“এই উৎসবের মৌসুমে যখন সমালোচকেরা একের পর এক ‘হট টেক’ দিচ্ছেন, তখন “আপনি এরকম সিনেমা আগে কখনো দেখেননি” এই কথাটা যেন এতটাই ক্লিশে হয়ে গেছে যে এখন আর কেউ সিরিয়াসলি নেয় না। এখন যেকোনো নতুন বড় বাজেটের সিনেমাকে “মাস্টারপিস” (অমর সৃষ্টি) বলা হয়, যেন খুব সহজ একটা বিশেষণ। কিন্তু আসলেই যদি এমন কোনো সিনেমা সামনে আসে যা অপ্রত্যাশিত, অসাধারণ ও দারুণভাবে নতুন কিছু বলছে, তখন আমরা সেটা বোঝাতে কী ভাষা ব্যবহার করব? আর যদি সত্যিকার অর্থে একটা “মাস্টারপিস” এসে পড়ে, একটা এমন চলচ্চিত্র যার প্রতিটি বাঁক চমকপ্রদ এবং যেটা নিয়ে গভীর লেখা তখনই সম্ভব হবে যখন স্পয়লার দেওয়ার ভয় থাকবে না, তখন কী করা উচিত?
আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, কারণ বং জুন-হোর “Parasite” নিঃসন্দেহে বছরের সেরা চলচ্চিত্রগুলোর একটি। শুধু আমার কথাটা বিশ্বাস করুন।Bong Joon-ho এর আগেও শ্রেণিগত বৈষম্য নিয়ে ছবি বানিয়েছেন, যেমন “Snowpiercer” কিংবা “Okja”। তবে “Parasite” সম্ভবত তার সবচেয়ে সাহসী প্রচেষ্টা, যেখানে সে বর্তমান বিশ্বের কাঠামোগত বৈষম্যকে সরাসরি ও তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরেছেন। এটি একধরনের টোনাল জাগলিং, প্রথমে মনে হবে ব্যঙ্গচিত্র বা রসবোধসম্পন্ন সামাজিক নাটক; কিছু মজার ও চতুর প্রতারক চরিত্র ধাক্কা খাচ্ছে এক ধনী, অদ্ভুত পরিবারের সঙ্গে।
কিন্তু এরপর হঠাৎ করেই বং আমাদের এমন এক মোড় ঘুরিয়ে দেন যেখানে প্রশ্ন উঠে, “আসলে আমরা কী দেখছি?” এবং সেখান থেকে গল্প রক্তপাতের দিকে গড়ায়। গরিবেরা কি সত্যিই ধনীদের জগতে প্রবেশ করতে পারে? সিনেমার দ্বিতীয়ার্ধ যেন এক নিঃশ্বাসে টানা দেখা এক দুঃসাহসী অভিযাত্রা। কোথাও কোথাও মনে হতে পারে সিনেমাটি হয়তো ভেঙে পড়বে, অতিরিক্ত মোচড়ে হারিয়ে ফেলবে নিজেকে, কিন্তু বং সুনিপুণ দক্ষতায় সবকিছু এক সুতোয় বেঁধে রাখেন। আর ফলাফল? শ্বাসরুদ্ধকর!
কিম কি-উ ও তার পরিবার দারিদ্র্যের চরম কিনারায় বাস করে। তারা পিজার বাক্স ভাঁজ করে কিছু টাকা রোজগার করে, পাশের ক্যাফের ওয়াই-ফাই চুরি করে ইন্টারনেট চালায়, আর প্রতিবেশীদের জন্য ফগিং চললে জানালা খুলে রাখে, যাতে নিজের ঘরটাও ফ্রীতে কীটনাশক পায়।
কিম কি-উ’র জীবন বদলে যায় যখন তার এক বন্ধু তাকে একটি ইংরেজি টিউটরের কাজ অফার করে। বন্ধুটি বিদেশে যাচ্ছে, আর সে চায় না অন্য কেউ এসে তার পছন্দের মেয়েটিকে হাতিয়ে নিক। প্রশ্ন ওঠে, সে কেন কি-উকে এতটা বিশ্বাস করে, যদিও আমরা জানি এবং জানতে পারি সে আসলে কেমন।
কি-উ নিজের নাম বদলে “কেভিন” হয়ে যায় এবং শিক্ষক হিসেবে ঢুকে পড়ে পার্ক পরিবারে। মেয়েটি, পার্ক দা-হিয়ে (জং জি-সো), তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। কিন্তু কেভিনের লক্ষ্য আরও বড়। সে ধীরে ধীরে তার পুরো পরিবারকে পার্কদের বাড়িতে ঢোকাতে চায়। সে পার্কদের মা ইয়ন-কিয়ো-কে (যিনি অসাধারণ অভিনয় করেছেন) বোঝায় যে বাড়ির ছেলের একজন ‘আর্ট টিচার’ দরকার, আর সেই সুবাদে তার বোন ‘জেসিকা’ (পার্ক সো-দাম) চরিত্রে প্রবেশ করে। অল্প সময়ের মধ্যেই বাবা-মাও ঢুকে পড়ে পার্কদের ঘরে। সবকিছু যেন নিখুঁতভাবে চলছে কিম পরিবারের জন্য। পার্করাও খুশি মনে হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় রূপান্তর।
“Parasite”-এর চিত্রনাট্য অবশ্যই অনেক প্রশংসা পাবে, কারণ এর টুইস্ট এবং টার্নগুলো অত্যন্ত চতুরভাবে লেখা। বং এবং হান জিন-ওন একসাথে এই চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন। কিন্তু এই চলচ্চিত্রকে শুধু চিত্রনাট্যের মাধ্যমে বোঝা যাবে না, এটি মূলত ভিজ্যুয়াল ভাষার এক বিস্ময়কর প্রয়োগ।সিনেমাটোগ্রাফার কিয়ং-পিও হং (“Burning,” “Snowpiercer”) ও সেরা ডিজাইন টিমের সহায়তায় প্রতিটি দৃশ্য হয়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন ও অর্থবহ।পার্কদের পরিষ্কার, শূন্য ও আধুনিক ঘরবাড়ির বিপরীতে কিম পরিবারের সংকীর্ণ, স্যাঁতসেঁতে বাসস্থান শুধু প্রতীকী নয়, চোখের আরামও বটে্ কিন্তু সেটা কখনও খুব জোরে দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। আর কিমদের বাসা যেহেতু আধা-ভূগর্ভস্থ, সেটা যেন তাদের অবস্থানকেই চিহ্নিত করে। তারা না পুরোপুরি নিচে, না পুরোপুরি ওপরে, আটকে আছে ধনী-গরিবের মধ্যে বিস্তৃত ফাঁকে।
“Parasite” শুধুই এক চমৎকার গল্প নয়, এর নিচে আছে গভীর সব রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ। কীভাবে ধনীরা দরিদ্রদের শ্রমের উপর নির্ভর করে টিকে থাকে, হোক সেটা গৃহপরিচারিকা, গাড়িচালক, বা শিক্ষকের রূপে, কিংবা আরও অন্ধকার কোনো বাস্তবতায়, তা এখানে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। কিম পরিবার সেটা ভবিষ্যতের অপ্রত্যাশিত নিষ্ঠুরতায় নিজে গায়ের চামড়ায় টের পায়।
তবে এ চলচ্চিত্র কখনোই একরৈখিক বার্তা-বহনকারী সিনেমা হয়ে ওঠে না। বরং এর ভেতরেই আছে একধরনের আনন্দ, আর সেই আনন্দটাই আবার দুঃখের ছায়া ফেলে। আমি নিজেও জানি না ঠিক কীভাবে এটা সম্ভব, কিন্তু “Parasite” এমন এক নিখুঁতভাবে গাঁথা কাজ যেখানে প্রতিটি দৃশ্য উপভোগ্য, আর সেই আনন্দে ভেসে যাওয়ার পরেও মাথায় ঘুরতে থাকে বং জুন-হোর বলার বিষয়গুলো। বিশেষ করে শেষ কয়েকটি দৃশ্য যেগুলো হৃদয় বিদারক এবং দীর্ঘকাল ধরে আপনার মনে গেঁথে থাকবে।
এই সিনেমা নিঃসন্দেহে বছরজুড়ে আলোচনার জন্ম দেবে। আর আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেবে যে বং জুন-হো বিশ্বের অন্যতম সেরা নির্মাতা।আপনি কখনও এমন কোনো সিনেমা দেখেননি। আচ্ছা… এবার আমি নিজেই সেই ক্লিশে কথাটা বলে ফেললাম। কিন্তু এবার সেটা সত্যি।
– Brian Tallerico
Managing Editor of RogerEbert.com


