হারিয়ে যাওয়া ছায়া নাচের গল্প

শ্যাডো পাপেট্রি বা ছায়া পুতুলের নাটক চীনের অন্যতম প্রাচীন লোকশিল্প। শত শত বছর ধরে এটি শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং সামাজিক বার্তা, ঐতিহাসিক কাহিনি ও আধ্যাত্মিক ভাবনার বাহক হিসেবেও কাজ করত। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ, চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল বিনোদনের ব্যাপক বিস্তারের ফলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। এই শিল্পের উৎপত্তি হান রাজবংশের (২০২ খ্রিস্টপূর্ব -২২০ খ্রিস্টাব্দ) সময় থেকে। চীনা কিংবদন্তি অনুসারে, সম্রাট হান উডি তার প্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে গভীর শোকে মুষড়ে পড়েছিলেন। এক রাজকীয় যাদুকর তখন চামড়ার তৈরি পুতুলের সাহায্যে তার স্ত্রীর ছায়া তৈরি করে এক বিশেষ নাট্য প্রদর্শন করেন। এই ছায়া দেখে সম্রাটের মনে হয় যেন তার স্ত্রী জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে। এখান থেকেই ছায়া পুতুলের নাটকের সূচনা হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।

প্রথমদিকে ছায়া পুতুলের চরিত্রগুলো পাতলা চামড়া কেটে তৈরি করা হতো এবং রঙিনভাবে সাজানো হতো। এরপর এগুলোকে একটি সাদা পর্দার সামনে রেখে পেছন থেকে আলো ফেলা হতো, যাতে ছায়াগুলো জীবন্ত মনে হয়। সাধারণত পৌরাণিক কাহিনি, বৌদ্ধ গল্প ও যুদ্ধের মহাকাব্য ছিল এই নাটকের প্রধান বিষয়বস্তু। ছায়া পুতুলের নাটকের স্বর্ণযুগ ছিলো সুং রাজবংশের সময়কালে (৯৬০-১২৭৯ খ্রিস্টাব্দ)। এই সময় ছায়া পুতুল নাটক চীনে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। বিভিন্ন গ্রামে এটি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। মিং ও চিং রাজবংশের (১৩৬৮-১৯১২ খ্রিস্টাব্দ) সময়ে ছায়া পুতুল নাটকের আকার তুলনামূলক বড় হয় এবং নাটকের বিষয়বস্তু আরও সমৃদ্ধ হয়।

এর মধ্যে শেডো পাপেট্রি শুধু চীনেই নয়, কোরিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী “Wayang Kulit” এবং ভারতের “তোগলু বোম্মালাতা” নাটকের শেকড়ও এই চীনা ছায়া পুতুলের শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একসময় মানুষেষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল লোকনাট্য। কিন্তু এখন সিনেমা, টেলিভিশন ও ডিজিটাল কনটেন্ট মানুষের প্রধান বিনোদন হয়ে উঠেছে। ছায়া পুতুলের নাটক এখন শিশুদের কাছেও আকর্ষণ হারিয়েছে। একসময় চীনা রাজারা ও শাসকেরা এই শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন, কিন্তু আধুনিক চীনে একে সেভাবে আর সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।

একটি ভালো শেডো পাপেট্রি দলের জন্য আলাদা মঞ্চ ও সরঞ্জাম প্রয়োজন, যা ব্যয়বহুল। অনেক দল এই খরচ বহন করতে পারে না, ফলে তারা পেশা বদলে নিচ্ছে। ইউনেস্কো ২০১১ সালে চীনের শেডো পাপেট্রিকে ‘Intangible Cultural Heritage’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিছু চীনা বিশ্ববিদ্যালয় ও নাট্যগোষ্ঠী শিক্ষার্থী ও দর্শকদের এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। ডিজিটাল মিডিয়া ও অ্যানিমেশনের সাহায্যে নতুন আঙ্গিকে ছায়া পুতুলের গল্প বলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায় এই নতুন রূপ কি সত্যিকারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি এটি কেবল নস্টালজিয়ার একটি ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে?



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন