জল একদিকে জীবন ধারণের মূল উপাদান, অন্যদিকে এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে শক্তি, দখল ও আধিপত্যের প্রতীক।দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও চীন, এই অঞ্চলের নদীগুলো শুধু প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, বরং একটি কূটনৈতিক অস্ত্র, যা দিয়ে গঠন বা ভাঙা হয় ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য। নদী নিয়ে এই রাজনীতি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ইন্দাস নদীর জলবণ্টন ইস্যুতে।
নদী মানেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা?
“Water is the new oil” এই কথাটি বিশ্ব রাজনীতিতে আজ আর নিছক কবিত্ব নয়। নদী যার নিয়ন্ত্রণে, তার হাতে একপ্রকার ভৌগোলিক অস্ত্র থাকে। ভারতের মতো নদীর উজান রাষ্ট্র যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানি আটকে রাখে বা অতিরিক্ত ছেড়ে দেয়, তবে ভাটির দেশ বাংলাদেশ হয়ে পড়ে দুর্বল ও জিম্মি। আর এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক দরকষাকষিতে, কখনও সরাসরি আবার কখনও গোপনে।
তিস্তা নদী মূলত ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। ১৯৮৩ সাল থেকেই উভয় দেশ এই নদীর পানি বণ্টন নিয়ে আলোচনা করে আসছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ চুক্তি হয়নি। কেন? একদিকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তির পক্ষে থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার, বিশেষত মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এর বিরোধিতা করে থাকেন। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিশ্রুতিও বারবার ভেস্তে যায়। এখানে বোঝা যায় রাজ্য ও কেন্দ্রের দ্বন্দ্বের মাঝখানে পড়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক! বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তার পানি নির্ভরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তি না হওয়ায় খরা, চাষাবাদের ব্যাঘাত ও পানির সঙ্কট স্থানীয় জনগণের জন্য একটা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি করেছে।
ব্রহ্মপুত্র নদ চীন থেকে শুরু হয়ে ভারতে প্রবেশ করে এবং পরে বাংলাদেশে এসে মিশে যায় যমুনায়। এই নদী নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হচ্ছে চীনের ‘ড্যাম কূটনীতি’। চীন ইতিমধ্যে নদীর উজানে একাধিক বাঁধ নির্মাণ করেছে, যার ফলে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে এবং বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির প্রবাহে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। চীনের এই একতরফা পানি ব্যবস্থাপনা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একধরনের জিওপলিটিক্যাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—চীন যদি একদিন পুরো নদীর উৎস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তবে ভারত বা বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের ভূখণ্ডের সেচ, পানীয় ও কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করবে?
১৯৬০ সালে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের মধ্যে ইন্দাস নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ইন্দাস ওয়াটার ট্রিটি নামে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হয়।বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় তৈরি এই চুক্তি অনেক সময় পানি নিয়ে সংঘাত রোধ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক কৌশল ও উত্তেজনার জেরে মোদি সরকার ইন্দাস চুক্তিকে ‘পুনর্বিবেচনার হুমকি’ দিয়েছে। এতে পাকিস্তান একে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে। এটি একধরনের water weaponization পানি দিয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা।
নদী কূটনীতিতে আজ আর শুধু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফগলা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও খরার প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। এই পরিবর্তন একদিকে কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনমানকে হুমকির মুখে ফেলছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমঝোতা বাস্তবায়নকেও জটিল করে তুলছে।
বিশেষ করে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদে বর্ষাকালে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি প্রবাহ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা উভয় পরিস্থিতিই বাংলাদেশকে বিপদে ফেলছে। এই জিও-ইকোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণটি এখন পর্যন্ত আঞ্চলিক চুক্তিতে গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সরকারি কূটনৈতিক তৎপরতার বাইরে নাগরিক সমাজ এবং পরিবেশ আন্দোলনকারীদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশে নানা সময় মানববন্ধন, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়েছে। ভারতের মধ্যেও কিছু সংগঠন তিস্তা নিয়ে যৌক্তিক সমঝোতার পক্ষে কথা বলেছে। এই ধরনের Bottom-up (জনগণের দাবি থেকে উঠে আসা) আন্দোলন রাষ্ট্রকে গণমুখী নদী কূটনীতিতে এগিয়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। তবে এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন থেকে দূরে রাখতে হবে।
নদীগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই বিভিন্ন দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে চলে। ফলে এগুলো নিয়ে যৌথ ব্যবস্থাপনা না করলে কোনো দেশই টেকসইভাবে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। কিন্তু সমস্যা হলো এই অঞ্চলটিতে পানির ব্যবস্থাপনা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গি বেশি সক্রিয়। চীন বা ভারত দুই দেশই নিজেদের ভূরাজনৈতিক শক্তিকে বজায় রাখতে নদীকে ব্যবহার করছে একপ্রকার ‘চুপচাপ অস্ত্র’ হিসেবে। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশ এসব ক্ষেত্রে পড়ে যায় একধরনের কূটনৈতিক একঘরে অবস্থানে। যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং বহুপাক্ষিক কাঠামো তৈরি না হয়, ততক্ষণ দক্ষিণ এশিয়ায় নদী হবে দ্বন্দ্বের প্রতীক।
কিন্তু নদী হলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণ। কিন্তু এই প্রাণ আজ পলিটিক্সের টানাপড়েনে আটকে। তিস্তা হোক, ব্রহ্মপুত্র হোক কিংবা ইন্দাস এসব নদীর জল কেবল পানি নয়, এটি ক্ষমতার প্রতীক। আজ প্রয়োজন, নদীকে ‘ক্ষমতার অস্ত্র’ নয়, সহযোগিতার সেতু হিসেবে দেখা। না হলে ভবিষ্যতের দক্ষিণ এশিয়া শুধু পানিশূন্যই নয়, আরও সংকটগ্রস্ত এবং সংঘাতপ্রবণ হয়ে উঠবে।


