” … জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য শক্তিশালী জনমুখী বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কোন দল ক্ষমতা গ্রহণ করবে, তা নিয়ে খুব বেশি অনিশ্চয়তা না থাকলেও অনিশ্চয়তা রয়েছে প্রধান বিরোধী দল নিয়ে।
নির্বাচনের পর অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনেরও একটা আলোচনা আছে। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল কারা হবে এবং কতটা শক্তিশালী হবে। বিরোধী দল ছাড়া কিংবা দুর্বল বিরোধী দল থাকা অবস্থায় জাতীয় সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করলে যে দেশে আবারও একটি একচেটিয়া শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে না, তার কী নিশ্চয়তা?
… শুধু সাংবিধানিক সংস্কার দিয়ে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকানো যাবে না, সংস্কারকৃত সংবিধান মেনে চলার মতো রাজনৈতিক সংস্কৃতিও লাগবে।
আবার কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের দল প্রধান বিরোধী দল হবে, সেটা নিয়েও প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা আছে। সম্ভাব্য মধ্য ডানপন্থী সরকারি দল বা জোটের বিপরীতে যদি কোনো ডানপন্থী দল বা জোট শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, তাহলে মধ্যপন্থী দলটি আরও ডান দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বা জোট যদি বামপন্থী বা মধ্য বামপন্থী দলের জোট হয়, তাহলে মধ্য ডানপন্থী সরকারি দল বা জোট বাধ্য হবে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর জোর দিতে।
বাংলাদেশে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির ব্যাপক শূন্যতা রয়েছে। একসময় অনেকে আওয়ামী লীগকে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দল ভেবে সমর্থন দিয়েছেন। যদিও আওয়ামী লীগ কখনোই তা ছিল না। গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর দলটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়েছে।…এ রকম একটি অবস্থায়, যাঁরা সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক ভেবে একসময় আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁরা কাকে সমর্থন দেবেন?
চারদিকে উগ্র ডানপন্থার হাওয়া। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একদিকে যখন রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন বন্দোবস্তের আলাপ চলছে; অন্যদিকে তখন ধর্মীয়-লিঙ্গীয়-জাতিগত বিভাজন উসকে দেওয়া উগ্রবাদী পরিচয়ের রাজনীতি জোরদার হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে সেক্যুলার ডেমোক্রেটিক শক্তির দীর্ঘদিনের শূন্যতা আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে। বামপন্থীরা আছেন, কিন্তু নানান বিভক্তি ও দুর্বলতার কারণে জোটবদ্ধ হয়ে জনগণের সামনে শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে দাঁড়াতে পারছেন না।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় বামপন্থীরা ধর্ম ও জাতিগত বিভাজনের ডানপন্থী রাজনীতিকে অগুরুত্বপূর্ণ করে দিয়ে মূলত অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে মানুষের মন জয় করেছেন। শ্রীলঙ্কার অ্যাকটিভিস্ট ও তাত্ত্বিকদের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, তাঁরা এককথায় অর্থনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী এজেন্ডাকেই বামপন্থী দিশানায়েকের নেতৃত্বাধীন এনপিপি জোটের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
বাংলাদেশে এ রকম কোনো জোটবদ্ধ তৎপরতা ও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। উত্তরণকালে কে কী করছেন বা করছেন না, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ সময়ের একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা বা না করার ফল সবাইকে বহুদিন ভোগ করতে হয়।”


