গত কয়েক দশকে নিজেদের মধ্যে হওয়া একাধিক সংঘর্ষে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একে অন্যের বিরুদ্ধে উন্নত মানের যুদ্ধবিমান, প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করেছে। কিন্তু মে মাসে টানা চার দিনের সংঘর্ষে প্রথমবারের মতো নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ ব্যাপকভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে ড্রোন ব্যবহার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর প্রতিবেশী ওই দেশ দুটির মধ্যে সংঘর্ষ থামে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার এ দুই শক্তি এখন ড্রোনকে ঘিরে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে। রয়টার্সের নেওয়া দুই দেশের নিরাপত্তা কর্মকর্তা, শিল্প নির্বাহী, বিশ্লেষকসহ ১৫ জনের সাক্ষাৎকারে এমন তথ্য উঠে এসেছে। ভারত ও পাকিস্তান গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে।
এ মাসে ভারত জরুরি সামরিক সরঞ্জাম কিনতে প্রায় ৪৬০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। এ তথ্য দুজন শিল্প-বিশ্লেষকও নিশ্চিত করেছেন। অর্থাৎ ভারত জরুরিভিত্তিতে বড় অঙ্কের সামরিক কেনাকাটা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ বিষয়ে অবগত দুজন ভারতীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত তহবিলের কিছু অংশ যুদ্ধ ও নজরদারিতে ব্যবহৃত ড্রোনের জন্য বরাদ্দ করার পরিকল্পনা করছে ভারতের সামরিক বাহিনী।
অন্যদিকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী আরও বেশি ইউএভি সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যাতে তাদের মূল্যবান উন্নত প্রযুক্তির বিমানগুলো ঝুঁকিতে না পড়ে। এমন তথ্য জানিয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি পাকিস্তানি সূত্র।
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা জেনেসের ওইশি মজুমদার বলেন, চীন ও তুরস্কের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে দেশীয় ড্রোনের গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করবে পাকিস্তান।
কিংস কলেজ লন্ডনের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ল্যাডউইগ বলেছেন, ‘ভারত ও পাকিস্তান ড্রোন হামলাকে বড় ধরনের উত্তেজনা ছড়ানো ছাড়াই সামরিক চাপ প্রয়োগের একটি উপায় হিসেবে দেখছে বলে মনে হচ্ছে।’
ল্যাডউইগ বলেন, ইউএভিগুলো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এগুলো ব্যবহার করে কোনো দেশ তাদের শক্তি দেখাতে পারে, নিজেদের জনগণকে সন্তুষ্ট রাখতে পারে, আবার বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি ছাড়া শত্রুপক্ষকে চাপে রাখতে পারে। তবে এ ধরনের সংঘর্ষ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। কারণ, বিতর্কিত বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন পাঠালে ভুলক্রমে বড় ক্ষতি হতে পারে।
দুই পাকিস্তানি সূত্র জানায়, পাকিস্তান তুরস্কের ইহা-৩ ও অ্যাসিসগার্ডের সোনগার ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত রাষ্ট্রায়ত্ত গ্লোবাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ডিফেন্স সলিউশনের তৈরি শাহপার-৩ ড্রোন ব্যবহার করে পাকিস্তান।
একটি ভারতীয় ও দুটি পাকিস্তানি সূত্র অনুসারে, ভারত পাকিস্তানের আকাশসীমায় ইসরায়েলি হারপ (আত্মঘাতী ড্রোন), পোলিশ ওয়ারমেট (ক্ষুদ্রাকৃতির আত্মঘাতী ড্রোন) ও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ইউএভি) পাঠিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি ইউএভি সামরিক ও ‘সন্ত্রাসী’ ঘাঁটিতে নির্ভুলভাবে হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন দুই ভারতীয় কর্মকর্তা।
এখন যুদ্ধের ধরন বদলাচ্ছে। আগের মতো দামি যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র না পাঠিয়েও এখন অনেক কম খরচে বেশি কার্যকরভাবে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা যাচ্ছে ড্রোন ব্যবহার করে।
অনেক ড্রোন ধ্বংস হওয়ার পরও উভয় পক্ষই দ্বিগুণ উদ্যমে প্রস্তুতি নিচ্ছে। দুই দেশ তাদের ড্রোনগুলোকে ইলেকট্রনিক যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য হিসেবে গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করছে।


