বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত শুধুমাত্র পরিবেশ, কৃষি কিংবা ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক এক গবেষণা আমাদের সামনে এনেছে এক গভীর উদ্বেগের চিত্র, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে স্তন ক্যানসার ও ডিম্বাশয় ক্যানসারের মতো নারীবিশেষ রোগগুলোর মৃত্যুহার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে বলে জানাচ্ছে এই গবেষণা।
২০২৫ সালের মে মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস নিউজ হেলথ বিভাগে প্রকাশিত এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও পরিবেশতত্ত্ববিদ। গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীদের মধ্যে ক্যানসারজনিত মৃত্যুহারের একটি বিস্ময়কর সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষত যেসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গ্রীষ্মপ্রধান এবং তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, সেখানে এই হার অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রা নারীর দেহে হরমোনাল ভারসাম্য ও কোষীয় কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব স্তনের টিস্যু ও ডিম্বাশয়ের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও নারীর স্বাস্থ্য এই দুই বিষয়ের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। কিন্তু গ্রীষ্মের ক্রমাগত দীর্ঘায়ন, ঘন ঘন হিটওয়েভ এবং পরিবেশে দূষণের মাত্রা বাড়তে থাকায় মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শরীরে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বাড়ে, যা ক্যানসারের কোষ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুমাত্র জৈবিক প্রভাব নয়, বরং সমাজ-অর্থনীতিক স্তরেও নারীরা বেশি ঝুঁকিতে। জলবায়ু সংকটের ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীরা স্বাস্থ্যসেবার বাইরে পড়ে যান, যাদের সময়মতো স্ক্রিনিং বা চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ কম। ফলে তাঁদের মধ্যে মৃত্যুহারও বেশি।
আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে নারীস্বাস্থ্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে। এসব অঞ্চলের নারীরা যেসব পেশায় নিযুক্ত, যেমন কৃষিকাজ, নির্মাণ শ্রম কিংবা গৃহস্থালি কাজ—সেগুলোর সঙ্গে উচ্চ তাপমাত্রার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারীদের এই অংশ সবচেয়ে আগে ও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতের জলবায়ু নীতিতে নারীর স্বাস্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রথমত নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত গবেষণায় জলবায়ু ফ্যাক্টর অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত স্বাস্থ্যসেবা ও স্ক্রিনিং প্রোগ্রামকে তাপদূষণ-সংবেদনশীল এলাকাগুলোর জন্য আলাদাভাবে ডিজাইন করতে হবে। তৃতীয়ত নারীবান্ধব পরিবেশনীতি প্রণয়ন ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় নেই। জলবায়ু সংকট এখন আর কেবল গলছে-বরফ কিংবা উঠছে-সাগরের গল্প নয়। এটি এখন মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে।


