প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি মাকড়সা। প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই প্রাণীটি বৈচিত্র্য, অভিযোজন এবং বিশেষত তাদের তৈরি সিল্কের জন্য বিজ্ঞানের কাছে রহস্য ও আগ্রহের বিষয়। মাকড়সার জাল বা সিল্কের গুণগত মান, শক্তি ও নমনীয়তা নিয়ে বহুদিন ধরেই গবেষণা চলছে।সম্প্রতি এক যুগান্তকারী সাফল্য এসেছে, জার্মানির গবেষকরা প্রথমবারের মতো CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাকড়সার জিন সম্পাদনা করেছেন। এই গবেষণার ফলে মাকড়সার সিল্কে নতুন বৈশিষ্ট্য সংযোজন এবং ভবিষ্যতে শিল্প ও চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি আধুনিক জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই প্রযুক্তি দিয়ে প্রাণীর ডিএনএ-তে নির্দিষ্ট স্থানে কাটাকাটি, সংযোজন বা অপসারণ করা যায়। ইঁদুর, মাছ, গাছ, এমনকি মানুষের কোষেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু মাকড়সার ক্ষেত্রে এতদিন কোনো গবেষণা হয়নি। অথচ মাকড়সার সিল্কের বৈশিষ্ট্য, যেমন টেনসাইল স্ট্রেংথ, নমনীয়তা, ওজনের তুলনায় শক্তি এসবই একে অনন্য করেছে।গবেষকরা মনে করেন, এই সিল্কের গুণগত মান আরও বাড়ানো বা নতুন বৈশিষ্ট্য সংযোজনের জন্য জিন সম্পাদনা অপরিহার্য।
বিশ্বের অন্যতম সেরা বায়োকেমিস্ট, ইউনিভার্সিটি অব বাইরয়থ-এর থমাস শেইবেল বলেন, “মাকড়সার সিল্কের বৈচিত্র্য ও বহুমুখী ব্যবহার সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করলে আশ্চর্য লাগে যে এতদিন কেউ মাকড়সার জিন সম্পাদনায় CRISPR ব্যবহার করেনি।”
গবেষকরা প্রথমে সাধারণ গৃহস্থালী মাকড়সা (Parasteatoda tepidariorum) বেছে নেন। প্রাথমিকভাবে তারা একটি সহজ লক্ষ্য ঠিক করেন, মাকড়সার চোখ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ‘sine oculis’ জিনটি সরিয়ে ফেলা। এজন্য তারা CRISPR-Cas9 সিস্টেমকে বিশেষভাবে ডিজাইন করেন এবং অজ্ঞান করা স্ত্রী মাকড়সার পেটে ইনজেকশনের মাধ্যমে এই জিন সম্পাদনার উপাদান ঢোকান। এভাবে সম্পাদিত ডিম থেকে জন্ম নেয় চোখবিহীন মাকড়সার বাচ্চা।
প্রথম ধাপে সফলতা পাওয়ার পরে গবেষকরা পরবর্তী ধাপে যান, এবার লক্ষ্য মাকড়সার সিল্ক উৎপাদনকারী জিন। তারা স্পাইড্রোইন (spidroin) নামক প্রোটিনের জিনে একটি লাল ফ্লোরোসেন্ট প্রোটিনের জিন সংযোজন করেন। ফলস্বরূপ কিছু মাকড়সা বাচ্চা লাল ফ্লোরোসেন্ট সিল্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়।
মাকড়সার সিল্ক পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক ফাইবারগুলোর একটি। কিছু প্রজাতির সিল্কের টেনসাইল স্ট্রেংথ স্টিলের কাছাকাছি, অথচ তা অনেক হালকা ও নমনীয়। সিল্কের এই বৈশিষ্ট্য চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা, টেক্সটাইল, এমনকি পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং তৈরিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।উদাহরণস্বরূপ অস্ত্রোপচারের সেলাই, বুলেটপ্রুফ কাপড়, উন্নত বায়োমেডিকেল ডিভাইস, এমনকি কৃত্রিম লিগামেন্ট ও টেন্ডন তৈরিতে মাকড়সার সিল্ক ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে মাকড়সা একাকী ও আক্রমণাত্মক স্বভাবের হওয়ায় এদের খামারে চাষ করা অসম্ভব। ফলে বিজ্ঞানীরা এতদিন কৃত্রিমভাবে মাকড়সার সিল্ক উৎপাদনের চেষ্টা করেছেন, যদিও তা এখনও প্রকৃতির মতো নিখুঁত হয়নি। জিন সম্পাদনার মাধ্যমে মাকড়সার সিল্কের কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য যোগ করা গেলে, কৃত্রিম উৎপাদন আরও সহজ ও কার্যকর হবে।
CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি জীববিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। ইঁদুর, মাছ, গাছ, এমনকি মানুষের কোষেও এই প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।এর মাধ্যমে জিনের নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা, পরিবর্তন বা নতুন জিন সংযোজন করা যায়। মাকড়সার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, জিন সম্পাদনার মাধ্যমে নতুন বৈশিষ্ট্য সংযোজন সম্ভব। এটি শুধু মাকড়সার ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।
গবেষণার প্রধান সাফল্য দুটি, প্রথমত মাকড়সার জিন সম্পাদনায় CRISPR প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে; দ্বিতীয়ত, মাকড়সার সিল্কে নতুন বৈশিষ্ট্য সংযোজন করা গেছে। গবেষকরা দেখিয়েছেন জিন সম্পাদনার মাধ্যমে মাকড়সার সিল্কে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য যোগ করা সম্ভব, যেমন লাল ফ্লোরোসেন্ট সিল্ক উৎপাদন। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী, নমনীয় কিংবা জীবাণুনাশক সিল্ক তৈরি করা যেতে পারে।
জিন সম্পাদনা নিয়ে নৈতিক ও পরিবেশগত প্রশ্নও রয়েছে। মাকড়সার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির জিন পরিবর্তন করলে প্রকৃতিতে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে। গবেষকরা অবশ্য বলেছেন, এই গবেষণার মাকড়সাগুলোতে বিষের কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং তারা সাধারণ মাকড়সার মতোই আচরণ করছে। তবুও বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োগের আগে পরিবেশগত ও নৈতিক দিকগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি।
মাকড়সার জিন সম্পাদনার এই গবেষণা বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতে মাকড়সার সিল্কের গুণগত মান বাড়ানো, নতুন বৈশিষ্ট্য সংযোজন এবং শিল্প ও চিকিৎসাক্ষেত্রে বহুমুখী ব্যবহার সম্ভব হবে। কৃত্রিম সিল্ক উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব উপকরণ, চিকিৎসা ও প্রতিরক্ষা খাতে এই প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটাতে পারে। তবে এর নৈতিক ও পরিবেশগত দিকগুলো বিবেচনা করে এগিয়ে যাওয়াই হবে বিজ্ঞানের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক পথ।
মাকড়সার জিন সম্পাদনার এই গবেষণা শুধু মাকড়সার জগতে নয়, সামগ্রিকভাবে জিন প্রযুক্তি ও উপাদান বিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে আমরা এই প্রযুক্তিকে কীভাবে কাজে লাগাতে পারি এবং এর মাধ্যমে মানবজীবন কতটা উপকৃত হতে পারে।গবেষণার নৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে, বিজ্ঞানীরা যদি সঠিকভাবে এগিয়ে যান, তাহলে এই প্রযুক্তি মানবসভ্যতার জন্য এক অনন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে।


