QAnon ও ট্রাম্পের পুনরাবৃত্তি ! ‘দ্য স্টর্ম’ কি বাস্তবে রূপ নেবে!

QAnon হলো আমেরিকান রাজনীতির একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। যারা বিশ্বাস করে বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, হলিউড তারকা এবং ধনীদের নিয়ে গঠিত একটি গোপন এলিট গোষ্ঠী রয়েছে। অনুসারীদের মতে এই গোষ্ঠী শিশু পাচার, রিচুয়াল শয়তানপূজা এবং বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্র করছে। তাদের বিশ্বাস, ডোনাল্ড ট্রাম্প এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন এবং একসময় “The Storm” বা “Great Awakening” নামে এক বিপ্লব আসবে যেখানে এই এলিটদের ধ্বংস করা হবে। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে 4chan নামক অজ্ঞাত ফোরামে “Q” নামের একজন ব্যবহারকারী পোস্ট করতে শুরু করে। এই ব্যবহারকারী দাবি করেন যে তিনি মার্কিন সরকারের গোপন তথ্য জানা এমন একজন ব্যক্তি যার “Q-level security clearance” রয়েছে। এর মানে হলো মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের এক ধরনের উচ্চ নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনুমোদন।

এই পোস্টগুলো একরকম সাংকেতিক ভাষায় এবং অস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীমূলক বার্তা বহন করত। যেগুলো অনুসারীরা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করত। পরে এই পোস্টগুলো 8chan নামের প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত করা হয় এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। QAnon ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যে শিশুদের রক্ত ও মাংস ভক্ষণ সম্পর্কিত গুজবও অন্তর্ভুক্ত ছিল। QAnon অনুসারীরা বিশ্বাস করে গোপন এলিট গোষ্ঠী শুধু শিশু পাচারই নয়, বরং তাদের হত্যা করে “adrenochrome” সংগ্রহ করে, যা তারা চিরযৌবন ধরে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়। কিছু চরমপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্বে এমনও দাবি করা হয়েছে যে এই এলিটরা শিশুদের মাংস খায় বা রিচুয়াল শয়তানপূজার অংশ হিসেবে কুরবানির মতো কর্মকাণ্ড করে।

গুজবের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হিলারি ক্লিনটন ও কিছু ডেমোক্র্যাট নেতা, বারাক ওবামা, ধনকুবের ও ফিলানথ্রপিস্ট জর্জ সোরোস, হলিউড তারকা টম হ্যাঙ্কস ও উইনফ্রে এর নামও ছড়িয়ে পড়েছিলো।QAnon অনুসারীরা মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই এলিটদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এবং একসময় “The Storm” নামে এক বিপ্লব আসবে যেখানে সেনাবাহিনী এসে এই ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেফতার করবে এবং তাদের বিচার করা হবে।যদিও ট্রাম্প কখনো সরাসরি QAnon সমর্থন করে কিছু বলেননি। তবে তিনি কয়েকবার তাদের তত্ত্বগুলোর প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের সামনে “The Storm” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন যেটা QAnon অনুসারীদের মধ্যে আবেগময় উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিলো।

২০১৬ সালে জন পোডেস্তার ইমেইল হ্যাক হওয়ার পর কিছু সাংকেতিক শব্দ পাওয়া যায় যেগুলো শিশু পাচারের ইঙ্গিত বহন করে বলে দাবি করা হয়। কিছু অনুসারীদের মতে ওয়াশিংটনের Comet Ping Pong নামের একটি পিৎজা রেস্তোরাঁ শিশু পাচার চক্রের কেন্দ্রস্থল ছিল। যদিও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই গুজবের ফলে সেখানে হামলা চালানো হয়।QAnon মূলত ছড়িয়ে পড়ে Facebook, Twitter, YouTube এবং Reddit-এর মাধ্যমে।Facebook এ হাজার হাজার গ্রুপ ও পেজ গড়ে ওঠে যেখানে লক্ষাধিক অনুসারী সরাসরি এ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করত। ইউটিউবেও QAnon ভিত্তিক ভিডিও ভাইরাল হতে শুরু করে। টুইটারে #WWG1WGA (“Where We Go One, We Go All”) নামে একটি হ্যাশট্যাগ জনপ্রিয় হয়।

২০২০ সালের পর থেকে ফেসবুক, টুইটার এবং ইউটিউব QAnon সম্পর্কিত কনটেন্ট ব্যান করতে শুরু করে। তবে এর পরপরই Parler, Gab-এর মতো বিকল্প প্ল্যাটফর্মে এটি ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাপিটল হিল হামলায় QAnon-এর ভূমিকা ছিলো বলে দাবী করা হয়। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের অনুসারীরা মার্কিন ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ে হামলা চালায়। “Q Shaman” নামে পরিচিত Jacob Chansley এই আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। QAnon অনুসারীরা ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। টাইমস স্কয়ারে এক ব্যক্তির বোমা হামলার পরিকল্পনা ধরা পড়ে। তাদের বিশ্বাস ছিলো এটি এলিটদের আস্তানা। ২০১৯ সালে এক মার্কিন ব্যক্তি তার পরিবারকে সবাইকে “deep state”-এর সদস্য মনে করে হত্যা করেন।

আরো গুজব উঠে যে COVID-19 “deep state”-এর পরিকল্পিত কৌশল। ভ্যাকসিনের মাধ্যমে জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এবং বিল গেটস ও ড. ফাউচি এই ষড়যন্ত্রের মূল পরিকল্পনাকারী।সেসময় FBI এটিকে “Domestic Terror Threat” হিসেবে ঘোষণা করে ও মার্কিন সরকার QAnon-কে সন্ত্রাসবাদী আদর্শের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে। আলোচকদের ধারণা এটি COVID, রাজনীতি এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে শক্তিশালী হয়েছিল। তবে এরপরে সোশ্যাল মিডিয়ার বিধিনিষেধের ফলে কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

২০২১ সালে ট্রাম্পের পরাজয়ের পর অনেক QAnon অনুসারী হতাশ হয়ে পড়ে। তবে কিছু অনুসারী তখনো বিশ্বাস করতো ট্রাম্প আবার ফিরে এসে এলিটদের ধ্বংস করবেন। তাদের “The Storm” বিলম্বিত হলেও শিগগিরই ঘটতে পারে!২০২৫ সালে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে! তাহলে এখন QAnon অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া কী! তাদের দীর্ঘকালীন বিশ্বাসে কি কোন ধরনের পরিবর্তন এসেছে? এ পরিস্থিতিতে QAnon অনুসারীরা নতুনভাবে কী ধরনের কর্মকাণ্ড বা পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা ভাবছে তা নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠতে পারে। যদি তারা এখনও বিশ্বাস করে ট্রাম্প ভিন্ন এক ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ায় নতুন পৃথিবী গড়বেন! তবে সেই বিশ্বাস কি আবারও তাদের কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করবে? প্রশ্ন থেকে যায়!

সেসময় FBI এটিকে “Domestic Terror Threat” হিসেবে ঘোষণা করে ও মার্কিন সরকার QAnon-কে সন্ত্রাসবাদী আদর্শের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করে আলোচকদের ধারণা এটি COVID, রাজনীতি এবং সামাজিক বিভাজনের কারণে শক্তিশালী হয়েছিল। তবে এরপরে সোশ্যাল মিডিয়ার বিধিনিষেধের ফলে কিছুটা দুর্বল হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন