মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম The Divine Comedy, এর প্রথম অংশ Inferno, যেখানে কবি দান্তে আলিগিয়েরি স্বয়ং নরকে অবতরণ করছেন তাঁর পথপ্রদর্শক ভার্জিলের সঙ্গে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে এই নরকের স্তরভিত্তিক গঠন, সুদূর গহিন গহ্বরে লুকিয়ে থাকা শয়তানের আখড়া, এই সমস্ত কিছু কি কেবল কল্পনার ফল? নাকি এর পেছনে বাস্তব কোনো স্থাপত্য কিংবা ভৌগোলিক অনুপ্রেরণা কাজ করেছে? এই প্রশ্নকেই কেন্দ্রে রেখে Pierre Ionica রচনা করেছেন তাঁর গবেষণাধর্মী বই Dante’s Hell under Mont Saint Michel। সেখানে তিনি এক রহস্যময় ধারণার জন্ম দেন—দান্তের নরকের গঠন আসলে ফ্রান্সের একটি প্রকৃত স্থানের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যার নাম Mont Saint-Michel বাংলায় মঁ সাঁ মিশেল।
ফ্রান্সের উত্তর উপকূলে অবস্থিত Mont Saint-Michel একটি দ্বীপনগরী, যা জোয়ার-ভাটার উপর ভিত্তি করে কখনও দ্বীপ আবার কখনও স্থলভাগের অংশ হয়ে ওঠে। এক হাজার বছরেরও পুরনো এই স্থানটি মূলত একটি অ্যাবে (ধর্মীয় ঘর), যার ভেতরে স্তরভিত্তিক গঠন, সিঁড়ি, গোপন টানেল ও ভূগর্ভস্থ প্রকোষ্ঠ রয়েছে।
Pierre Ionica-এর মতে, Mont Saint-Michel-এ থাকা এই স্তরভিত্তিক স্থাপত্য ও অন্ধকার গহ্বর ডান্তের কল্পিত নরকের সঙ্গে আশ্চর্যরকম সাদৃশ্যপূর্ণ। বিশেষ করে তিনি যে অংশটিকে নরকের কেন্দ্র বা শয়তানের বাসস্থান হিসেবে চিত্রিত করেন, সেটির বিন্যাস অনেকটাই Mont Saint-Michel-এর কেন্দ্রস্থ গুহা ও চূড়ার গঠন অনুসরণ করে বলেই Ionica দাবি করেন।
দান্তে কি সত্যিই ভ্রমণ করেছিলেন মঁ সাঁ মিশেলে?
এই প্রশ্নটির উত্তর নিশ্চিতভাবে দেওয়া কঠিন। ইতিহাসের পাতা দান্তের জীবনের বহু দিকেই ধোঁয়াশা রেখে গেছে। তবে Pierre Ionica সম্ভাবনার ভিত্তিতে যুক্তি দেন, দান্তে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে একটি দীর্ঘ ইউরোপীয় ভ্রমণে বের হন, সেই সময় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর ও ধর্মীয় কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেই সূত্রে Mont Saint-Michel-এ তাঁর যাওয়া অসম্ভব নয়।
Mont Saint-Michel তখন কেবল একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং স্বর্গ ও নরকের মাঝখানে অবস্থিত এক অন্য জগৎ ছিলো। এই ‘আন্তঃজাগতিকতা’ই হতে পারে ডান্তের নরকের জন্য এক আদর্শ অনুপ্রেরণা। Ionica-এর মতে দান্তে সেখানে যা দেখেছিলেন, তা কল্পনার রূপ নিয়ে পরিণত হয় Inferno-র একেকটি স্তরে।
Inferno-তে ডান্তে নরককে নয়টি স্তরে ভাগ করেন। প্রত্যেকটি স্তর একটি নির্দিষ্ট পাপের শাস্তির প্রতীক। এই স্তরগুলো ক্রমশ গভীরে নামতে থাকে, একেবারে কেন্দ্রে শয়তানের অবস্থান। Mont Saint-Michel-এর অ্যাবেতে প্রবেশ করলেও দেখা যায় একটির পর একটি ঘর ও সিঁড়ির মধ্য দিয়ে নিচে নামতে হয় গহিন অন্ধকারে, যা এক ধরণের পারলৌকিক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যযুগীয় ইউরোপে স্থাপত্য কেবল বসবাসের কাঠামো ছিল না, বরং আত্মার পরিক্রমার প্রতীক ছিল। Mont Saint-Michel-এর এই স্থাপত্য হয়তো ডান্তের কাছে ঠিক তেমন এক মানসিক ও আধ্যাত্মিক ভূচিত্র তৈরি করেছিল যেখানে স্থাপত্যই হয়ে উঠেছিল নরকের মানচিত্র।
Pierre Ionica-এর বিশ্লেষণ কেবল স্থাপত্যগত সাদৃশ্য দিয়ে থেমে যায় না, বরং তিনি দাবি করেন, Inferno-তে যেসব ধ্বনির উল্লেখ আছে গুমগুম শব্দ, কান্না, বাতাসের ঝাপটা—তা Mont Saint-Michel-এর গুহা ও সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবাহিত হওয়া বাতাস ও প্রতিধ্বনির মতোই।
এমনকি তিনি স্থাপনার প্রতিটি স্তরের সঙ্গে Inferno-র স্তরগুলোর তুলনাও টানেন। যেমন ‘গ্লুটনির স্তর’ মানে অতিভোজনকারীদের শাস্তির স্তর, সেটিকে তিনি মিলান Mont Saint-Michel-এর এক সময়কার সংরক্ষিত মদের গুদামের সাথে। নিছক কল্পনা নয় বরং এটি মধ্যযুগীয় মানসিকতা ও ধর্মীয় আখ্যানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা প্রতীকতত্ত্বের একটি গভীর অনুধাবন।
Pierre Ionica-এর বই Dante’s Hell under Mont Saint Michel আমাদের দাঁড় করায় একটি অদ্ভুত কিন্তু চমকপ্রদ ধারণার সামনে, দান্তের কালজয়ী Inferno হয়তো কোনো দূর জগতের কল্পনা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বাস্তব স্থানের ছায়া। Mont Saint-Michel শুধু একটি ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, বরং সম্ভবত এক পার্থিব নরক, যার স্তর, গহ্বর, গর্জন, আর রহস্যময় কাঠামো ডান্তের কল্পনায় জন্ম দিয়েছে একটি মহাকাব্যিক গহ্বরের।


