‘The Substance’ সৌন্দর্যের আতঙ্ক : মণিকা ক্যাস্টিলো, critic, journalist, programmer

“অসাধারণ সৌন্দর্যের অসম্ভব মানদণ্ড আর সমাজের তরুণত্ব-আসক্তি, এই দুইয়ের চাপে ভেঙে পড়ার অনুভূতি নতুন নয়। কিন্তু করালি ফারজিয়াত পরিচালিত নতুন সিনেমা The Substance এমন এক সময়ে এসেছে, যখন “ওজেম্পিক যুগ” আমাদের জানায়, শরীরে ছুরি-কাঁচি ছাড়াই এক ইঞ্জেকশনে অসম্ভব মনে হওয়া ওজন কমানো সম্ভব।

আমার সামাজিক মাধ্যমে নিয়মিতই বিজ্ঞাপন আসে “ফিরে পান আপনার পুরনো নিজেকে”, “সস্তায় শুরু করুন, ফলাফল পাবেন দ্রুত”। লোভনীয়, নয় কি?যদিও ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত GLP-1 ওষুধের সঙ্গে সিনেমায় দেখানো রহস্যময় “Substance”-এর কোনো সরাসরি মিল নেই, তবুও সিনেমাটি এই আকাঙ্ক্ষা “যৌবনের ঝর্ণাধারা” খোঁজার অন্ধ অনুসন্ধানকে রক্ত-ও-নিয়ন আলোয় মুড়ে এক ভয়াবহ দৃষ্টিতে তুলে ধরে।

ডেমি মুর অভিনীত এলিজাবেথ স্পার্কল, একসময় পর্দায় জ্বলজ্বল করতেন। এখন তাঁর তারকা হাঁটা শুরু করেছে পতনের পথে, যেন হলিউড ওয়াক অফ ফেমে খোদাই করা তার নামও অতীতের স্মৃতি। এক বিকৃত মানসিকতার নির্বাহী হার্ভি (ডেনিস কুয়েড) তাঁকে তাঁর ফিটনেস টিভি অনুষ্ঠান থেকে বরখাস্ত করে, শুধুমাত্র তার বয়সের কারণে, কারণ তার জায়গায় চাই “তরুণ কেউ”।

অপমান ও বিষাদে জর্জরিত এলিজাবেথ জানতে পারে “The Substance” নামক এক রহস্যময় প্রডাক্টের কথা, যা তারই একটি তরুণ সংস্করণ তৈরি করে দেয়, তাঁর ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখার মতো যৌবন। তবে এই পদার্থের নিয়ম-কানুন অনেকটা “Gremlins” ছবির দানবদের মতো জটিল, একবারেই তরুণ সংস্করণ সক্রিয় করা যাবে, আর প্রতি সাত দিন পরপর তারা একে অপরের সঙ্গে স্থানবিনিময় করবে। যদিও তারা একসঙ্গে এক চেতনার অংশ, কিন্তু এলিজাবেথ ও তাঁর তরুণ রূপ সু (মার্গারেট কোয়ালি) সময়ের সঙ্গে বুঝতে শুরু করেন চিরতরুণ থাকার ব্যয় কত গভীর ও নীরব।

ফারজিয়াত এলিজাবেথ ও সু-কে উপস্থাপন করেন যেন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ও তার সৃষ্ট দানব—যাদের দুঃখ সমানভাবে বোধগম্য। যা একটি পুনর্জন্মের চেষ্টারূপে শুরু হয়, তা খুব দ্রুত এক ভয়াবহ পরিণতিতে মোড় নেয়। The Substance-এ পরিচালক স্পষ্টভাবেই সম্মান জানাচ্ছেন ডেভিড ক্রোনেনবার্গের বডি-হরর ধারাকে (যেমন The Brood), স্টুয়ার্ট গর্ডনের Re-Animator (যেখানে একটি সবুজ পদার্থ দানব তৈরি করে), The Invisible Man, এমনকি ব্রায়ান ডি পালমার Carrie-এর মতো রক্তে ভেজা প্রতিশোধময় নারীর জগতকে। বার্নার্ড হারম্যানের Vertigo থিম হয়তো একটু বেশিই সরাসরি ব্যবহার মনে হতে পারে, কিন্তু সিনেমার আবেশী আবহে তা খাপে খাপে মেলে।

ফারজিয়াতের প্রথম সিনেমা Revenge-এর মতো, এখানে তিনি খুব স্বল্প চরিত্রের ওপর একটি আঁটসাঁট চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। তাঁর পেছনের দলটিও সমান দক্ষ, সিনেমাটোগ্রাফার বেঞ্জামিন ক্রাচুন ‘Revenge’-এর উজ্জ্বল গোলাপি ও নীল রঙকে আরও প্রসারিত করে এক ঝলমলে, বেভারলি হিলস-সুলভ রঙের আড়ালে ঢেকে দিয়েছেন ছবিকে। পোশাক পরিকল্পনায় এম্যানুয়েল ইউচনোভস্কি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ রূপকে চোখধাঁধানো রঙ আর উপকরণে প্রকাশ করেন। আর রাফার্টির সুর যেন এলএ-র ৪০৫ হাইওয়েতে ছুটে চলা এক গাড়ির মতো ছবির গতি বাড়িয়ে তোলে।

The Substance মূলত ভয়াবহতার আবরণে ঢেকে রেখেছে বিনোদন দুনিয়ার তীব্র সমালোচনা—একটি এমন শিল্প, যা মানুষকে যৌবনের প্রতারণামূলক বিকল্প দিয়ে টাকা কামায়। চরিত্র হার্ভির মাধ্যমে যিনি বিকৃত, উঁচু গলায় চিৎকার করেন, আর নারীদের অবমাননার প্রতিমূর্তি ফারজিয়াত ও ক্রাচুন ক্যামেরায় কখনও ফিশ-আই লেন্স, কখনও তাকে আরও বিকৃত করে তুলতে অস্বস্তিকর ক্লোজ-আপ ব্যবহার করেন।

স্ট্যানিসলাস রেইডেল্লেতের প্রোডাকশন ডিজাইনের জন্য যেমন স্টুডিওর অতিরিক্ত লম্বা করিডোর “The Shining”-এর কমলা কার্পেটের রঙে মাখানো, কিংবা ফার্মাসিউটিক্যাল ডিপোর ডিজাইন যেন হুবহু 2001: A Space Odyssey থেকে উঠে আসা, সব মিলিয়ে সিনেমাটির পরিবেশ যেন বাস্তবের থেকে একটু বেশি উজ্জ্বল, একটু বেশি অতিরঞ্জিত।

সু চরিত্রে মার্গারেট কোয়ালি রূপান্তরিত হয়েছেন পাশের বাড়ির হট-গার্লরূপে, নিয়ন পোশাক, লিপগ্লস, ঝুলে পড়া কানে দুল, আর ছেলেদের প্রতি দুর্বলতা। এলিজাবেথের শো-এর তুলনায় সু-র ভিডিওতে বেশি ফোকাস তার শরীরের খুঁটিনাটিতে, যা বাস্তবে কর্পোরেট সমাজ বিক্রি করে যৌবনের মোহে।ডেনিস কুয়েড যেন এমন একজন ভিলেন যার গোঁফ না থাকলেও, তার কণ্ঠস্বর, ঠাটবাট আর হৃদয়হীনতা দিয়ে নারী বিদ্বেষের অঙ্গুলি চিহ্ন।

তবে এই সিনেমাটি আসলে দাঁড়িয়ে আছে ডেমি মুরের হৃদয়ভাঙা অভিনয়ের ওপর। এক নারীর আত্ম-অস্বীকৃতি, সমাজের চোখে তার মূল্যহীনতা আর একটি মিরাকল ওষুধে আসক্তির অসহ্য যন্ত্রণাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা গভীর। একটি দৃশ্যে এলিজাবেথ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরিপাটি মেকআপ আর সাজে নিজেকে প্রস্তুত করেন, কিন্তু তার চোখে ফুটে ওঠে হতাশা। সে নিজের সৌন্দর্য দেখতে পায় না। সে লিপস্টিক মুছে ফেলে, চোখ থেকে টেনে ফেলে কৃত্রিম পাপড়ি। সেই মুহূর্তে তার নিজের প্রতিচ্ছবি তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই চেনা, যখন নিজেকে সাজিয়ে তোলার মাঝে নিজের ত্রুটি খুঁজি, সৌন্দর্যের চাপে নিজেকে হারিয়ে ফেলি। এই গল্প শুধুমাত্র সময়োপযোগী একটি সতর্কবার্তা নয় The Substance আমাদের জানিয়ে দেয়, এই ভয়াবহতাগুলো বহুদিন ধরেই আমাদের সাথে ছিল এবং এই ব্যথা শুধু চামড়ার নিচেই নয় তারও অনেক গভীরে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন