ADHD – মনোযোগের সমস্যা থেকে সামাজিক সচেতনতা

আপনি কি কখনো এমন কাউকে চেনেন, যে একসাথে দশটা কাজ শুরু করলেও একটাও শেষ করতে পারে না? কিংবা এমন শিশু, যাকে আপনি এক মিনিটের জন্যও শান্তভাবে বসাতে পারেন না? এমন মানুষদের ঘিরে আমাদের সমাজে একটা ধারণা গড়ে উঠেছে “ও খুব দুষ্ট”, “মন বসে না”, “মনোযোগের অভাব”। কিন্তু এই আচরণগুলো কখনো কখনো মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি বৈজ্ঞানিক সমস্যার অংশ হতে পারে, যার নাম ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder) বা মনোযোগ ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তা ব্যাধি।

ADHD কী?

ADHD হলো এক ধরনের নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, অর্থাৎ মস্তিষ্কের বিকাশগত একটি সমস্যা। এটি সাধারণত শৈশবে শুরু হয়, কিন্তু অনেক সময় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এর লক্ষণ রয়ে যায়। এই সমস্যা প্রধানত তিন ধরনের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, মনোযোগে ঘাটতি (Inattention), অতিসক্রিয়তা (Hyperactivity) ও আচরণগত উচ্ছৃঙ্খলতা (Impulsivity)।

ADHD থাকা মানেই কেউ “অসফল” বা “বিচ্ছিন্ন” নয়। বরং সঠিক বুঝে এবং সহায়তায় ADHD ব্যক্তিরা নিজেদের জীবনে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে পারে। তবে তার আগে আমাদের দরকার বোঝা এই অবস্থার শিকড় ঠিক কোথায়?

ADHD নতুন কোনো রোগ নয়। ১৯০২ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক Sir George Still প্রথম এই ধরণের আচরণকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। তবে তখনও এটিকে নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে DSM (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders)-এর মাধ্যমে ADHD একটি স্বীকৃত মানসিক ব্যাধি হিসেবে পরিচিতি পায়। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) সহ আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো ADHD-কে একটি বৈধ ও গবেষণাভিত্তিক নিউরোলজিকাল সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করেছে।

শিশুদের মধ্যে ADHD:

. মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা

. নিয়মিত জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা

. শিক্ষক বা বড়দের কথা মাঝপথে কেটে দেওয়া

. অতিরিক্ত দৌড়াদৌড়ি বা নড়াচড়া

. অপেক্ষা করার ধৈর্য না থাকা

. প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ADHD:

. অনেক কাজ শুরু করে কোনোটা শেষ না করা

. সময় ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা

. সম্পর্ক বা পেশাগত জীবনে স্থিরতা না থাকা

. আত্ম-আলোচনা বা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

. খুব স্বাভাবিক বিষয়ে নার্ভাস ফিল করা

. সারাক্ষণ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা

ADHD হওয়ার পেছনে জেনেটিক (genetic) এবং নিউরোকেমিক্যাল (neurochemical) কারণই মূলত দায়ী। গবেষণায় দেখা গেছে, ADHD রোগীদের মস্তিষ্কের ডোপামিন এবং নরএপিনেফ্রিন নামক নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। এদের প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স (যা পরিকল্পনা, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী) যথাযথভাবে কাজ করে না। পারিবারিক ইতিহাস, গর্ভাবস্থায় ধূমপান/মাদক সেবন, কম জন্ম ওজন এবং নির্দিষ্ট পরিবেশগত বিষক্রিয়া ADHD হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আমাদের সমাজে ADHD নিয়ে অনেক ভুল ব্যাখ্যা চালু আছে, যেমন:
“এটা অলসতার অজুহাত।”

“শিশুরা বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে।”

“ADHD মানেই মানসিক রোগী।”

“চিন্তাভাবনার সমস্যা নয়, অভ্যাসের সমস্যা।”

এসব ভুল ধারণা ADHD রোগীদের প্রতি সহানুভূতির পরিবর্তে বিরূপ মনোভাব তৈরি করে। ফলে শিশুরা অবহেলার শিকার হয়, প্রাপ্তবয়স্করা চাকরি বা সম্পর্কে সমস্যায় পড়ে।

ADHD নির্ণয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একক পরীক্ষা নেই। মূলত DSM-5 গাইডলাইনের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা ইতিহাস, আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবক বা শিক্ষকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয় করেন।

চিকিৎসা সাধারণত তিনটি ভাগে বিভক্ত :

ঔষধ (Medication): যেমন: মেথাইলফেনিডেট, অ্যামফেটামিন, যা মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা স্বাভাবিক করতে সহায়তা করে।

বিহেভিয়ার থেরাপি: বিশেষত শিশুদের জন্য কার্যকর। এর মাধ্যমে আচরণ নিয়ন্ত্রণ শেখানো হয়।

শিক্ষা ও পারিবারিক সহায়তা: ADHD সম্পর্কে বাবা-মা ও শিক্ষকদের সঠিক জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে ADHD নিয়ে সচেতনতা অত্যন্ত সীমিত। বেশিরভাগ অভিভাবক এটিকে “দুষ্টামি”, “শাসনের অভাব” বা “পড়ালেখায় অমনোযোগিতা” হিসেবে দেখেন। ফলে শিশুদের অবস্থা আরও জটিল হয়। ঢাকা শহরের কিছু মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ADHD সংক্রান্ত নির্ণয় ও থেরাপি চালু থাকলেও তা অধিকাংশ অঞ্চলে নেই। স্কুল পর্যায়ে ADHD নিয়ে কোনো প্রশিক্ষণ বা নীতিমালা নেই। ফলে অনেক শিশু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ে।

একটি ADHD-যুক্ত ব্যক্তি শুধুমাত্র একটি “problem case” নয়, বরং তারা একেকজন divergent thinker যারা সঠিক সহায়তায় ভিন্নরকম সমাধান খুঁজে পেতে পারে। এমন বহু উদাহরণ আছে যেখানে ADHD-যুক্ত ব্যক্তিরা সফল উদ্যোক্তা, শিল্পী, উদ্ভাবক হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন।সমাজ যদি ADHD-কে “ব্যতিক্রমী মস্তিষ্ক” হিসেবে বুঝে, তাহলে সে সমাজ আরও সহানুভূতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী হতে পারে।

ADHD কোনো অলসতা নয়, কোনো দুষ্টামিও নয় এটা এক ধরনের বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত নিউরো-বৈচিত্র্য। তাই প্রশ্ন উঠছে, ADHD-কে আর “বাজে অভ্যাস” না বলে, একটি বৈধ পার্থক্য হিসেবে দেখতে আমরা কি প্রস্তুত?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন