কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI আমাদের ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে চলেছে। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘নেক্সাস’-এ তথ্য নেটওয়ার্কের বিবর্তন এবং Al-এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। হারারি ব্যাখ্যা করেছেন মানব সভ্যতা শুরু থেকেই বিভিন্ন তথ্য নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল। পাথরের ফলক থেকে শুরু করে প্যাপিরাসের পাণ্ডুলিপি, মুদ্রণযন্ত্র থেকে ইন্টারনেট, প্রতিটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বারবার আমাদের সমাজের কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করেছে। তথ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা গল্প, বিশ্বাস এবং জ্ঞান ভাগ করে নিয়েছি, যা আমাদের সহযোগিতা ও উন্নতির অন্যতম মূল ভিত্তি।
বর্তমানে AI এমণ একটি তথ্য নেটওয়ার্ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে এবং নতুন ধারণা তৈরি করতে সক্ষম।হারারি এটিকে “এলিয়েন ইন্টেলিজেন্স” বা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমত্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন এটি মানবিক সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত এবং আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। Al-এর এই স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে গণতন্ত্র, অর্থনীতি এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
গণতন্ত্রের উপর প্রভাবের বর্ণনা দিতে গেলে Al-এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে হ্রাস করতে পারে। যখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি মানুষের বোঝার বাইরে থাকা অ্যালগরিদম দ্বারা নেওয়া হয়, তখন নাগরিকদের পক্ষে সেগুলো চ্যালেঞ্জ করা বা পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হতে পারে এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের উত্থানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এতে করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যও তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করেছেন হারারি। AI-এর অগ্রগতির ফলে উন্নত দেশগুলো আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। কারণ তারা এই প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে তাদের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। অপরদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
হারারি উল্লেখ করেছেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে চীন ও উত্তর আমেরিকা যৌথভাবে অও থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মুনাফার ৭০% নিজেদের কারায়ত্ত করে নিতে পারবে। AI-এর মাধ্যমে তৈরি করা কনটেন্ট এবং তথ্যের বিস্তার আমাদের সামাজিক সম্পর্ক ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। হারারি উদাহরণ হিসেবে মিয়ানমারে ফেসবুকের অ্যালগরিদম দ্বারা ঘৃণামূলক বক্তব্যের প্রচার এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উল্লেখ করেছেন। এটি দেখায় অও কিভাবে তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজে বিভাজন ও সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে। হারারি জোর দিয়ে বলেছেন, Al-এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় আমাদেরকে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন মানবজাতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো Al-এর অগ্রগতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং এটি যাতে কেবল আমাদের সেবাতেই ব্যবহৃত হয় সেই নিশ্চয়তা প্রদান করা। এজন্য প্রয়োজন তথ্যের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া।
সারসংক্ষেপে, ‘নেক্সাস’ গ্রন্থে ইউভাল নোয়া হারারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন তথ্য নেটওয়ার্কের বিবর্তন আমাদের সমাজকে গঠন করেছে এবং AI-এর উত্থান আমাদের ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সুতরাং, আমাদেরকে সচেতনভাবে এবং যৌথভাবে এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুফল নিয়ে কাজ করতে হবে, যাতে এটি মানবজাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।


