গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ১৯৬৭ সালের মহাকাব্যিক উপন্যাস Cien Años de Soledad (One Hundred Years of Solitude) লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের একটি মাইলফলক। এক প্রকারে আমেরিকান সাহিত্যে Moby Dick যেমন। এই উপন্যাসটির জন্য মার্কেস ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান এবং এটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যকর্মগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
আমি প্রথম এই উপন্যাস পড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাও আবার স্প্যানিশ ভাষায়। যেভাবে এটি জাদুবাস্তবতাকে সাহিত্যে এনে দিয়েছে, কলম্বিয়ার ইতিহাসকে কাল্পনিক শহর ম্যাকোন্ডোর মাধ্যমে রূপকভাবে তুলে ধরেছে, আর বুয়েন্দিয়া পরিবারের সাত প্রজন্মের মধ্য দিয়ে সময়ের পরিবর্তন দেখিয়েছে,আমি মুগ্ধ হয়ে যাই ।
তাই যখন নেটফ্লিক্স ঘোষণা করলো তারা উপন্যাসটি টেলিভিশনে রূপ দিতে যাচ্ছে, তখন আমার মধ্যে একধরনের সতর্ক আশাবাদ কাজ করছিল। এই উপন্যাসকে পর্দায় রূপ দেওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে এর বিশাল সময়সীমা এবং প্রচুর বিশেষ প্রভাব দরকার এমন দৃশ্যের জন্য। সৌভাগ্যবশত নেটফ্লিক্স যে প্ল্যাটফর্ম একসময় Selena সিরিজের গল্প বলায় কৃপণতা করেছিল, তারা One Hundred Years of Solitude-এর জন্য অনেক বড় বাজেটই খরচ করেছে বলে মনে হচ্ছে।
জাদুবাস্তবতা পর্দায় উপস্থাপন করা কঠিন হলেও এখানে তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা হয়েছে, অলৌকিক ঘটনাগুলো দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে, যেন ম্যাকোন্ডো এক রহস্যময়, কামনা-বাসনা ও হতাশায় পূর্ণ জীবন্ত শহর।
প্রথম সিজনে আটটি এক ঘণ্টার এপিসোড আছে, যা বইয়ের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ কভার করে, একশো বছরের গল্প বলে দিতেই সময় লাগে। অবশ্যই কোথাও কোথাও গল্প টেনে লম্বা করার প্রবণতা আছে, কিছু কিছু দৃশ্য মাঝপথে মন্থর লাগে।
আর কিছু চরিত্র, বিশেষ করে মাতৃপতি উরসুলা ইগুয়ারান (যুবা চরিত্রে সাসানা মোরালেস এবং প্রবীণ চরিত্রে মার্লেইদা সোতো রিওস) এবং পিতৃপতি হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া (মার্কো গনসালেস ও দিয়েগো ভাসকেস), বাস্তব মানুষের চেয়ে বেশি যেন প্রতীক বা ধাঁচ বলে মনে হয়। তবু সামগ্রিকভাবে নেটফ্লিক্সের ম্যাকোন্ডো দৃষ্টিনন্দন এবং গভীর।
পোশাক নিখুঁত, সেট নির্মাণ অতুলনীয়, আর ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট মনোমুগ্ধকর। ভূকম্পন ঘটানো জীব থেকে শুরু করে ভূত কিংবা ঘুমহীনতার মহামারী সবকিছুই চোখ ধাঁধানোভাবে ফুটে উঠেছে। এই প্রযোজনাটি দর্শকদের এমন এক ঘন ও সমৃদ্ধ ম্যাকোন্ডোতে নিয়ে যায়, যা বই পড়ে কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
এটা চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীর এক চমৎকার উদাহরণ। তবে এই বিস্ময়কর জগৎ যে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মন থেকে এসেছে, তা ভুলে যাওয়া যায় না। তিনি নিঃসন্দেহে সাহিত্যপ্রতিভা, কিন্তু তার নারী ও যৌনতা বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমস্যাজনক।
তাঁর লেখায় বারবার দেখা যায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ককে রোমান্টিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আর পুরুষতান্ত্রিক সুবিধাকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন সেটাই স্বাভাবিক।
নেটফ্লিক্সের সংস্করণেও আমরা দেখি কর্নেল আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া (ক্লদিও কাতানো) এক শিশুকন্যা রেমেদিওস মস্কোতের (ক্রিস্তাল আপারিসিও) সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলে।
মেয়েটির বয়স তখনও কৈশোরে পা দেয়নি, কিন্তু উপন্যাস এবং সিরিজ দুটোই তাকে সবচেয়ে “পবিত্র” ও “সুখী” নারী হিসেবে দেখায়। (তাকে “নারী” বলাও ঠিক নয়, কারণ সে এখনো শিশু।) শেষপর্যন্ত রেমেদিওস গর্ভধারণ করে মারা যায়, আর কর্নেল এক শোকাবহ চরিত্র হয়ে ওঠে। এই পুরো ব্যাপারটা যথেষ্ট বিব্রতকর এবং একে “সময়বিশেষের পণ্য” বলার সুযোগ নেই। উপন্যাসে এমনকি শিশুটির বাবা-মাও প্রথমে এই সম্পর্কে আতঙ্কিত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে সেটি তখনকার সমাজেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবুও শেষ পর্যন্ত সবাই একে “ভালোবাসার গল্প” হিসেবে মেনে নেয়।
এটাই একমাত্র উদাহরণ নয়ভআরেকটি জায়গায় দেখা যায়, আর্কাদিও (জেনার ভিয়াররিয়াল) তার নিজের মা পিলার তেরনেরা (ভিনিয়া মাচাদো)–কে ধর্ষণের চেষ্টা করে, যদিও সে জানে না যে পিলার তার জন্মদাত্রী। পিলার তারপর সান্তা সোফিয়াকে (জোহানা অ্যাঙ্গুলো) টাকার বিনিময়ে আর্কাদিওর বিছানায় পাঠায়। সান্তা সোফিয়া কেন সেখানে রয়ে যায়, কেন কিছু বলে না তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয় না। সে যেন শুধুই ভোগের বস্তু।
অন্যদিকে উল্টো দিকেও একই সমস্যা। পিলার নিজে দুই বুয়েন্দিয়া ছেলের সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক করে, যারা তখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক। কিন্তু বই এবং সিরিজ দুটোতেই এই ঘটনাগুলোকে উত্তেজনাকর ও “রোমান্টিক” হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এইসব ব্যাপার ২০২৪ সালে এসে খুবই হতাশাজনক লাগে, এক সময় যখন “Wicked”-এ ডাইনি চরিত্রের নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হয় বা মার্ক টোয়েনের Huckleberry Finn উপন্যাসকে সাবেক দাস Jim-এর দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরায় ব্যাখ্যা করা James বইটি জাতীয় পুরস্কার পায়। কিন্তু এখানেই আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটি সরল, সম্মানসূচক অথচ সমস্যাবহ উপন্যাসের সরল রূপান্তর দেখতে।
পরিচালক লরা মোরা ও আলেক্স গার্সিয়া লোপেজ স্পষ্টতই মূল গ্রন্থটির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। সম্ভবত এমন এক আক্ষরিক রূপান্তর দরকার ছিল আমাদের। কারণ আমরা ম্যাকোন্ডোকে এমনভাবে আগে কখনও দেখিনি।
তবুও মনে হয় ১৯৬৭ সালের পর এতদিন কেটে গেলেও, লাতিন আমেরিকান বা তার প্রবাসী পরিচয় নিয়ে আলোচনায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বাজেট বড় হয়েছে, চিত্রনির্মাণ উন্নত হয়েছে, কিন্তু বলার মতো নতুন কিছু যেন আর নেই।


