“Game of Thrones” কীভাবে এটি এক দশক শাসন করল, তারপর হারিয়ে ফেলল নিজের পথ : সারা হিউজেস, ব্রিটিশ লেখিকা ও সাংবাদিক

২০১০-এর দশকে টেলিভিশনে অনেক সিরিজ ছিল, কিন্তু ‘গেম অব থ্রোনস’ ছিল একেবারেই আলাদা। এইচবিওর জর্জ আর. আর. মার্টিনের বিশাল কল্পকাহিনি অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজ পুরো টেলিভিশন জগতকেই একরকম দখল করে নিয়েছিল। এটি এতটাই আলোচিত ছিল যে প্রতিটি পর্ব নিয়েই অনলাইনে বিশ্লেষণ, আলোচনা চলত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা থেকে শুরু করে স্নুপ ডগ সবাই এই সিরিজের ভক্ত । ফ্যান ভিডিও, থিওরি, মিমে ভরে উঠেছিল ইন্টারনেট। প্রতি পর্বে গড়ে ২৫ মিলিয়নের বেশি দর্শক ছিল (যেখানে অবৈধ ডাউনলোডের সংখ্যাও অন্তর্ভুক্ত ছিল না) এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাইরেট হওয়া শো হওয়ার গৌরব’ও এটি অর্জন করে।

এই সিরিজ ছিল শেষ ‘ইভেন্ট টেলিভিশন’ যেটা একসাথে সবাই দেখত, একসাথে আলোচনা করত। যেখানে আজকের দিনে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের কারণে মানুষ নিজ নিজ সময়ে বিঞ্জ করে দেখে, সেখানে ‘গেম অব থ্রোনস’ সবাইকে সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করিয়ে রাখত। এই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো উত্তেজনা, গুঞ্জন, আলোচনার ঝড়।

সবচেয়ে বড় কথা, এই সিরিজ ছোট পর্দায় ‘ফ্যান্টাসি’ ধারাটির ধারণাই বদলে দিয়েছিল। এর আগে মনে করা হতো, ফ্যান্টাসি সিরিজ টিভিতে সফল হবে না।কিন্তু এই শো’র পর থেকে যেন সবাই ফ্যান্টাসি বানাতে ছুটে গেল। ওয়েস্টেরোসের ছায়া দেখা যায় ‘দ্য লাস্ট কিংডম’ থেকে শুরু করে ‘ব্রিটানিয়া’র মতো ইতিহাসনির্ভর সিরিজেও। নেটফ্লিক্সের ‘দ্য উইচার’ এর রক্তাক্ত সহিংসতা আর অপ্রয়োজনীয় নগ্নতা ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ছাঁচ অনুসরণ করে তৈরি।

তবে সব সময় এমন ছিল না। ২০১১ সালে যখন সিরিজটি শুরু হয়, তখন মূল আকর্ষণ ছিল তীক্ষ্ণ সংলাপ, রাজনীতিক ষড়যন্ত্র, চরিত্রগুলোর মানসিক জটিলতা। কিন্তু যত সময় গেলো এবং যখন লেখক মার্টিনের মূল বই থেকে কনটেন্ট শেষ হয়ে গেল, তখন নির্মাতা বেনিয়ফ ও ওয়েইস নিজেদের মতো গল্প লিখতে শুরু করলেন। চরিত্রভিত্তিক গল্প গড়িয়ে গিয়ে বড়সড় যুদ্ধ আর বিস্ফোরণে পরিণত হলো।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল ষষ্ঠ সিজনের ফিনালে, ‘দ্য উইন্ডস অব উইন্টার’। সার্সি যখন পুরো ‘বেলর’ সেপ্ট উড়িয়ে দেয়, তখন সেটা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু এখন অনেকে মনে করেন, সেটাই ছিল সেই মুহূর্ত যখন এই সিরিজের ভিতটা ভেঙে পড়ে। নির্মাতারা প্রমাণ করে ফেললেন যখন কোনো ধারণা থাকবে না, তখন তারা বিস্ফোরণ দিয়ে গল্প টানবেন।

সার্সিকে ভিলেন বানিয়ে ফেললেও, তারপর তার চরিত্র নিয়ে কিছুই করা হয়নি। রাজনীতির জায়গায় তারা পুরো মনোযোগ দিলেন যুদ্ধ আর ভিজ্যুয়াল স্পেক্টাকেলে। নাইট কিং-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের গুরুত্ব থাকলেও, কিংস ল্যান্ডিংয়ের রাজনীতিক জটিলতা বাদ যাওয়ায় শেষের দুই সিজন হয়ে পড়েছিল ‘স্টাইল ওভার সাবস্ট্যান্স’-এর নজির। হঠাৎ লিটলফিঙ্গারের মৃত্যু, ডেনেরিসের আগুনে কিংস ল্যান্ডিং ধ্বংস সবই যেন নাটকীয়তা তৈরির চেষ্টা, বাস্তবিক নয়।

এই ‘শুধুই দৃশ্যমান চমক’ ধরনটি অনেক সিরিজের ক্ষতিও করেছে। ‘ট্রয়’, ‘দ্য বাস্টার্ড এক্সিকিউশনার’, ‘আমেরিকান গডস’ সবই ‘গেম অব থ্রোনস’ এর মতো হতে চেয়েছিল, কিন্তু আসল চাবিকাঠি কাহিনির গভীরতা উপেক্ষা করে ব্যর্থ হয়েছে।

অন্যদিকে যেসব সিরিজ সফল হয়েছে যেমন আউটল্যান্ডার, পেনি ড্রেডফুল, হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস তারা মূল গল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা দেখিয়েছে, ভালোবাসা থেকে উৎসারিত গল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকলে সেটি দর্শককে আকর্ষণ করে। নিছক জনপ্রিয়তার খোঁজে তৈরি হলেই তা সফল হয় না।

তবু ব্যর্থতা থামায়নি নতুন ফ্যান্টাসি প্রজেক্টগুলোর পরিকল্পনা। ‘লর্ড অব দ্য রিংস’, ‘দ্য হুইল অব টাইম’, ‘দ্য কিংকিলার ক্রনিকল’ সবকিছু তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তখন কি দর্শক এসব দেখার আগ্রহ রাখবে? কারণ, ‘গেম অব থ্রোনস’ যতটা আলোড়ন তুলেছিল, ততটাই দ্রুত যেন বিস্মৃতও হয়ে গেছে। সেরা দশকের সিরিজের তালিকায়ও এটি ধীরে ধীরে নেমে গেছে।

‘গেম অব থ্রোনস’ শেষ পর্যন্ত অনেক কিছুর প্রতিশ্রুতি দিয়েও তার গভীরতা ধরে রাখতে পারেনি। জাতিগত উপস্থাপনায় ছিল বড় সীমাবদ্ধতা, ডোথরাকিদের বর্বর হিসেবে দেখানো, ডেনেরিসের চরিত্রে ‘সাদা ত্রাণকর্তা’ ভাব, বা যৌনতা নিয়ে বিতর্কিত উপস্থাপন সব মিলিয়ে এটি নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। অনেক দৃশ্যেই ছিল নারীবিরোধী বা বিভ্রান্তিকর চিত্রায়ন।

ফলে হয়তো সিরিজটির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হতে পারে এর গল্প নয়, বরং এর বাজেট আর সেই বাজেটকে অনুসরণ করে যারা কপি করেছে তাদের দৌড়। গেম অব থ্রোনস শেষ। কিন্তু তার ছায়া, চাইলে বলাই যায় আজও চলমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন