Home Blog Page 120

পাকিস্তান ও ভারতকে বার্তা দিলেন – মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে ফোন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গতকাল বুধবার দুজনকে ফোন করেন তিনি। এ সময় হামলার ঘটনা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া উত্তেজনা কমানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন রুবিও।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস এক বিবৃতিতে বলেন, শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ফোনকলে পেহেলগামে হামলার ‘নিন্দা জানানোর প্রয়োজনীতা নিয়ে’ কথা বলেন রুবিও। একই সঙ্গে ‘অযৌক্তিক’ এই হামলার তদন্তে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সহযোগীতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে করা আলাদা একটি ফোনকলে নয়াদিল্লির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাশাপাশি পেহেলগামে হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত আছে বলে ভারত যে অভিযোগ তুলেছে এবং প্রতিশোধের যে হুমকি দিচ্ছে—এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানান তিনি।

ট্যামি ব্রুস বলেন, ‘পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় যে প্রাণহানি হয়েছে, তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (রুবিও)। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ভারতের সঙ্গে একজোট হয়ে কাজ করার যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা–ও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।’

চীনের আধিপত্য খর্ব করবে , ওয়াশিংটন-কিয়েভ খনিজ চুক্তি

প্রায় দুই মাস দেরির পর অবশেষে খনিজ সম্পদ নিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তিতে সই করেছে ওয়াশিংটন ও কিয়েভ। ফলে ওয়াশিংটন কিয়েভের মূল্যবান দুর্লভ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার পাবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে তার পুনর্গঠনে তহবিল জোগান দেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই চুক্তিকে কিয়েভের প্রতি নতুন ধরণের অঙ্গীকার বলে অভিহিত করেছে। দুই মাস আগে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-জেলেনস্কির তুমুল বাদানুবাদে চুক্তিটি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ট্রাম্পের দাবি, ওয়াশিংটন-কিয়েভের খনিজ সম্পদ চুক্তি সই ইউক্রেনের জন্য মঙ্গলজনক পদক্ষেপ এবং এর মাধ্যমেই দেশটি নিরাপদ থাকবে।

ইউক্রেন জানিয়েছে, দীর্ঘ দরকষাকষির পর গতকাল বুধবার যে চুক্তি সই হয়েছে, তাতে দেশটির স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছে। বিরল খনিজ সম্পদের ওপর পূর্ণাঙ্গ সার্বভৌমত্বও থাকছে কিয়েভের। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ‘রেয়ার আর্থ’ নামে পরিচিত এসব খনিজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিয়ে এতোটা আগ্রহী।

বিশ্বের বিরল ও প্রথাগত খনিজের পাঁচ শতাংশের মালিক ইউক্রেন। তবে দেশটির বেশিরভাগ খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ এখনো শুরু হয়নি। চলমান যুদ্ধের ফল হিসেবে খনিজ সমৃদ্ধ বেশ খানিকটা ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। বিশ্বের গ্রাফাইট মজুদের ২০ শতাংশ ইউক্রেনে। এটি ইলেকট্রিক ব্যাটারির অপরিহার্য উপকরণ। পাশাপাশি ম্যাঙ্গানিজ, টাইটানিয়াম ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর মালিক দেশটি।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চায় চীনের খনিজ নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস গড়ে তুলতে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ বিরল খনিজ চীনের নিয়ন্ত্রণে। চুক্তির আওতায় ইউক্রেনের খনিজ, তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নে মার্কিন বিনিয়োগ হবে। প্রথম ১০ বছর শুধুমাত্র এই খাতগুলোর উন্নয়ন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করা হবে, যার পর লাভের একটি অংশ দুই দেশ ভাগ করে নেবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য এই চুক্তি প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে ইউক্রেনকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের দাবি জানান। ট্রাম্পের দাবি ছিল, তার পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময় ইউক্রেনকে দেওয়া ১২০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পুনরুদ্ধার করা। চুক্তির একটি খসড়া যাচাই করে দেখেছে রয়টার্স। খসড়া বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, পূর্ববর্তী মার্কিন সহায়তার জন্য ট্রাম্প অর্থ ফেরত চাইছিলেন, সেটা চুক্তিতে বাদ পড়েছে। ইউক্রেনের আপত্তি থাকা এই বিষয়টি বাদ পড়লেও খনিজসম্পদ চুক্তির বিনিময়ে ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কোনও শর্ত দেখতে পায়নি রয়টার্স। চুক্তির একমাত্র নিরাপত্তা সম্পর্কিত শর্তে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রয়াস চালাবে’।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে এই চুক্তি ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন ঘটনায় ওয়াশিংটন এবং কিয়েভের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনের আশা, রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

ইউক্রেন ইস্যুতে ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টা উদ্যোগ ও খনিজসম্পদ বিষয়ক চুক্তি দুটি ভিন্ন বিষয়। তবে এদুটো ক্ষেত্রেই ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামগ্রিক কৌশল প্রতিফলিত হয়।

ট্রাম্প এবার ক্ষমতায় এসেই মার্কিন নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে রাশিয়ার প্রতি নমনীয় অবস্থান নিয়েছেন। তিনি একাধিকবার বিভিন্ন কথায় সরাসরি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করেছেন। এমনকি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রুশ অধিকৃত ইউক্রেনীয় ভূমি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিতেও কোনও রাখঢাক করেননি।

বাংলাদেশে বজ্রপাত বাড়ছে কেন ?

২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করে চলমান মে মাসজুড়ে বাংলাদেশ জুড়ে ঘন ঘন বজ্রপাতের ঘটনা নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু ৩০ এপ্রিল, বুধবারেই দেশের অন্তত ছয়টি জেলায় বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন বিশজনেরও বেশি মানুষ। প্রতি বছর গ্রীষ্মের শুরুতেই এমন ঘটনা নতুন নয় বটে, তবে এবারের ঘটনা সংখ্যার দিক থেকে নজরকাড়া এবং চিন্তারও বিষয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভূগোল ও জলবায়ু এই প্রবণতার মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ ফারুখের ভাষ্য অনুসারে, ‘‘একদিকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র বাতাস এবং অন্যদিকে উত্তরের হিমালয় থেকে আসা ঠাণ্ডা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অত্যন্ত উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।’’ এই দুই প্রবাহের সংঘর্ষ থেকে সৃষ্ট অস্থির বায়ুপ্রবাহই মূলত বজ্রঘন মেঘ (Cumulonimbus cloud) তৈরি করে, যা থেকে বিদ্যুৎচমক ও বজ্রপাত সংঘটিত হয়।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলছে ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ১৪০০ জনের মৃত্যু হলেও, প্রকৃত সংখ্যা দুই হাজারের বেশি হতে পারে। শুধু এপ্রিল ২০২৫-এ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (বিশেষ করে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, পঞ্চগড়, নওগাঁ, সুনামগঞ্জ) সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রেক্ষিতে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক বজ্রপাতের ঘনত্বের সঙ্গে। আন্তর্জাতিক একাধিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা প্রতি ১°C বৃদ্ধিতে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০–১২% পর্যন্ত বাড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো আর্দ্র অঞ্চলে এই প্রবণতা আরও বেশি প্রভাবশালী। জাতিসংঘের “Global Climate Risk Index 2024”-এর তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে রয়েছে। বজ্রপাতও নতুন আরেকটি জলবায়ু-প্রণোদিত ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় ভেনিজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদ অঞ্চলে এবং ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে। তবে ড. ফারুখের ভাষায়, “তুলনামূলক উন্নত দেশের মানুষ সচেতন থাকায় মৃত্যুহার অনেক কম।” বাংলাদেশে এই চিত্র ভিন্ন। দেশের ৪০% কর্মক্ষম মানুষ খোলা মাঠে কৃষিকাজ, মাছ ধরা কিংবা নির্মাণকাজের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বৈরি আবহাওয়ার সময় আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ ও চর্চা সীমিত। আবার গত কয়েক দশকে গ্রামাঞ্চলে বড় গাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি মানুষের ওপর আঘাত করার ঝুঁকি বেড়েছে। খোলা স্থানে উঁচু বৃক্ষের ভূমিকা বজ্রের আকর্ষণ শোষণ করত, যা এখন কমছে। বাংলাদেশ জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (২০২১–২০২৫) বজ্রপাতকে ‘High Impact Sudden Hazard’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, অর্থাৎ ভূমিকম্পের মতোই আকস্মিক ও প্রাণঘাতী দুর্যোগ।

সচেতনতার ঘাটতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে বজ্রপাতকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ২০২২ সালে দেশের আটটি এলাকায় পরীক্ষামূলক বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র (Lightning Detection Sensor) স্থাপন করা হয়েছে—ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, খুলনা, পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা এই সেন্সর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২০ কোটি টাকা। প্রকল্প কর্মকর্তাদের মতে, ‘‘সেন্সরগুলো ৩০–৪৫ কিমি দূরত্বের বজ্রপাতও শনাক্ত করে আগাম সতর্কতা পাঠাতে সক্ষম।’’ ২০২৫ সালের শুরু থেকে এই সেন্সরগুলোর মাধ্যমে অন্তত ৭৫টি আগাম সতর্কতা বার্তা পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে ৫২টি সঠিকভাবে সময়মতো পৌঁছেছে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। যদিও এখনো এই বার্তা মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা (যেমন: SMS-based mass alert system বা কমিউনিটি রেডিও) সর্বত্র চালু হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রযুক্তি স্থাপন যথেষ্ট নয়; জনসচেতনতা বাড়াতে স্কুলপাঠ্যবই, কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা জরুরি। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ ত্যাগ করা, বড় গাছের নিচে না দাঁড়ানো, মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা, লোহার বস্তু থেকে দূরে থাকা—এসব সাধারণ সতর্কতা অধিকাংশ মানুষ মানেন না বলে একাধিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। অন্যদিকে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য (SDG-13: Climate Action) অর্জনের অংশ হিসেবে বজ্রপাতের মতো জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট দুর্যোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন (Climate Adaptation) পরিকল্পনা নিতে হবে বলে মত দিচ্ছেন দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা। বিশেষত হাওড়াঞ্চলে বজ্রপাত-নিরোধক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক কন্ডাক্টর বসানো এবং বজ্রবান্ধব চাষাবাদ কৌশল শেখানো সময়োপযোগী হবে।

বাংলাদেশের বজ্রপাত এখন আর নিছক ঋতুবদলের দৃষ্টান্ত নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ও প্রাণঘাতী প্রতিফলন। প্রযুক্তি ও সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগেই এই নীরব ঘাতকের প্রকোপ কমানো সম্ভব। অন্যথায় আমাদের কৃষিজীবী-প্রধান জনপদগুলো প্রতিবছরই এই বিপদের বলি হতে থাকবে।

শিকাগো থেকে ঢাকা , শ্রমিক রক্তের অনুতপ্ত ইতিহাস

১লা মে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এর শিকড় ১৮৮৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে, যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। ১লা মে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ৩ মে হে মার্কেট স্কয়ারে রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। পুলিশের গুলিতে অনেক শ্রমিক নিহত হন এবং পরে আটজন শ্রমিক নেতাকে সাজা দেওয়া হয়, যাদের ‘শিকাগো মার্টায়ার্স’ বলা হয়। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক কংগ্রেস এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সে থেকে শুরু হয় এক বৈশ্বিক ঐক্য, যেখানে শ্রমিকের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ন্যায্য মজুরি এবং মর্যাদার দাবিতে লক্ষ-কোটি মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।

তখনকার ব্রিটিশবিরোধী শ্রমিক আন্দোলনের ধারায় বাংলাদেশে মে ডে পালিত হয় ১৯২১ সাল থেকে। এখনো এই দিনটি শ্রমিকশ্রেণির জীবনমান উন্নয়ন, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, ন্যায়সংগত মজুরি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবির প্রতীক। কার্ল মার্কসের ‘শ্রম-মূল্য তত্ত্ব’ (Value of Labour Theory) অনুযায়ী, শ্রমই পণ্যের আসল মূল্য সৃষ্টি করে, অথচ শ্রমিক তার উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত থাকে। এই তত্ত্ব বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে। বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত দুই ভাগে বিভক্ত আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২৩ অনুসারে দেশের শ্রমশক্তির ৮৫% অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BGMEA) তথ্যানুসারে, এই খাতে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করেন, যাদের মধ্যে ৮০% নারী। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে এই খাতের শ্রমিকদের মাসিক গড় আয় ১৩,০০০ টাকা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পোশাকের মুনাফা তার তুলনায় বহু গুণ বেশি। কৃষি খাতে প্রায় ৪৮% মানুষ যুক্ত। অধিকাংশ ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক মৌসুমভিত্তিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। একইভাবে প্রায় ৩০ লাখ নির্মাণ শ্রমিক দেশের নগরায়ন প্রক্রিয়ার প্রধান শক্তি হলেও শ্রমিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিক থেকে অবহেলিত।

গবেষণায় দেখা যায়, পোশাকশিল্প ও গৃহকর্মী খাতে নারীশ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্যমতে, ৭৬% গৃহকর্মী কখনও চুক্তিপত্র পায় না এবং ৬৩% যৌন হয়রানির শিকার হয়। নারীশ্রমিকদের অবদান অর্থনীতিতে অপরিসীম হলেও সামাজিক স্বীকৃতি তুলনামূলকভাবে ক্ষীণ। অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত শ্রমিকদের অধিকাংশেরই কর্মচুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসুরক্ষা ইত্যাদি নেই। বিশেষজ্ঞরা একে ‘অদৃশ্য শ্রম’ (Invisible Labour) বলে অভিহিত করেন। এ খাতে নারীর অংশগ্রহণ বেশি, ফলে লিঙ্গ ও শ্রেণি দুই ধরনের বৈষম্য একইসাথে কার্যকর হয়।

বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় শ্রমিক শ্রেণি এখনও নীচুস্তরে অবস্থান করছে। পুঁজিপতি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি উভয়ই শ্রমিকদের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও, সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে তারা বঞ্চিত। ‘শ্রমিক’ পরিচয় এখনও ‘অশিক্ষিত’, ‘নিম্নবিত্ত’ ও ‘অযোগ্য’ এই ধারণার সাথে জড়িত। অথচ শ্রমিকরাই দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মে ডে বাংলাদেশের জন্য কেবল শ্রমিক অধিকারের স্মারক নয়, এটি আমাদের সমাজের অবচেতনে চাপা পড়া শ্রমিক শ্রেণির মর্যাদার পুনর্জাগরণের আহ্বান। রাষ্ট্র, পুঁজিপতি এবং নাগরিক সমাজ—এ ত্রিমাত্রিক শক্তির নৈতিক দায়িত্ব হলো শ্রমিককে কেবল শ্রমের যন্ত্র নয়, পূর্ণ মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া। কারণ শ্রমিকের হাতে গড়া প্রতিটি পথ, প্রতিটি ভবন, প্রতিটি বস্ত্র আমাদের সভ্যতার ভিত্তি। এই ভিত্তি উপেক্ষিত থাকলে কোনও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ টিকে থাকতে পারে না।

১২৫ বছর পরে পাওয়া গেলো , হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার সমাধান

বিজ্ঞান এবং গণিতের ইতিহাসে ১৯০০ সাল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল। সে বছর আন্তর্জাতিক গণিত সম্মেলনে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট তাঁর বিখ্যাত ২৩টি অমীমাংসিত সমস্যার তালিকা উপস্থাপন করেছিলেন। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা, যা ছিল পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্বগুলোকে গাণিতিক ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। এক শিরোনামহীন স্বপ্নের মতো এই সমস্যা ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের মাঝে সেতুবন্ধন নির্মাণের চ্যালেঞ্জ। সে সময়ে এই সমস্যাটি এতটাই জটিল ছিল যে, তার সমাধান কে বা কারা কখনও ভাবতে পারেনি।

তবে সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর গবেষক ইউ ডেং এবং ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের গবেষকগণ জাহের হানি ও শাও মা এক যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে তারা দাবি করেছেন যে, তারা পদার্থবিজ্ঞানের তরল গতি সম্পর্কিত তিনটি স্তরের তত্ত্বকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি পদার্থবিজ্ঞানে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে এবং যদি এটি সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে এটি হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার সমাধানেও একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তরল গতি বা ফ্লুইড ডাইনামিকস, পদার্থবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা যা তরলের গতির আচরণ এবং তার ভেতরে সৃষ্ট শক্তির প্রভাব বিশ্লেষণ করে। এটির ব্যবহৃত গাণিতিক মডেলগুলোর মধ্যে বেশ কিছু স্তর রয়েছে, যা এই বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলির মধ্যে জটিল সম্পর্ক নির্দেশ করে।

তিনটি প্রধান স্তর হল:

মাইক্রোস্কোপিক স্তর: এই স্তরটি কণার গতির বিশ্লেষণ করে। এখানে পরমাণু বা মৌলিক কণার মিথস্ক্রিয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি তরলের আচরণ বোঝার জন্য সবচেয়ে মৌলিক স্তর।

মেসোস্কোপিক স্তর: এই স্তরের মূল তত্ত্ব হল বোল্টজমান সমীকরণ। এটি একটি স্ট্যাটিস্টিক্যাল পদ্ধতি যা ক্ষুদ্র কণার গতি এবং অবস্থানসমূহের গাণিতিক মডেল তৈরি করে। এই স্তরটি তরলের মৌলিক আচরণের মধ্যবর্তী স্তর হিসেবে কাজ করে, যেখানে সিস্টেমের ভর বা শক্তি বিশ্লেষণ করা হয়।

ম্যাক্রোস্কোপিক স্তর: এই স্তরটি তরলের বৃহত্তর বৈশিষ্ট্যগুলোর বিশ্লেষণ করে, যেমন তরলের প্রবাহের গতি, চাপ এবং অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য। নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণ এবং ইউলার সমীকরণ এই স্তরের প্রধান গাণিতিক মডেল, যা তরলের গতির বিশ্লেষণ করে।

এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এই তিনটি স্তরের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারছিলেন না। বিশেষত কীভাবে ক্ষুদ্র কণার মিথস্ক্রিয়া বৃহত্তর তরলের গতি বা প্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়নি। তবে গবেষকরা যে নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, তা এই সব স্তরের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন স্থাপন করেছে, এটি পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে। গবেষকরা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন মাইক্রোস্কোপিক স্তরের মিথস্ক্রিয়া কীভাবে বোল্টজমান সমীকরণ এ রূপান্তরিত হতে পারে। এই সমীকরণটি ক্ষুদ্র কণার গতির গাণিতিক বর্ণনা দেয় এবং এটি মধ্যবর্তী স্তরের তরল গতির অঙ্কন করে। তারপরে এই স্তরটি থেকে তারা পৌঁছেছেন নাভিয়ার-স্টোকস সমীকরণের মতো ম্যাক্রোস্কোপিক স্তরের ক্লাসিক্যাল তরল গতি সমীকরণে, যা সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয় তরলের প্রবাহের বিশ্লেষণে।

এই গাণিতিক প্রক্রিয়াটি পদার্থবিজ্ঞানে নতুন দিক উন্মোচন করেছে। এতদিন পর্যন্ত এই তিনটি স্তরের মধ্যে গাণিতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে গবেষকরা যে যুক্তি দিয়েছেন তা পদার্থবিজ্ঞানে গাণিতিক নির্ভরযোগ্যতা ও গভীরতার একটি বড় অগ্রগতি হতে পারে। হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার মূল লক্ষ্য ছিল পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্বগুলোকে গাণিতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। গত শতাব্দীতে পদার্থবিদরা বিভিন্ন মৌলিক গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে তরল গতি, শক্তি, এবং অন্যান্য পদার্থবৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু এই তত্ত্বগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সঠিকভাবে প্রমাণিত হলে এই নতুন গবেষণাপত্রটির মাধ্যমে, হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার সমাধানের দিকে এটি একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে।

গবেষণার সাফল্য বিজ্ঞানী সমাজে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এটি গাণিতিক মডেলগুলির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করেছে, যা পদার্থবিজ্ঞানে নতুন তত্ত্ব তৈরির পথ দেখাতে পারে। আগামী দিনে, যদি এই গবেষণাটি সঠিক বলে প্রমাণিত হলে এটি শুধু পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বগুলোর আরও গভীর বিশ্লেষণেই সাহায্য করবে না, বরং এটি হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যার সমাধানের পথেও এক ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমানে এই গবেষণাপত্রটি প্রি-প্রিন্ট জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর প্রমাণ প্রক্রিয়া চলছে। এটি এক ধরনের তাত্ত্বিক মডেল যা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা ও বিশ্লেষিত হবে। যদি এটি সত্যি সঠিক হয়, তবে এটি পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই গবেষণা একধাপে পদার্থবিদ্যার আরও গভীর তত্ত্ব নির্মাণের দিকে একটি বিশাল পদক্ষেপ হতে পারে।

এই গবেষণার সাফল্য পৃথিবীজুড়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক নতুন প্রেরণা জোগাবে। হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা এখন আর এক অসাধ্য সাধনা নয়, বরং এটি বিজ্ঞান ও গণিতের একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে চলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে , ব্যাংক খাতের ঝুঁকি বাড়বে – বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি প্রকাশিত প্রথম climate stress testing প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, অবিলম্বে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের ব্যাংক খাত মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা বিভাগ’ কর্তৃক পরিচালিত এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জলবায়ুজনিত উচ্চ ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোতে ঋণ ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।

প্রতিবেদনটি ভবিষ্যতমুখী একটি climate stress testing কাঠামো গঠন করে বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য জলবায়ু পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীরগতি হয়ে গেলে ব্যাংকগুলোর non-performing loan (অসুস্থ ঋণ) অনুপাত বাড়ে এবং সেই সঙ্গে ঋণ ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। উচ্চ ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে বেশি ঋণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অভিঘাতে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা তুলে ধরে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, “যেকোনো সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি রোধে অবিলম্বে জলবায়ুবিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।” প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, দেশের যেসব অঞ্চলে জলবায়ু ঝুঁকি সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠতে পারে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠানটির মতে, আগাম ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনতে।

প্রতিবেদনটিতে econometric satellite models ব্যবহার করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও অসুস্থ ঋণের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং capital engine models দ্বারা বিভিন্ন জলবায়ু পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া নমুনাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বিশেষ করে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত, ঋণ ক্ষতির চাহিদা বাড়তে পারে—যদি দেশ দেরিতে অভিযোজন নীতি গ্রহণ করে কিংবা বর্তমানে চলমান নীতিতে স্থবির থাকে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু সুপারিশ উত্থাপন করেছে। ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যেন তারা জলবায়ু ঝুঁকি তাদের ব্যবসায়িক কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করে, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কাঠামো তৈরি করে। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ ও রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তদারককারী সংস্থাগুলোর জন্যও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যেমন—জলবায়ু ঝুঁকি গভর্ন্যান্সে নির্দেশিকা তৈরি, তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু বিবেচনার অন্তর্ভুক্তি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনই কোনো কঠোর মূলধন সংরক্ষণের নির্দেশনা দিচ্ছে না। বরং তারা ব্যাংক ও তদারক সংস্থাগুলোর মধ্যে জলবায়ু ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি সময়োপযোগী সতর্কতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

মন্টাউক প্রজেক্ট – টাইম ট্র্যাভেল ও মাইন্ড কন্ট্রোলের রহস্যময় পরীক্ষা

১৯৮০ সালের দিকে মন্টাউক প্রজেক্ট নামে একটি রহস্যময় গল্প যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা একেবারে অদ্ভুত ও গোপন পরীক্ষা সম্পর্কিত ছিল। এই পরীক্ষা প্রাথমিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনীর দ্বারা পরিচালিত হত বলে দাবি করা হয়, সাধারণ মানুষদের মধ্যে সৃষ্টি করে নানা ধরনের প্রশ্ন এবং রহস্য। এটি এক ধরনের গোপন মাইন্ড কন্ট্রোল এবং টাইম ট্র্যাভেল পরীক্ষা ছিল। এই প্রজেক্টের সংজ্ঞা আজও রহস্যময় এবং বিতর্কিত, এবং এর প্রকৃত ঘটনা বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে বহু তত্ত্ব রয়েছে। মন্টাউক প্রজেক্টের গল্পের সূত্রপাত হয় ১৯৮০ সালে, যখন এক ব্যক্তি পিটার মুন নামের এক লেখক একটি বই প্রকাশ করেন, যার নাম ছিল “The Montauk Project: Experiments in Time”। এই বইয়ে তিনি দাবি করেন, যে ঘটনাগুলি তিনি বর্ণনা করছেন তা মার্কিন সরকারের গোপন পরীক্ষার অংশ ছিল। বইটি প্রকাশ হওয়ার পরই মন্টাউক প্রজেক্টের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

মন্টাউক প্রজেক্ট মূলত মন্টাউক, নিউ ইয়র্কে পরিচালিত একটি অত্যন্ত গোপন প্রকল্প। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল টাইম ট্র্যাভেল এবং মাইন্ড কন্ট্রোল নিয়ে পরীক্ষা চালানো, যা সম্পূর্ণরূপে নতুন এবং অস্বাভাবিক বিজ্ঞানকল্প কল্পনা হিসাবে বিবেচনা করা হত। মন্টাউক প্রজেক্টের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং বিতর্কিত পরীক্ষাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল টাইম ট্র্যাভেল পরীক্ষা। দাবি করা হয় যে, মার্কিন সরকার টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে গবেষণা চালানোর জন্য মন্টাউক প্রজেক্ট শুরু করেছিল। এই পরীক্ষা অনুযায়ী, বিজ্ঞানীরা মানুষ এবং বস্তুদের সময়ের মধ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের ক্ষমতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা স্পেস-টাইম কন্টিনিউম (Space-Time Continuum) এর মাধ্যমে সময় এবং স্থানের সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা করছিলেন। এটি ছিল এক ধরনের কুয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কিত তত্ত্ব, যেখানে মহাকর্ষের শক্তি এবং পৃথিবী থেকে বহুদূরে অন্য গ্যালাক্সিতে স্থানান্তর হওয়া সম্ভব ছিল বলে মনে করা হয়েছিল। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা টাইম ট্র্যাভেল করে অতীত বা ভবিষ্যতের কোনও সময় বা স্থানে চলে যেতে সক্ষম হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে এই পরীক্ষার কোনও প্রমাণ বা বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পাওয়া যায়নি এবং এটি এখন শুধুই রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।

মন্টাউক প্রজেক্টের একটি আরেকটি রহস্যময় দিক ছিল মাইন্ড কন্ট্রোল পরীক্ষা। দাবি করা হয়, এই পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষদের মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল সরকার। বিভিন্ন ধরনের মেন্টাল প্রোগ্রামিং এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, কিছু মানুষের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এই পরীক্ষার অংশ হিসেবে, বিশেষজ্ঞরা তাদের মনোবিজ্ঞানের সাহায্যে মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। কিছু সূত্র দাবি করে, এই পরীক্ষাগুলির ফলে অংশগ্রহণকারীরা এমন এক ধরনের মানসিক আক্রমণের শিকার হন, যার মাধ্যমে তাদের মনের মধ্যে অদ্ভুত শক্তি এবং অতিপ্রাকৃত পরিবর্তন আসে। এমনকি কিছু মানুষ মনে করেছিলেন, এই পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে তারা একটি ভিন্ন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছেন, যেখানে সময় এবং স্থান উলট-পালট হয়ে গেছে।

মন্টাউক প্রজেক্টের এই মাইন্ড কন্ট্রোল পরীক্ষাগুলি আজও এক রহস্যের মধ্যে ঢাকা এবং এটি এলিয়েন যোগাযোগ বা আত্মবিশ্বাসের প্রভাব সম্পর্কিত নানা তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এই পরীক্ষার ফলে অদৃশ্য শক্তি এবং অস্তিত্বের একটি নতুন ধারণা উদ্ভূত হয়েছিল।মন্টাউক প্রজেক্টের শুরু মূলত সামরিক উদ্দেশ্য ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। এটি মূলত ইন্টেলিজেন্স এবং জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত একটি প্রজেক্ট ছিল, যেখানে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং টাইম ট্র্যাভেল সংক্রান্ত গবেষণা চালানো হচ্ছিল। কিছু রিপোর্টের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারকে মহাকর্ষের শক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ সম্পর্কিত নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে সাহায্য করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

বিগত দশকের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রজেক্ট মন্টাউক ছিল শব্দ এবং রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে মানুষের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব ফেলতে। তবে এই প্রকল্পের সব তথ্য গোপন রাখা হয় এবং এর কিছু অংশ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। এসব কারণে প্রজেক্ট মন্টাউক নিয়ে সৃষ্ট রহস্যের সীমা আজও অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি। মন্টাউক প্রজেক্টের বিষয়ে অনেক ভুতুড়ে তত্ত্ব ও কল্পনাও রয়েছে। কিছু মানুষ বিশ্বাস করেন, এই পরীক্ষা গুলো অন্য দুনিয়ার শক্তি বা এলিয়েনদের সাহায্যে পরিচালিত হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অজানা শক্তির দ্বার খুলতে চেয়েছিলেন। এমনকি কিছু রিপোর্ট দাবি করেছে যে, এই পরীক্ষার অংশ হিসেবে মানুষের অতিপ্রাকৃত শক্তি বা ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা উন্মোচিত হয়েছিল। আজও এই প্রজেক্টের বিষয়ে নানা ধরনের অদ্ভুত ও রহস্যময় গল্প এবং কিংবদন্তি রয়েছে। কিছু লোক বিশ্বাস করে এই পরীক্ষা আজও কোনো এক গোপন স্থানে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ধূমপানের চেয়েও বিপজ্জনক ভ্যাপিং –

ফলের সুবাস, চকলেটের গন্ধ কিংবা ক্যান্ডির মতো রঙিন স্বাদ, এই সব মিষ্টি মোহে মোড়ানো ই-সিগারেট আজকাল অনেকের হাতেই দেখা যায়। কিন্তু এই সাজানো মোড়কের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা, একটি মরণব্যাধি, যার নাম “popcorn lung” । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক কিশোর মাত্র তিন বছর গোপনে ভ্যাপ করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তার কিশোর জীবনের প্রাণশক্তি ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের ভাষ্যে, তার ফুসফুসের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শ্বাসনালীগুলো স্থায়ীভাবে চিরতরে সংকুচিত হয়ে গেছে। এটি এমন এক রোগ, যা নিরবধি ধ্বংস ঘটায়। বাহ্যিক কোনো রক্ত নেই, হঠাৎ কোনো জ্বালা নেই, অথচ শরীরের ভেতরে ফুসফুসগুলো নিঃশব্দে দম নিতে ভুলে যেতে শুরু করে। আজীবনের যন্ত্রণা তার নিয়তি, আর চিকিৎসা? সীমিত, অনেক সময় হয়তো আর কোনো পথই থাকে না।

ই-সিগারেটকে অনেকেই এখন ধূমপানের “নিরাপদ” বিকল্প বলে মনে করেন। বিজ্ঞাপন, সোশ্যাল মিডিয়া আর বন্ধুদের প্রভাব মিলিয়ে তরুণরা এটির প্রতি ভয়ঙ্করভাবে ঝুঁকে পড়ছে। ফল বা চকলেটের ফ্লেভারে মোড়ানো এই ছোট ডিভাইসগুলো যেন দেখায়—স্বাস্থ্যের ক্ষতি ছাড়াই আনন্দের, স্বাধীনতার, এবং ট্রেন্ডের একটি প্রতীক। কিন্তু বাস্তবতা হলো ফ্লেভারযুক্ত ই-সিগারেটের ভ্যাপে রয়েছে শত শত রাসায়নিক উপাদান, যার মধ্যে অনেকগুলোর প্রভাব বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি জানেই না। এর মধ্যে কিছু কেমিক্যাল এমনও রয়েছে, যা গরম হয়ে শরীরে ঢুকলে সরাসরি ফুসফুসের কোষ ধ্বংস করতে পারে।

আমাদের একটা বড় ভুল ধারণা হলো, এ কেমিক্যাল খাওয়ার জন্য নিরাপদ, সেটি নিঃশ্বাসের মাধ্যমে নিলেও নিরাপদ হবে। অথচ বাস্তবতা একেবারেই বিপরীত। যখন এই ফ্লেভারিং কেমিক্যালগুলো গরম হয়ে ইনহেলড হয়, তখন তারা শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি রক্তপ্রবাহে পৌঁছে যায়। বিশেষত diacetyl নামের একটি ফ্লেভারিং এজেন্ট, যেটি একসময় পপকর্ন ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের ফুসফুস ধ্বংস করে দিয়েছিল, আজ তা ই-সিগারেটের মিষ্টি গন্ধে লুকিয়ে আছে। এই কেমিক্যালটি শ্বাসনালীর দেয়ালে চিরস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করে, একবার যা ক্ষতি হয়ে যায়, তা আর রিপেয়ার হয় না।

বাংলাদেশেও ই-সিগারেট ব্যবহারের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। অনেকে এটিকে ধূমপান ছাড়ার মাধ্যম হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ নিছক কৌতূহল বা ফ্যাশনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিষয়ে স্বাস্থ্যগত গবেষণা, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণনীতি কিংবা জনসচেতনতা এখনো আশানুরূপ নয়। ভ্যাপিং একটি নিঃশব্দ মহামারি হয়ে উঠছে। এটি হয়তো প্রথমদিকে ঠাণ্ডা ধোঁয়া, ক্যান্ডির মতো সুগন্ধ কিংবা বন্ধুত্বের একটি অংশ হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু ধীরে ধীরে সে ছিনিয়ে নেয় ফুসফুসের স্বাভাবিকতা, জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য।

আলিবাবার জ্যাক মা , চীন সরকারের ভীতি প্রদর্শনে ব্যবহৃত হয়েছে – অভিযোগ

চীনা সরকারের টার্গেট: একজন বন্ধু, একজন সাক্ষী
এইচ, একজন চীন-জন্মগ্রহণকারী সিঙ্গাপুরীয় নাগরিক, ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা। কিন্তু ২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে চীনের পুলিশের তরফে অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়, যা অনুসরণ করে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ‘রেড নোটিশ’ জারি করা হয়। এরপর তাঁর পাসপোর্ট জব্দ করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ, এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
কিন্তু পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে, যখন জ্যাক মা নিজে এইচ-কে ফোন করেন। তিনি বলেন, “তারা বলেছে, তোমাকে ফিরিয়ে আনতে আমিই পারি।” এইচ ফোনটি রেকর্ড করেছিলেন, এবং আদালতে তা প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন। এর আগেও তিনি চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের এবং বন্ধুদের ফোন রেকর্ড করেছিলেন যারা তাঁকে ফিরে যেতে বলেছিলেন।
উদ্দেশ্য: পতিত নেতা সান লিজুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য
চীনা সরকারের উদ্দেশ্য ছিল এইচ-কে দেশে ফিরিয়ে এনে এক সময়ের ক্ষমতাধর চীনা নিরাপত্তা কর্মকর্তা সান লিজুনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা। সান লিজুনকে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও শেয়ারবাজারে হস্তক্ষেপের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। সান পূর্বে হংকংয়ের নিরাপত্তা দায়িত্বে ছিলেন এবং বেইজিংয়ের গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থানের বিরুদ্ধে হওয়া বিক্ষোভ দমনেও ভূমিকা রেখেছিলেন।
জ্যাক মা এইচ-কে ফোনে বলেন, “তোমার সমস্যাগুলো আসলে সান-এর জন্য। তারা চায় তুমি সাক্ষ্য দাও। তুমি ফিরে গেলে সব মিটে যাবে।” কিন্তু ফোনালাপে মা নিজেই অসন্তুষ্ট ছিলেন এ ঘটনায় তাঁকে টেনে আনার জন্য। তিনি প্রশ্ন করেন, “তুমি কেন আমায় এতে জড়ালে?”
জ্যাক মার চাপের পেছনে
জ্যাক মা নিজেও ২০২০ সালে একটি বক্তৃতায় চীনের আর্থিক নিয়ন্ত্রকদের সমালোচনা করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রোষানলে পড়েন। তাঁর কোম্পানি অ্যান্ট গ্রুপের আইপিও বাতিল করা হয় এবং ২.৮ বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করা হয়। এরপর তিনি বহু মাস লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।
ফোনালাপে মা বলেন, “তারা খুব কঠিনভাবে আমার সঙ্গে কথা বলেছে। বলেছে তুমি ফিরে এলে শাস্তি মাফ করা হতে পারে। অন্য কোনো পথ নেই, দড়ি টানটান হতে থাকবে।”
মানসিক যন্ত্রণা ও আইনি লড়াই
এইচ ও তাঁর আইনজীবীরা জানতেন যে চীনে ফেরত গেলে তাঁকে আটক, নির্যাতন ও জোর করে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হবে। তাঁর ব্যবসার শেয়ার অন্যদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। চীনের বিচারব্যবস্থায় দণ্ডদানের হার ৯৯.৯৮ শতাংশ, যেখানে জোরপূর্বক গুম ও নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনা।
এইচ-এর বিরুদ্ধে আনীত অর্থ পাচারের অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল Tuandai.com নামক একটি ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠাতা ২০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। এইচ বিনিয়োগকারী ছিলেন, এবং চীনা পুলিশ সন্দেহ করেছিল তিনি কিছু তহবিল বিদেশে স্থানান্তর করেছিলেন। তবে তাঁর আইনজীবীরা দাবি করেন, তিনি জানতেন না যে অর্থের উৎস অনৈতিক ছিল।
রেড নোটিশের ব্যবহার
এইচ-এর ওপর ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা হয়, যা তাঁকে বিশ্বজুড়ে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে। এর ফলে তিনি কোথাও ভ্রমণ করতে পারছিলেন না। টেড ব্রোমুন্ড, একজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একে বলেন “প্রজাপতির গায়ে পিন লাগিয়ে দেওয়া”— একধরনের স্থবিরতা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
বিশ্বের বহু স্বৈরশাসক দেশ রেড নোটিশ ব্যবস্থার অপব্যবহার করে। রিস ডেভিস নামক এক ব্রিটিশ আইনজীবী এটিকে বলেন “স্বৈরাচারদের স্নাইপার রাইফেল— দূর থেকে, লক্ষ্যভিত্তিক ও কার্যকর।” তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের কৌশল ভিন্ন। তারা অধিকাংশ সময় আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের পথে না গিয়ে পরিবারকে ভয় দেখিয়ে ও হুমকি দিয়ে ব্যক্তিকে “স্বেচ্ছায়” ফেরার জন্য চাপ দেয়।
বিচার ও পুনর্বাসন
২০২১ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সের বোর্দো আপিল আদালত চীনের প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং পরে ইন্টারপোল ‘রেড নোটিশ’ বাতিল করে। আদালতে প্রমাণিত হয়, এ অনুরোধ ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অবশেষে, সান লিজুনকে এইচ-এর সাক্ষ্য ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডের স্থগিত রায় দেওয়া হয়। অন্যদিকে এইচ চীনে ব্যবসা করতে না পেরে প্রচণ্ড ঋণে জর্জরিত হন, এবং ১৩৫ মিলিয়ন ডলারের দেনায় পড়েন। গার্ডিয়ানের অনুরোধেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জ্যাক মা’র ফিরে আসা
জ্যাক মা-কে পরে দেখা যায় চীনের নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্যে হাসিমুখে হাততালি দিতে, যা তাঁর “পুনর্বাসনের” ইঙ্গিত বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। এইচ-এর আইনজীবী ক্লারা জেরার্দ-রদ্রিগেজ বলেন, “যে মানুষটিকে বিশ্বব্যাপী অপ্রতিরোধ্য মনে করা হতো, তিনি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলেন, পরে ফিরে এলেন পার্টির প্রতি আনুগত্য দেখাতে। এইচ-এর ক্ষেত্রেও একইটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল।”

সেক্যুলারাইজেশন বনাম বাস্তবতা – বিজ্ঞান কি ধর্মকে প্রতিস্থাপন করতে পেরেছে ?

১৯৬৬ সালে কানাডিয়ান নৃতত্ত্ববিদ অ্যান্থনি ওয়ালেস এক আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা দিয়েছিলেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিশ্বব্যাপী ধর্ম বিলুপ্ত হবে। তাঁর মতে, “ বিজ্ঞানের জ্ঞানের প্রসার এবং কার্যকারিতার ফলে অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রতি বিশ্বাস বিশ্বজুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।” এই পূর্বানুমান তখন ব্যতিক্রম ছিল না; বরং ১৯শ শতকের পশ্চিমা ইউরোপে জন্ম নেওয়া সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে এটি ছিল একটি মূল প্রবণতা যেখানে মনে করা হতো, সব সংস্কৃতি ধাপে ধাপে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ, উদার গণতান্ত্রিক মডেলের দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম।

সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ইরান, ভারত, ইসরায়েল, আলজেরিয়া এবং তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে ধর্মনিরপেক্ষ সরকারসমূহ হঠাৎ ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কাছে পরাজিত হয়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে কেউ কেউ পুরোপুরি ধর্মভিত্তিক সরকার দ্বারা শাসিত হচ্ছে, আবার কোথাও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। অর্থাৎ, সমাজবিজ্ঞান যেভাবে সেক্যুলারাইজেশনের অগ্রগতি কল্পনা করেছিল তা ব্যর্থ হয়েছে।

অবশ্য এই ব্যর্থতা নিরঙ্কুশ নয়। অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ গণনা বলছে, সেখানে ৩০ শতাংশ মানুষ নিজেদের ‘ধর্মহীন’ হিসেবে চিহ্নিত করছে। পশ্চিম ইউরোপ ও অস্ট্রেলেশিয়াতেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চার হার তুলনামূলকভাবে কম। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও নাস্তিকের হার বেড়েছে, যদিও তা এখনো মাত্র ৩ শতাংশ। কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়ে আবদ্ধ রাখছে এবং ভবিষ্যতের জনসংখ্যাগত প্রবণতা ধর্মের আরো বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানের বিস্তার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্মকে অপসারিত করবে। কিন্তু এই ধারণা বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি। ধর্মীয় চেতনার বিকাশ বা স্থায়ীত্ব কোন সমাজে বিজ্ঞানের উপস্থিতির উপর নির্ভর করে না, বরং সেটা নির্ভর করে সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনের মৌলিক নিশ্চয়তার উপর। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞানে যতটা অগ্রসর, ঠিক ততটাই ধর্মীয়। ২০১১ সালে ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী ডেভিড মার্টিন লিখেছিলেন—“বিজ্ঞান অগ্রগতির মাত্রা ও ধর্মীয় প্রভাব কমে যাওয়ার মধ্যে কোনো ধারাবাহিক সম্পর্ক নেই।”

ভারতীয় প্রসঙ্গেও বিষয়টি স্পষ্ট। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক মনোভাবের প্রবক্তা ছিলেন। তিনি মনে করতেন, প্রাচীন বৈদিক কল্পনা কিংবা ইসলামি রাষ্ট্রের স্বপ্ন ভবিষ্যতের আধুনিকতার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ভারতে হিন্দু ও ইসলামি মৌলবাদ যেভাবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, তা প্রমাণ করে নেহরুর ধারণা ভুল ছিল। একইসাথে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বিজ্ঞানকে একসূত্রে বাঁধার প্রচেষ্টা উল্টো ফল দিয়েছে, বিজ্ঞানও এই বিদ্রোহের শিকার হয়েছে।

তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক ধর্মনিরপেক্ষ জাতি গঠনের লক্ষ্যে বিজ্ঞানের ওপর অনেক জোর দিয়েছিলেন, বিশেষত বিবর্তনবাদকে রাষ্ট্রীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। কিন্তু তুরস্কের ইসলামপন্থী দলগুলো আতাতুর্কের রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধিতা করতে গিয়ে বিবর্তনবাদকেই আক্রমণের লক্ষ্য বানিয়েছে। ২০২৩ সালে তারা উচ্চমাধ্যমিকে বিবর্তনবাদ বাদ দিয়েছে। এই ঘটনার মূলে বিজ্ঞান ও সেক্যুলারিজমের একক সমীকরণ।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও যেখানে সৃষ্টিতত্ত্ব ও বিবর্তনবাদ নিয়ে বিতর্ক ব্যাপক, দেখা যায় যে এ দ্বন্দ্ব মূলত নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অনেক আমেরিকান মনে করেন, বিবর্তনবাদ হচ্ছে একটি ধর্মহীন বস্তুবাদী মতবাদের বাহক। ফলে এখানে বিজ্ঞানকেই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রচারের একটি অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়।

এই ভুল ধারণার জন্ম মূলত ১৯শ শতকের প্রগতিশীল ইতিহাসচিন্তা থেকে, যেখানে অগাস্ট কোম্তে তিনটি ঐতিহাসিক স্তরের কথা বলেন—ধর্মীয়, রূপান্তরধর্মী ও বৈজ্ঞানিক। তাঁর মতে ধর্ম একসময় পরিত্যক্ত হবে এবং সমাজ এক বৈজ্ঞানিক যুগে প্রবেশ করবে। এই চিন্তা বিশেষভাবে আতাতুর্ক এবং তুরস্কের ‘ইয়াং তুর্ক’ আন্দোলনের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

একইসঙ্গে ১৯শ শতকে বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বন্দ্বমূলক ইতিহাসচিন্তা (যেমন: অ্যান্ড্রু ডিকসন হোয়াইটের A History of the Warfare of Science with Theology in Christendom) বিজ্ঞানকে ধর্মের বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ইতিহাসবিদরা এখন একমত যে এই দ্বন্দ্বকাহিনি অনেকাংশেই অতিরঞ্জিত। গ্যালিলিও বিতর্ক, ডারউইনের সমর্থক ও বিরোধীরা, সবই দেখায় যে ধর্ম ও বিজ্ঞান বহুক্ষেত্রে একে অপরকে সহায়তা করেছে। ১৭শ শতকে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ধর্মীয় অনুমোদনের ওপরই দাঁড়িয়েছিল, ১৮-১৯ শতকের প্রাকৃতিক ধর্মতত্ত্ব বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলে।

বিজ্ঞান এবং ধর্ম এই দুই পর্বকে চিরকালীন বিরোধ হিসেবে কল্পনা করা শুধু ইতিহাসের ভুল বোঝাবুঝিই নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য একটি বিপজ্জনক কৌশল। একদিকে যেমন ধর্ম গেঁড়ে বসে আছে বৈশ্বিক জনসংখ্যায়, অন্যদিকে বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা হুমকির মুখে। এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানকে টিকিয়ে রাখতে হলে ধর্মকে শত্রু বানিয়ে রাখা যুক্তিসংগত নয়।

আধুনিক বিজ্ঞান এখন এক বিশাল সামাজিক অবকাঠামো ও রাজনৈতিক মতবাদের চাপে বিদ্ধ। জলবায়ু পরিবর্তনের অস্বীকার, টিকা বিরোধিতা, কিংবা ধর্মীয় মৌলবাদ—এসব সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞানকে বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনসমর্থন প্রয়োজন।