নতুন বৈজ্ঞানিক বোধগম্যতা ও প্রকৌশল কৌশল আমাদের বিস্মিত করে এবং একই সঙ্গে কখনো কখনো শঙ্কিতও করে তোলে। OpenAl সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে তারা এই দশকের মধ্যেই “সুপারইন্টেলিজেন্স” – এমন এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Al) তৈরি করবে, যা মানুষের সক্ষমতাকে অতিক্রম করবে। সেই লক্ষ্যে তারা তাদের কম্পিউটিং সম্পদের ২০% এই ধরনের AI সিস্টেমের আচরণকে মানব মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার জন্য বিনিয়োগ করছে। আমরা প্রায়শই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরুদ্ধে মানবতার লড়াই দেখেছি, যেমন জেমস ক্যামেরনের ১৯৮৪ সালের “দ্য টার্মিনেটর” সিনেমায়। OpenAl এর বর্তমান উদ্যোগ সেই ভীতিকে মোকাবিলা করার প্রচেষ্টারই অংশ। কিন্তু এখানে প্রশ্ন আসে, Al এর বিকাশে দার্শনিকদের কি কোনো ভূমিকা থাকতে পারে? আর এই প্রযুক্তির বিকাশের সাথে প্রাচীন দর্শনের সংযোগ কী?
প্রকৃতপক্ষে Al এর মূল শিকড় দর্শনের মধ্যেই নিহিত। ১৯৫৬ সালে অ্যালেন নিউয়েল ও হার্বার্ট সাইমন “দ্য লজিক থিয়োরিস্ট” নামে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করেছিলেন, যা গণিত ও যুক্তিবিদ্যার জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারত। এই প্রোগ্রামটি আলফ্রেড নর্থ হোয়াইটহেড ও বার্ট্রান্ড রাসেলের বিখ্যাত গ্রন্থ “প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা”-র ধারণার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয়েছিল। আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, জার্মান দার্শনিক গটলব ফ্রেগে আধুনিক যুক্তিবিদ্যার বিকাশে এক বিশাল অবদান রেখেছিলেন। ফ্রেগে যুক্তিতে চলকের ব্যবহার করেন, যা শুধু নির্দিষ্ট বাক্য নয়, বরং সার্বিক চিন্তাভাবনার কাঠামো তৈরি করেছিল। এছাড়া ১৯৩০-এর দশকে কুর্ট গডেল, আলফ্রেড টাস্কি এবং অ্যালান টুরিং-এর গবেষণা Al-এর ভিত্তি স্থাপনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমান AI প্রযুক্তি বিশেষ করে ডিপ লার্নিং, বিশাল পরিমাণ ডেটা প্রক্রিয়াকরণ করে কাজ করে। এই প্রসঙ্গে লুডভিগ ভিটগেনস্টাইনের দর্শন প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তিনি বলেছিলেন, “একটি শব্দের অর্থ তার ব্যবহারের মধ্যে নিহিত”। বর্তমান ভাষাভিত্তিক অও মডেল যেমন ChatGPT ভাষার ব্যবহার বিশ্লেষণ করেই নতুন বাক্য গঠন করে। কিন্তু Al কি আসলেই ভাষা বোঝে? এটি কি চেতনা অর্জন করতে পারে? এগুলো গভীর প্রশ্ন। বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত মস্তিষ্ক থেকে চেতনার উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে পারেনি। কিছু দার্শনিক মনে করেন এটি বিজ্ঞানের এক “কঠিন সমস্যা”, যা দর্শনের সহায়তা ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।
একইভাবে প্রশ্ন ওঠে AI কি সৃজনশীল হতে পারে? ব্রিটিশ জ্ঞানতাত্ত্বিক মার্গারেট বোডেন মনে করেন, যদিও AI নতুন ধারণা তৈরি করতে পারে, এটি মানব সৃজনশীলতার মতো সেই ধারণাগুলোর মূল্যায়ন করতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করেন যে শুধুমাত্র নিউরাল নেটওয়ার্ক ও প্রতীকী যুক্তিবিদ্যার সংমিশ্রণ (নিউরাল-সিম্বলিক আর্কিটেকচার) সত্যিকারের কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা (AGI) অর্জন করতে পারবে। OpenAl-এর লক্ষ্য Al-এর বিকাশকে মানব মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। কিন্তু এটি শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা নয়, সামাজিক চ্যালেঞ্জ। এখানে দার্শনিকদের পাশাপাশি আইনজীবী, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণও জরুরি।
বর্তমানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তি ও গণতন্ত্রের উপর তাদের প্রভাব নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ও লেখক জেমি সাসকিন্ড যুক্তি দিয়েছেন যে আমাদের “ডিজিটাল রিপাবলিক” নির্মাণ করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। Al কীভাবে দর্শনকে প্রভাবিত করবে? আনুষ্ঠানিক যুক্তিবিদ্যার শেকড় অ্যারিস্টটলের দর্শনের মধ্যে রয়েছে। ১৭শ শতকে গটফ্রিড লাইবনিজ পরামর্শ দিয়েছিলেন যে একদিন আমরা “ক্যালকুলাস রেটিওসিনেটর” নামক গণনা মেশিন তৈরি করতে পারব, যা দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান দেবে। আজ Al সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
অনেকে আজ “কম্পিউটেশনাল দর্শন” ধারণার পক্ষে কথা বলছেন, যেখানে দর্শনের বিভিন্ন অনুমান Al-এর মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ পলিগ্রাফস প্রকল্প সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য শেয়ারিং-এর প্রভাব বিশ্লেষণ করে এবং এটি আমাদের মতামত গঠনের ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলে তা বুঝতে সাহায্য করে। Al-তে সাম্প্রতিক উন্নয়ন দর্শনের জন্য নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একইভাবে দর্শনের পুরনো ধারণাগুলোও আধুনিক Al গবেষণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ভবিষ্যতে Al ও দর্শন একে অপরকে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করবে, যা মানব সভ্যতার জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।


