ক্যান্সার চিকিৎসায় – ফেইথ হিলিং !!!

বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসা, অর্থাৎ ঈশ্বর, আত্মিক শক্তি বা অলৌকিক প্রার্থনার মাধ্যমে রোগ নিরাময়ের চর্চা দীর্ঘকাল ধরে মানব সভ্যতার অংশ।কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান যেখানে ক্যান্সারের মতো জটিল রোগের প্রতিকার খুঁজছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, ওষুধ ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে, সেখানে কিছু গোষ্ঠী আজও এই প্রাণঘাতী রোগের “অলৌকিক নিরাময়”-এর দাবিতে মানুষকে প্রভাবিত করছে। এই দাবিগুলো শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে নয়, বরং একধরনের সংগঠিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা কন্সপিরেসি থিওরি গড়ে তুলেছে যার লক্ষ্য হতে পারে জনমত নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক লুট এবং কখনো কখনো আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়া।

বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসকদের মতে, ক্যান্সার কোনো “শারীরিক রোগ” নয়, বরং তা আত্মিক দুর্বলতা, ঈশ্বরের অবাধ্যতা বা শয়তানের প্ররোচনার ফসল। তাই এই রোগের নিরাময় একমাত্র সম্ভব প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি এবং অলৌকিক উপায়ে। ১৯৬০-৮০ দশকে আমেরিকায় এমন বহু “Faith Healer” জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যারা বিশাল স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষের সামনে ক্যান্সার “সেরে যাওয়ার” মিরাকল দেখাতেন। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব “সুস্থ” মানুষ কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন।

অন্যদিকে ক্যান্সার একটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কোষগত সমস্যা। এর চিকিৎসায় প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ডায়াগনোসিস, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন বা অস্ত্রোপচার। গবেষণাগার, গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ছাড়া এই রোগের প্রতিকার কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা থাকা সত্ত্বেও কেন মানুষ এখনো বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসার দিকে ঝুঁকে পড়ে?

Faith Healing ও ক্যান্সার নিরাময় নিয়ে কন্সপিরেসি থিওরির মূল ভিত্তি হলো, “আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যান্সারের প্রকৃত নিরাময় গোপন রাখছে, যাতে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো কোটি কোটি ডলার আয় করতে পারে।” এই ধারণার প্রচারকরা দাবি করেন যদি মানুষ বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসার দিকে ঝোঁকে এবং অলৌকিক নিরাময় পায়, তাহলে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

এছাড়া Faith Healer-দের একটি অংশ নিজেরাই দাবী করেন তারা বিভিন্ন বিকল্প হার্বাল রেমেডি বা “ডিভাইন ফর্মুলা” ব্যবহার করে ক্যান্সার সারিয়ে তুলছেন, কিন্তু “মেডিক্যাল মাফিয়া” তাদের দমন করে রাখছে। কিছু থিওরিস্ট দাবি করেন যারা সত্যিকারের চিকিৎসা আবিষ্কার করেছেন তাদের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে বা তারা নিখোঁজ হয়েছেন।

একটি বিখ্যাত নাম হচ্ছে ড. গ্যাস্টন নেস, একজন কানাডিয়ান ডেন্টিস্ট যিনি “714-X” নামক একটি তথাকথিত ক্যান্সার চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের দাবি করেছিলেন। কিন্তু তার এই চিকিৎসা কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পায়নি এবং কানাডিয়ান সরকার তা অবৈধ ঘোষণা করে।

একইভাবে রিক সিম্পসন নামের এক ব্যক্তি “Cannabis oil” দ্বারা ক্যান্সার নিরাময়ের দাবি করেন এবং বলেন যে ওষুধ কোম্পানিগুলো তার আবিষ্কারকে ধ্বংস করতে চায়। কিছু কেস স্টাডি ক্যানাবিস উপাদানের কিছু উপকার দেখালেও পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার নিরাময়ে এটি আজও অপ্রমাণিত।

ধর্মীয় বিশ্বাস না কৌশলী প্রতারণা?
বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসকরা প্রায়শই এমন মানুষের কাছে যান যারা হতাশ, দারিদ্রপীড়িত, কিংবা চিকিৎসা খরচ বহন করতে অপারগ। তারা তাদের “সুবিধাজনক” বার্তা দেন, আপনার ক্যান্সার সেরে যাবে, শুধু ঈশ্বরের উপর আস্থা রাখুন। কেউ কেউ আর্থিক অনুদান বা “বিশ্বাসের বীজ বপন”-এর নামে অর্থ দাবি করেন। এখানে “বিশ্বাস” আসলে হয়ে ওঠে একটি বাজারজাতকরণ কৌশল। এই প্রেক্ষাপটে Faith Healing আর ধর্ম নয়, বরং হয়ে দাঁড়ায় একধরনের এক্সপ্লয়টেশন বা প্রতারণা—যেখানে ক্যান্সারের ভয়কে পুঁজি করে একজন মানুষের বিশ্বাস ও আর্থিক সামর্থ্যকে ব্যবহার করা হয়।

এই কন্সপিরেসির আরও এক ভয়ংকর দিক হলো ভিকটিম ব্লেমিং। যখন কোন রোগী “বিশ্বাস রেখেও” সুস্থ না হন, তখন তাদেরই দোষারোপ করা হয়, তাদের বিশ্বাস যথেষ্ট ছিল না, ঈশ্বরের উপর আস্থা কম ছিল। এতে একদিকে রোগীর মানসিক অবস্থা ভেঙে পড়ে, অন্যদিকে Faith Healer নিজে দায়মুক্ত থাকেন।

ক্যান্সার একটি জটিল রোগ। এর চিকিৎসা এবং গবেষণা এখনও চলমান এবং অনেকাংশে সফল। কিন্তু এরই ফাঁকে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্ম, বিশ্বাস ও কল্পনার মিশেলে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে, এবং তাদের সামনে “আশার আলো” দেখিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্যান্সার নিরাময়ে অলৌকিকতা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানবিক সহানুভূতি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন