CNN বিশ্লেষণ – সম্ভাব্য যে পাঁচ উপায়ে শেষ হতে পারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল পরিবেশে আবারো আলোচনায় এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সম্ভাব্য বৈঠক। আগামী ১৫ আগস্ট আলাস্কায় এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই সময়ে তারা কেন একে অপরের সাথে সরাসরি আলোচনায় বসতে চান? এই বৈঠকের পেছনে রয়েছে যুদ্ধ সমাপ্তির সম্ভাবনা, কূটনৈতিক কৌশল, এবং আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার বিভিন্ন উদ্দেশ্য।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ব্যক্তিত্ব ও কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে সমাধানের একটি পথ তৈরি করতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, বৈঠকের মাধ্যমে মস্কোর অটল অবস্থান ভেঙে ফেলা সম্ভব । ট্রাম্প মনে করেন ক্রেমলিনকে যুদ্ধ থামাতে রাজি করানো গেলে, পশ্চিমা জোট এবং ইউক্রেনের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি আসতে পারে। অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তার অবস্থান অনেক কঠোর রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের জনগণ এক এবং রুশ সেনা যেখানে পৌঁছাবে সেখানই রাশিয়ার ভূমি। এটি এক ধরনের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সংকেত যা যুদ্ধবিরতি কিংবা আঞ্চলিক বিভাজনের বিরোধিতা করে।

পুতিনের আসল লক্ষ্য সময় গ্রহণ এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টিই। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মে মাসে দেয়া নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পরিবর্তে তার পক্ষ থেকে দু’বার স্বল্পস্থায়ী ও একতরফা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এসেছে, যা কূটনৈতিক ভাবে খুবই সীমিত মূল্যবান। গ্রীষ্মকালীন সামরিক অভিযানে রাশিয়ার বাহিনী ফ্রন্টলাইনে অগ্রগতি লাভ করায়, পুতিন এখন বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। এই অবস্থান থেকে তিনি হয়তো আলোচনায় বসবেন, তবে যুদ্ধের সমাধান নিয়ে নয়, বরং নিজস্ব অবস্থান শক্ত করার জন্য।

যদি বৈঠক হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও রাশিয়ার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন। মূল উদ্দেশ্য হবে যুদ্ধের অবসান নিশ্চিত করা। কিন্তু গত মে মাসে ইস্তাম্বুলে একই ফরম্যাট রাশিয়া প্রত্যাখ্যান করেছিল, যা এই ধরনের আলোচনা কতটা সহজ হবে তার ইঙ্গিত দেয়। পুতিন হয়তো ট্রাম্পকে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ঝোঁকাতে চাইবেন, যাতে রুশ দাবিগুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী হয়।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আলোচনা থেকে পাঁচটি সম্ভাব্য পথ সামনে আসতে পারে, যা যুদ্ধের ভবিষ্যত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রথমত, নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বর্তমানে খুবই ক্ষীণ। পুতিন বর্তমানে ফ্রন্টলাইন ধরে রাখতে চাইছেন এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়ে প্রায় অসম্মতি প্রকাশ করেছেন। মে মাসে পশ্চিমা দেশগুলো নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বছরের শুরুতে ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতিও সফল হয়নি। ক্রেমলিন এখন ছোট ছোট সামরিক সাফল্যকে বড় কৌশলগত সুবিধায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাস্তববাদী সমঝোতা ও শীতকালে নতুন আলোচনা হতে পারে। যুদ্ধের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে, ফ্রন্টলাইন ‘ফ্রিজ’ হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যেই রুশ বাহিনী পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকায় দখল বাড়াতে পারে, যা তাদের অবস্থানকে শক্ত করবে। ২০২৬ সালেও যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে অথবা কূটনৈতিকভাবে রাশিয়া স্থায়ী দখলের পথে হাঁটবে। এ সময় ইউক্রেনের নির্বাচনের প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে জেলেনস্কির বৈধতা সংকটে ফেলা হতে পারে এবং রাশিয়াপন্থী প্রার্থীর প্রবেশ ঘটতে পারে।

তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি পশ্চিমা সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকে এবং ইউক্রেন ফ্রন্টলাইনে বড় ছাড় না দিয়ে টিকে থাকে, তাহলে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতি সীমাবদ্ধ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুতিন আলোচনায় বসতে বাধ্য হতে পারেন। ইতিমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো একটি ‘রিএশিউরেন্স ফোর্স’ পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে, যা কিয়েভসহ বড় শহরে নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন কাজে সাহায্য করবে এবং মস্কোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে চাপ দেবে। এটি ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে ভালো সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চতুর্থত, ইউক্রেন ও ন্যাটোর জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় আসতে পারে যদি বৈঠকের পর পুতিন পশ্চিমা ঐক্য ভাঙতে সক্ষম হন এবং রাশিয়া-মার্কিন সম্পর্ক উন্নত হয়। এ অবস্থায় ইউক্রেন একা পড়ে যাবে, কারণ মার্কিন সহায়তা ছাড়া ইউরোপ যুদ্ধের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারবে না। পূর্বাঞ্চলের রুশ অগ্রগতি ইউক্রেনীয় বাহিনীর পতনে পরিণত হতে পারে, যার ফলে কিয়েভও হুমকির মুখে পড়বে। জনবল সংকট ও জেলেনস্কির বড় সেনা মোতায়েনের দাবি দেশীয় রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করবে। ন্যাটো যদি ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দিতে ব্যর্থ হয়, ইউক্রেনের স্বাধীনতা সংকটে পড়তে পারে।

পঞ্চমত, পুতিনের জন্য আফগানিস্তানের মতো বিপর্যয়ের আশঙ্কাও থেকে গেছে। যুদ্ধ চলতে থাকলে ক্রমাগত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় চীন-রাশিয়া সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে, ভারতের বাজারে ক্ষতি হতে পারে এবং রাশিয়ার রিজার্ভ তহবিল শেষ হতে পারে। ক্রমাগত কূটনৈতিক সমাধান প্রত্যাখ্যান করায় মস্কোর অভিজাত মহলে অসন্তোষ বেড়ে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে পশ্চিমা নীতি রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আরো কঠোর হতে পারে। সোভিয়েতদের আফগানিস্তানে আটকে যাওয়া পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি পুতিনের জন্য বিপদজনক হতে পারে।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধবিরতি ও স্থিতিশীলতার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। তবে বৈঠকের ফলাফল কী হবে, তা যুদ্ধের বর্তমান গতি, পক্ষগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক জোটের সমর্থনের ওপর নির্ভর করবে। অনেকেই মনে করছেন, পশ্চিমা জোট ও ইউক্রেনের ঐক্যই এখন সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি, যা যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণ করবে। আর পুতিনের কৌশল ও ট্রাম্পের উদ্যোগ এই সংঘাতের পরবর্তী রূপরেখা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন