সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে, তবে এটি নিম্নমুখী : সেলিম রায়হান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের অর্থনীতিতে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল, তার মধ্যে মূলত ব্যাংকিং খাতে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেছে। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে, রিজার্ভ বেড়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে ডলার বিক্রি করতে হয়নি। ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম দূর করার উদ্যোগও দেখা গেছে। তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেছে। প্রধান কারণ হলো বিনিয়োগের প্রবাহে ধীরগতি, যা সরাসরি চাকরির বাজার ও সাধারণ মানুষের আয়ের উপর প্রভাব ফেলছে। নতুন শিল্প বা প্রকল্প না হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় না, বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ কমাতে গিয়ে ছাঁটাই শুরু করে, ফলে আয় সংকুচিত হয়। শেয়ারবাজারেও এই ধাক্কা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতার কারণে আমদানি ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ওষুধ, কাঁচামাল ও জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তি তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার কমেছে, তবে এটি পুরোপুরি মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না। সামগ্রিক অর্থনীতিতে মূলত ব্যবস্থাপনাগত স্থিতিশীলতা দেখা গেলেও বাস্তব অর্থনৈতিক সংস্কার বা প্রবৃদ্ধি তেমন চোখে পড়েনি।

জন মেনার্ড কেইনসের তত্ত্ব অনুযায়ী, বিনিয়োগই অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। যখন ব্যবসায়ীরা আস্থাহীন হয়ে বিনিয়োগ কমিয়ে দেন, তখন তার মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উৎপাদন কমে, কর্মসংস্থান হ্রাস পায় এবং ভোগব্যয় সংকুচিত হয়। শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শ্রমবাজারের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা, ব্যবসায়িক পরিবেশের অবনতি ও কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে অনেকেই শ্রমবাজার থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ কমে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর বহু কারখানা বন্ধ হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়েছেন। গাজীপুরের শ্রমিকরা এমন পরিস্থিতিতে অস্থায়ীভাবে সবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

দারিদ্র্যের হারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পিপিআরসির তথ্য অনুযায়ী, আন্ডারএমপ্লয়মেন্ট বা ছদ্মবেকার অবস্থায় কর্মজীবীর সংখ্যা বেশী।মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক প্রভাবের কারণে বাস্তব মজুরি বৃদ্ধির হার কম, ফলে ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে আরও ৩০ লাখ মানুষ অতিদরিদ্রের মধ্যে পড়বেন। ২০২৪ সালে এটি ছিল ৭.৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে বাড়তে গিয়ে ৯.৩ শতাংশে পৌঁছাবে।

প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর্মসংস্থান, আয়ের সুযোগ ও ভোগব্যয় সবই সংকুচিত হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯৭ শতাংশে নেমে গেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে তুলনামূলকভাবে খুব কম। প্রবৃদ্ধির ধীরগতি কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলে; নতুন শিল্প বা ব্যবসা গড়ে ওঠে না, বেতন বৃদ্ধি রোধ হয় এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় হ্রাস পায়। এর ফলে সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, দারিদ্র্য বেড়ে যায় এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

মূল্যস্ফীতির দিকেও এখনও সমস্যার ছাপ আছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৫৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের দাম এখনও বেশি। বিশেষত চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনে প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। সবজির দামও বৃষ্টির কারণে বাড়ছে, যা ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

মূলধনি পণ্যের আমদানি কমেছে। বাংলাদেশে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য শিল্প উপকরণের আমদানি যথেষ্ট কমেছে। ফলে উৎপাদন, আধুনিকীকরণ ও নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। এই ধীরগতির কারণে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি কমছে এবং বিদেশি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক সেলিম রায়হান মন্তব্য করেছেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে, তবে এটি নিম্নমুখী।বিনিয়োগ খুব সীমিত, নতুন প্রকল্প আসছে না এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত না হলে এই ধীরগতি অব্যাহত থাকবে।

বিনিয়োগ অর্থনীতির প্রাণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া অর্থনীতি পুনরায় গতিশীল হওয়া কঠিন।স্থিতিশীলতা ফিরলে নতুন প্রযুক্তি ও মূলধনি যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন শিল্প ও ব্যবসা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে। অন্যথায় বাংলাদেশ স্থবির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে আটকে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন