জলবায়ু পরিবর্তন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা বিশ্বব্যাপী মানববসতি ও অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।বাংলাদেশের মতো একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র, যেখানে ঘনবসতি এবং দুর্বল অবকাঠামো রয়েছে, সেখানে এই প্রভাব আরও প্রকট। এখানকার মানুষ কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কারণেও প্রতিনিয়ত অভ্যন্তরীণ অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হচ্ছে। এই অভিবাসন একদিকে যেমন মানবিক সংকট তৈরি করছে, অন্যদিকে দেশের নগরকেন্দ্রিক অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
প্রতি বছর বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়। Migration Policy Institute (MPI)-এর ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় ১৪.৭ মিলিয়ন বার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এখানে “বার” বলতে (displacement events) বোঝানো হয়েছে, যার অর্থ একজন ব্যক্তি একাধিকবার স্থানচ্যুত হতে পারে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং মানুষের দুর্দশার ঘনত্ব এবং স্থিতিশীলতার অভাবকে নির্দেশ করে। একটি পরিবার বছরের পর বছর ধরে ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, নতুন করে বসত গড়ছে এবং আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে, এই চক্রটি মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তোলে। এটি একটি গভীর মানবিক সংকট, যা কেবল ঘর হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
যদি বর্তমান পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকে এবং কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে। World Bank-এর ২০২১ সালের Groundswell রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশে প্রায় ১৯.৯ মিলিয়ন মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে। তবে, এই রিপোর্টেই উল্লেখ করা হয়েছে যে যদি বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর নীতিগত অভিযোজন বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। এর অর্থ আমাদের হাতে এখনো সুযোগ আছে ভবিষ্যতের এই বিশাল বাস্তুচ্যুতি রোধ করার।
কেন মানুষ শহরমুখী হচ্ছে?
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসনের পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের নদীগুলো আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু একই সাথে নদীভাঙন দেশের একটি বড় সমস্যা। প্রতিবছর পদ্ম, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো বড় নদীগুলো তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে এবং এর ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। গ্রামের পর গ্রাম নদীভাঙনের শিকার হয় এবং গৃহহীন মানুষগুলো জীবন ও জীবিকার সন্ধানে নিকটবর্তী শহর বা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। এই নদীভাঙন কেবল মানুষের আশ্রয়স্থল কেড়ে নেয় না, বরং তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও ভেঙে দেয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো নিয়মিত ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের শিকার হয়। সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯), রোয়ানু (২০১৬) এবং আম্পান (২০২০)-এর মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলো উপকূলীয় জনপদের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এই দুর্যোগগুলো কৃষিজমি, ঘরবাড়ি ও মাছের খামার ধ্বংস করে দেয়, যার ফলে মানুষ জীবিকা হারায় এবং বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণভাবে অভিবাসন করে।
বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার বাড়তে পারে, যা উপকূলীয় অঞ্চলে অন্তত ৯ লক্ষ মানুষের বসতভিটা হারানোর কারণ হতে পারে। ২১১০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বহুগুণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কৃষিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। কৃষকরা জীবিকা হারিয়ে বিকল্প উপায়ের খোঁজে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব ছাড়াও এর পরোক্ষ প্রভাব নগরায়ণকে ত্বরান্বিত করছে। গ্রামঞ্চলে জীবিকার সুযোগ কমে যাওয়ায় এবং কৃষি উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় মানুষ অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য শহরের দিকে ঝুঁকছে। ঢাকায় প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৪ লক্ষ নতুন অভিবাসী যোগ হচ্ছে, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১,০০০ থেকে ১,১০০ জন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন ঢাকার মতো মহানগরীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।


