রাত তখন তিনটা। ১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মকাল। যুক্তরাজ্যের ওক্সফোর্ড শহরের এক ছাত্রাবাসে ২১ বছর বয়সী থমাস হ্যামিল ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ঠিক তখনই তার মনে হয়-এই মুহূর্তটা, জানালার বাইরে সেই গাড়ির শব্দ, বিছানার পাশে পড়ে থাকা বইয়ের অবস্থান-সবকিছু যেন সে আগে কোথাও দেখেছে। কিছুক্ষণ পর তার বন্ধু এসে বলে, ‘কাল তুমি এই সময়েই এমন একটা কথা বলেছিলে-আজ ঠিক সেটাই ঘটছে!’ থমাস হতবাক। এটা কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি সে ভবিষ্যতের কোনো ছায়া অনুভব করল?
Déjà vu ফরাসি শব্দ, এর অর্থ ‘আগেই দেখা’ । এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি অনুভব করেন যে একটি নতুন অভিজ্ঞতা পূর্বেও ঘটেছিল। সাধারণত এটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়, কিন্তু প্রভাব অত্যন্ত গভীর ও বিভ্রান্তিকর।
সাইকোলজিস্ট অ্যান ব্রাউন (২০০৩) জানান, প্রায় ৬০-৭০% মানুষের জীবনে একবার না একবার Déjà vu ঘটেই থাকে। এই অভিজ্ঞতার প্রধান ব্যাখ্যাটি নিউরোসায়েন্সে পাওয়া যায়, Temporal lobe-এর সাময়িক বিভ্রাট। বিশেষত hippocampus এবং parahippocampal gyrus এই সময় বিভ্রান্ত হয়ে বর্তমান অভিজ্ঞতাকে পুরনো মনে করে। এটি মেমোরি মিসম্যাচ থিওরি নামে পরিচিত (Spatt, ২০০২)।
অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, সময় লিনিয়ার নয় বরং ‘Block Universe’-এর মতো, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে অস্তিত্বশীল (Greene, ২০০৪)। এই মডেল অনুসারে, Déjà vu হতে পারে এমন একটি মুহূর্ত যখন আমাদের চেতনা সময়ের এক স্তর থেকে অন্য স্তরে “লিক” করে যায়। Quantum Entanglement বা ‘স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট এ ডিস্ট্যান্স’ ধারণা বলে-দূরবর্তী দুটি কণাও একে অপরের অবস্থার সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সংযুক্ত হতে পারে। এই ধারায় কিছু থিওরিস্ট মনে করেন, চেতনা কণার স্তরে সময় অতিক্রম করতে পারে, ফলে Déjà vu হতে পারে ভবিষ্যতের কণিকাংশের প্রতিচ্ছবি। মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ংয়ের মতে, Déjà vu হচ্ছে Collective Unconscious-এর বহিঃপ্রকাশ, যেখানে ব্যক্তিগত চেতনার বাইরে একটি বৃহত্তর মনোজগতে সকল মানুষের অভিজ্ঞতা সংরক্ষিত। এখানে Déjà vu পূর্বানুভব, যা স্বপ্ন, প্রার্থনা বা ধ্যানের মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করা যায়।
পুনর্জন্ম তত্ত্বে বলা হয়, পূর্বজন্মের স্মৃতি কখনো কখনো বর্তমান জীবনের সাথে মিশে যায়। Déjà vu সেই স্মৃতির টুকরো, যেগুলো চেতনার গভীরে থেকে হঠাৎ ভেসে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের ও প্রযুক্তিবিদ এলন মাস্ক সহ অনেকেই বিশ্বাস করেন, আমরা হয়তো একটি সিমুলেটেড রিয়ালিটিতে বাস করছি। এই থিওরি অনুসারে, Déjà vu হচ্ছে গ্লিচ ইন দ্য ম্যাট্রিক্স-যেখানে রিয়েলিটি কোডিং এ সাময়িক ভুল ধরা পড়ে। MIT ও NASA-র কিছু গবেষক ধারণা করেছেন, মহাবিশ্বের গঠন একটি বিশাল তথ্য কাঠামোর মতো, যেখানে স্থান-কাল-চেতনা সবই অ্যালগরিদমিক। তাহলে কি Déjà vu হচ্ছে পূর্ব-প্রোগ্রাম করা কোনো স্ক্রিপ্টের পুনরাবৃত্তি?
Multiverse Theory অনুযায়ী, একই ব্যক্তি একাধিক সমান্তরাল বাস্তবতায় ভিন্নভাবে অস্তিত্বশীল। কিছু কনস্পিরেসি থিওরিস্ট দাবি করেন, Déjà vu হলো সেইসব বিকল্প বাস্তবতার ছায়া, যেখানে আমরা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। একটি জনপ্রিয় ধারণা বলে, ‘যখন দুইটি বিকল্প বাস্তবতা সাময়িকভাবে এক বিন্দুতে এসে মিলে যায়, তখনই Déjà vu ঘটে।’ কিছু থিওরিস্ট মনে করেন ভবিষ্যতের কিছু মানুষ বা অস্তিত্ব আমাদের সময়কে পর্যবেক্ষণ করছে বা সামান্য পরিবর্তন করছে। Déjà vu হতে পারে সেই পরিবর্তনের ঝাঁপটা-যেমন Mandela Effect-এর মতো সামাজিক স্মৃতিবিভ্রাট, যা alternate timeline-এর ফল।
নিউ ইয়র্কে ১৯৮১ সালে এক যুবক প্রতিদিন তার কলেজ যাওয়ার পথে একই একটি ক্যাফে দেখে বলে-‘এখানে কোনোদিন আগুন লাগবে।’ তিন সপ্তাহ পর ক্যাফেটিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তার কাছে এটি Déjà vu-র একটি অতল অনুভব ছিল। বিশেষজ্ঞরা পরে জানান, তার মস্তিষ্কে কোনও নিউরোলজিক ত্রুটি ছিল না। জাপানে ২০১৫ সালে এক নারী বারবার স্বপ্নে তার নতুন চাকরির অফিস, সহকর্মী এবং কথোপকথন দেখতে পান। কয়েক মাস পর সেই একই জায়গায় চাকরি পান এবং প্রত্যেকটি ঘটনা স্বপ্নের মতো মিলে যায়। তিনি এই অভিজ্ঞতাকে “ভবিষ্যতের স্মৃতি” বলেন।


