Home Blog Page 22

জুলাইয়ে বৃষ্টিপাতের প্রভাবে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে

পরিমিত বৃষ্টিপাতের কারণে জুলাই মাসে দেশে চা উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৭০টি বড় চা বাগান ও উত্তরবঙ্গের ক্ষুদ্রায়তন চা চাষের জমিতে জুলাইয়ে মোট ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এটি গত বছরের একই সময়ের উৎপাদনের তুলনায় ২০ লাখ ৫৪ হাজার কেজি বেশি। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১৪ লাখ ৩৫ হাজার কেজি।

চা বোর্ড আরও জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছিল। চলতি বছরের একই সময়ে উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার কেজি পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন থেকে দেশে চায়ের ভরা মৌসুম শুরু হয় এবং বৃষ্টিপাতের সঠিক মাত্রা চায়ের উন্নত মান ও পরিমাণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চা খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি চা বোর্ড ন্যূনতম নিলামমূল্য কিছুটা বৃদ্ধি করেছে। এতে বাগান কর্তৃপক্ষ চায়ের উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে। নিলামে সরবরাহ বৃদ্ধির ফলে বাজারে চায়ের চাহিদা ও দাম উভয়ই ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চা নিলামের তথ্য অনুযায়ী, বিক্রির জন্য প্রস্তাবিত চায়ের পরিমাণ ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ৯৫৮ কেজি, যা গত বছরের একই নিলামের তুলনায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ৬৯১ কেজি বেশি। এর আগে ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত নিলামে ৩৩ লাখ ২৫ হাজার ৪৮৫ কেজি চা প্রস্তাব করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের একই সময়ে প্রস্তাবিত চায়ের পরিমাণ ছিল ৩৮ লাখ ২২ হাজার ৪৮৩ কেজি।

মূল্য বৃদ্ধির ফলে চা বিক্রির গড় দামও ভালো অবস্থানে রয়েছে। ১৫তম চট্টগ্রাম নিলামে চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ২৪৫ দশমিক ৫৮ টাকা, যেখানে ৭৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ চা ক্রেতাদের হাতে গেছে। ১৬তম নিলামে গড় দাম বেড়ে কেজিপ্রতি ২৪৬ দশমিক ৬৬ টাকায় লেনদেন হয়েছে এবং প্রস্তাবিত চায়ের মধ্যে ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ বিক্রি হয়েছে।

বাগান মালিকরা জানাচ্ছেন, ন্যূনতম গড়মূল্য বৃদ্ধির কারণে তারা আগের তুলনায় বেশি লাভে চা বিক্রি করছেন। ২০২৩-২৪ নিলামবর্ষে প্রতি কেজি চায়ের গড়মূল্য ছিল ২০০ টাকা, যা ২০২৪-২৫ নিলামবর্ষে বেড়ে ২০৩ টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ২৪০ টাকার ওপরে লেনদেন হচ্ছে এবং খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন বার্ষিক গড় দাম আরও বাড়তে পারে।

ন্যাশনাল টি ব্রোকার্সের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক অঞ্জব দেব বর্মণ বলেন, “নিলামে চায়ের ভালো দাম পাচ্ছেন বাগান মালিকরা। মূল্যবৃদ্ধির কারণে জুলাই থেকে নিলামে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। কয়েক মাস আগে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন আশানুরূপ ছিল না। এখন বাজারের চাহিদা ও দাম দুটোই ভাল হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।”

সার্বিকভাবে দেশের চা খাত বর্তমানে উজ্জ্বল অবস্থায় রয়েছে। পরিমিত বৃষ্টিপাত, ন্যূনতম মূল্য বৃদ্ধি এবং বাজারে ক্রেতাদের ভালো চাহিদার কারণে উৎপাদন ও বিক্রির উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে।

Massimo Vignelli এবং আধুনিক ভিজ্যুয়াল ডিজাইনের ইউনিভার্সাল নীতি

ডিজাইন জগতে এমন কিছু নাম আছে, যা সময় ও প্রবণতার ঊর্ধ্বে উঠে চিরন্তন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। ম্যাসিমো ভিগনেল্লি (Massimo Vignelli) তাঁদের মধ্যে একজন। ইতালীয় এই গ্রাফিক ও শিল্প ডিজাইনার তাঁর কাজের মাধ্যমে একটি দর্শন প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা কেবল নকশার সৌন্দর্য নয়, বরং কার্যকারিতা, স্পষ্টতা এবং স্থায়িত্বের উপর জোর দেয়। তাঁর ডিজাইন শুধুমাত্র দেখতে সুন্দর ছিল না, বরং সেগুলো ছিল বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টির ফসল, যা আধুনিক ভিজ্যুয়াল যোগাযোগকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

ম্যাসিমো ভিগনেল্লির ডিজাইন দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল ‘ডিজাইন ইজ ওয়ান’ (Design is One) — অর্থাৎ, ডিজাইনের কোনো একক ভাগ নেই, এটি একটি সার্বজনীন প্রক্রিয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন একটি ডিজাইন ভালো হলে সেটি যেকোনো মাধ্যমে, যেকোনো উদ্দেশ্যে কাজ করতে পারে। তাঁর মূলমন্ত্র ছিল “Less is More” এবং “If you can design one thing, you can design everything”। এই দর্শন তাঁকে শুধু গ্রাফিক ডিজাইনেই নয়, বরং পণ্য ডিজাইন, স্থাপত্য এবং আসবাবপত্র ডিজাইনেও সফল হতে সাহায্য করেছে।

ভিগনেল্লি মনে করতেন, ডিজাইনকে হতে হবে সুসংগঠিত এবং কার্যকরী। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো তথ্যকে পরিষ্কার এবং সহজবোধ্য উপায়ে উপস্থাপন করা, যাতে ব্যবহারকারীর জন্য কোনো রকম বিভ্রান্তির সুযোগ না থাকে। তিনি অপ্রয়োজনীয় অলংকরণ এবং বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে পরিহার করতেন, কারণ তাঁর মতে এগুলো তথ্যের প্রবাহকে ব্যাহত করে। এই দর্শন আধুনিক ভিজ্যুয়াল যোগাযোগের মূলনীতি হিসেবে আজও প্রাসঙ্গিক।

ভিগনেল্লির টাইপোগ্রাফি ছিল তাঁর ডিজাইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন টাইপফেসের সংখ্যা যত কম রাখা যায়, ততই ভালো। তিনি সীমিত সংখ্যক টাইপফেস, যেমন – হেলভেটিকা (Helvetica), Bodoni, Century Gothic এবং গ্যারামন্ড (Garamond) ব্যবহার করতেন। তাঁর যুক্তি ছিল, এই টাইপফেসগুলো বহুমুখী এবং যেকোনো ডিজাইনে সহজে মানিয়ে যায়, যা একটি সার্বজনীন ভাষা তৈরি করে।

হেলভেটিকা টাইপফেসটি ভিগনেল্লির কাজের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই স্যান-সেরিফ টাইপফেসটির পরিষ্কার এবং নিরপেক্ষ চরিত্র তথ্যের সঠিক উপস্থাপনার জন্য আদর্শ ছিল। নিউইয়র্ক সাবওয়ে ম্যাপের মতো জটিল তথ্য ব্যবস্থায় হেলভেটিকার ব্যবহার ভিগনেল্লির দূরদৃষ্টি প্রমাণ করে। এই টাইপফেসটি শুধুমাত্র সহজ পাঠযোগ্যতাই নিশ্চিত করেনি, বরং একটি আধুনিক এবং কার্যকরী নকশার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

ভিগনেল্লি কেবল টাইপফেসের সংখ্যা কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি টাইপোগ্রাফিক হায়ারার্কির প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। শিরোনাম, উপশিরোনাম এবং মূল পাঠ্যের মধ্যে আকারের তারতম্য, বোল্ড এবং লাইট ফন্টের ব্যবহার এবং লাইনের ব্যবধান (leading) ও অক্ষরের ব্যবধান নিয়ন্ত্রণ করে তিনি তথ্যকে সুবিন্যস্ত করতেন। এর ফলে ব্যবহারকারী সহজেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো চিহ্নিত করতে পারতেন।

আধুনিক ভিজ্যুয়াল যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভিগনেল্লির টাইপোগ্রাফিক নীতিগুলো এখনও শিক্ষা দেওয়া হয়। ডিজিটাল মিডিয়া, ওয়েব ডিজাইন এবং মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনে তথ্যের দ্রুত এবং কার্যকরী উপস্থাপনার জন্য তাঁর পদ্ধতিগুলো অপরিহার্য।

ভিগনেল্লির ডিজাইনে গ্রিড সিস্টেমের ব্যবহার ছিল তাঁর কাজের আরেকটি স্তম্ভ। তিনি মনে করতেন, একটি সুসংগঠিত গ্রিড ডিজাইনকে কাঠামোবদ্ধ করে এবং সকল উপাদানকে একটি যৌক্তিক বিন্যাসে রাখে। গ্রিড সিস্টেম শুধুমাত্র নান্দনিকতার জন্যই নয়, বরং এটি ডিজাইনের প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

গ্রিড সিস্টেমের মাধ্যমে ভিগনেল্লি পৃষ্ঠার প্রতিটি উপাদানকে (যেমন, ছবি, পাঠ্য, গ্রাফ) একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করতেন। এর ফলে ডিজাইনটি দেখতে পরিচ্ছন্ন এবং সুসংগঠিত মনে হতো। এটি তথ্যের সহজে পাঠযোগ্যতা নিশ্চিত করত এবং ব্যবহারকারীর চোখে একটি ছন্দ তৈরি করত।

বিশেষ করে যখন একটি প্রকল্পের একাধিক অংশে কাজ করা হয়, যেমন একটি বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠা বা একটি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন বিপণন সামগ্রী, তখন গ্রিড সিস্টেম ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভিগনেল্লির নিউইয়র্ক সাবওয়ে ম্যাপের নকশায় গ্রিড সিস্টেমের ব্যবহার এতটাই নির্ভুল ছিল যে এটি একটি জটিল তথ্যকে অত্যন্ত সহজবোধ্য করে তুলেছিল।

আধুনিক ওয়েব ডিজাইনে রেসপন্সিভ গ্রিড সিস্টেমের ব্যবহার ভিগনেল্লির দর্শনেরই একটি সম্প্রসারণ। বিভিন্ন স্ক্রিন আকারে ডিজাইনকে মানানসই করার জন্য গ্রিড সিস্টেম অপরিহার্য। এটি মোবাইল অ্যাপ ডিজাইন এবং ইউজার ইন্টারফেস (UI) ডিজাইনেও শৃঙ্খলার ভিত্তি তৈরি করে।

ভিগনেল্লি বিশ্বাস করতেন প্রতিটি ডিজাইন উপাদানের একটি উদ্দেশ্য থাকতে হবে। রঙ, আকার, এবং বিন্যাস সবই যেন তথ্যের প্রবাহকে সমর্থন করে।American Airlines-এর লোগো বা Knoll-এর ব্র্যান্ডিং ডিজাইনে তাঁর এই দর্শন স্পষ্ট দেখা যায়। এই ডিজাইনগুলো শুধু দেখতেই সুন্দর ছিল না, বরং তাদের উদ্দেশ্যকে অত্যন্ত সফলভাবে পূরণ করত।

ভিগনেল্লির ডিজাইনগুলো সময়ের সাথে সাথে পুরনো হয়ে যায়নি । তাঁর কাজের সরলতা, স্পষ্টতা এবং কার্যকারিতা তাদের একটি কালজয়ী আবেদন দিয়েছে।তিনি প্রবণতাকে অনুসরণ না করে মৌলিক নীতিগুলোর উপর ভিত্তি করে ডিজাইন করতেন, যার ফলে তাঁর কাজগুলো আজও আধুনিক এবং প্রাসঙ্গিক।

আধুনিক পণ্য ডিজাইন এবং ব্র্যান্ডিংয়ে কার্যকরী নান্দনিকতার ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পণ্য বা ব্র্যান্ডের ডিজাইন শুধু তার বাহ্যিক রূপকেই নয়, বরং তার ব্যবহারযোগ্যতা এবং গ্রাহকের সাথে তার সংযোগকেও প্রতিফলিত করে। ইউজার এক্সপেরিয়েন্স ডিজাইনের মূলনীতিতেও ভিগনেল্লির এই দর্শনের প্রভাব দেখা যায়, যেখানে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে যেখানে তথ্য এবং ভিজ্যুয়াল উপাদান প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আসছে, সেখানে ভিগনেল্লির নীতিগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বর্তমান যুগে তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভিগনেল্লির সরলতা এবং স্পষ্টতার নীতিগুলো এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহায্য করে।পরিষ্কার টাইপোগ্রাফি এবং সুসংগঠিত বিন্যাস ব্যবহারকারীদের জন্য তথ্য প্রক্রিয়া করা সহজ করে তোলে।

ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, প্রিন্ট মিডিয়া বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একটি ব্র্যান্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। ভিগনেল্লির গ্রিড সিস্টেম এবং সীমিত টাইপফেস ব্যবহারের নীতিগুলো এই ধারাবাহিকতা অর্জনে সহায়তা করে।

ম্যাসিমো ভিগনেল্লি কেবল একজন গ্রাফিক বা শিল্প ডিজাইনার ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ এবং দার্শনিক যিনি ডিজাইনকে একটি সার্বজনীন ভাষা হিসেবে দেখতেন। তাঁর সরলতা, স্পষ্টতা এবং কার্যকারিতার নীতিগুলো টাইপোগ্রাফি, গ্রিড সিস্টেম এবং কার্যকরী নান্দনিকতার মাধ্যমে আধুনিক ভিজ্যুয়াল যোগাযোগকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, রাষ্ট্রপতির নয় : হাইকোর্ট

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নয়, এখন থেকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা থাকবে সুপ্রিম কোর্টের হাতে। এই রায়ের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের মূল ধারা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে বলা ছিল, নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং ছুটি সংক্রান্ত বিষয়সমূহে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের অধীনে থাকবে।

রায়ে হাইকোর্ট সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছে, তিন মাসের মধ্যে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন করতে। বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন এবং ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

হাইকোর্টের এই রায় আসে এমন একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে, যেখানে রাষ্ট্রপতিকে নিম্ন আদালতের ওপর কর্তৃত্ব প্রদানের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল। হাইকোর্ট বেঞ্চের মধ্যে ছিলেন বিচারপতি আহমেদ সোহেল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরী।
উল্লেখ্য এই একই রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছরের ২৭ অক্টোবর হাইকোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং রুল জারি করেন।

১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল-নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে।”

হাইকোর্টের রুলে বিবাদীদের, অর্থাৎ আইন সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রশ্ন করা হয়েছে কেন সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলাভঙ্গ সংক্রান্ত) বিধিমালা, ২০১৭ সংবিধানবিরোধী ঘোষণা করা হবে না এবং কেন সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না।

রুলটি সুপ্রিম কোর্টের ১০ জন আইনজীবীর দায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। এ আইনজীবীদের মধ্যে আছেন মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন, মো. আসাদ উদ্দিন, মো. মুজাহেদুল ইসলাম, মো. জহিরুল ইসলাম, মুস্তাফিজুর রহমান, শাইখ মাহদি, আব্দুল্লাহ সাদিক, মো. মিজানুল হক, আমিনুল ইসলাম শাকিল ও জায়েদ বিন আমজাদ।

এই রায় বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশনার ফলে বিচারকদের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা আরও সুদৃঢ় হবে।

নরওয়ের লোকজ নান্দনিকতার রঙিন ভাষা – রোজমালিং

নরওয়ের লোকশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন হলো রোজমালিং (Rosemaling)। এটি কেবল একটি চিত্রশৈলী নয়, এটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নরওয়ের গ্রামগুলোতে বিকশিত হয়েছে।

রোজমালিংয়ের আক্ষরিক অর্থ হলো “গোলাপের চিত্র” । এর জন্ম সপ্তদশ শতকে নরওয়ের গ্রামীণ অঞ্চলে। তখন ইউরোপে রোকোকো (Rococo) এবং বারোক (Baroque) শৈলীর প্রভাব ছিল। নরওয়ের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে, যেখানে পেশাদার শিল্পীদের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত, সেখানে সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমন কাঠের বাক্স, আসবাবপত্র, থালা-বাসন এবং ঘরের দেয়াল সাজানোর জন্য নিজেরাই চিত্র আঁকা শুরু করে। এই স্বশিক্ষিত শিল্পীরা তাদের নিজস্ব রুচি ও স্থানীয় প্রকৃতির উপাদান যেমন ফুল, পাতা ও লতাপাতার নকশাকে রোকোকো এবং বারোকের মোচড়ানো রেখা ও কারুকার্যের সঙ্গে মিশিয়ে এক নতুন শৈলীর জন্ম দেয়।

রোজমালিংয়ের বিকাশে নরওয়ের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিটি উপত্যকা বা অঞ্চলের শিল্পীরা তাদের নিজস্ব শৈলী এবং রঙের ব্যবহার বিকশিত করে। এর ফলে রোজমালিংয়ের একাধিক আঞ্চলিক রূপ তৈরি হয়, যার মধ্যে টেলিমার্ক (Telemark), হলিনগডাল (Hallingdal) এবং ভস (Voss) উল্লেখযোগ্য।

টেলিমার্ক রোজমালিং সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং জটিল শৈলী হিসেবে পরিচিত। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো C এবং S আকৃতির মোচড়ানো রেখা, যা শাখা-প্রশাখা, ফুল এবং লতাপাতার রূপ নেয়। এই শৈলীতে গভীর, উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করা হয় এবং এর নকশাগুলো অত্যন্ত গতিশীল ও ছন্দময়। ফুলের পাপড়িগুলো প্রায়শই ত্রি-মাত্রিক (3D) দেখানোর জন্য শেডিং ব্যবহার করা হয়। টেলিমার্ক শৈলীর কাজগুলো সাধারণত কালো বা গাঢ় সবুজ পটভূমিতে আঁকা হয়, যা রঙের উজ্জ্বলতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

হলিনগডাল শৈলী টেলিমার্কের চেয়ে কিছুটা সরল। এর নকশায় বড়, উজ্জ্বল এবং সুষম ফুলের ব্যবহার দেখা যায়। এই শৈলীতে অ্যাসিমেট্রি (asymmetry) বা অসামঞ্জস্যতা কম এবং নকশাগুলো আরও সুনির্দিষ্ট। রঙের ব্যবহার সাধারণত গাঢ় লাল, হলুদ এবং নীল। এই অঞ্চলের শিল্পীরা প্রায়শই তাদের কাজকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতেন, যা তাদের কাজকে একটি স্বতন্ত্র চেহারা দেয়।

ভস রোজমালিং তার সরলতা এবং জমকালো রঙের জন্য পরিচিত। এই শৈলীতে প্রধানত গাঢ় নীল, লাল এবং সবুজ রঙের ব্যবহার দেখা যায়। নকশাগুলো প্রায়শই ছোট এবং পুনরাবৃত্তিমূলক, যা পুরো পৃষ্ঠকে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে আবৃত করে। ভস শৈলীর কাজগুলোতে টেলিমার্কের মতো জটিল রেখা বা মোচড়ানো নকশা কম দেখা যায়।

রোজমালিং কেবল সজ্জিতকরণ নয়, এটি নরওয়ের গ্রামীণ জীবনের এক প্রতিফলন। এটি মূলত লোকশিল্প হলেও, এর নকশা এবং কৌশলগত দিক থেকে এটি একটি উচ্চমানের চিত্রকলার নিদর্শন।

রোজমালিংয়ে ব্যবহৃত প্রতিটি মোটিফ বা নকশার একটি নির্দিষ্ট প্রতীকী অর্থ রয়েছে। ফুল, বিশেষ করে গোলাপ, জীবন ও সৌন্দর্যের প্রতীক। পাতা ও লতাপাতা বৃদ্ধি ও প্রকৃতির চক্রকে বোঝায়। এই নকশাগুলো কেবল সৌন্দর্যবর্ধন করে না, বরং এটি মানুষের প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি ভালোবাসারও প্রকাশ।

রোজমালিংয়ে রঙের ব্যবহার অত্যন্ত প্রতীকী। গাঢ় পটভূমির ওপর উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করে শিল্পীরা জীবনের অন্ধকার ও আলোর ভারসাম্য দেখিয়েছেন। নীল রঙ প্রায়শই শান্তি ও স্থবিরতার প্রতীক, যেখানে লাল রঙ উষ্ণতা ও জীবনের স্পন্দনকে বোঝায়। এই রঙের ব্যবহার রোজমালিংকে একটি গভীর শৈল্পিক মাত্রা দেয়।

রোজমালিংয়ের প্রতিটি কাজ দক্ষ কারিগরী ক্ষমতার প্রমাণ। সূক্ষ্ম তুলির আঁচড়, রঙের সঠিক মিশ্রণ এবং নকশার নিখুঁত বিন্যাস এটিকে একটি উচ্চমানের কারুশিল্পে পরিণত করে। শিল্পীরা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ব্রাশ স্ট্রোক ব্যবহার করে ফুল ও পাতা তৈরি করতেন, যা তাদের কাজকে একটি স্বতন্ত্রতা দিত।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রোজমালিংয়ের জনপ্রিয়তা কমে যায়। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ ঐতিহ্যবাহী এই শৈলী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। তবে ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে এবং নরওয়েতে এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন শুরু হয়। অভিবাসী নরওয়েজীয়রা তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য রোজমালিং চর্চা শুরু করেন। এটি তাদের শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে সাহায্য করে।

বর্তমানে রোজমালিং একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত শিল্প। এর ঐতিহ্যবাহী রূপের পাশাপাশি আধুনিক শিল্পীরা এটিকে নতুন নতুন মাধ্যমে যেমন সিরামিক, গ্লাস এবং টেক্সটাইলে ব্যবহার করছেন। রোজমালিং এখন শুধু নরওয়ের গ্রামগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সারা বিশ্বে নরওয়ের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

রোজমালিং নরওয়ের এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এটি কেবল একটি চিত্রশৈলী নয়, এটি একটি গল্প, যা নরওয়ের মানুষের প্রকৃতি, বিশ্বাস এবং তাদের শৈল্পিক চেতনার কথা বলে। এর প্রতিটি আঁচড়, প্রতিটি রঙ এবং প্রতিটি নকশা তাদের জীবন ও সংস্কৃতির গভীরতাকে ধারণ করে। রোজমালিংয়ের এই ফুলেল ঐতিহ্য কেবল অতীতের গৌরব নয়, এটি বর্তমানের অনুপ্রেরণা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সাংস্কৃতিক সম্পদ।

অগভীর ভূমিকম্প কেন বেশি ধ্বংসাত্মক হয়?

আফগানিস্তানে সম্প্রতি আঘাত হানা ৬.০ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হয়েছে। শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার আহত হয়েছেন। ভূকম্পনবিদরা এটিকে ‘অগভীর’ ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কারণ এর কেন্দ্রস্থল ছিল মাত্র ৮ কিলোমিটার গভীরে। প্রশ্ন হলো, কেন এই ধরনের অগভীর ভূমিকম্প এত বেশি ধ্বংসাত্মক হয়?

ভূমিকম্প মূলত টেকটোনিক প্লেটগুলোর নড়াচড়ার কারণে ঘটে। পৃথিবীর পৃষ্ঠ কঠিন শিলার তৈরি, যা টেকটোনিক প্লেট নামে পরিচিত। এই প্লেটগুলো গরম, তরল শিলার উপরে ভাসমান। তরল শিলার ঘূর্ণনের কারণে প্লেটগুলো ধীর গতিতে নড়াচড়া করে। যখন দুটি প্লেট একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, তখন চাপ তৈরি হয়। একপর্যায়ে এই চাপ আকস্মিকভাবে মুক্ত হলে প্লেটটি নড়ে ওঠে এবং চারপাশের শিলায় শক্তি বিস্ফোরিত হয়। এই কম্পনই ভূমিকম্প হিসেবে অনুভূত হয়।

ভূমিকম্পের গভীরতা অনুসারে এটিকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয় –

অগভীর (Shallow focus): ০-৭০ কিমি (০-৪৩ মাইল) গভীরতা।
মধ্যবর্তী (Intermediate focus): ৭০-৩০০ কিমি (৪৩-১৮৬ মাইল) গভীরতা।
গভীর (Deep focus): ৩০০-৭০০ কিমি (১৮৬-৪৩৫ মাইল) গভীরতা।

একই মাত্রার হলে, একটি অগভীর ভূমিকম্প একটি গভীর ভূমিকম্পের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এর প্রধান কারণ হলো, অগভীর ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের অনেক কাছাকাছি থাকে। এর ফলে ভূমিকম্পের শক্তি মানুষ ও স্থাপনা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য খুব কম দূরত্ব অতিক্রম করে। যখন শক্তি নির্গত হয়, তখন তা ভূপৃষ্ঠে অনেক বেশি শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি করে, যা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।

অন্যদিকে গভীর ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে শক্তিকে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর জন্য শিলার একাধিক স্তর ভেদ করতে হয়। এই দীর্ঘ যাত্রার সময় শিলার স্তরগুলোতে ঘষা লাগার কারণে কম্পনের শক্তি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। এর ফলে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর পর এর প্রভাব অনেক কমে আসে, যার কারণে এটি অগভীর ভূমিকম্পের মতো ততটা ধ্বংসাত্মক হয় না।

আফগানিস্তান পৃথিবীর অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলের একটি। দেশটির হিন্দুকুশ পর্বতমালা অগভীর এবং গভীর উভয় ধরনের ভূমিকম্পের জন্যই একটি হটস্পট। এর কারণ হলো ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বিশাল চাপ ভূত্বককে ভেঙে দেয়। এর ফলে উত্তর আফগানিস্তানের পামির-হিন্দুকুশ অঞ্চলে প্রায়ই তীব্র ভূমিকম্প হয়, যা ২০০ কিমি পর্যন্ত গভীরতায় পৌঁছাতে পারে। এটি পৃথিবীতে একটি বিরল ঘটনা।

তবে আফগানিস্তানের সুলাইমান রেঞ্জ (পশ্চিম পাকিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের সীমানায়) এবং পামির মালভূমির কাছে সৃষ্ট ভূমিকম্পগুলো সাধারণত অগভীর এবং তাই অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি সুলাইমান রেঞ্জের নিকটবর্তী হওয়ায় এটি এমন ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়েছে।

ভূমিকম্পের তীব্রতা পরিমাপ করা হয় মাত্রা দিয়ে। তবে এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা নির্ভর করে মূলত এর কেন্দ্রস্থলের গভীরতার উপর। অগভীর ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের খুব কাছে থাকায় এর শক্তি সরাসরি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হানে, যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এই কারণটিই আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের মতো ঘটনাকে আরও বেশি ভয়াবহ করে তোলে।

যে কৌশলে ইরানের সামরিক নেতাদের হত্যা করে ইসরায়েল

গত ১৩ জুন ইসরাইলি আক্রমণে শুরু হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের বেশ কয়েকটি জায়গায় উপর্যুপরি বোমা ফেলে দেশটির সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তা এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের হত্যা করে ইসরায়েল।

ইরানে কীভাবে বেছে বেছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করা হয়েছে তার একটি চিত্র উঠে এসেছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ৩০ আগস্টের প্রতিবেদনে।

প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিকটি জানায়, ইরানের নেতাদের দেহরক্ষীদের অবস্থান শনাক্ত করে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। তাদের মাধ্যমে ইরানি নেতাদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। আর সেই সব তথ্য ব্যবহার করে পরে তাদেরকে একে একে হত্যা করে ইসরায়েল।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইরানের নিরাপত্তাকর্মীদের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছিল।

ইরান ও ইসরায়েলের কর্মকর্তারা বলছেন যে, ইরানের সেইসব নিরাপত্তাকর্মীরা গত কয়েক বছর মোবাইল ফোন যথেচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন। তারা মোবাইল ফোন থেকে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করতেন। সেই সূত্র ধরেই এগিয়েছিল ইসরায়েলের বিমান বাহিনী। ফলে ইরানের নিরাপত্তাকর্মীদের এই খামখেয়ালিপনার জন্য মূল্য দিতে হয় তাদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের।

ফোন ট্র্যাক করার সংবাদ আগেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছিল। তবে এই হামলার অন্তত দুই মাস আগে থেকেই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় থাকা ইরানের সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দাদের নিবিড়ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছিল।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তা সাসান কারিমি গণমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আমরা জানি যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডাররা ফোন বহন করেন না। তাদের গাড়িচালক, নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যদের সঙ্গে ফোন থাকে। তারা সতর্কতার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। তাই তাদেরকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়।’

এ বিষয়ে ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘বেশি বেশি দেহরক্ষী রাখা দুর্বলতার প্রমাণ। আর আমরা সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়েছি।’

নিজস্ব AI মডেল উন্মোচন করেছে মাইক্রোসফট

মাইক্রোসফট সম্প্রতি তাদের প্রথম নিজস্ব AI মডেল MAI-Voice-1 এবং MAI-1-preview উন্মোচন করেছে। এটি প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, এর মাধ্যমে মাইক্রোসফট ওপেনএআই-এর উপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের AI গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্রীয় করে তুলেছে।কোম্পানির এই পদক্ষেপ কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং AI ব্যবহারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল প্রদর্শন করছে।

MAI-Voice-1 একটি উচ্চ-গতির কণ্ঠস্বর উৎপাদন মডেল, যা এক মিনিটের অডিও মাত্র এক সেকেন্ডে তৈরি করতে সক্ষম। এটি কোপাইলট ডেইলি এবং পডকাস্ট ফিচারে ব্যবহৃত হচ্ছে। মডেলটি ব্যবহারকারীদের জন্য কণ্ঠস্বরের ধরন ও স্টাইল কাস্টমাইজ করার সুবিধা প্রদান করে, যার ফলে আরও প্রাকৃতিক ও মানবসদৃশ অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব। ব্যবহারকারী সহজেই সংবাদের সারাংশ, ব্লগ রিডিং বা পডকাস্ট স্টাইল আলোচনার জন্য কণ্ঠ নির্বাচন করতে পারেন। এটি প্রযুক্তি বিশ্বের জন্য AI-এর অডিও সম্ভাবনাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।

MAI-1-preview মডেলটি ১৫,০০০ NVIDIA H100 GPU ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত এবং এটি সাধারণ ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন প্রশ্নের উত্তর প্রদানে সক্ষম। এটি কোপাইলটের বিভিন্ন ফিচারে সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যেমন অফিসিয়াল নোট তৈরী, তথ্যসংগ্রহ ও দ্রুত বিশ্লেষণ। মডেলটির লক্ষ্য হলো ব্যবহারকারীদের জন্য আরও দ্রুত, নির্ভুল ও ব্যক্তিগতকৃত AI সহকারী সরবরাহ করা। বর্তমানে MAI-1-preview LM Arena প্ল্যাটফর্মে পরীক্ষামূলকভাবে দেখা হয়েছে, যা অন্যান্য মডেলের সঙ্গে তুলনা ও কার্যক্ষমতা মূল্যায়নের সুযোগ দেয়।

মাইক্রোসফটের এই উদ্যোগে স্পষ্ট দেখা যায় তাদের ওপেনএআই-এর উপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতায়। GPT-4-এর উচ্চ খরচ ও কিছু ধীরগতির পারফরম্যান্স সমস্যার কারণে মাইক্রোসফট নিজস্ব মডেল তৈরিতে উৎসাহিত হয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানি AI প্রযুক্তিতে আরও স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে চাচ্ছে। তবুও মাইক্রোসফট ওপেনএআই-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখবে এবং বার্ষিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের মাধ্যমে AI অবকাঠামো উন্নত করবে।

মাইক্রোসফটের এই পদক্ষেপ এআই শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল ওপেনএআই-এর উপর নির্ভরশীলতা কমাতেই সাহায্য করবে না, বরং এআই মডেলের বাজারকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। বিভিন্ন কোম্পানি যখন নিজস্ব মডেল নিয়ে আসবে, তখন এআই প্রযুক্তি আরও দ্রুত গতিতে বিকশিত হবে এবং এর ফলে ব্যবহারকারীরা আরও উন্নত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সুবিধা পাবে। এটি এআই প্রযুক্তির বিকেন্দ্রীকরণ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে উদ্ভাবনের এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে : মির্জা ফখরুল, বিএনপি মহাসচিব

বিএনপি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সোমবার রাজধানীর জিয়া উদ্যানে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি এ কথা জানান। তিনি বলেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে সেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিএনপি সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

মির্জা ফখরুল আরও উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশন যে সংস্কার প্রস্তাবনা করেছে, তাতে বিএনপি সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপিকে বারবার ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে। দলকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে দলের ৬০ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, প্রায় ২০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১ হাজার ৭০০ নেতা-কর্মীকে গুম বা খুন করা হয়েছে। এসব অত্যাচারের মধ্যেও বিএনপি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে লড়াই করে চলেছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শকে অবলম্বন করে ফিনিক্স পাখির মতো পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে। জনগণের সমর্থন পেলে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এর ফলে বাংলাদেশ আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এবং ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপির এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। দলটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যে কোনো প্রয়াসে তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে।

মোদির চীন সফরকে কেন ‘পরাজয়’ হিসেবে দেখছেন ভারতের রাজনীতিকেরা?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক চীন সফর দেশীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সফরটিকে তিয়ানজিনে চীনের কাছে “ভারতীয় হাতির আত্মসমর্পণ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কংগ্রেস মুখপাত্র জয়রাম রমেশ সোমবার ‘এক্স’ হ্যান্ডলে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি স্বঘোষিত ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মতো তিয়ানজিনে পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, চীনের দ্বিমুখী নীতি এবং সন্ত্রাসবাদের বিষয়গুলোতে মোদি কোনো দৃঢ় অবস্থান নেননি। এসসিও সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং মোদিকে বলেছিলেন যে ভারত এবং চীন দুই দেশই সন্ত্রাসবাদের শিকার, যা ভারতের দীর্ঘদিনের অভিযোগের বিপরীত।

সদৃশ সমালোচনায় সরব হয়েছে হায়দরাবাদের এআইএমআইএম। দলের নেতা ও লোকসভা সদস্য আসাউদ্দিন ওয়েইসি অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী মোদি নির্বাক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের যুগলবন্দী এবং চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে মোদি কোনো অবস্থান গ্রহণ করেননি। এছাড়া সীমান্ত পরিস্থিতি এমন যে এখনও ভারতীয় সেনারা লাদাখের বাফার জোনে নিরাপদভাবে টহল দিতে পারছেন না।

জয়রাম রমেশ আরও বলেন, মোদি ২০২০ সালের ১৯ জুন গালওয়ান সংঘর্ষের পর চীনকে ক্লিন চিট দিয়ে দেশের স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। এবার তিয়ানজিন সফরেও তার পদক্ষেপ দেশ ও জনগণের স্বার্থে উপযুক্ত ছিল না। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদি কোনো শক্তিশালী বা কার্যকরী পদক্ষেপ নেননি। চীনা পণ্যের অবাধ আমদানি ভারতের মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে প্রভাব ফেলতে পারে, যা কংগ্রেসের গভীর উদ্বেগের বিষয়।

ওয়েইসি তার সমালোচনায় উল্লেখ করেন, গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর জলবণ্টন, সীমান্তে নিরাপত্তা, বিরল খনিজ পদার্থ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি বিষয়ে চীনের সঙ্গে কোনো অগ্রগতি হয়নি। মোদি–সি বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে এবং ভারতের স্বার্থকে সংরক্ষণে কোনও দৃঢ় পদক্ষেপ দেখা যায়নি।এছাড়া ছবি তোলা, জ্যাকেটের রঙ বা কার্পেটের দৈর্ঘ্য নিয়ে মোদি–সি বৈঠকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও ভারতীয় জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন।

তিয়ানজিন সফরের আগে কংগ্রেস স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, তারা আশা করেছিল পূর্ব লাদাখে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা, চীনা পণ্যের ভারতীয় বাজারে প্রভাব, সীমান্ত নিরাপত্তা, নদী ও জলবণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কার্যকরী আলোচনা হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ফল দেখা যায়নি। জয়রাম রমেশ প্রশ্ন তুলেছেন, চীনের দাপট এবং ভারতের নতিস্বীকার কি এই নতুন স্বাভাবিকতা হিসেবে ধরা হবে?

বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানও ভারতের চীনের প্রতি নির্ভরতার উদ্বেগকে প্রমাণ করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চীনের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্য হয়েছে ১১৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চীনের পণ্য আমদানি করেছে ১০,৯০০ কোটি ডলারের সমতুল্য, আর ভারতের চীনে রপ্তানি মাত্র ৯৮০ কোটি ডলারের। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৯,৯২০ কোটি ডলার। বিভিন্ন ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছেন, এই ঘাটতি আগামীতে আরও বৃদ্ধি পাবে।

বিশেষ করে টেলিকম, ইলেকট্রনিকস ও শক্তি ক্ষেত্রে চীনের ওপর ভারতের নির্ভরতা দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বাজারে চীনা পণ্যের প্রাধান্য বেড়ে যেতে পারে, যা চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে শক্তিশালী করবে।

মোদির চীন সফর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়েছে। কংগ্রেস এবং এআইএমআইএম দুই দলই মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী এই সফরে দেশের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন এবং ভারতের স্বনির্ভরতা ও নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ হয়নি।

জীবন, নিঃসঙ্গতা ও নিহিলিজমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’

বাংলা সাহিত্যের এক চিরায়ত প্রশ্ন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কুবের কি শুধুই ভাগ্যের হাতে অসহায় এক পুতুল? নাকি তার জীবনের গভীরে লুকিয়ে আছে সূক্ষ্ম, নিহিলিস্টিক শূন্যতাবোধ? উপন্যাসের পরতে পরতে কুবেরের জীবন সংগ্রাম, তার দারিদ্র্য, প্রকৃতি ও সমাজের নিষ্ঠুরতা সবকিছুই পাঠককে এই প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড় করায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা কুবেরকে একজন সহজ-সরল মানুষ হিসেবে দেখি, যার জীবন পদ্মার স্রোতের মতোই অনিয়ন্ত্রিত। কিন্তু একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুবেরের এই সরলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অস্তিত্বের সংকট, যা তাকে কোনো আদর্শ, মূল্যবোধ বা উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এটি কেবল নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং জীবনের প্রতি এক ধরনের নিরাসক্ত উদাসীনতা, যা আধুনিক নিহিলিজমের ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

কুবেরের জীবন শুরু থেকেই দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে বন্দি। তার পেশা মাঝি জীবন, তাকে প্রকৃতির সঙ্গে এক অবিরাম লড়াইয়ে লিপ্ত রাখে। পদ্মা নদীর ভাঙন, তার পরিবারের নিত্য অভাব, ঋণের বোঝা এসবই তার জীবনকে এক অনিয়ন্ত্রিত স্রোতের দিকে ঠেলে দেয়। সে যেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই এক অসহায় শিকার। তার স্ত্রী মালা অসুস্থ, কন্যা গোপী রোগা এবং ছেলে পীতমকে নিয়ে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই কঠিন বাস্তবতা তাকে কোনো স্বপ্ন দেখতে দেয় না, কোনো আদর্শের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে শেখায় না। সে কেবল বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকে।

উপন্যাসে দেখা যায়, কুবের কোনোদিনও তার ভাগ্যের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। যখন তার ঘর ভাঙে, সে নতুন করে ঘর বাঁধে। যখন তার পরিবারে অভাব দেখা দেয়, সে নিরন্তর পরিশ্রম করে। কিন্তু এই সংগ্রাম কেবল বেঁচে থাকার জন্য, এর পেছনে কোনো বড় লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই। এই অসহায় আত্মসমর্পণই কি তার চরিত্রের মূল দিক? আপাতদৃষ্টিতে তাই মনে হয়। কিন্তু এই আত্মসমর্পণ নিছকই নিয়তির কাছে হার মানা নয়, বরং এটি জীবনের প্রতি তার এক প্রকার উদাসীনতার ফল।

কুবেরের জীবনকে কেবল দারিদ্র্যের নিরিখে বিশ্লেষণ করলে তার চরিত্রের গভীরতা বোঝা যাবে না। তার নৈতিক মূল্যবোধের দিকে তাকালে এক ধরনের শূন্যতা চোখে পড়ে। তার জীবনে নৈতিকতার কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো নেই। সে গোপীচাঁদের জাল কিনে ঠকে যায়, আবার কপিলাকে নিয়ে এক জটিল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে কপিলাকে নিয়ে তার পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি তার চরিত্রের নৈতিক অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তোলে। সে নিজের অসুস্থ স্ত্রী ও সন্তানদের ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুব বেশি দ্বিধা করে না। এই আচরণ কি কেবলই তার অসহায়তার ফল? নাকি এর পেছনে কাজ করছে জীবনের প্রতি তার নিহিলিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি?

কুবেরের কাছে জীবনের কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, তাই ভালো-মন্দ, পাপ-পুণ্যের ধারণা তার কাছে অস্পষ্ট। সে শুধু স্রোতের টানে ভেসে চলে। সে যখন ময়নাদ্বীপে যায়, সেখানেও তার জীবনে কোনো নতুন অর্থ বা উদ্দেশ্য আসে না। সে কেবল নতুন পরিবেশে আবার বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এই যাত্রা তার জীবনের অর্থহীনতাকে আরও জোরালো করে। তার চরিত্রের এই দিকটিই প্রমাণ করে যে সে নিছকই ভাগ্যের শিকার নয়, বরং তার মধ্যে এক নিহিলিস্টিক শূন্যতাবোধ কাজ করে।

তার জীবনে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় আদর্শের প্রতি বিশ্বাস নেই। তার সমাজের অন্যরা যখন ধর্ম বা সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলে, তখন সে অনেকটা বিচ্ছিন্নভাবে নিজের জীবন যাপন করে। সে হোসেন মিয়ার মতো একজন শক্তিশালী ও রহস্যময় চরিত্রের সংস্পর্শে আসে, কিন্তু তার জীবনদর্শনে সে কোনো পরিবর্তন আনতে পারে না। সে যেন এক বদ্ধ জলাশয়, যেখানে কোনো নতুন স্রোত প্রবেশ করতে পারে না।

এই আদর্শহীনতা এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে এক গভীর শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়। জীবনের কোনো দিকনির্দেশনা নেই, কোনো লক্ষ্য নেই। সে শুধু ঘটনাক্রমে বেঁচে থাকে। এই অবস্থা আধুনিক নিহিলিজমের মূল বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করে, যেখানে ব্যক্তি জীবনের উদ্দেশ্যহীনতায় ভোগে এবং কোনো আদর্শে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে না।

উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে যখন কুবের হোসেন মিয়ার সঙ্গে ময়নাদ্বীপে চলে যায়, তখন এই যাত্রাকে কি নতুন জীবনের দিকে যাত্রা বলা যায়? নাকি এটি তার জীবনের এক ধরনের পলায়ন? এটি শুধুই ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ নয়, বরং তার জীবনের অর্থহীনতা থেকে মুক্তি পাওয়ার এক প্রচেষ্টা। সে নতুন কোনো স্বপ্ন বা লক্ষ্য নিয়ে যাচ্ছে না, বরং সে শুধু এই কঠিন বাস্তবতা থেকে পালাতে চাইছে।

কুবেরের জীবনকে কেবল ভাগ্যের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তার চরিত্রের গভীরে লুকিয়ে আছে নিহিলিস্টিক শূন্যতাবোধ, যা তাকে কোনো আদর্শ, নৈতিকতা বা উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে শুধু দারিদ্র্যের চিত্রই তুলে ধরেননি, বরং মানবজীবনের অস্তিত্বের সংকট এবং আধুনিক নিহিলিজমের দার্শনিক ধারণাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেছেন।