আমরা বিশ্বাস করি পৃথিবী কঠিন গঠনে তৈরি। ভিতরে লোহা, ম্যাগমা আর শক্ত নিউক্লিয়াস। কিন্তু যদি বলা হয়, এই কঠিন পৃথিবীর ভেতরে লুকিয়ে আছে আরেকটি পৃথিবী? যেখানে আছে নিজস্ব সূর্য, অচেনা প্রাণী, আর উন্নত সভ্যতা, তাহলে কেমন হবে?
এটাই হোলো আর্থ থিওরি, বা “ফাঁপা পৃথিবী তত্ত্ব”। এটি এক অদ্ভুত ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, যা বিজ্ঞানসম্মত না হলেও ইতিহাস, মিথ ও আধুনিক সংস্কৃতির ধারায় দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে।
হোলো আর্থ তত্ত্বের ছায়া প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ, উপকথা, লোককাহিনি ও দর্শনের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে। হিন্দু ধর্মে পাতাললোক, বৌদ্ধ ধর্মে ‘অঘর্তি’ নামক গোপন স্থান, প্রাচীন গ্রীক উপকথায় হেডিস (Underworld)—এই সবকিছু যেন ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর অভ্যন্তরে অন্য এক গোপন জগত আছে। তিব্বতের “শাম্বালা” নামক গুপ্ত রাজ্য ও মঙ্গোলিয়ান ধারণায় “আগর্থা”—দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের কল্পিত আধ্যাত্মিক জগৎ, যার অবস্থান পৃথিবীর গভীরেই বলে বিবেচিত।
এই ধারণাকে আধুনিক সময়ে নিয়ে আসেন ১৭শ শতকের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি। তিনি ১৬৯২ সালে প্রস্তাব করেন, পৃথিবী একাধিক ঘূর্ণনশীল স্তরের ফাঁপা গোলকে তৈরি এবং এর কেন্দ্রেও হয়তো একটি সূর্য আছে। তিনি এই ধারণা দেন ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। ১৮১৮ সালে জন ক্লিভস সাইমস উত্তর ও দক্ষিণ মেরুতে গহ্বরের (Polar Openings) অস্তিত্ব দাবি করে বলেন, মানুষ সেই পথ দিয়ে ভেতরের পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারবে। তিনি সরকারের কাছে অর্থ চেয়ে “সাইমস হোল” নামে পরিচিত অভিযানের পরিকল্পনাও করেন।
হোলো আর্থ তত্ত্ব অনুসারে ভেতরের জগতে এক উন্নত সভ্যতা বাস করে, যাদের বুদ্ধিবৃত্তি, প্রযুক্তি এবং আধ্যাত্মিকতা বাইরের মানবজাতির তুলনায় অনেক বেশি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ একসময় মানবজাতির হয়েছে এমন দাবিও উঠে এসেছে অনেক ডায়েরি ও রহস্যময় লেখায়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ১৯১৩ সালে মার্শাল বি. গার্ডনার তার বইতে বলেন, পৃথিবীর ভেতরে একটি সূর্য, বনাঞ্চল এবং এলিয়েনজাতীয় উন্নত মানব জাতি বসবাস করে। তিনি ছবি ও মানচিত্র দিয়ে তার তত্ত্ব সমর্থন করার চেষ্টা করেন।
নাজি জার্মানি হোলো আর্থ থিওরিকে একটি কার্যকর বিশ্বাসে পরিণত করে। বলা হয় হিটলারের কিছু ঘনিষ্ঠ বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর অভ্যন্তরে এক আদি আর্য জাতির উৎস রয়েছে। তারা এন্টার্কটিকায় অভিযান চালিয়ে সেখানে গোপন ঘাঁটি তৈরি করে এবং ভেতরের পৃথিবীতে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিছু ষড়যন্ত্রতত্ত্বে দাবি করা হয় হিটলার আত্মহত্যা করেননি বরং সেই গোপন অভ্যন্তরীণ জগতে পালিয়ে যান।
১৯৪৭ সালে অ্যাডমিরাল রিচার্ড বার্ড ‘অপারেশন হাইজাম্প’ নামে এক অভিযান চালান দক্ষিণ মেরুতে। কিছু গোপন ডায়েরি অনুসারে তিনি জানান তিনি এক অজানা অঞ্চলে প্রবেশ করেন যেখানে সবুজ বন, বৃহদাকার পাখি এবং আলো ছড়ানো অভ্যন্তরীণ সূর্য রয়েছে। সেখানকার সভ্যতা শান্তিপূর্ণ ও উন্নত।যদিও এই ঘটনার কোনো প্রামাণ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তথাপি ষড়যন্ত্রবাদীরা একে হোলো আর্থ থিওরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বলে মনে করেন।
আজকের দিনে এই তত্ত্ব সিনেমা, টিভি সিরিজ, গেমস ও ইউটিউব ষড়যন্ত্রতত্ত্বে দারুণভাবে জনপ্রিয়। “Journey to the Center of the Earth” (জুল ভার্নের উপন্যাস), “Godzilla vs Kong” (২০২১), এবং Marvel-এর কিছু কাহিনিতে এই ধারণার ছায়া পড়েছে। ইন্টারনেটে বহু ব্যক্তি দাবি করেন NASA এবং শক্তিশালী সরকারসমূহ উত্তর-দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে যাতে পৃথিবীর অভ্যন্তরের গোপনীয়তা টিকিয়ে রাখা যায়।
বিজ্ঞান কী বলে?
ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ, গ্র্যাভিটেশনাল মডেল ও ভূ-তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বারবার প্রমাণ করেছেন, পৃথিবীর গভীরে রয়েছে কঠিন ও গলিত ধাতব স্তর, ম্যাগমা ও সলিড কোর। কোনো ফাঁপা জায়গা নেই। তবে হোলো আর্থ থিওরি বিশ্বাসীরা মনে করেন, এই প্রমাণপত্র ও তথ্য ‘মহা ষড়যন্ত্র’ এর অংশ। NASA এবং ক্ষমতাবান গোষ্ঠী সত্য লুকিয়ে রেখেছে। হোলো আর্থ তত্ত্ব কেবল একটি ষড়যন্ত্র নয় এটি এক আদিম মানবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। অজানার খোঁজ, গোপন পৃথিবীর বাসিন্দা হওয়ার কল্পনা এবং এমন এক বাস্তবতা যেখানে সব কিছু আমাদের চেনা জগতের বাইরে।


