Bio-mimicry – প্রকৃতি ও জীবন থেকে অনুপ্রাণিত ডিজাইন

বর্তমান বিশ্বে নকশা বা ডিজাইন একটি শিল্প এবং বিজ্ঞান, যা নান্দনিকতা, কার্যকারিতা এবং স্থায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু এই আধুনিক নকশার ভিত্তি কোথায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে চোখ ফেরাতে হয় প্রকৃতির দিকে। প্রকৃতি তার দীর্ঘ বিবর্তনের মাধ্যমে এমন কিছু কাঠামো, পদ্ধতি ও উপাদান তৈরি করেছে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে কার্যকরী এবং টেকসই নকশার উদাহরণ। এই প্রকৃতির নকশা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মানবজাতির তৈরি নকশার পদ্ধতিকেই বলা হয় বায়ো-মিমিক্রি বা জীব-অনুকরণ। এটি শুধু প্রকৃতির অনুকরণ নয়, বরং প্রকৃতি থেকে শেখার একটি পদ্ধতি, যেখানে প্রকৃতির নিয়মাবলিকে মানবীয় সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানো হয়।

বায়ো-মিমিক্রি কী?

বায়ো-মিমিক্রি শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে, “বায়োস” যার অর্থ জীবন, এবং “মিমেসিস” যার অর্থ অনুকরণ। অর্থাৎ জীবনের অনুকরণের মাধ্যমে নকশা প্রণয়ন। বায়ো-মিমিক্রি হলো একটি উদ্ভাবনী পদ্ধতি, যা কোনো বিশেষ জীবের আকৃতি, গঠন বা প্রক্রিয়া অনুকরণ না করে, বরং প্রকৃতির দীর্ঘ-মেয়াদী স্থিতিশীলতার নীতিগুলো থেকে শিক্ষা নেয়। যেমন, একটি পাখির ডানা দেখে উড়োজাহাজ তৈরি করা বায়ো-মিমিক্রি নয়, কিন্তু পাখির ডানার বায়ুপ্রবাহ এবং লিফট তৈরি করার প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণ করে উড়োজাহাজের পাখা আরও কার্যকরভাবে ডিজাইন করা বায়ো-মিমিক্রি।

বায়ো-মিমিক্রি প্রধানত তিনটি স্তরে কাজ করে। রূপ বা আকৃতি যেমন, শশার পাতায় পানি জমা হওয়ার কৌশল দেখে জলরোধী কাপড় তৈরি করা। প্রক্রিয়া যেমন, গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া অনুকরণ করে সৌরশক্তি দিয়ে কৃত্রিম জ্বালানি তৈরি। বাস্তুতন্ত্র যেমন, কোনো একটি বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি। এই পদ্ধতিটি মূলত একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, কারণ এটি প্রচলিত নকশা পদ্ধতির বিপরীতে কাজ করে। প্রচলিত নকশায় মানুষ প্রায়শই প্রকৃতিকে শোষণ করে, কিন্তু বায়ো-মিমিক্রি প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সমন্বিত ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করে।

প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নকশা তৈরির ধারণাটি মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। প্রাচীন সভ্যতায় মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিল।যেমন, শিকারীরা তাদের শিকার ধরার জন্য গাছের ডাল বা পাতার কৌশল অনুকরণ করত। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি পাখির ওড়ার কৌশল পর্যবেক্ষণ করে উড়োজাহাজের নকশা এঁকেছিলেন, যা ছিল বায়ো-মিমিক্রির একটি প্রাথমিক উদাহরণ।

কিন্তু বায়ো-মিমিক্রিকে একটি সুশৃঙ্খল এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন জীববিজ্ঞানী এবং লেখিকা জ্যানিন বেনিয়াস। ১৯৯৭ সালে তার “Biomimicry: Innovation Inspired by Nature” বইটি এই ধারণার ভিত্তি স্থাপন করে। বেনিয়াস বায়ো-মিমিক্রিকে “প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের একটি নতুন বিজ্ঞান” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। এই বইয়ের পর থেকে বায়ো-মিমিক্রি একটি একাডেমিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্র হিসেবে দ্রুত বিকাশ লাভ করে।

বায়ো-মিমিক্রি নকশা আমাদের চারপাশে অনেক পণ্যে দেখা যায়, যা হয়তো আমরা জানি না। কিছু সফল উদাহরণ দেওয়া হলে –

ভেলক্রো (Velcro): সুইস প্রকৌশলী জর্জ দে মেস্ট্রাল তার কুকুর নিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখেন, বুরডক (burdock) ফলের বীজ তার কাপড়ে এবং কুকুরের লোমে আটকে গেছে। তিনি মাইক্রোস্কোপের নিচে বীজটিকে পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, এতে ছোট ছোট আঁকশি আছে যা কাপড়ের সুতার সাথে আটকে যায়। এই পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি ভেলক্রো আবিষ্কার করেন, যা এখন জুতা, ব্যাগ এবং জামাকাপড়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

বুলেট ট্রেন (Bullet Train): জাপানের বুলেট ট্রেন (শিনকানসেন) যখন প্রথম তৈরি হয়, তখন এটি টানেল থেকে বের হওয়ার সময় প্রচণ্ড শব্দ করত। প্রকৌশলী এইজি নাকাতসু পাখির একটি বিশেষ প্রজাতি কিংফিশারের (kingfisher) শিকার ধরার কৌশল পর্যবেক্ষণ করেন। কিংফিশার পানির নিচে শিকার ধরতে তার তীক্ষ্ণ ঠোঁট ব্যবহার করে, যা অত্যন্ত কম প্রতিরোধ তৈরি করে। এইজি নাকাতসু ট্রেনের সামনের অংশকে কিংফিশারের ঠোঁটের মতো আকৃতি দেন, যা ট্রেনের গতি বাড়ায়, শব্দ কমায় এবং শক্তি সাশ্রয় করে।

শার্কস্ক্রিন প্রযুক্তি (Sharkskin Technology): হাঙ্গরের ত্বক বা চামড়ার পৃষ্ঠে অসংখ্য ছোট ছোট খাঁজ বা ডেন্টিকল (denticles) থাকে, যা পানির প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং শ্যাওলা বা অন্যান্য অণুজীবকে আটকে থাকতে দেয় না। এই কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এক ধরণের বিশেষ সাঁতারের পোশাক তৈরি করা হয়েছে, যা সাঁতারুদের গতি বৃদ্ধি করে। এছাড়াও এই প্রযুক্তি জাহাজের তলদেশে এবং বিমানের গায়ে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ে সহায়তা করে।

লোটাস-ইফেক্ট (Lotus-Effect): পদ্ম ফুলের পাতা জলরোধী এবং এর উপর পানি পড়লে ফোঁটা হয়ে গড়িয়ে যায় এবং একই সাথে ধুলোবালিও পরিষ্কার করে দেয়। এর কারণ হলো পদ্ম পাতার পৃষ্ঠে অতি ক্ষুদ্র স্ফুটিকা রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্ব-পরিষ্কারক রঙ, জলরোধী কাপড় এবং জানালার কাঁচ তৈরি করা হয়েছে।

বায়ো-মিমিক্রি নকশা ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এটি শুধু পণ্য নকশায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং রসায়নেও এর প্রয়োগ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন প্রকৃতির স্থিতিস্থাপক এবং আত্ম-নিরাময় ক্ষমতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন নতুন উপাদান তৈরি করার চেষ্টা করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন