গাজা ও আশপাশের অঞ্চলে চলমান ইসরায়েলি অভিযান কেবল ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, ইসরায়েলের নিজ সেনাদের জন্যও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গত ২৩ মাসে ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ২০ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছেন, যার মধ্যে শারীরিক ও মানসিক রোগে ভুগছেন অনেকেই। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুনর্বাসন দপ্তর সম্প্রতি এই বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।
দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আহত সেনাদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (PTSD) এবং অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগছেন।শারীরিক আঘাত পেয়েছেন মোট আহত সেনাদের ৪৫ শতাংশ, আর একইসঙ্গে ২০ শতাংশ সেনা শারীরিক ও মানসিক দুটো সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন।এছাড়া ২০ হাজার আহতের মধ্যে ৬৪ শতাংশই রিজার্ভ সেনা। প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার আহত সেনা পুনর্বাসন দপ্তরের চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন, তবে আগের যুদ্ধ থেকে আহত সেনাদের অনুরোধও অন্তত ৬০০টি প্রতিমাসে আসছে।
মোট ৮১,৭০০ সেনা পুনর্বাসন সেবা গ্রহণ করছেন। এর মধ্যে ৩৮ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে এই সংখ্যা এক লাখ ছাড়াবে এবং তার অন্তত অর্ধেক PTSD ও অন্যান্য মানসিক রোগে ভুগবেন।
পুনর্বাসন দপ্তরের বার্ষিক বাজেট প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৫০ শতাংশ মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ। তবে থেরাপিস্টের অভাব এবং কর্মী সংকট সমস্যাকে জটিল করেছে। বর্তমানে প্রতি ৭৫০ জন রোগীর জন্য মাত্র একজন পুনর্বাসন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন।
পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামীর যুদ্ধ ও নতুন সংঘর্ষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আহত সেনাদের সংখ্যা বাড়বে। মানসিক রোগের চিকিৎসা দিতে বিশেষজ্ঞদের উপর চাপ বাড়বে এবং আত্মহত্যার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাটজ ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মৎরিচ একটি সরকারি কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির নেতৃত্বে আছেন লেমিত হেলথ সার্ভিসেসের চেয়ারম্যান ড. শ্লোমো মোর-ইয়োসেফ।
কমিটি আহত সেনাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া উন্নয়নের জন্য সুপারিশ প্রদান করবেন। এতে থাকবে আহত সাবেক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনাদের স্বীকৃতি দেওয়া, শারীরিক-মানসিক চিকিৎসার মধ্যে সমন্বয়, পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ সেনাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান, হতাহত সেনাদের পরিবারের জন্য সহায়তা এবং পুনর্বাসন দপ্তরের বাজেট ও মানবসম্পদ বরাদ্দ।
টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজার অভিযানে মোট ৯০৪ সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩২৯ জন ৭ অক্টোবর নিহত হন এবং পরবর্তী স্থল অভিযানে ৪৬০ জন মারা যান। এছাড়া হিজবুল্লাহ, লেবানন, ইরাক ও ইরানের হামলায় আরও ৮৩ জন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলে নিজের সহকর্মীদের হাতে ২২ জন সেনা নিহত হয়েছেন।
এই তথ্য ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধের প্রভাব শুধুমাত্র শারীরিক নয়, মানসিক ক্ষেত্রেও গভীর। PTSD ও অন্যান্য মানসিক রোগের সঙ্গে লড়াই করা সেনাদের জন্য পর্যাপ্ত পুনর্বাসন ব্যবস্থা না থাকা দেশের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
ইসরায়েলি অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সেবা দ্রুত সম্প্রসারণ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার উন্নতি ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। যুদ্ধ চলাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে অগ্রাধিকার না দিলে সেনাদের মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বৃদ্ধি পাবে।


