বিশ্বজুড়ে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির সংকটে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মরুকরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের ফলে এই সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। ঠিক এই সংকটময় সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমআইটি (Massachusetts Institute of Technology) একটি বৈপ্লবিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে, যা বিদ্যুৎ ছাড়াই বাতাস থেকে সরাসরি পানযোগ্য পানি সংগ্রহ করতে পারে।
এই প্রযুক্তিটি একটি “প্যাসিভ” অর্থাৎ স্বনির্ভর, শূন্য-শক্তি-নির্ভর জানালার প্যানেল, যা দেখতে অনেকটা কালো কাচের পাতের মতো হলেও এর ভেতরে রয়েছে উচ্চতর বিজ্ঞান ও প্রকৌশল নকশা। প্যানেলটির মধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে একটি হাইড্রোজেল ম্যাট্রিক্স, যা গ্লিসারল এবং হাইগ্রোস্কোপিক লবণ দিয়ে তৈরি। এই উপাদানগুলো রাতে বাতাসের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সক্ষম।
কীভাবে কাজ করে প্রযুক্তিটি?
এই প্যানেলের ডিজাইনটি অনুপ্রাণিত হয়েছে ওরিগামি (জাপানি কাগজ ভাঁজ করার নকশা) থেকে, যার ফলে এটি সহজে ভাঁজ করা, বহনযোগ্য এবং খরচে সাশ্রয়ী। রাতে প্যানেলের ভেতরের উপাদানগুলো বাতাসের মধ্যে থাকা জলীয় বাষ্প শোষণ করে। এরপর দিনের বেলায় সূর্যের তাপে সেই আর্দ্রতা বাষ্পীভূত হয়ে বিশুদ্ধ পানিতে রূপ নেয় এবং সহজে সংগ্রহ করা যায়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে কোনো ধরণের ফিল্টার বা পরিশোধন যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে না। প্যানেল নিজেই লবণ এবং অন্যান্য দূষণকে নিষ্ক্রিয় করে পানিকে সরাসরি পানযোগ্য করে তোলে।
এটি ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ‘ডেথ ভ্যালি’ অঞ্চলে পরীক্ষা করা হয়েছে, যা পৃথিবীর অন্যতম শুষ্ক অঞ্চল। পরীক্ষায় দেখা গেছে প্রতিটি প্যানেল প্রতিদিন গড়ে ১৬০ মিলিলিটার বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি ছোট পরিবারের ন্যূনতম পানি চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট, যদি তারা কয়েকটি প্যানেল একসঙ্গে ব্যবহার করে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি কোনো রকমের বিদ্যুৎ, পাইপলাইন বা পাম্প ছাড়াই কাজ করে। ফলে এটি এমন সব স্থানে ব্যবহারযোগ্য যেখানে অবকাঠামোগত সুবিধা নেই, ফলে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, মরুভূমি, মানবিক বিপর্যয়পীড়িত এলাকা, শরণার্থী শিবির, কিংবা গ্রিডবিহীন গ্রামীণ অঞ্চলে সহজে ব্যবহার করা যাবে।
হালকা ও বহনযোগ্য হওয়ায় সহজেই স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য। একইসাথে এটি সহজে স্কেলআপ করা যায় অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী একাধিক প্যানেল বসিয়ে পানি উৎপাদন বাড়ানো যায়।
এমআইটি বর্তমানে এই প্রযুক্তির ২০২৬ সালের মধ্যে ব্যাপক পরিসরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। আশা করা হচ্ছে এর মাধ্যমে নিরাপদ পানির অভাব দূর করে কোটি কোটি মানুষের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।


