Home Blog Page 18

শেখ হাসিনার পূবালী ব্যাংকের লকার জব্দ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে পূবালী ব্যাংক, মতিঝিল শাখায় থাকা লকার জব্দ করেছে। সিআইসির মহাপরিচালক আহসান হাবীব এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

মহাপরিচালক জানান, পূবালী ব্যাংকের সেনা কল্যাণ ভবনে অবস্থিত ১২৮ নম্বর লকারের সন্ধান পাওয়া গেছে। লকারটির দুটি চাবির মধ্যে একটি চাবি শেখ হাসিনার কাছে রয়েছে, আর অন্যটি ব্যাংকের কাছে। আজ সকালে রাজস্ব গোয়েন্দারা অভিযান চালিয়ে লকারটি জব্দ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, লকারে মূল্যবান দলিল, গোপন তথ্য সম্বলিত ফাইল এবং অলংকার রাখা থাকতে পারে। এছাড়া শেখ হাসিনার নামে ১২ লাখ টাকা এবং তাঁর বোন শেখ রেহেনার যৌথ নামে আরও ৪৪ লাখ টাকার এফডিআরও জব্দ করা হয়েছে।

এর আগে শেখ হাসিনার অর্থসম্পদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশের ৬৫টি ব্যাংককে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের নামে অনুমোদিত লকার ও সম্পদের তথ্য জানতে চাওয়া হয়। বেশ কিছু ব্যাংক জবাব প্রদান করলে, পূবালী ব্যাংকে লকারের অবস্থান ও তথ্য জানা যায়।

এনবিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, লকার ও এফডিআর জব্দের অভিযান আইনানুগভাবে এবং বিস্তারিত তদন্তের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে।ব্যাংকের লকারে থাকা দলিল ও অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্রের প্রকৃত অবস্থা পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে।

এ নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ইতিমধ্যেই বেশ আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের অভিযান সাবেক নেতাদের সম্পদের স্বচ্ছতা এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে লকারের ভেতরের বিস্তারিত বিষয়বস্তু এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলায় শিখ ধর্ম কেন বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি?

ভারতের ধর্মীয় মানচিত্রে শিখ ধর্মের একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। পাঞ্জাব থেকে উদ্ভূত এই ধর্ম তার শক্তিশালী দর্শন, সাম্যবাদী আদর্শ এবং বলিষ্ঠ সামরিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। গুরু নানকের মতো পরিব্রাজক এবং পরবর্তীকালে শিখ গুরুদের বাংলায় আগমনের লোককথা এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন থাকা সত্ত্বেও, শিখ ধর্ম বাংলায় পাঞ্জাবের মতো শক্তিশালী ভিত্তি গড়তে পারেনি। বাংলাদেশে এখনো সাতটি এবং পশ্চিমবঙ্গে ২৭১টি গুরুদুয়ারা থাকলেও সাধারণ বাঙালি সমাজে শিখ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা নগণ্য।

শিখ ধর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর একেশ্বরবাদ, জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা এবং সাম্যের আদর্শ। গুরু নানকের দর্শন ছিল মূলত ভক্তি আন্দোলনের এক অমোঘ পরিণতি। গুরু গ্রন্থ সাহেব-এ কবীর, রবী দাস, জয়দেবসহ অনেক ভক্তিবাদী সাধকের বাণী অন্তর্ভুক্ত আছে, যা প্রমাণ করে শিখ দর্শন এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতা। কিন্তু এই দর্শন ও আদর্শের সঙ্গে বাংলার নিজস্ব আধ্যাত্মিক ধারার গভীর সাদৃশ্য ছিল।

মধ্যযুগে বাংলায় ইসলামের আগমন ঘটেছিল। ইসলামের একেশ্বরবাদ, সাম্য ও মৈত্রীর বার্তা এখানকার সমাজে নতুন এক ধারণা এনেছিল। সুফিবাদ ও লোকায়ত ইসলামের প্রভাবে এখানকার মানুষে মানুষে বিভাজন কমতে শুরু করে। কোরআনে আল্লাহকে মানুষের ‘ঘাড়ের রগের চেয়েও নিকটবর্তী’ বলা হয়েছে, যা সুফিবাদের মাধ্যমে ‘মানুষের ভেতরই ঈশ্বরের বাস’ এই ধারণাকে দৃঢ় করেছিল। এই বার্তা শিখ ধর্মের মতোই ছিল।

পঞ্চদশ শতকে শ্রীচৈতন্যদেব কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণব আন্দোলন ছিল বর্ণবাদবিরোধী এবং ভক্তিবাদ-আশ্রিত। তার বাণী ছিল “মুচী হলেও সুচী হয় যদি কৃষ্ণ ভজে।” এই আন্দোলনের প্রভাবে বাংলার সমাজে সাম্য ও মৈত্রী এক শক্তিশালী আদর্শে পরিণত হয়েছিল। শিখ ধর্মের সাম্যের বার্তা পাঞ্জাবের প্রেক্ষাপটে নতুন হলেও বাংলার প্রেক্ষাপটে তা ছিল মূলত ইসলাম ও চৈতন্যের প্রভাবে বহু পুরোনো।

বাংলায় বৌদ্ধ সহজিয়া, নাথপন্থী এবং পরবর্তীকালে লালন সাঁইয়ের মতো মরমীয়া সাধকদের ধারা ছিল খুবই শক্তিশালী। এই ধারাগুলো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, কঠোর তপস্যা এবং জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিল। লালনের বাণী, “খুঁজলে জনমভর মেলে না, কে কথা কয়রে দেখা দেয় না?” এই ভাব সরাসরি সুফিবাদ ও বৈষ্ণব দর্শনের গভীরতা বহন করে। শিখ ধর্মের ঈশ্বর-চেতনা, যা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বর্জিত এবং মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বরের অবস্থান খোঁজে, তা বাংলায় এই সহজিয়া ধারাগুলোর মাধ্যমে আগেই প্রচারিত ছিল। ফলে শিখ ধর্ম এখানে কোনো নতুন দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক বার্তা নিয়ে আসেনি যা স্থানীয় মানুষদের আকৃষ্ট করতে পারত।

শিখ ধর্ম সাম্য, মৈত্রী ও যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে কথা বললেও কিছু সামাজিক প্রথা ও সংস্কারের ক্ষেত্রে এটি বাংলার প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পূর্ণ খাপ খাওয়াতে পারেনি।

ইসলাম ধর্মে বিধবা বিবাহকে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং ব্রাহ্ম আন্দোলনও এর পক্ষে ছিল। কিন্তু শিখ ধর্মে বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের পুনর্বিবাহকে শাস্ত্রগতভাবে অনুমোদন থাকলেও, সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এই প্রথা সেভাবে প্রচলিত হয়নি। এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদকে এখনো অনেক শিখ পরিবার ভালোভাবে গ্রহণ করে না। এই বিষয়টি বাংলার প্রগতিশীল সমাজের জন্য একটি ভিন্ন ধারা ছিল।

শিখ ধর্মে কোনো স্থায়ী পরকালের ধারণা নেই। এটি জন্মান্তরবাদ ও কর্মফলের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তবে বৌদ্ধ সহজিয়া, লালনপন্থী এবং ব্রাহ্ম ধর্মও স্থায়ী পরকালের ধারণাকে অস্বীকার করে। এই ধারাগুলো পৃথিবীতেই ন্যায্যতা ও সাম্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। এই কারণেও শিখ ধর্ম বাংলায় কোনো নতুন সামাজিক বা দার্শনিক বার্তা দিতে পারেনি।

শিখ ধর্ম জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও, সাম্প্রতিককালে কিছু শিখ পরিবারে জাতপাত দেখে বিবাহ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা উইলিয়াম ওয়েন কোল-এর মতো গবেষকদের সমালোচনার শিকার হয়েছে। এই প্রথাটি বাংলার সমাজের একটি অংশ এখনো বহন করলেও, ভক্তি আন্দোলন, ব্রাহ্ম সমাজ এবং অন্যান্য সংস্কারবাদী আন্দোলনগুলো এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। ফলে শিখ ধর্মের এই আদর্শ বাংলার জন্য নতুন কিছু ছিল না।

শিখ ধর্ম বিস্তৃতি লাভ না করার পেছনে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু কারণও রয়েছে।
শিখ ধর্মের বৃহত্তর অংশটি খালসা বা নির্ভেজাল ধারা, যার প্রবর্তন করেন দশম গুরু গোবিন্দ সিং। এই ধারাটি তুলনামূলকভাবে দেরিতে বাংলায় আসে। এর আগে নানকপন্থীদের মতো অন্য ধারাগুলো বিদ্যমান ছিল, যারা ধর্ম প্রচার বা ধর্মান্তরে আগ্রহী ছিল না। এই বিভাজন শিখ আন্দোলনের গতিকে কমিয়ে দিয়েছে।

গুরু নানকের পর গুরুপদের উত্তরাধিকার নিয়েও বিতর্ক ছিল। প্রথম তিনজন গুরুর পর চতুর্থ গুরু রাম দাসের বংশ থেকেই বাকি গুরুদের আগমন ঘটে।নানক পুত্র বাবা শ্রীচাঁদ গুরু না হয়ে উদাসী নামক একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেন। এই বিভাজনগুলো শিখদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র-বৃহৎ বিভাজন থাকায় একটি একক ও শক্তিশালী ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

অনেক শিখ ধারা, বিশেষ করে নানকপন্থী ও উদাসীদের মতো ধারাগুলো অন্যদের ধর্মান্তর করানোর বিষয়ে তেমন আগ্রহী ছিল না। এই মানসিকতা ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে। এর ফলে অন্য ধর্মাবলম্বীরা এই ধর্ম সম্পর্কে জানতে বা আকৃষ্ট হতে পারেনি।

বাংলায় শিখ ধর্ম তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও আদর্শ থাকা সত্ত্বেও বিস্তৃতি লাভ করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ ছিল দার্শনিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণসমূহের জটিল মিথস্ক্রিয়া। শিখ ধর্মের মূল বার্তাগুলো একেশ্বরবাদ, সাম্য, জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা বাংলায় ইসলাম, সুফিবাদ, শ্রীচৈতন্যদেব এবং স্থানীয় সহজিয়া ধারাগুলোর মাধ্যমে আগেই প্রচারিত হয়েছিল। ফলে শিখ ধর্ম এখানে কোনো নতুন দার্শনিক বা সামাজিক আন্দোলন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।

এছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং প্রচারণায় অনীহা এই প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। বাংলার মাটি তাই শিখ ধর্মের জন্য একটি উর্বর ক্ষেত্র হলেও, তা তাদের নতুন কোনো ফুল ফোটাতে সক্ষম হয়নি।

বিবিএস-এর প্রতিবেদন – দেশের গৃহস্থালির কাজে নারীর বিনা মজুরির শ্রমের মূল্য বছরে ৫,৭০,০০০ কোটি টাকা

বাংলাদেশে নারীরা গৃহস্থালির কাজ এবং বিভিন্ন ধরনের সেবাযত্নের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এ পর্যন্ত এই শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য মূলধারার হিসাব থেকে বাদ পড়ে আসছিল। রান্না, ঘর গোছানো, কাপড় ধোয়া, শিশু ও বৃদ্ধের যত্ন, অসুস্থের সেবা এসব কার্যকলাপের ওপর পরিবার ও সমাজ নির্ভরশীল। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত দেশের জাতীয় অর্থনীতির হিসাবপত্রে এই কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এই অদৃশ্য শ্রমের আর্থিক গুরুত্ব উদঘাটন করেছে।

বিবিএসের হাউসহোল্ড প্রডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট (এইচপিএসএ) ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যদি বাংলাদেশের নারীরা গৃহস্থালি এবং সেবাযত্নের কাজে মজুরি পেতেন, তাহলে এর আর্থিক মূল্য ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা হতো। এর মধ্যে গৃহস্থালির কাজের বিনা মজুরির আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং সেবাযত্নের কাজে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। নারীর পাশাপাশি পুরুষদের বিনা মজুরির কাজকে যুক্ত করলে মোট আর্থিক মূল্য বছরে ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা বা ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা হিসেবে অনুমান করা হয়েছে।

এই তথ্য থেকে স্পষ্ট নারীর শ্রম শুধুমাত্র পারিবারিক বা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির একটি অদৃশ্য কিন্তু বড় অংশের সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের সঙ্গে তুলনা করলে, এই পরিমাণ অর্থ নারীর অবদানকে দৃশ্যমান করার পাশাপাশি নীতি নির্ধারণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। নারীর বিনা মজুরির শ্রমকে যদি অর্থনৈতিক হিসাবের আওতায় আনা হয়, তবে অর্থনীতির প্রকৃত ছবি এবং সামাজিক উন্নয়নের মূল্যায়ন আরও যথাযথভাবে করা সম্ভব হবে।

বিবিএসের হাউসহোল্ড প্রডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন দীর্ঘদিন ধরে নারীর শ্রম অর্থনীতির ছায়ায় ছিল এবং এই প্রতিবেদন সেই অমূল্য অবদানকে দৃশ্যমান করেছে। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মমতাজ আহমেদ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার এবং ইউএন উইমেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি গীতাঞ্জলি সিংহ। অনুষ্ঠান সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। প্রতিবেদনের উপস্থাপন করেন বিবিএসের উপপরিচালক আসমা আখতার।

অতীতের অর্থনৈতিক হিসাবপত্রে নারীর বিনা মজুরির শ্রমকে অন্তর্ভুক্ত না করার ফলে দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র প্রায়শই অসম্পূর্ণ দেখানো হতো। বিবিএসের এই গবেষণা এবং প্রতিবেদনের মাধ্যমে নারীর এই শ্রমের আর্থিক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ স্থাপন করেছে। এটি নীতি নির্ধারক এবং সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যাতে নারীর অবদানকে কেবল সামাজিক বা পারিবারিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থনৈতিক এবং নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

নারীর বিনা মজুরির শ্রম কেবল পরিবারের কার্যকরী রক্ষণাবেক্ষণ নয়, এটি দেশের অর্থনীতির একটি মৌলিক ভিত্তি। বিবিএসের এই গবেষণা দেশীয় নীতি নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রবর্তন করেছে, যা নারীর শ্রমকে অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অ্যাংকোর ওয়াটের স্থাপত্য – জ্যামিতি, প্রতীক ও ধর্মের যোগাযোগ

অ্যাংকর ওয়াট বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপত্য এবং কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতীক, শুধুমাত্র একটি মন্দির নয়; এটি স্থাপত্য, শিল্প, ধর্ম এবং রাজনীতির সমন্বিত নকশার এক চূড়ান্ত উদাহরণ। ১২শ শতাব্দীতে খেমার সাম্রাজ্যের রাজা সুরিয়াভর্মা দ্বিতীয়র সময় নির্মিত এই স্থাপত্যটি খেমার স্থাপত্যের সর্বোচ্চ শীর্ষে পৌঁছেছে। ডিজাইন দৃষ্টিকোণ থেকে অ্যাংকর ওয়াট একটি অধ্যয়ন।

এটি মানব সভ্যতার এক অসাধারণ স্থাপত্য কীর্তি, যা একাধারে ধর্ম, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা এবং প্রকৌশলের নিখুঁত সমন্বয়। দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা সূর্যবর্মণ দ্বিতীয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই বিশাল মন্দিরটি মূলত হিন্দু দেবতা বিষ্ণুকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি বৌদ্ধ মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। এর নকশা শুধু একটি রাজকীয় উপাসনা কেন্দ্র নয়, বরং একটি মহাজাগতিক মডেল, যা স্বর্গীয় জ্যামিতি এবং প্রতিসাম্যের এক জটিল বিন্যাসকে মূর্ত করে তোলে।

অ্যাঙ্কর ওয়াট-এর নকশার মূল ভিত্তি হলো হিন্দু ও বৌদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্বের ধারণা, যেখানে মেরু পর্বতকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। অ্যাঙ্কর ওয়াটকে এই মেরু পর্বতের একটি প্রতীকী উপস্থাপনা হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে। পাঁচটি শিখরের সমন্বয়ে গঠিত মন্দিরের প্রধান টাওয়ার, মেরু পর্বতের পাঁচটি চূড়ার প্রতিনিধিত্ব করে। মূল কেন্দ্রীয় টাওয়ারটি মেরু পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া, যা দেব-দেবীদের আবাসস্থল। এর চারপাশে রয়েছে চারটি ছোট টাওয়ার এবং একটি বিশাল বেষ্টনী প্রাচীর এটি মহাবিশ্বের পর্বতমালা ও সমুদ্রের প্রতীক।

অ্যাঙ্কর ওয়াট-এর নকশাটি জ্যামিতিক নির্ভুলতা এবং প্রতিসাম্যের এক দুর্লভ উদাহরণ। পুরো মন্দিরটি পশ্চিমে একটি প্রধান প্রবেশপথের দিকে মুখ করে একটি বিশাল আয়তাকার বেষ্টনীর মধ্যে অবস্থিত। এই পশ্চিমমুখী অবস্থানটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ হিন্দু মন্দির সাধারণত পূর্বমুখী হয়ে থাকে। এর পেছনের কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে, কেউ কেউ মনে করেন এটি বিষ্ণুর পশ্চিমমুখী অবস্থানের জন্য, আবার কেউ এটিকে রাজা সূর্যবর্মণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মন্দির হিসেবে নির্দেশ করে।

মন্দিরের বাইরের বেষ্টনীটি প্রায় ১.৫ x ১.৩ কিলোমিটার, যা একটি পরিখা দ্বারা বেষ্টিত। এই পরিখা মহাবিশ্বের আদি মহাসাগরের প্রতীক। মন্দিরের মূল কাঠামোটি তিনটি স্তরের উপর নির্মিত। এই স্তরগুলো ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে গিয়ে স্বর্গ আরোহণকে নির্দেশ করে। প্রতিটি স্তরের মাঝখানে একটি করে বর্গাকার আঙিনা রয়েছে। প্রতিটি আঙিনার চারদিকে রয়েছে লম্বা বারান্দা এবং টাওয়ার, এইখানে দর্শকের মনে একটি মহাজাগতিক যাত্রার অনুভূতি তৈরি হয়।

অ্যাঙ্কর ওয়াট-এর নকশায় ব্যবহৃত সংখ্যাগুলো কেবল স্থাপত্যের অংশ নয়, এগুলোর গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। মন্দিরের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং টাওয়ারের সংখ্যা হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্বের বিভিন্ন চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। টাওয়ারের সংখ্যা পাঁচ, যা হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় ধর্মেই পবিত্র বলে বিবেচিত।এছাড়াও মন্দিরের বিভিন্ন অংশে অলঙ্কৃত ভাস্কর্য এবং খোদাই করা রিলিফ প্যানেলগুলো হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত থেকে নেওয়া হয়েছে যা মন্দিরের ধর্মীয় তাৎপর্যকে আরও দৃঢ় করে।

অ্যাঙ্কর ওয়াট-এর নকশাটি কেবল জ্যামিতি ও ধর্মীয় প্রতীকবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি জ্যোতির্বিদ্যার সূক্ষ্ম জ্ঞানেরও প্রতিফলন। মন্দিরের অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে বছরের বিশেষ কিছু দিনে সূর্যের আলো মন্দিরের নির্দিষ্ট টাওয়ারগুলোর উপর এমনভাবে পড়ে, যা জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে নির্দেশ করে।

বসন্ত বিষুব এবং শরৎ বিষুবের দিনে সূর্যোদয়ের সময় সূর্যের প্রথম রশ্মি মন্দিরের প্রধান শিখরের ঠিক উপরে পড়ে। এই ঘটনাটি জ্যোতির্বিদ্যা এবং স্থাপত্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন। এটি ইঙ্গিত করে মন্দিরের নকশা শুধুমাত্র নান্দনিকতার জন্য নয়, বরং এটি মহাজাগতিক সময়কাল এবং মহাবিশ্বের নিয়মগুলোকে ধারণ করার জন্যও ডিজাইন করা হয়েছিল।

কিছু গবেষক মনে করেন, মন্দিরের টাওয়ারগুলোর বিন্যাস এবং তাদের মধ্যকার দূরত্ব চন্দ্রের পরিক্রমা এবং রাশিচক্রের সাথে সম্পর্কিত। এই ধরনের সূক্ষ্ম জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক জ্ঞান সেই সময়ের স্থপতিদের অসাধারণ দক্ষতা এবং জ্ঞানের গভীরতা প্রমাণ করে।

অ্যাঙ্কর ওয়াট-এর স্থাপত্য নকশা মানব উদ্ভাবন এবং বিশ্বাসের এক অনন্য উদাহরণ। এর জ্যামিতিক প্রতিসাম্য, ধর্মীয় প্রতীকবাদ এবং জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক নির্ভুলতা এটিকে কেবল একটি উপাসনালয় থেকে এক মহাজাগতিক মডেল হিসেবে রূপান্তরিত করেছে। এর নকশাটি কেবল একটি স্থূল কাঠামো নয়, এটি একটি দার্শনিক বিবৃতি, যা মহাবিশ্বের ক্রম, সময়ের প্রবাহ এবং মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রাকে চিত্রিত করে। অ্যাঙ্কর ওয়াট-এর নকশা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, প্রাচীন প্রকৌশলী এবং স্থপতিরা কেবল পাথর দিয়ে কাঠামো নির্মাণ করেননি, বরং তারা পাথরকে ব্যবহার করে মহাবিশ্বের রহস্যকেও মূর্ত করে তুলেছিলেন।

সব মত ও আদর্শের সঙ্গে মিলে কাজ করার অঙ্গীকার : ডাকসুর নতুন ভিপি সাদিক কায়েমের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে ইসলামী ছাত্রশিবিরের আবু সাদিক কায়েম বিজয়ী হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর সকল মত ও আদর্শের সঙ্গে সমন্বয় করে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চমৎকার একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

আজসকালে সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সাদিক কায়েম বলেন, তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেকে ডাকসুর প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং বন্ধুর, শিক্ষকের ছাত্র বা পরিবারের সদস‍্য হিসেবে পরিচয় দিতে চান। তিনি সব শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও একাডেমিক সমস্যা সমাধানে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।

সাদিক কায়েম আরও বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধর্মের, যে মতের, যে পথের বা আদর্শের শিক্ষার্থীই থাকুক না কেন, আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব। বিশ্ববিদ্যালয়কে মাল্টিকালচারাল ইনস্টিটিউট হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। প্রতিটি শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষ থেকে চমৎকার একাডেমিক পরিবেশ, গবেষণার সুযোগ, নিরাপদ আবাসন, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সেবা এবং নারীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করবে।”

তিনি নির্বাচনের গুরুত্বকে সাধারণ বিজয়ের চেয়ে শিক্ষার্থীর জয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “ডাকসু নির্বাচনে জয়–পরাজয় নেই। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাই প্রজন্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এবং ছাত্র সমাজের আকাঙ্ক্ষা বিজয়ী হয়েছে। আমরা স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের এবং ক্যাম্পাসে সহপাঠী ও সহযোদ্ধাদের যারা নিহত হয়েছেন।”

সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে বিজয়ী এস এম ফরহাদও বক্তব্য দেন। তিনি জানান, জিএস পদে তার বিজয় কোনো ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর দেওয়া আমানতের ফল। তিনি শিক্ষার্থীদেরকে উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং বলেন, কোনো ভুল হলে শিক্ষার্থীদের সমালোচনার মাধ্যমে তা শুধরে নেবেন।

দুই নেতা-ই বিজয়ের পর কোনো শোভাযাত্রা বা আনুষ্ঠানিক র‍্যালি না করার ঘোষণা দেন। তাদের মতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর স্বপ্নের ক্যাম্পাস নির্মাণ করা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করাই প্রধান লক্ষ্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আবু সাদিক কায়েম ভিপি পদে ১৪,০৪২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান পেয়েছেন ৫,৭০৮ ভোট। জিএস পদে এস এম ফরহাদ ১০,৭৯৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের তানভীর বারী হামিম পেয়েছেন ৫,২৮৩ ভোট। এছাড়া এজিএস পদে ছাত্রশিবিরের মুহা. মহিউদ্দীন খান ১১,৭৭২ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।

কীভাবে ঋতুপর্ণ ঘোষ নারীর চরিত্রলেখন পাল্টে দিলেন : তাবাসসুম ইসলাম, সাংবাদিক, দ্য ডেইলি স্টার, প্রভাষক, ইউল্যাব

দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমার প্রেক্ষাপটে নারীদের দীর্ঘকাল ধরে একঘেয়ে দুটি চরিত্রে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে— আত্মত্যাগী মা অথবা পুরুষের আনন্দের জন্য সাজানো প্রেমিকা। এই সীমানার বাইরে নারীকে খুব কমই দেখা গেছে। আর এই প্রেক্ষাপটেই ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্রগুলো হাজির হয় এক শক্তিশালী ভিন্নধারার মতো। বাংলার সবচেয়ে প্রশংসিত সমসাময়িক পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম, ঘোষ তাঁর সিনেমার ভুবনে নারীর প্রতিচ্ছবি নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি তুলে ধরেছেন নারীর অন্তর্জগত, আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের গল্প।

ঘোষের অবদান বুঝতে হলে আগে দেখতে হবে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক সিনেমার প্রচলিত ধারা। চলচ্চিত্র পণ্ডিত আশা কাসবেকরের মতে, এসব সিনেমা নারীর সতীত্ব ও সম্মান নিয়ে “অতিরঞ্জিত অলঙ্কারপূর্ণ বাগাড়ম্বর”-এ ডুবে থাকত। ফলে নারী চরিত্রকে দেখা যেত দুই ভাগে একদিকে “আদর্শ নারী”: পবিত্র, বাধ্য, বিনয়ী, আত্মত্যাগী; অন্যদিকে “ভ্যাম্প”: লাগামহীন যৌনতা ও নৈতিক স্খলনের প্রতীক। এই দ্বৈত কাঠামো পিতৃতান্ত্রিক ভাবাদর্শে প্রোথিত যা নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সিনেমায় জায়গা দেওয়ার সুযোগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।

এই জায়গা থেকেই ঋতুপর্ণ ঘোষ এক ভিন্নধারার পথ তৈরি করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে নারী চরিত্র আত্মত্যাগী বা ভ্যাম্প নন, বরং জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ এবং মানবিক। তাঁদেরও ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা আছে, যা প্রায়ই সামাজিক প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁরা ভুল করেন, প্রশ্ন তোলেন, আবার প্রচলিত পরিবারকেন্দ্রিক সীমানার বাইরে নিজেদের পূর্ণতার খোঁজ করেন।

ঘোষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো পুরুষ দৃষ্টিকোণের বদলে নারী দৃষ্টিকোণকে সামনে আনা। সাধারণত সিনেমায় পুরুষের চোখ দিয়েই নারীকে দেখা হয়, কিন্তু ঘোষ উল্টে দেন এই দৃষ্টিভঙ্গি। “চোখের বালি” (২০০৩) এর বিখ্যাত দৃশ্য তার প্রমাণ। বিধবা বিনোদিনী অপেরা গ্লাস দিয়ে এক নবদম্পতিকে দেখে। ক্যামেরা কখনো তার চোখের ক্লোজআপে, কখনো তার দেখা দৃশ্যে। এখানে পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা পুরুষ নয়, বরং সমাজে অদৃশ্য হওয়ার কথা যাঁর— সেই বিধবার হাতে। বিনোদিনীর দৃষ্টিতে মিশে থাকে কৌতূহল, আকাঙ্ক্ষা, আবার এক ধরনের দুষ্টুমি। সে না চিরাচরিত সতী বিধবা, না ষড়যন্ত্রকারী প্রলোভনকারিণী, বরং নিজের আকাঙ্ক্ষা ও জটিলতা নিয়ে পূর্ণ এক নারী।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিনোদিনীর দৃষ্টি কোনোভাবেই অব্জেক্টিফায়িং নয়। বরং তা সহানুভূতিশীল, কৌতূহলী ও জটিল। এর মধ্য দিয়ে পর্যবেক্ষক-পর্যবেক্ষিত কিংবা ক্ষমতাবান-অক্ষম বাইনারির বাইরে গিয়ে সম্পর্ক ও আকাঙ্ক্ষার বহুমাত্রিকতা বোঝার জন্য ঘোষ দর্শককে চ্যালেঞ্জ করেন।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে নারী যৌনতা প্রায়ই নিষিদ্ধ বিষয়। অথচ ঘোষ সেটিকেই বিপ্লবী ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। “অন্তরমহল” (২০০৫)-এর মহামায়া চরিত্রটি তার বড় উদাহরণ। ১৯শ শতাব্দীর জমিদার বাড়িতে, উত্তরাধিকারী পাওয়ার জন্য জমিদার ছোট স্ত্রীকে গর্ভবতী করার সময় পুরোহিত দিয়ে মন্ত্র পড়াচ্ছেন। সেই আচার নারীর শরীরের ওপর ধর্মীয় ও যৌন নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। এ সময় মহামায়া যে আসলে প্রান্তিক, অবহেলিত সে পুরোহিতকে লক্ষ্য করে শাড়ির আঁচল সামান্য তুলে গোড়ালি দেখান। এই সামান্য কাজই রক্ষণশীল সমাজে এক চরম অশ্লীলতা। কিন্তু ঘোষের ক্যামেরা মহামায়ার মুখে ফোকাস করে—যেখানে ধরা পড়ে অবাধ্যতা ও পরিকল্পিত প্রলোভনের মিশ্রণ।

শেষে পুরোহিতের মন্ত্র থেমে যায়, মহামায়া বিজয়ের হাসি নিয়ে বেরিয়ে যান। এই দৃশ্যে নারী যৌনতা পুরুষের আনন্দের বস্তু নয়, বরং নারীর ক্ষমতার উৎস। একই সঙ্গে এটি ধর্মীয় ও পিতৃতান্ত্রিক মিলনকেও সমালোচনা করে।

দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমায় মায়ের চরিত্র প্রায়ই আত্মত্যাগের প্রতীক। ঋতুপর্ণ ঘোষ “উনিশে এপ্রিল” (১৯৯৪) এ সেই ধারণাই বদলে দেন।

সরোজিনী একজন খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী। তিনি প্রচলিত অর্থে আত্মত্যাগী মা নন, বরং কর্মমুখর, দূরবর্তী, কখনো কঠোর। তার মেয়ে অদিতি বাবার মৃত্যুবার্ষিকীর কথা মনে করালে সরোজিনী তা ভুলে গিয়ে নিজের পুরস্কার উদযাপনকে অগ্রাধিকার দেন। এখানেই স্পষ্ট হয় দ্বন্দ্ব— মা হিসেবে পরিচয় বনাম শিল্পী হিসেবে পরিচয়।

এক পর্যায়ে সরোজিনী বলেন, “আমারও স্বপ্ন ছিল।” এই সংলাপই মায়ের চিরাচরিত আত্মবিসর্জনের ধারণাকে ভেঙে দেয়। তিনি দেখান, নারী মায়ের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ নন, বরং তাঁরও ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে।

মা-মেয়ের দ্বন্দ্বের আবেগঘন মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘোষ তুলে ধরেন সম্পর্কের বাস্তবতা—রাগ, ভুল বোঝাবুঝি, আঘাত যা সাধারণত সিনেমায় আড়াল করা হয়। এর মধ্য দিয়েই তিনি প্রমাণ করেন পরিবারও জটিল, দ্বন্দ্বপূর্ণ, অসম্পূর্ণ, যেমন বাস্তব জীবন।

এখন ভাবলে মনে হয়, ঋতুপর্ণ ঘোষের অ-হেটেরোনরমেটিভ পরিচয় পরিচয় তাঁর সিনেমার নারীবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। প্রচলিত লিঙ্গ পরিচয়ের বাইরে থেকে তিনি হয়তো নারীদের ওপর আরোপিত সামাজিক চাপগুলোকে ভিন্নভাবে অনুভব করতেন। সেই বহিরাগত অভিজ্ঞতা আর শিল্পীসুলভ সংবেদনশীলতা তাঁকে নারীর সূক্ষ্ম মানসিকতা ও সংগ্রাম বোঝার চোখ দিয়েছে।

বিনোদিনীর প্রান্তিকতা, মহামায়ার প্রলোভন, সরোজিনীর দ্বন্দ্ব সবই সমাজের কঠোর কাঠামোর ভেতরে নারীর পথ খোঁজার গল্প। আর এখানেই ঘোষের cinema queer অভিজ্ঞতা আর নারীবাদী চেতনার মিলন ঘটায়।

ঋতুপর্ণ ঘোষ আজ দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমায় এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা প্রমাণ করে প্রতিনিধিত্ব কতটা শক্তিশালী হতে পারে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো নারীর জটিলতা, দ্বন্দ্ব ও স্বপ্নকে যে জায়গা দিয়েছে তা এখনও সমসাময়িক। যে বিশ্ব এখনও লিঙ্গ সমতা ও উপস্থাপনার প্রশ্নে লড়ছে, সেখানে ঘোষের চলচ্চিত্র অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কারণ তাঁর সিনেমা সব জটিলতা, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদসহ সত্যিকারের মানুষ হিসেবে নারীকে দেখে, পুরুষতান্ত্রিক চোখে নয়।

আইইইএফএর গবেষণা – দেশে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আমদানিনির্ভর

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ক্রমশ আমদানিনির্ভর হয়ে উঠছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস , ফার্নেস অয়েল, কয়লা এবং ভারত ও নেপাল থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ আমদানি মিলিয়ে বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ পূরণ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)–এর গবেষণায় উঠে এসেছে এ তথ্য।

‘জ্বালানির রূপান্তর: বাংলাদেশ কি সঠিক পথে?’ শীর্ষক সেমিনারে এ গবেষণা উপস্থাপন করেন আইইইএফএর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম। তিনি বলেন, কয়লার প্রায় পুরোটা, গ্যাসের ২৫-৩০ শতাংশ এবং ফার্নেস অয়েল আমদানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ এখন আমদানি-নির্ভর।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল ৭১ হাজার ৪১৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা যার মধ্যে ৩৯.৯ শতাংশ আমদানি করা হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ সালে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ হাজার ৪২৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টায় এবং এ সময় আমদানিনির্ভরতার হার পৌঁছে যায় ৫০ শতাংশে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যবহৃত ৮৫ হাজার ৬০৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের মধ্যে ৫৫.৫ শতাংশ, ২০২২-২৩ সালে ৮৮ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টার মধ্যে ৫৬.৫ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় এক লাখ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ আমদানিনির্ভর ছিল।

এ আমদানিনির্ভরতা বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ৪ টাকা ৮৮ পয়সা, যেখানে গড় বিক্রিমূল্য ছিল ৫ টাকা ৯১ পয়সা। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ টাকা ৩৫ পয়সায়, আর গড় বিক্রিমূল্য ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৫৭ পয়সা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে, যা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে।

সেমিনারে অংশ নেওয়া ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, দেশে বিদ্যুতের ব্যয় লুণ্ঠনমূলক খরচ ও মুনাফা বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে। সরকার ব্যয়ের কারণ হিসেবে উৎপাদন খরচ ও ডলারের দাম বাড়াকে দায়ী করলেও আসলে ব্যয়ের হিসাবের স্বচ্ছতা নেই।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো হচ্ছে না। তাঁর মতে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগের খাসজমির ৫ শতাংশ ব্যবহার করলেই ২৮ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। তিনি বিপিডিবিকে পুনর্গঠন করে আলাদা রেগুলেটরি অথরিটি গঠনের পরামর্শ দেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষ জনবল ও আর্থিক সহায়তার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইপিসি কোম্পানিগুলো বছরে পর্যাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে না, আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে।

সেমিনারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—২০৩০ ও ২০৪০ সালের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ তৈরি, ধাপে ধাপে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা, রুফটপ সৌর প্রকল্পে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া, ক্ষুদ্র প্রকল্পের সরঞ্জাম আমদানি শুল্কমুক্ত করা, এলএনজি নির্ভরতা কমানো, সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি বাস্তবায়ন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের ব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

কাতারে শান্তি আলোচনায় যাওয়া হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালালো ইসরায়েল

কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, হামাসের শীর্ষ নেতারা শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য দোহায় অবস্থান করছিলেন।এ কারণে ইসরায়েল তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন হামাস।

ইসরায়েলের আইডিএফ ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসএ যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামাসের নেতৃত্বের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করে আসছে। তাই তাদের উপর সুনির্দিষ্টভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে। হামলার আগে নাগরিকদের ক্ষতি কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ছিল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সতর্কতা, সুনির্দিষ্ট অস্ত্র ব্যবহার এবং অতিরিক্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ।

আইডিএফ ও আইএসএ আরও জানিয়েছে, অক্টোবর ৭-এ সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী হামাসকে পরাজিত করতে তারা দৃঢ়তার সঙ্গে অভিযান চালিয়ে যাবে।

কাতার এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড. মাজেদ আল আনসারি এক বিবৃতিতে বলেন, দোহার এক আবাসিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর কয়েকজন সদস্য অবস্থান করছিলেন।তিনি বলেন, এই ধরনের হামলা কাতারে থাকা মানুষদের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে। ড. আনসারি আরও বলেন, ‘কাতার এই হামলাকে দৃঢ়ভাবে নিন্দা জানায়। দোহা কোনোভাবেই অবিবেচক ইসরায়েলি আচরণ এবং অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে খেলা সহ্য করবে না। কাতারের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।’

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইসরায়েলের এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার উৎস হিসেবে দেখছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমন সুনির্দিষ্ট হামলা কাতার এবং ইসরায়েলের সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং এটি অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা নতুনভাবে উত্তেজনা বাড়ানোর সম্ভাবনা রাখে।

‘কোকেন’ কিভাবে তৈরি করলো একজন পাবলো এসকোবার ও অপরাধ সাম্রাজ্য?

কোকেন’ শব্দটি শুনলেই মানুষের মনে আসে নেশা, অপরাধ ও বৈশ্বিক মাদক চক্রের ছবি। তবে এই মাদকপদার্থের ইতিহাস বহু শতকের এবং তা কেবল আজকের অবৈধ বাজারেরই নয়, বরং মানব সভ্যতার প্রাচীন ব্যবহার ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

কোকেনের মূল উৎস হলো দক্ষিণ আমেরিকার অ্যান্ডিস পর্বতমালার স্থানীয় উদ্ভিদ কোকা (Erythroxylon coca)। হাজার হাজার বছর ধরে বলিভিয়া, পেরু এবং কলম্বিয়ার স্থানীয় আদিবাসীরা কোকা পাতা চিবিয়ে ক্ষুধা ও ক্লান্তি দূর করত, উচ্চতার কারণে সৃষ্ট শারীরিক অসুবিধা মোকাবেলা করত এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করত। এটি ছিল তাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ যা কোনো নেশা বা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না। ইনকা সভ্যতা বিশ্বাস করত, কোকা পাতা চিবানো দেহকে কাজের জন্য শক্তিশালী করে এবং দীর্ঘ ভ্রমণ সহনীয় করে তোলে। কিন্তু সেই সময় কোকেনের সক্রিয় রাসায়নিক উপাদান এতটা শক্তিশালী ছিল না।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরা কোকা পাতার মধ্যে থাকা মূল সক্রিয় উপাদানটি বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শুরু করেন। ১৮৬০ সালে জার্মান রসায়নবিদ আলবার্ট নিয়েমান প্রথম এই উপাদানটি সফলভাবে পৃথক করেন এবং এর নাম দেন ‘কোকেন’। প্রাথমিকভাবে কোকেনকে একটি অলৌকিক ওষুধ হিসেবে দেখা হয়েছিল। এটি দাঁতের অস্ত্রোপচারে স্থানীয় অবশকারী হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

আবার এর সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড, তিনি এটিকে বিষণ্ণতা, স্নায়ুরোগ এবং এমনকি মর্ফিনের আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে প্রচার করেছিলেন। ফ্রয়েড নিজে এর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারকারী ছিলেন এবং এটিকে জাদুকরী ওষুধ বলে বর্ণনা করতেন।
তবে ১৯৩০ এ ফ্রয়েড কোকেন ব্যবহার থেকে সরে আসেন এবং তার প্রাথমিক ধারণাগুলো ত্যাগ করেন।

কোকেনের বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয় যখন এটি বিভিন্ন টনিক, ওয়াইন এবং অন্যান্য পণ্যে যোগ করা হতে থাকে। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ছিল জন এস. পেম্বার্টনের ‘কোকা-কোলা’। ১৮৮৬ সালে কোকা-কোলাতে কোকেন এবং কোলা বাদামের নির্যাস ব্যবহার করা হতো, যা এটিকে একটি ‘নিরাময়কারী’ পানীয় হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯০৩ সালে কোকা-কোলা থেকে কোকেন সরিয়ে ফেলা হয়, তবে ততদিনে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে কোকেনের পরিচিতি তৈরি করে দিয়েছে।

বিশ শতকের শুরুতে কোকেনের ক্ষতিকর দিকগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। এর আসক্তি সৃষ্টিকারী ক্ষমতা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সামনে চলে আসে।বিভিন্ন দেশে কোকেনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘হ্যারিজন ট্যাক্স অ্যাক্ট’ (Harrison Tax Act) পাশ হয়, যা কোকেন ও অন্যান্য নেশাজাতীয় পণ্যের ব্যবহার সীমিত করে। কিন্তু ততদিনে কোকেন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন থেকে বেরিয়ে এসে অন্ধকার জগতের হাতে চলে গেছে।

কোকেনের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা এর অবৈধ বাজার তৈরি করে। ফলে এটি অপরাধী চক্র এবং মাফিয়াদের জন্য এক বিশাল লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়। বিশ শতকের শেষ ভাগে কলম্বিয়াতে কোকেন উৎপাদন ও পাচার কেন্দ্রিক বড় বড় ড্রাগ কার্টেল গড়ে ওঠে। এদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল মেডেলিন কার্টেল এবং কালি কার্টেল।

মেডেলিন কার্টেলের নেতৃত্বে ছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত ড্রাগ লর্ড পাবলো এসকোবার। ১৯৮০-এর দশকে এসকোবারের কার্টেল পৃথিবীর প্রায় ৮০% কোকেন সরবরাহ করত। তার সাম্রাজ্য এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তিনি শুধু ড্রাগ পাচার নয়, বরং পুরো দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছিলেন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রতিদ্বন্দ্বী চক্রের বিরুদ্ধে সহিংস যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়কালে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। এসকোবারের অপরাধ জীবনের চূড়ান্ত পর্যায় ছিল কলম্বিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত যুদ্ধ। ১৯৯৩ সালে তার মৃত্যুর পর এই কার্টেলের পতন ঘটে।

পাবলো এসকোবারের মেডেলিন কার্টেলের পতনের পর কালি কার্টেল কোকেনের বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে। তারা এসকোবারের মতো সহিংস না হয়ে বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করত। তাদের পাচার কৌশল ছিল আরও সূক্ষ্ম এবং বিস্তৃত। এর মূল নেতারা গ্রেফতার হলে তাদের পতন হয় ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে।

এইসব কলম্বিয়ান কার্টেলের মাধ্যমে কোকেন উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ছিল তাদের সবচেয়ে বড় বাজার। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে মেক্সিকোর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের জন্য নতুন নতুন রুট তৈরি হয়। মেক্সিকান ড্রাগ কার্টেলগুলো এই পাচারের কাজে যুক্ত হয়ে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সিনালোয়া কার্টেল এবং গালফ কার্টেলের মতো সংগঠনগুলো এখন বিশ্বজুড়ে কোকেন পাচারের প্রধান নিয়ন্ত্রক।

আজও কোকেন পাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যা। ক্যারিবিয়ান সাগর, মধ্য আমেরিকা এবং আফ্রিকার দেশগুলো পাচারের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।কোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত সহিংসতা, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন এক মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।

কোকা পাতা থেকে শুরু হয়ে কোকেন আজ মানবজাতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এটি শুধু একটি মাদকের গল্প নয়, বরং বিজ্ঞান, ঔষুধ, অর্থনীতি এবং অপরাধের এক অন্ধকার যাত্রার কাহিনি। কোকেন তার ঔষুধ হিসেবে ব্যবহারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে কীভাবে একটি ভয়াবহ নেশায় এবং বিশাল আন্তর্জাতিক অপরাধ সাম্রাজ্যের ভিত্তি হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে, তা মানব সমাজের একটি জটিল দিক তুলে ধরে। পাবলো এসকোবারের মতো ড্রাগ লর্ডদের উত্থান এবং পতন প্রমাণ করে অবৈধ ড্রাগ ব্যবসা কেবল ব্যক্তিবিশেষের লোভের ফল নয়, বরং এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক জটিল জাল।

হুমকিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী ভারত, উৎপাদন কমছে

ভারতের আসাম ও দার্জিলিং অঞ্চলের চা-বাগানগুলো সম্প্রতি অস্বাভাবিক খরা এবং তাপপ্রবাহের ফলে উৎপাদন হ্রাসের মুখে পড়েছে। চা উৎপাদনের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের অস্থিরতা এখন আর বিরল ঘটনা নয়, বরং এটি শিল্পের নতুন বাস্তবতা হিসেবে ধরা হচ্ছে।

ভারতীয় চা গবেষণা সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশের চা উৎপাদন প্রায় ৭.৮ শতাংশ কমে ১৩০ কোটি কেজিতে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনের এই হ্রাসের প্রধান কারণ আসামের খরা ও উচ্চ তাপমাত্রা।

উৎপাদনের হ্রাসের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দেখা দিয়েছে। ভারতের চায়ের গড় দাম ২০ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ২০১ রুপি ২৮ পয়সায় পৌঁছেছে। দেশে চায়ের চাহিদা গত এক দশকে ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দ্রুত বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে রফতানি হ্রাসের শঙ্কা তৈরি করছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ভারতের রফতানি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে চা আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে গত বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪ কোটি ৫৩ লাখ কেজিতে পৌঁছেছে।

বিশেষ করে গুণমানের জন্য বেশি সমাদৃত আসামের ‘সেকেন্ড ফ্লাশ’ বা দ্বিতীয় দফার চা তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খরা শুধুমাত্র উৎপাদন কমাচ্ছে না, বরং পোকামাকড়ের আক্রমণও বাড়াচ্ছে যার ফলে পাতার মানও নষ্ট হচ্ছে। চা শিল্প ইতিমধ্যেই উচ্চ ব্যয়, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং পুরনো গাছ প্রতিস্থাপনের চাপে রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সরকারি প্রণোদনা এই ক্ষতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারেও চা রফতানি সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কার্যকর হওয়ায় ভারতের চা রফতানিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। গত বছর ভারত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ কেজি চা রফতানি করেছিল, তবে চলতি বছরের জানুয়ারি-মে মাসে রফতানি ছিল মাত্র ৬২ লাখ ৬০ হাজার কেজি। ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন (আইটিএ) জানিয়েছে, ভারতের চা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো অত্যন্ত সীমিত মুনাফা আয় করে তাই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারবে না এবং এর ফলে বৈশ্বিক চা সরবরাহ চেইনেও সংকট তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতি দেশের শতাব্দীপ্রাচীন চা শিল্পের ভবিষ্যৎকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। খরা, তাপপ্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক বৃদ্ধি মিলিতভাবে ভারতের চা উৎপাদন ও রফতানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।