২০২৫ সালের জুলাই মাসে জাপান-ভ্রমণে আগ্রহী হাজার হাজার পর্যটক হঠাৎ সফর বাতিল করতে শুরু করলেন। এয়ারলাইন্স ফ্লাইট বাতিল করল, হোটেল বুকিং হ্রাস পেল। সাধারণের মনে প্রশ্ন, জাপানে কি কোনো বড় বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে?
না, এটির ভিত্তি কোনো বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস নয়। আতঙ্কের উৎস একটি মাঙ্গা ‘The Future I Saw’। এই একটি শিল্পকর্ম কীভাবে একটি দেশের পর্যটন ব্যবস্থা, গণমানসিকতা ও মিডিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে, তার এক গভীর ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ ভাবার মতো।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় Ryo Tatsuki রচিত মাঙ্গা ‘Watashi ga Mita Mirai’ বা ‘The Future I Saw’। Tatsuki নিজেকে লেখক নন, বরং ‘স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার দাবি তিনি ভবিষ্যতের ঘটনা স্বপ্নে দেখেন এবং সেগুলোই ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করেন।
এই মাঙ্গার বিশেষ গুরুত্ব জন্ম নেয় যখন দেখা যায়, এতে ২০১১ সালের টোহোকু ভূমিকম্প ও সুনামি-এর কথা পূর্বেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবের সাথে মিলে যাওয়ার কারণে Tatsuki-র মাঙ্গা এক ধরণের আধা-মিথিক সাংস্কৃতিক সম্মান লাভ করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে মাঙ্গাটির পুনর্মুদ্রণ হয়, এবং সেখানে এগিয়ে আসে নতুন একটি ভবিষ্যদ্বাণী, “A catastrophic event will occur in July 2025!”
মাঙ্গায় কোনো নির্দিষ্ট দিন উল্লেখ ছিল না। কিন্তু পাঠক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা এটিকে ৫ জুলাই ২০২৫ হিসেবে ছড়িয়ে দিতে থাকে। TikTok, YouTube, Reddit ও বিভিন্ন ব্লগে এই তথ্য প্রচারিত হয়। অদ্ভুতভাবে অনেকেই তা বিশ্বাস করতে শুরু করে।এর ফলে Hong Kong Airlines, Greater Bay Airlines-এর মতো সংস্থাগুলো জানায়, তারা হংকং থেকে জাপানগামী জুলাই ও আগস্ট মাসের বহু ফ্লাইট বাতিল করেছে। এক হংকং-ভিত্তিক ট্রাভেল এজেন্সির মতে, “৫০% ক্লায়েন্ট শেষ মুহূর্তে জাপান সফর বাতিল করছেন, বিশ্বাসের ভিত্তি শুধু একটি মাঙ্গা।”
এই ঘটনাটি কেবল গুজব নয়, বরং এক প্রকার সংস্কৃতি-নির্ভর সামাজিক আতঙ্ক (cultural panic)-এর প্রতিচ্ছবি। আতঙ্ক নিজে যেমন সামাজিক শক্তি, তেমনি তা শিল্প ও মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।
এখানে ভয় চারটি স্তরে কাজ করে। পূর্ব-ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা, Tatsuki অতীতে সঠিক বলেছিলেন বলে এবারও তাকে বিশ্বাস করা হয়।জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় জনগণের মধ্যে ভয় সহজেই জন্মায়। মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম এই ভয়কে বারবার পুনরুৎপাদন করে। জাপানসহ পূর্ব এশিয়ার বহু সংস্কৃতিতে ভবিষ্যদ্বাণী ও পূর্বলক্ষণ বিশ্বাসযোগ্য ধরা হয়।
এই আতঙ্ক বাড়তেই লেখিকা Ryo Tatsuki-কে সামনে আসতে হয়। তিনি বলেন, “আমি কোনো ভবিষ্যদ্বক্তা নই, আমি শুধু স্বপ্ন দেখি এবং তা আঁকি। ‘জুলাই ২০২৫’-এ কী হবে, আমি তা জানি না। স্বপ্নের মধ্যে কোনো তারিখ দেখলে তা বাস্তবে ঘটবে এমনটা বিশ্বাস করার যৌক্তিকতা নেই।” তবে এই ব্যাখ্যা আর কতটা কার্যকর তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ একবার যখন একটি কাল্পনিক ভয় বিশ্বাসের জায়গা দখল করে নেয়, তখন তা অনেক বেশি প্রভাব ফেলতে শুরু করে বাস্তব সমাজে।
‘The Future I Saw’ মাঙ্গাটি একাধারে আধুনিক কল্পনার মিথ এবং মিডিয়া-কনস্ট্রাক্টেড বাস্তবতা। এটি দেখায় কিভাবে একটা শিল্পকর্ম, যখন গণবিশ্বাসের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তা বাস্তবের মতোই বাস্তব হয়ে ওঠে। তথ্য ও যুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও, মানুষ কেন একটি মাঙ্গাকে বিশ্বাস করে? কারণ মানুষ শুধুমাত্র তথ্য চায় না, তারা নিরাপত্তার অর্থ, কল্পনার ব্যাখ্যা এবং সামষ্টিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিও খোঁজে। এমনকি ভয়ও যখন সম্মিলিত হয়, তখন তা এক ধরণের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান তৈরি করে।


