“আজকে জামাত সেক্রেটারি বলছেন, একাত্তরের স্বাধীনতা প্রকৃত স্বাধীনতা নয়। জামাত এইসব বইলা সেই পুরনো ডিনায়লিজমের রাজনীতিই করতে চায়। জেনোসাইড বা এইধরনের মাস ভায়োলেন্সের অস্বীকারের প্রবণতা সামাজিক পরিসর ও রাজনৈতিক পরিসরে যে অস্থিতিশীলতা ও ক্ষেত্রভেদে সহিংসতার প্রেক্ষাপট তৈরি করে, তা আমরা দেখেছি। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকেই। জামায়াত এখনো সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে নাই। একাত্তর নিয়ে বিএনপির যে অবস্থান আজকে, এইটা তাদের সবসময়ের অবস্থান।… স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র তৈরি, জামুকার প্রতিষ্ঠা – মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন প্রচুর কাজ আসলে বিএনপির আমলে হয়েছিল। এবং, আজকে তাদের যে অবস্থান, তা শুনতে যতই আপনার কাছে লীগের মতো শোনাচ্ছে, কিন্তু সেটাই তাদের অবস্থান হওয়ার কথা। একেবারে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই বিএনপি গঠিত। একাত্তরের জেনোসাইড ও রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে রয়েছে।
নতুনরা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ম্যাডিকেল শিফট ঘটাইতে চান, বা মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ক্রিটিক্যাল অবস্থান তৈরি করতে চান, সেটা একাত্তরের প্রজন্মের দ্বারা প্রায় অসম্ভব। এইটা জেনারেশনাল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মোটাদাগে একাত্তরের প্রজন্ম দ্বারা চালিত দলগুলো প্রায় একই অবস্থান যে নিবে, তা খুব সহজেই অনুমেয়। তাদের মধ্যে গেঞ্জাম লাগে আসলে কার অবদান কতটুকু সেই জায়গায়, বা কে কতটুকু দলীয় ইতিহাস তৈরি করে ফেলছে, সেইটা নিয়া গেঞ্জাম। মুক্তিযুদ্ধের বেসিক প্রেমিসিস নিয়ে তাদের কারোর মধ্যেই কোনো আপত্তি নেই। থাকার কথাও না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়া সিপিবির অবস্থানও প্রায় সমানই দেখবেন। মোটাদাগে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই দলসমূহের অবস্থান দেখে আপনার মনে হতে পারে, তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেছে, কিন্তু সেটা আদতে ভুল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের সবার রাজনীতিই আসলেই এক। জামাত যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এইটা তারা প্রায় সবাই মানেন, কিন্তু তারা রাজনীতি করবে কিনা, কীভাবে করবে, এইটা নিয়া তাদের মধ্যে বিরাট মতপার্থক্য। মুজিব জিয়া ভাসানী কারে গুরুত্ব দিবো, কতটুকু দেব, তা নিয়ে হামেশা তর্ক চলতে থাকলেও, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে তারা সবাই একই অবস্থান নিবেন। আওয়ামী লীগের আমলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উৎকট দলীয় উদযাপন, এবং এই ইস্যুতে তাদের গলার সুর এতো উচুতে ছিল, সে কারণেই এই অবস্থানগুলো আমার আপনার কাছে কমজোর লেগেছে। এখন আওয়ামী লীগ নেই, ফলে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়া মেইনস্ট্রিম সুরটা তাদেরই। এটাকে কেবল আওয়ামী লীগের রাজনীতির অবশেষ হিসাবে দেখাটা উচিৎ হবে না।
আবার খেয়াল করে দেখেন, আজকে সিপিবি বলছেন, ‘৪৭ আর ‘৭১ পরস্পরবিরোধী হওয়ায় এ দুটো একসঙ্গে ধারণ করা সম্ভব নয়। এইটা কিন্তু আমাদের ইতিহাসের মেইনস্ট্রিম ভাবনা। এটা দেখানো সম্ভবও (আমার অপ্রকাশিত এক প্রবন্ধে দেখিয়েছিও), ৪৭ ও ৭১-কে পরষ্পরবিরোধী হিসাবে দেখাটা আসলে কলকাতার দৃষ্টিভঙ্গি। কিন্তু আমাদের এখানে অজস্র নজির আছে, যেগুলো দিয়ে দেখানো সম্ভব, ৪৭ ও ৭১ আসলে পরষ্পরবিরোধী নয়, বরঞ্চ এই জনগোষ্ঠীর তৎপরতা ও সক্রিয়তার ধারাবাহিকতা। আবুল মনসুর আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, কামরুদ্দিন আহমদ সহ অনেকের লিটারেচার দিয়েই এটা প্রমাণ করা সম্ভব। কিন্তু, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যে এইটা বলতে পারলেন, এতো কনফিডেন্টলি, কারণ এই বয়ানটাই মেইনস্ট্রিম, আশির দশক থেকেই।
ফলে, আমরা এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এনসিপির নাহিদ আজকে বলছেন, ৪৭কেও নিতে চান, ৭১কেও নিতে চান, চব্বিশকেও নিতে চান। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী হিসাবে তিনটাকেই নিতে পারাটা খুব জরুরি। মানে, তিনটা ইভেন্টকে পরষ্পরবিরোধী হিসাবে না দেখে ধারাবাহিকতা আকারে দেখা যেতে পারে। কিন্তু নাহিদ যখন পোস্টার বানান, তখন ৪৭-এ নেতাদের ছবি ইউজ করেন, চব্বিশে পরিচিত শহীদদের ছবি ইউজ করেন, কিন্তু ৭১-এ কোনো পরিচিত কারো ছবি ইউজ করেন না। কারণ, বোঝা যায়, একাত্তরে যারা/যিনি মূলনায়ক ছিলেন, তার দলই পরবর্তীতে স্বৈরশাসন কায়েম করে, এবং চব্বিশের সহিংসতার জন্য দায়ী। ফলে, স্বাভাবিক অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু এতে আবার ঐতিহাসিক বিভ্রাট ঘটতেছে। একাত্তরের চরিত্ররা বিমূর্ত হয়ে উঠছে। বর্তমানই ইতিহাস এর একটা নজির হতে পারে এই ঘটনা। এই কারণেই বলছিলাম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন দিনগুলোতে ‘ইতিহাস’ আরও বিবাদমান ইস্যুতে পরিণত হতে যাচ্ছে। … বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে আরও নতুন সন্ধিক্ষণে। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী হিসাবে ৪৭, ৭১, ২৪ এগুলোকে সমান না কইরাও এগুলোকে ধারাবাহিক সক্রিয়তা আকারে দেখার তারুণ্য দরকার। …”


