একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষভাগে এসে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কেবল শিল্প ও অর্থনীতির রূপ বদলে দিচ্ছে না, বরং মানুষের জীবনের মূল কাঠামো, পরিচয় ও আত্মবোধকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিস্তার একদিকে যেমন কর্মদক্ষতা ও উদ্ভাবন বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে মানবসমাজে গভীর বিভাজন, আতঙ্ক এবং সৃজনশীলতার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মাইক্রোসফট, ম্যাচ গ্রুপসহ একাধিক আন্তর্জাতিক টেক জায়ান্ট ঘোষণা করেছে, তারা AI প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করছে। এই সিদ্ধান্তগুলো এমন এক সময় এসেছে যখন বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব, কর্মসংস্থান নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে চলেছে।
এই ছাঁটাই কেবল চাকরি হারানোর পরিসংখ্যান নয়—এটি একটি সামাজিক বার্তা। এটি বলে দিচ্ছে যে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার আর আগের মতো থাকবে না। যারা প্রথাগত দক্ষতায় দক্ষ, তারা হয়ত এই প্রযুক্তি-নির্ভর পরিবেশে নিজেদের স্থান খুঁজে পাচ্ছেন না। এখানে কেবল প্রযুক্তির দক্ষতা নয়, বরং ‘প্রযুক্তি সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা’ই হয়ে উঠছে টিকে থাকার পূর্বশর্ত।
এই পরিস্থিতি একটি ভয়াবহ প্রশ্ন —”কোন শ্রেণির মানুষ টিকে থাকবে?” যদি স্বল্প বা মাঝারি দক্ষতাসম্পন্ন চাকরিগুলো AI দখল করে নেয়, তবে মধ্যবিত্ত শ্রেণি একরকম অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এর মানে দাঁড়ায়, সমাজে এক নতুন শ্রেণি-সংগ্রাম শুরু হয়েছে—যেখানে মানুষের কর্মক্ষমতা নয়, বরং তার প্রযুক্তিসম্পৃক্ততা-ই শ্রেণির সূচক হয়ে উঠছে।
অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, নিজেকে প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনা করার চাপ, এবং “অপ্রয়োজনীয় মানুষ” হয়ে পড়ার ভয়—এই তিনটি উপাদান আজকের সমাজে এক নতুন মানসিক রোগতত্ত্বের জন্ম দিচ্ছে। গবেষণা বলছে, AI ও অটোমেশনের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের মধ্যে অনাস্থা, নিঃসঙ্গতা ও কর্মহীনতাজনিত বিষণ্নতা বাড়ছে।
Hotmail-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাবির ভাটিয়া সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন—যখন AI কবিতা লিখে, প্রবন্ধ তৈরি করে, এমনকি দর্শনের যুক্তিও তৈরি করে ফেলতে পারে, তখন মানুষ করবে কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় মানবিকতার দিকে। একটি যন্ত্র নিখুঁত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কোড লিখতে পারে, এমনকি “অনুকরণে” সৃজনশীলতা দেখাতেও পারে—কিন্তু তার মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা নেই, নেই দুঃখ, প্রেম, বা বিবেক। সাবির ভাটিয়া তাই বলেন, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে মানুষ যদি কেবল প্রযুক্তির দাসে পরিণত হয়, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য, সৃজনশীলতা, ও মানবিক অনুভবের স্থান কোথায় থাকবে?
তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, যেখানে শুধুমাত্র টেকনো-দক্ষতা নয়, বরং ‘মৌলিক চিন্তা’, ‘সমালোচনামূলক বোধ’, ও ‘সৃজনক্ষমতা’ কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া বা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে AI বিপ্লব এসেছে উন্নত বিশ্বের ছাঁচে গড়া কাঠামো নিয়ে—যেখানে শ্রমসাশ্রয়ী অটোমেশন মানে কর্মসংস্থান হ্রাস। এসব দেশে যেখানে এখনও শিক্ষার মান, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো দুর্বল, সেখানে AI হয়ে উঠতে পারে এক ভয়ঙ্কর বৈষম্যজন্মদাতা।
গার্মেন্টস বা কল-সেন্টারভিত্তিক শিল্প যদি অটোমেশনের কারণে মানুষের বদলে যন্ত্র ব্যবহার শুরু করে, তাহলে কয়েক লাখ মানুষ এক রাতেই কর্মহীন হতে পারে। এই বিপদ উন্নত দেশে প্রযুক্তির রূপান্তর হলেও, উন্নয়নশীল দেশে তা হয়ে দাঁড়াতে পারে ‘সামাজিক রসদ হারানোর’ আর্থিক ও নৈতিক বিপর্যয়।
এই সংকটময় চিত্রের মাঝে একটি আশার আলোও রয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) ২০২৫ সালে নতুন তিনটি “চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কেন্দ্র” প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কেন্দ্রগুলো মানবকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের রূপরেখা তৈরিতে কাজ করবে।
এই পদক্ষেপটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি স্বীকার করে—প্রযুক্তি মানেই উন্নয়ন নয়, যদি সেটি মানুষকে বাদ দিয়ে এগোয়। এখানে প্রশ্ন প্রযুক্তির নয়, বরং প্রযুক্তির পরিচালনার। কে পরিচালনা করবে এই বুদ্ধিমত্তাকে লোভ না নৈতিকতা?
বিশেষত নারীদের, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুদের প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি সমাজকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। WEF-এর নীতিমালা তাই সমাজকে নতুনভাবে চিনতে ও গড়তে শেখায়, যেখানে প্রযুক্তির গতি নয়, মানুষের গুণই হবে মূল সূচক।
এই অবস্থার প্রেক্ষিতে আমাদের সমাজের সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে,মানুষ কি কেবল কর্মক্ষমতা দিয়ে মূল্যায়িত হবে? আমরা কি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি যেখানে মানুষ তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য? উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কি পৃথক নীতিনির্ধারণ জরুরি নয়?
প্রযুক্তি কখনোই সমাজের বাইরের কোনো শক্তি নয় বরং এটি আমাদের চাহিদা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতির প্রতিফলন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সমাজে যে পরিবর্তন আনছে, তা কেবল প্রযুক্তিগত নয়, নৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অস্তিত্বগতও। আমরা চাইলে AI-কে এমন এক শক্তিতে রূপ দিতে পারি, যা সমাজে অন্তর্ভুক্তি ও সমতা আনে, আবার এটিকে এমন এক অস্ত্রও বানাতে পারি, যা মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে। প্রশ্নটা তাই প্রযুক্তির নয়, আমাদের ইচ্ছার।


