“… সরকার, রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যে মতভিন্নতা তৈরি হয়েছে, সেটা কমেনি। কার্যত সব পক্ষ যার যার অবস্থানে অনড়। এমন অবস্থায় যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও কঠিন করে তুলতে পারে।
নির্বাচনের রোডম্যাপ (পথনকশা) ঘোষণা করা নিয়ে সরকারের সঙ্গে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের দূরত্বের কথাও জনপরিসরে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোর মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
… গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন—এ নিয়ে প্রারম্ভিক আলোচনায় ভিন্নমতের কথা শোনা যায়। শুরু থেকে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দূরত্ব বা ভুল–বোঝাবুঝির একটা কারণ বলে অনেকে মনে করেন। অতীতের কিছু ঘটনাও সন্দেহ–অবিশ্বাস তৈরিতে ভূমিকা রাখে বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বিতর্কিত মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতারা কীভাবে দেশ ছেড়ে পালালেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন, দোষারোপ ছিল এবং আছে।
পুলিশ বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থার কারণে মাঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের যুক্ত রাখা হচ্ছে কি না, সেটা নিয়েও ভেতরে-ভেতরে আলোচনা ছিল। … শুরু থেকে রাজনীতির মাঠের বর্তমান অংশীজনদের মধ্যে একটা চাপা দূরত্ব ও মতভেদ, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমেনি; বরং ক্রমেই বেড়েছে।
… আবদুল হামিদের দেশত্যাগের ঘটনার চার দিনের মাথায় ১২ মে হঠাৎ সেনানিবাসকেন্দ্রিক একধরনের উত্তেজনা ও নিরাপত্তা জোরদারের খবর আসে জনপরিসরে এবং তা বেশ আলোড়ন তোলে। কিছু বিষয় গুজব আকারেও সামাজিক মাধ্যমে আসে। তখন এমন খবরও নানাভাবে প্রচার পায় যে, সরকারের ভেতর থেকে সেনাপ্রধানকে সরানোর চিন্তা বা চেষ্টা হচ্ছে। যদিও সরকার বা সেনাবাহিনী কোনো পক্ষ থেকেই এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি।
এমন একটা পরিস্থিতিতে ২০ মে দেশের ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি’ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তাঁর সরকারি বাসভবন যমুনায় উচ্চপর্যায়ের একটি বৈঠক হয়। তাতে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীর প্রধানেরাসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। ওই বৈঠকের আগে বা পরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানদের আলাদা বৈঠক হয় বলে আলোচনা আছে। তবে সরকারি সূত্র থেকে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
… সেনাপ্রধানের এমন বক্তব্যকে ভিন্নমতের ইঙ্গিত হিসেবে দেখেন অন্তর্বর্তী সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, প্রধান উপদেষ্টা বলে আসছেন, ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। এ ছাড়া করিডর, বন্দর, সংস্কারসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়েও সেনাপ্রধান যা বলেছেন তার সঙ্গে বিএনপির বক্তব্য ও দাবির অনেকাংশে মিল রয়েছে। ফলে বিএনপি ও সেনাপ্রধানের মধ্যে একধরনের বোঝাপড়া রয়েছে কি না, বিভিন্ন মহলে সেই আলোচনাও আছে।
… সর্বশেষ সরকারের ভেতরের বিভিন্ন সূত্র থেকে যতটা জানা যাচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টা তাঁর অবস্থানে অটল রয়েছেন। তিনি একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে চান। চাপ তৈরি করে যেনতেন নির্বাচন করানোর পরিস্থিতি তৈরি হলে তিনি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অনেকে মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাবাহিনী এবং প্রধান ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হওয়ায় অনিশ্চয়তা গভীর হয়েছে। দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, সেনাবাহিনী, বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতসহ অন্যদের মধ্যে একটা আস্থার সম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি।…”


