সম্ভবত আপনি পেড্রো কোস্টার সিনেমা দেখেননি, না দেখতে পারারও নানা কারণ আছে, কোস্টার চলচ্চিত্রগুলি শুরুতে সাধারণত কল্পকাহিনী মনে হলেও, এক ধরনের স্বপ্নের মতো। যেখানে ডকুমেন্টারি এবং কল্পনা একে অপরের সাথে মিশে যায়। পর্তুগীজ চলচ্চিত্র নির্মাতা পেড্রো কোস্টা একই সাথে কাব্যিক এবং বাস্তবতার সংমিশ্রনে সিনেমা তৈরি করে নিজস্ব জগত প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিখ্যাত। তার কাজ সিনেমা জগতের প্রথাগত সৃজনশীলতাকে অস্বীকার করে। যেখানে নিঃসঙ্গ ও বঞ্চিত মানুষের গল্প এবং লিসবনের দরিদ্র এলাকায় শহুরে জীবনের নৃশংস ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। কোস্টার চলচ্চিত্রগুলি সাধারণ কল্পকাহিনী নয়, এক ধরনের স্বপ্নের মতো। যেখানে ডকুমেন্টারি এবং কল্পনা একে অপরের সাথে মিশে যায়।
কোস্টার Horse Money (২০১৪) তার একক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শৈলীর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। চলচ্চিত্রটি লিসবনের কেপ ভার্ডীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের ৭০ বছর বয়সী পুরুষ ভেনচারকে কেন্দ্র করে নির্মিত, যিনি পুনরায় তার জীবন ও অতীতের শোক স্মরণ করেন। ভেনচার একজন সাবেক নির্মাণ শ্রমিক এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি, যিনি ১৯৭৫ সালে এক ট্রমাটিক ছুরি হামলায় আহত হয়ে স্কিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত হন। সিনেমার কাহিনীটি ভেনচারের রাতের ঘুরাঘুরি এবং হাসপাতালের অদ্ভুত করিডরে চলতে থাকে, যেখানে তিনি তার জীবনের বিভিন্ন কঠিন ঘটনা স্মরণ করেন। তাদের কথাগুলো প্রায়শই এক ধরনের রহস্যের ভেতরে বলা হয়, যেগুলো সম্পূর্ণরূপে অভিনেতাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং জীবনকে তুলে ধরে।
Horse Money চলচ্চিত্রের শিরোনামটি একটি রেসের থ্রিলার মনে হতে পারে, কিন্তু পর্তুগিজ মূল শিরোনাম Cavalo Dinheiro এর সঠিক অনুবাদ হবে “A Horse Named Money”, যা ভেনচারের সেই ঘোড়ার কথা বলে, যে ঘোড়া তিনি কেপ ভার্ডে তার তরুণ বয়সে পোষতেন। এই চলচ্চিত্রটি তার স্মৃতি, স্বপ্ন এবং তার অতীত ও পর্তুগালের রাজনৈতিক উথালপাথাল দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত জীবনের অনুসন্ধান করে। চলচ্চিত্রের কাহিনী পর্তুগালের ১৯৭৪ সালের কার্নেশন বিপ্লবের সাথে সম্পর্কিত, যা দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটায়, কিন্তু অভিবাসীদের জন্য, বিশেষত ভেনচারের মতো মানুষের জন্য এটি একটি গভীর ট্রমার জন্ম দেয়, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের কাউন্টার-কুপের পর। আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে Horse Money মিনি-উঠ ক্যামেরা দিয়ে শুট করা হয়েছিল মাত্র তিন বা চার জনের একটি ছোট দলের সাথে।
কোস্টার এর আগের চলচ্চিত্র Colossal Youth (২০০৬) ও কেপ ভার্ডীয় অভিবাসী সম্প্রদায়ের জীবন নিয়ে নির্মিত ছজখ। বিশেষ করে লিসবনের ফন্টাইনহাস নামে এক বস্তিতে, সেটি যখন ভাঙা হচ্ছিল। এই সিনেমায় ভেনচার আবারও তার সম্প্রদায়ের স্মৃতির সংগ্রাহক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, আর Horse Money এ তার অতীত ও জীবনের গল্প আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। In Vanda’s Room (২০০০) চলচ্চিত্রটিতেও কোস্টা তার ঘনিষ্ঠ পদ্ধতির পরিচয় দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি এক বছরের জন্য এক হেরোইন আসক্তের জীবন অনুসরণ করেছিলেন, কেবল নিজস্ব ক্যামেরা নিয়ে।
সামথিং লাস্ট (২০১৭) কোস্তার নতুন অধ্যায়, যেখানে তিনি আরও বৃহত্তর দৃষ্টিতে সামাজিক সংঘাত ও অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে কাজ করেছেন। এই সিনেমায় চরিত্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ককে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে। একটি নিরব নিদান বা মনের অন্ধকার দিক এখানে প্রকাশিত হয়, যা কোস্তার সিনেমার ধারাবাহিকতা এবং তাঁর দর্শনীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। কোস্টার চলচ্চিত্রগুলির রাজনৈতিক প্রেক্ষিতও স্পষ্ট। Horse Money এ ১৯৭৪ সালের কার্নেশন বিপ্লবের পরের রাজনৈতিক সঙ্কটকে একটি গভীরভাবে দেখানো হয়েছে। যেখানে অভিবাসীদের প্রতি পর্তুগালের আচরণ চিত্রিত হয়েছে। কোস্টা অবশ্য সিনেমা তৈরির পদ্ধতিতে একেবারে নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি আনতে চান সবসময়, যেখানে বাহ্যিক সাজসজ্জা এবং হট্টগোল ছাড়াই মানুষের জীবনের অন্তর্গত সৌন্দর্য ও দুঃখ তুলে ধরা হয়। কোস্টার চলচ্চিত্রগুলির প্রতি তার প্রতিশ্রুতি এবং তাদের যে চিত্র উপস্থাপন করেছে তা পর্তুগালের ক্ষমতাহীন জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচিত।


