বর্তমানে মানবদেহে কার্যকারিতা পরীক্ষার (efficacy trial) পর্যায়ে রয়েছে।

কীভাবে কাজ করে YCT-529?

YCT-529 এমন একটি নন-হরমোনাল (non-hormonal) ওষুধ, যা মুখে খেতে হয়। এটি পুরুষের দেহে শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, ফলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে না। সবচেয়ে ভালো দিক হলো, ওষুধটি বন্ধ করার কিছু সপ্তাহের মধ্যেই শুক্রাণু উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে যায়। ফলে এটি একটি অস্থায়ী, নিরাপদ এবং পুনরুদ্ধারযোগ্য পদ্ধতি। এই ওষুধে কোনো হরমোন ব্যবহৃত হয়নি। ফলে এটি শরীরের স্বাভাবিক হরমোন ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটায় না। অনেক নারী গর্ভনিরোধক বড়ির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভোগেন, যেমন ওজন বেড়ে যাওয়া, মুড পরিবর্তন বা রক্তচাপের সমস্যা। YCT-529-এ এমন ঝুঁকি নেই বলেই আশা করা হচ্ছে।

কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

বর্তমানে পুরুষদের গর্ভনিরোধনের জন্য রয়েছে দুইটি প্রধান উপায়—কনডম এবং ভ্যাসেকটমি। কনডম সবসময় কার্যকর হয় না, আবার ভ্যাসেকটমি একটি স্থায়ী পদক্ষেপ, যেটা অনেকেই নিতে চান না। ফলে নারীকেই জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। YCT-529 এই বৈষম্য কমিয়ে পুরুষদের জন্য দায়িত্ব নেওয়ার নতুন সুযোগ এনে দিচ্ছে।

গবেষণায় কী দেখা গেছে?

এই ওষুধটি ইতিমধ্যে পরীক্ষিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে এটি শুক্রাণু উৎপাদন বন্ধ করতে সফল এবং এতে বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা এখন চূড়ান্ত পরীক্ষার কাজ শুরু করেছেন। এই পরীক্ষায় মূলত দেখা হবে ওষুধটি কীভাবে কাজ করে, কতটা কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব আছে কি না। যদি এই ধাপেও সাফল্য আসে, তবে ভবিষ্যতে এটি বাজারে আসতে পারবে। এই ওষুধটি শুধু একটি চিকিৎসা উদ্ভাবন নয়, এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হতে পারে। পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়লে সম্পর্কেও দায়িত্ব ভাগাভাগি ও সম্মান বাড়বে। এটি নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর চাপ কমাবে।

তবে এখনো অনেক পথ বাকি। শুধু কার্যকারিতা নয়, সমাজে এই ধরনের ওষুধকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে। অনেক পুরুষ এখনো গর্ভনিরোধক বিষয়ে সচেতন বা আগ্রহী নন। তবে সময়ের সাথে সচেতনতা বাড়লে এই ধারণাও বদলাতে পারে।

ভূমিকম্প কি মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দেবে ?

গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারে চার বছর ধরে লড়াই চলার পর সামরিক শাসন গোষ্ঠী ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তবে ভূমিকম্পের প্রভাব সামনের বছরগুলোতে চলমান সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত মার্চের ২৮ তারিখ মিয়ানমারের মধ্য সাগাইং অঞ্চলে আঘাত হানা ভূমিকম্পে অন্তত ৩ হাজার ৬৪৯ জন নিহত হয়। ভূমিকম্পে সাগাইং শহর ও আশপাশের মান্দালয় অঞ্চলে ঘরবাড়ি, কারখানা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ধসে পড়ে; ভেঙে পড়ে সেতু, ফাটল ধরে সড়কে। ভূমিকম্পের ফলে সামরিক বাহিনীর অস্ত্র উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

সেনাবাহিনীর গোলাবারুদ উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটার খবর এমন সময় এসেছে, যখন মিয়ানমারের সেনানিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। তবে মিয়ানমারের প্রধান শহর এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর এখনও কড়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে সেনাবাহিনী। তারা শহরাঞ্চলে ঘাঁটি গেঁড়ে গ্রামাঞ্চলে নির্বিচারে বিমান হামলা চালাচ্ছে, জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রামগঞ্জ; যা জাতিসংঘের মতে, যুদ্ধাপরাধের শামিল। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত সাগাইং শহর এখনও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। তবে এর চারপাশের গ্রামাঞ্চলের অনেকাংশ বিদ্রোহী গোষ্ঠী শাসন করছে। যেমন পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ); যারা বিদ্রোহী জোটের জাতীয় ঐক্য সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের ধারণা, ভূমিকম্প সেনাবাহিনীর কৌশলগত উদ্দেশ্য থেকে মনোযোগ সরাবে না। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনী ত্রাণ কাজের জন্য বিরতি নিচ্ছে না। তারা আকাশ থেকে আক্রমণ অব্যাহত রাখবে এবং যেখানে সম্ভব, পিডিএফকে দুর্বল করতে স্থলপথে আক্রমণ চালাবে। “তবে রাখাইন রাজ্য, যেটি ভূমিকম্প থেকে বলতে গেলে অক্ষতই রয়েছে, এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র,” বলেন তিনি। রাখাইনে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সিত্তে এবং কিউকফিউ অঞ্চলের চারপাশে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। ওই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন রয়েছে, যা মিয়ানমার থেকে চীন পর্যন্ত গ্যাস পরিবহন করে।

ডেভিস বলেন, আনুমানিক ৪০ হাজার সৈন্যের “আরাকান আর্মি মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চল থেকে দেশটির কেন্দ্রস্থল মাগবি, বাগো ও ইয়াওয়েদি অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তারা হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়, যারা এই সংঘর্ষকে একদিকে বা অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করতে পারে।”

মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলীয় কায়াহ রাজ্যের এক বিদ্রোহী কমান্ডার বলেন, “ভূমিকম্প মিয়ানমারের শরণার্থী সম্প্রদায়ের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যারা আগে থেকেই যুদ্ধের ভার বহন করে চলেছে। যে পক্ষ জনগণের পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী, তারাই জনসমর্থন অর্জন করতে পারবে এবং সামনের লড়াইয়ে জয়ী হবে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিয়াও সান হ্লাইং জানান, সেনাবাহিনী এখনও ভূমিকম্প পরবর্তী ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আর এই সুযোগে আরাকান আর্মি ও অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর জন্য আরও শহর দখলের পথ তৈরি হতে পারে।

“তবে দীর্ঘমেয়াদে ভূমিকম্প মিয়ানমারের ক্ষমতার ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তন আনবে বলে আমার মনে হয় না।” ভূমিকম্প মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে বড় সঙ্কটে ফেলতে পারেনি সত্য, তবে জেনারেলদের ওপর মনস্তাত্বিক চাপ তৈরি করেছে। যে দেশে জ্যোতিষশাস্ত্র এবং কুসংস্কার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে পর্যন্ত প্রভাবিত করে, সেখানে অনেকেই এই প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ঐশ্বরিক শাস্তি হিসাবে দেখছেন ।ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সি মনে করেন, অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থানের কারণ না হয়ে ভূমিকম্পটি একটি খারাপ লক্ষণ হিসাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের কর্তৃত্ব হ্রাস এবং প্রকাশ্য সমালোচনার উত্থান ঘটাতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিয়াও সান হ্লাইং বলেন, কিছু সূত্র ইঙ্গিত দেয় যে সামরিক শাসনের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে ভূমিকম্পকে প্রচারের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হলেও তা গৃহযুদ্ধকে প্রভাবিত করবে, এমনটা অনুমান করা কঠিন বলে মনে করেন হর্সি। তিনি বলেন, সংঘাতে জড়িত শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সম্ভবত ভূমিকম্পের পরে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে আরও অনিচ্ছুক হবে।

‘মেড ইন কোরিয়া’ নামে চীনা পণ্য , রপ্তানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত বর্ধিত শুল্ক এড়াতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের প্রকৃত উৎস গোপন করে দক্ষিণ কোরিয়ার নামে রপ্তানির চেষ্টা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কাস্টমস এজেন্সি (Korea Customs Service – KCS) জানায়, এ ধরনের রপ্তানি জালিয়াতির মাধ্যমে ইতিমধ্যে ২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৯৭ শতাংশ পণ্যের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। আজ সোমবার কেসিএস জানায়, ট্রাম্পের শুল্কনীতি কার্যকর হওয়ার আগেই তারা জালিয়াতি রোধে প্রস্তুতি নেয়, কারণ তার প্রথম মেয়াদেও এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। কেসিএসের ইনভেস্টিগেশন প্ল্যানিং ডিরেক্টর লি কুয়াং উ বলেন, “এবার আমরা আগেভাগেই সতর্ক ছিলাম, তাই বছরের প্রথম প্রান্তিকে আমরা আগের বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি জালিয়াতি সনাক্ত করেছি।”

২০২৪ সালে এ ধরনের অনিয়মের পরিমাণ ছিল ২.৪ কোটি ডলার, যার মধ্যে ৬২ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রমুখী চালান। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকেই অনিয়মের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ বেশি। বেশিরভাগ রপ্তানি চীনা প্রতিষ্ঠানের, যারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘রূপকৌশলিক বাইপাস’ হিসেবে ব্যবহার করছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের অপপ্রয়াসের অন্যতম কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়ায় এখন পর্যন্ত কঠোর শুল্কনীতির আওতায় পড়েনি। অথচ ট্রাম্প চলতি মাসেই দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা আপাতত তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। আজ কোরীয় কাস্টমস কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার নাম ব্যবহার করে বিদেশি কোম্পানিগুলো শুল্ক ও প্রযুক্তিনিষেধাজ্ঞা এড়ানোর চেষ্টা করছে। কেসিএস জানিয়েছে, জানুয়ারি মাসে চীনের প্রায় ৩.৩ বিলিয়ন ওন মূল্যের ব্যাটারির ক্যাথোড উপকরণ দক্ষিণ কোরিয়ার উৎস বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। মার্চ মাসে ১৯.৩ বিলিয়ন ওনের নজরদারি ক্যামেরার যন্ত্রাংশ চীন থেকে এনে দক্ষিণ কোরিয়ায় সংযোজন করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির চেষ্টা হয়। এসব পণ্যের বেশ কিছু ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে, আর কিছু এখনো বন্দরে আটকে রয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার কাস্টমস বিভাগ বেআইনি রপ্তানি ঠেকাতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং দেশের বৈধ কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। যারা এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্য প্রসিকিউটরের দপ্তরে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এদিকে শুধু দক্ষিণ কোরিয়াই নয়, চীনের রপ্তানি ঠেকাতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ভিয়েতনামও। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হ্যানয় সরকার চীনা পণ্য ট্রানজিট করে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ওপর কঠোর নজরদারি চালাবে এবং সংবেদনশীল রপ্তানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মার্কিন বাজারে প্রবেশের জন্য চীন যদি অন্য দেশের নাম ব্যবহার করে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করে, তবে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রতি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

মেনোপজ – মনের যত্নে যা করবেন

মেনোপজ নারীর জীবনের একটি স্বাভাবিক ধাপ হলেও এর পরিবর্তন অনেক সময় উদ্বেগ, স্ট্রেস ও হতাশা সৃষ্টি করতে পারে। শারীরিক উপসর্গ হট ফ্ল্যাশ, ঘুমের সমস্যা বা ক্লান্তি ছাড়াও মানসিক পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে — যার মধ্যে আছে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, হতাশা বা অস্থিরতা। এই সময় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে যদি আপনি নিয়মিত দুঃখবোধ, শূন্যতা, বা ক্লান্তি অনুভব করেন তবে আপনি হতাশায় ভুগতে পারেন।

হতাশার লক্ষণ:

রাগ, বিরক্তি বা আকস্মিক মেজাজের পরিবর্তন

অতিরিক্ত উদ্বেগ, অস্থিরতা

আত্মগ্লানি বা নিজেকে তুচ্ছ মনে হওয়া

আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারানো

মনোযোগের অভাব বা সিদ্ধান্তহীনতা

স্মৃতিভ্রংশ

শক্তির অভাব

ঘুমের সমস্যা বা অতিরিক্ত ঘুম

ক্ষুধার পরিবর্তন

অজানা শারীরিক ব্যথা

হতাশার কারণ:

মেনোপজের সময় শরীরের ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা হ্রাস পায়, যা মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি একমাত্র কারণ নয়। অতীতে হতাশার ইতিহাস, বয়স নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, কর্মক্ষেত্র বা সম্পর্কজনিত চাপ, আর্থিক অসন্তুষ্টি, আত্মসম্মানের অভাব এবং সামাজিক সমর্থনের ঘাটতিও ভূমিকা রাখতে পারে। ধূমপান এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এসব ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে হতাশা মোকাবিলা:

মেনোপজের সময় হতাশা দেখা দিলে প্রথমে চিকিৎসক শারীরিক কোনো কারণ যেমন থাইরয়েড সমস্যা আছে কি না, তা পরীক্ষা করে থাকেন। এরপর হতাশার চিকিৎসা শুরু হয়।

ঘুমের সঠিক রুটিন:
প্রতিরাতে নির্দিষ্ট সময় ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, ঘুমের ঘর অন্ধকার ও ঠাণ্ডা রাখা উপকারী।

নিয়মিত ব্যায়াম:
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ৫ দিন ব্যায়াম করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। ভারোত্তোলন, যোগব্যায়াম, বা হাঁটা বিশেষ উপকারী।

রিলাক্সেশন :
যোগ, মেডিটেশন, ম্যাসাজ, ও তাই চি মানসিক প্রশান্তি আনে।

ধূমপান :
ধূমপান মেনোপজের উপসর্গ ও হতাশা উভয়কেই বাড়িয়ে দিতে পারে।

সামাজিক সংযোগ:
পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সংযোগ রাখা ও মেনোপজ অভিজ্ঞতাপ্রাপ্তদের সঙ্গে আলোচনা মানসিকভাবে সাহায্য করতে পারে।

চিকিৎসা ও থেরাপি:

জীবনধারায় পরিবর্তন যথেষ্ট না হলে, চিকিৎসক হরমোন থেরাপি (যেমন ইস্ট্রোজেন ট্যাবলেট বা স্কিন প্যাচ) অথবা অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ প্রস্তাব করতে পারেন। পাশাপাশি থেরাপিস্টের সঙ্গে আলাপ করে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ দূর করার পথ খুঁজে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। মেনোপজের সময় হতাশা স্বাভাবিক হলেও এটি চিকিৎসাযোগ্য। সঠিক জীবনযাপন, চিকিৎসা ও সহানুভূতিশীল সহায়তা হতাশা কাটিয়ে ওঠার পথ দেখায়। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি বেছে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।