দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোল্ড ওয়ার (স্নায়ুযুদ্ধ) ছিল শুধু একটি সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এটি ছিল একটি অব্যাহত লড়াই, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র (USA) এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) একে অপরের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে বিজ্ঞান, গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রোপাগান্ডার যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোল্ড ওয়ারের প্রথম বড় পরিসরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল স্পেস রেস। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তেজিত করে এবং ফলে ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ মিশনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চাঁদে মানুষ পাঠায়। একই সময়ে, পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যেখানে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েতরা প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চমকে দেয় এবং পরে উভয় দেশই হাইড্রোজেন বোমার (H-bomb) প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যায়।
কোল্ড ওয়ার ছিল তথ্য সংগ্রহ এবং গুপ্তচরবৃত্তিরও এক কঠিন প্রতিযোগিতা। ঈওঅ (USA) এবং কএই (USSR) দুটি ছিল শীর্ষ গুপ্তচর সংস্থা। ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কিম ফিলবি সোভিয়েতদের ডাবল এজেন্ট হয়ে বহু গোপন তথ্য সরবরাহ করেছিলেন।অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ট-২ স্পাই প্লেন ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নজরদারি চালায়, কিন্তু ১৯৬০ সালে গ্যারি পাওয়ারসের বিমান ভূপাতিত হলে সম্পর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এছাড়া, আলড্রিচ আমেস (CIA) এবং রবার্ট হ্যানসেন (FBI) দীর্ঘদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করেছিলেন।
কোল্ড ওয়ারের ইতিহাসে প্রোপাগান্ডা ছিল এক শক্তিশালী যুদ্ধ। দুই পরাশক্তি নিজেদের মতবাদ প্রচারের জন্য গণমাধ্যম, সিনেমা, রেডিও ইত্যাদি ব্যবহার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র “Radio Free Europe” এবং “Voice of America” চালু করে সোভিয়েত-শাসিত দেশগুলোতে গণতন্ত্রের বিভিন্ন বার্তা প্রচার করত, আর সোভিয়েত ইউনিয়ন “Radio Moscow”-এর মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের প্রচার করত। হলিউডে বহু অ্যান্টি-কমিউনিস্ট সিনেমাগুলো, যেমন “Red Dawn” তৈরি হয়েছিল, যেখানে সোভিয়েতদের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হতো, এবং সোভিয়েত সিনেমাগুলোতে পশ্চিমা বিশ্বকে ত্রাস এবং সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে দেখানো হতো।
কোল্ড ওয়ারের সর্ববৃহৎ বড় মাইলফলক ছিল কিউবা মিসাইল সংকট (১৯৬২), যেখানে সোভিয়েতরা কিউবায় পারমাণবিক মিসাইল স্থাপন করেছিল, যা বিশ্বজুড়ে পরমাণু যুদ্ধের হুমকি তৈরি করেছিল। কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০-১৯৫৩) এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৫) কোল্ড ওয়ারের সামরিক মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কমিউনিজমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লড়াই করছিল মানুষ।
আজকের বিশ্বে কোল্ড ওয়ারের মতো “স্পেস রেস” এবং প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা চীন, ভারত, এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলছে। সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রেও রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে সমান তালে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং ফেক নিউজ প্রোপাগান্ডার আধুনিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে, যা বিশ্ব রাজনীতির মতো পরিস্থিতিকেও হুমকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া, পারমাণবিক অস্ত্রের আধিপত্য প্রদর্শনের জন্য রাশিয়া উত্তর কোরিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো সর্বক্ষণ তৎপর রয়েছে, যা কোল্ড ওয়ারের পরবর্তী মোড় হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে।


