প্রশ্ন: আপনি তো সান ফ্রান্সিসকোতে “আকিরা কুরোসাওয়া আজীবন সম্মাননা পুরস্কার” নিতে এসেছেন। কুরোসাওয়ার ছবিগুলোর সঙ্গে আপনার কি বিশেষ কোনো আত্মিক টান আছে?
উত্তর: না, সরাসরি কোনো আত্মিক টান নেই। তবে আমার মনে হয়, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যিনি হয়তো এক ধরনের ধারায় কাজ করেন, অন্য একদম ভিন্ন ধাঁচের নির্মাতার কাজ থেকেও আনন্দ নিতে পারেন। যেমন, আমি “দ্য গডফাদার” সিনেমাটি সত্যিই খুব পছন্দ করি এবং এটা বললে অনেকেই অবাক হন। তারা বলেন, “আপনি যেরকম সিনেমা বানান, আপনি কিভাবে এমন একটা সিনেমা পছন্দ করতে পারেন?” কিন্তু এটাই তো সিনেমার সৌন্দর্য! [হাসি]
প্রশ্ন: আপনার ছবিগুলোতে অনেক সময়ই চরিত্র বা গল্পের সব কিছু স্পষ্টভাবে বলা থাকে না। আপনি নিজেই বলেছেন, দর্শক যেন নিজের মতো করে ছবিটা শেষ করে নেয়। কিন্তু একদিকে আপনি বলছেন সবাই একইরকম মানুষ, অন্যদিকে বলছেন সবাই যেন ভিন্নভাবে বুঝে। এই দ্বৈততা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
উত্তর: এটা সত্যিই কঠিন প্রশ্ন। হ্যাঁ, মানুষ আলাদা এবং আমি চাই না যে সবাই সিনেমা দেখে একদম একইভাবে সেটাকে বুঝে ফেলুক। একটা ক্রসওয়ার্ড পাজল যেমন সবাই ঠিকঠাক একইভাবে পূরণ করে সেটা আমার উদ্দেশ্য নয়। কেউ যদি ভুল বুঝেও ছবিটা শেষ করে, তাও সেটা সঠিক, কারণ সেটাই তার নিজের উপলব্ধি। আমি ছবিতে ফাঁকা জায়গা রাখি যেন দর্শক নিজের চিন্তা আর অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটা পূরণ করতে পারে। আমার মতে কবিতা, সংগীত বা ভাস্কর্যের মতো বিমূর্ততা সিনেমাতেও আসা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যমে আটকে গেছে, শিল্পের জায়গা থেকে দূরে সরে গেছে।
প্রশ্ন: কেউ কেউ সত্যিই বিমূর্ত সিনেমা বানান যেখানে গল্প নেই, শুধু রঙ, গতি, আবেগ। আপনাকে কি সেসব টানে?
উত্তর: প্রতিটি ছবিতে কিছু না কিছু গল্প থাকা উচিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই গল্পটা কীভাবে বলা হচ্ছে। আমি চাই গল্পটা যেন কবিতার মতো হয়, দর্শকের চোখে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ তৈরি করে। কিছু ছবি আমাকে পুরোপুরি আকর্ষণ করে না, তবুও মাঝখানে এমন একটা মুহূর্ত থাকে, যা আমার কল্পনায় একটা জানালা খুলে দেয়। অনেক সময় মাঝপথেই সিনেমা ছেড়ে বের হয়ে এসেছি, কারণ মনে হয়েছে, আমি ছবির শেষটা নিজের মতো বুঝে ফেলেছি। এরপর যদি বসে থাকি, তাহলে সে অনুভূতিটা নষ্ট হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: আপনি আসলে একজন কবির মতো কাজ করেন। আপনার ছবির নাম তো “The Wind Will Carry Us”—এটা তো কবিতার লাইন এবং ছবিতেও কবিতার অংশ আছে। আপনি কি সিনেমাকে উপন্যাসের চেয়ে বেশি কবিতার দিকে নিয়ে যেতে চাইছেন?
উত্তর: অবশ্যই। আমি বিশ্বাস করি, টিকে থাকার দিক থেকে কবিতার সিনেমাই বেশি সময় ধরে বাঁচবে, গল্প বলা সিনেমা নয়। আমার বাসার উপন্যাসের বইগুলো প্রায় নতুনই আছে, একবার পড়েই রেখে দিয়েছি। কিন্তু কবিতার বইগুলো ছেঁড়াফাঁড়া হয়ে গেছে কারণ আমি বারবার সেগুলো পড়ি। কবিতা সবসময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে, বারবার নতুন অর্থ বের হয়। উপন্যাস একবার পড়লে আপনি জেনে ফেলেন কী হয়েছে, কিন্তু কবিতা প্রতিবার নতুন কিছু দেয়।
প্রশ্ন: কিন্তু মানুষ তো সাধারণত সিনেমা একবার-দুইবার দেখেই শেষ করে। আপনি কি আশা করেন মানুষ আপনার ছবি বারবার দেখবে?
উত্তর: না, এটা বলা স্বার্থপরতা হবে। আমি সিনেমা বানানোর সময় ভাবি না কে ক’বার দেখবে। আমি যা জানি, সেইভাবে বানাই। তারপর ফলাফল মেনে নিই, সেটা সুখকর হোক বা না হোক। তবে আমি জানি, অনেক দর্শক ছবি দেখে হয়তো সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হবে না, কিন্তু সেটা তারা ভুলতেও পারবে না। ডিনারের সময় তারা এ নিয়ে কথা বলবে। আমি চাই দর্শকের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হোক, তারা ভাবুক ছবিটা নিয়ে।
প্রশ্ন: স্কুলে আমরা যেসব কবিতা মুখস্থ করতাম, সেগুলো আসলে ভাবনার দরজা খুলত না বরং ভেতরটা বন্ধ করে দিত। আপনার সিনেমা তো উল্টোভাবে কাজ করে।
উত্তর: একদম ঠিক বলেছেন। কবিতার সিনেমা হচ্ছে এমন এক ধাঁধা যেখানে টুকরোগুলো আপনি নিজের মতো সাজাতে পারেন। শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত ফলাফল নেই, কোনো উপদেশও নেই।
প্রশ্ন: আর কোন নির্মাতাদের আপনি আপনার ধরণের ভাবনার কাছাকাছি মনে করেন?
উত্তর: হৌ শিয়াও শিয়েন একজন। তর্কোভস্কির ছবি আমাকে বাস্তব জীবন থেকে পুরো আলাদা করে দেয় সবচেয়ে আধ্যাত্মিক মনে হয়। ফেলিনির ছবিতেও যেমন স্বপ্নের জগৎ আসে, তর্কোভস্কির ছবিতে সেটা পুরোটাই আছে। থিও অ্যাঞ্জেলোপুলাসের ছবিগুলোতেও কিছু মুহূর্তে সেই আধ্যাত্মিকতা আসে। আমার বিশ্বাস, সিনেমা ও শিল্প আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাইরের কোথাও নিয়ে যেতে পারে যদিও শুরুটা সেখান থেকেই হয়। এটাই আমাদের শান্তি দেয়।
প্রশ্ন: “Taste of Cherry” ছবির নায়ক তো পুরোপুরি জীবন থেকে মুক্তি চাইছিলেন। একে মানসিক সমস্যা বলা যায় না। বরং এটা আবারও সেই ভৌত ও আত্মিক দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে।
উত্তর: হ্যাঁ, দর্শকরা এ নিয়ে নানা মত দেয়। আত্মহত্যা ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ, কিন্তু অনেক ধার্মিক মানুষ ছবিটা ভালোবেসেছে। তারা বলেছে, এটা আত্মহত্যা নয়, এটা স্বর্গে যাওয়ার খোঁজ। ছবির শেষ দিকে চেরি ফুল আর প্রকৃতির দৃশ্য সেই বার্তাই দেয় সে একটা শান্তিময় জায়গায় পৌঁছেছে।
প্রশ্ন: ছবিটা কি সেন্সরের সমস্যা পড়েছিল?
উত্তর: কিছু বিতর্ক হয়েছিল। তবে আমি তাদের বোঝাতে পেরেছিলাম, ছবিটা আত্মহত্যা নিয়ে না, জীবনের শেষ করার “সক্ষমতা” নিয়ে। সেই সক্ষমতাই ঈশ্বরের দয়া। ঈশ্বর আমাদের এই দরজা দিয়েছেন, আমরা নিজেরা বেছে নেই জীবনে থাকা। একটা দার্শনিকের কথা আমাকে সাহায্য করেছিল: “আত্মহত্যার সম্ভাবনা না থাকলে, আমি অনেক আগেই নিজেকে মেরে ফেলতাম।” ছবির মূল বার্তা হলো জীবনকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা।
প্রশ্ন: আপনি তো সম্পূর্ণ স্ক্রিপ্ট ছাড়াই কাজ করেন, চরিত্র আর সংলাপ তৈরি হয় শুটিংয়ের সময়। কেন?
উত্তর: এটা করতে হয়েছে কারণ আমি অপেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে কাজ করি। যখন একটা দৃশ্য বুঝিয়ে দিই, তারা এমনভাবে কথা বলে, যা আমি ভাবিইনি। এটা একটা চক্রের মতো, আমি জানি না আমি তাদের শেখাই, না তারা আমাকে। অনেক সময় দর্শকদের মতো আমিও অবাক হয়ে যাই।


